বাংলাদেশ

গৃহযুদ্ধের পথে কি ইসরাইল?

২৪ আগস্ট ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তেলআবিবের সমুদ্রতীরে ইতজেল জাদুঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ‘আলতালেনা’ জাহাজের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারের কথা বলেন। ডানপন্থি ইহুদি আধাসামরিক সংগঠন ইতজেলের মালিকানাধীন এই জাহাজটি ১৯৪৮ সালে সদ্য গঠিত ইসরাইলি সেনাবাহিনীর গোলাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

নেতানিয়াহু প্রতিশ্রুতি দেন, জাহাজটি সমুদ্রের তলদেশ থেকে তুলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি প্রতীকে পরিণত করা হবে। সেই প্রতীকের মূল বার্তা হবে—‘আর কখনো গৃহযুদ্ধ নয়।’

ইংরেজিতে ইরগুন নামে পরিচিত ইতজেল ছিল অত্যন্ত জাতীয়তাবাদী ইহুদি রাজনৈতিক সংগঠন। ইসরাইল প্রতিষ্ঠার আগে সংগঠনটি স্বাধীন সশস্ত্র বাহিনী হিসেবে কাজ করত। নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরও তারা নিজেদের অস্ত্র ও স্বায়ত্তশাসন নতুন সরকারের হাতে তুলে দিতে অনাগ্রহী ছিল।

১৯৪৮ সালের জুনে ইতজেলকে নতুন ইসরাইলি সেনাবাহিনীর সঙ্গে একীভূত করার প্রক্রিয়া চলার সময় ‘আলতালেনা’ জাহাজটি ৯০০-এর বেশি অভিবাসী, চিকিৎসাসামগ্রী এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র নিয়ে ইসরাইলে আসে। অস্ত্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে ইতজেল ও সরকারের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। একপর্যায়ে সেই বিরোধ সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়।

তেলআবিবের উত্তরে প্রথম দফা সংঘর্ষের পর জাহাজটি শহরটির দিকে এগিয়ে যায়। তৎকালীন বামপন্থি প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়ন তেলআবিবের উপকূলে জাহাজটিতে গোলাবর্ষণের নির্দেশ দেন। জাহাজে থাকা ইতজেল নেতা মেনাখেম বেগিন তার অনুসারীদের পালটা হামলা না চালানোর আহ্বান জানান এবং গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা সম্পর্কে সতর্ক করেন।

ইসরাইলের ডানপন্থিদের কাছে ‘আলতালেনা’ এখনো এমন একটি ঘটনার প্রতীক, যেখানে বামপন্থিরা রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেদের দেশের ইহুদিদের বিরুদ্ধেও শক্তি প্রয়োগ করতে প্রস্তুত ছিল।

ঘটনাটি দীর্ঘদিন ঐতিহাসিক ক্ষোভের বিষয় হয়ে থাকলেও ইসরাইলের রাজনৈতিক জীবনে এটি কখনো স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়নি। কয়েক দশক ধরে এটি মূলত একটি প্রতীকী ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবেই ছিল। কিন্তু নির্বাচনি প্রচারের মাঝামাঝি সময়ে জাহাজটির ধ্বংসাবশেষ নতুন করে সামনে আসায় পুরোনো সেই প্রতীকও আবার আলোচনায় এসেছে।

নেতানিয়াহু বেগিনের ‘গৃহযুদ্ধ নয়’ সতর্কবার্তা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বামপন্থিদের বিরুদ্ধে ডানপন্থিদের পুরোনো অভিযোগও সামনে এনেছেন। এর মধ্যে শুধু ঐক্যের আহ্বান নয়, একটি পরোক্ষ রাজনৈতিক বার্তাও রয়েছে—অতীতের ঘটনা আমরা ভুলিনি।

তাহলে কি সত্যিই গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা আছে?

বাস্তবে ইসরাইল গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম। এর একটি বড় কারণ হলো, দেশটির জনগণের মধ্যে মৌলিক কিছু বিষয়ে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ইসরায়েলি সমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী অভিন্ন বিশ্বাস হলো নিরাপত্তা।

ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক জীবনে নিরাপত্তাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হয়। ইসরাইলি রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে ইহুদিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে বিবেচনা করা হয়। এর সঙ্গে প্রতিবেশী জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ভূখণ্ড ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতাও যুক্ত।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার পর ইসরাইলের নিরাপত্তা নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। শান্তি বা স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ধারণার পরিবর্তে যেকোনো সময়, যে কোনো স্থানে এবং নিজেদের পছন্দমতো সামরিক অভিযান পরিচালনার সক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ইসরাইলের বিভিন্ন ইহুদি রাজনৈতিক দল এ বিষয়ে মূলত একই অবস্থানে রয়েছে। তাদের মধ্যে সামরিক শক্তি প্রয়োগের পরিধি বা কৌশল নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু ইহুদি আধিপত্য বজায় রাখা, অধিকৃত ভূখণ্ডের দখল অবসানের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঐকমত্য রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ইসরাইলের দখলদারত্বকে অবৈধ বলে রায় দিলেও দেশটির মূলধারার রাজনীতিতে দখলদারত্ব অবসানের প্রশ্নটি গুরুত্ব পায়নি। বরং নিরাপত্তার যুক্তিতে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার প্রবণতাই শক্তিশালী হয়েছে।

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকলেও নীতিতে ঐকমত্য

ইসরাইলের সাধারণ মানুষের একটি অংশ প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত নৈতিকতা, আচরণ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে অসন্তুষ্ট হতে পারেন। কিন্তু তার সরকারের সামরিক ও নিরাপত্তা নীতির প্রতি জনসমর্থন তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত।

ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের আলোচনায় দেখা যায়, কয়েক হাজার মানুষের প্রতিবাদ থাকলেও বিপুলসংখ্যক ইহুদি নাগরিক দেশটির বর্তমান নিরাপত্তা ও সামরিক নীতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন। ফলে রাজনৈতিক বিভাজন থাকলেও তা এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি, যা সশস্ত্র গৃহযুদ্ধের দিকে যেতে পারে।

এই ঐকমত্য ঐতিহাসিক ‘আলতালেনা’ ঘটনার প্রতীকের চেয়েও শক্তিশালী। ইসরাইলি সেনাবাহিনী দেশটির জাতীয়তাবাদী পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই দেশটির রাজনৈতিক বিভাজন যতই তীব্র হোক, সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের মৌলিক আদর্শে যে ঐকমত্য রয়েছে, সেটিই গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনাকে দূরে রাখছে।

ফলে ‘আলতালেনা’ নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হলেও ইসরাইল শিগগিরই গৃহযুদ্ধের পথে যাচ্ছে—এমন আশঙ্কার বাস্তব ভিত্তি খুব বেশি নেই। যতদিন ইহুদি আধিপত্য ও নিরাপত্তা ইসরাইলি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে, ততদিন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাত সশস্ত্র গৃহযুদ্ধে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা সীমিতই থাকবে।

সূত্র: আলজাজিরা

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension