নিউ ইয়র্কযুক্তরাষ্ট্র

৯/১১-পরবর্তী ইসলামোফোবিয়া থেকে নিউইয়র্কে মুসলিম রাজনৈতিক জাগরণ

হোসনেআরা চৌধুরী:

৯/১১-এর সন্ত্রাসী হামলার পর নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের যে বৈষম্য, নজরদারি ও হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়েছিল, তা এক প্রজন্মের মধ্যে নতুন ধরনের রাজনৈতিক ও নাগরিক সচেতনতার জন্ম দেয়। গত ২৫ বছরে সেই সচেতনতা ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে সংগঠিত নাগরিক অধিকার আন্দোলন ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে।

৯/১১-পরবর্তী সময়ে ইসলামোফোবিয়ার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিউইয়র্কের মুসলিম তরুণদের একটি অংশকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হতে উদ্বুদ্ধ করে। যারা একসময় বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছিলেন, তাদেরই অনেকে পরবর্তীতে নাগরিক অধিকার, অভিবাসন ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

এই সময়ে মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী সম্প্রদায়ের ওপর সরকারি নজরদারি এবং নানা ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়। মসজিদ, শিক্ষার্থী সংগঠন ও মুসলিম মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে নজরদারির অভিযোগও সামনে আসে। এসব অভিজ্ঞতা মুসলিম কমিউনিটির মধ্যে নিজেদের অধিকার ও রাজনৈতিক শক্তি সম্পর্কে নতুন উপলব্ধি তৈরি করে।

নাগরিক অধিকার আন্দোলনের পাশাপাশি ধর্মীয় পরিচয়ের স্বীকৃতির দাবিও জোরালো হতে থাকে। নিউইয়র্কের পাবলিক স্কুলে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাকে ছুটির দিন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে মুসলিম সংগঠনগুলোর দীর্ঘ আন্দোলন তার অন্যতম উদাহরণ। বিভিন্ন ধর্মীয়, জাতিগত ও শ্রমিক সংগঠনের সমর্থনে গড়ে ওঠা বৃহত্তর জোটের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার পর ২০১৫ সালে নিউইয়র্ক সিটির পাবলিক স্কুল ক্যালেন্ডারে দুই ঈদকে ছুটির দিন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

একই সময়ে মুসলিম ভোটারদের রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করার উদ্যোগও জোরদার হয়। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত Muslim Democratic Club of New York মুসলিম ভোটার নিবন্ধন, ভোটারদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন করা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এর ফলে নিউইয়র্কের রাজনীতিতে মুসলিম নেতৃত্বের উপস্থিতিও ক্রমশ দৃশ্যমান হতে থাকে। দীর্ঘদিনের তৃণমূল সংগঠন, নাগরিক অধিকার আন্দোলন ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতায় মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব স্থানীয় রাজনীতি থেকে নগর প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

এই পরিবর্তনের প্রতীকী দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। একসময় ৯/১১-পরবর্তী ভয়, সন্দেহ ও বৈষম্যের কারণে যেসব মুসলিম পরিবার নিজেদের পরিচয় নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল, তাদেরই পরবর্তী প্রজন্ম আজ নিউইয়র্কের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিসরে নেতৃত্ব দিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, এটি শুধু মুসলিম সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক উত্থানের গল্প নয়; বরং নিউইয়র্কের বহুজাতিক ও বহুধর্মীয় সমাজে নাগরিক অধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং প্রতিনিধিত্বের পরিবর্তিত বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি।

৯/১১-এর পর যে অভিজ্ঞতা একটি প্রজন্মকে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি দিয়েছিল, দুই দশকের বেশি সময় পর সেই অভিজ্ঞতার ভেতর থেকেই তৈরি হয়েছে সংগঠন, নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের নতুন অধ্যায়। নিউইয়র্কের মুসলিম কমিউনিটির এই যাত্রা তাই একই সঙ্গে বেদনা, প্রতিরোধ এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের এক দীর্ঘ ইতিহাস।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension