
আটলান্টার পরিচিত মুখ কবি গোলাম রহমানের জীবনাবসান
রূপসী বাংলা ডেস্ক: বাংলাদেশ সফর শেষে আটলান্টায় ফিরে আসার পর অসুস্থ হয়ে দুই সপ্তাহের মধ্যে মৃত্যুবরণ করলেন জর্জিয়ার প্রিয়মুখ নিবেদিতপ্রাণ প্রবীণ কবি গোলাম রহমান ( ইন্নালি…রাজেউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়েস হয়েছিল ৮৬ বছর।
জীবদ্দশায় মরহুম রহমান ৫ পুত্র, ৫ কন্যা, নাতি নাতনীসহ অসংখ্য বন্ধু, স্বজন ও শুভানুধ্যায়ী রেখে যান।
প্রয়াত গোলাম রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র জর্জিয়া বাংলাদেশ সমিতির সাবেক সভাপতি মিন্টু রহমান জানান, গত ৭ আগস্ট তারিখে বাংলাদেশ থেকে আটলান্টায় ফিরে আসার দুইদিনের মধ্যে তিনি অসুস্থ বোধ করলে গত ৯ আগস্ট তারিখে তাঁকে ইস্ট সাইড হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। ডাক্তারদের সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানানো হয়। এছাড়া আগে থেকেই ডায়েবেটিক, হৃদরোগ ও কিডনি সমস্যার কারনে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় ক্রমশই তাঁর শারীরিক অবনতি হতে থাকে এবং গতকাল সোমবার ভোর ১ টা ৩০ মিনিটে তাঁর জীবনাবসান হয়।

কবি গোলাম রহমান ওরফে গোলাম রহমান সরকার ১৯৩৩ সালের ১ জানুয়ারি নরসিংদী জেলার সররাবাদ গ্রামে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম জমশেদ আলি সরকার ও মাতার নাম আমেনা খাতুন। বাবা মার দুই পুত্র ও এক কন্যার মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ সন্তান। ১৯৫১ সালে মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজ থেকে তিনি স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন।
মরহুমের পুত্র কন্যাদের মধ্যে জর্জিয়া বাংলাদেশ সমিতির সাবেক সভাপতি ও জর্জিয়া আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জ্যেষ্ঠ সন্তান মিন্টু রহমান ও তাঁর পত্নী সমিতির সাবেক সভাপতি নাদিরা রহমান, মোশারফ হোসেন ও গোলাম তারেক আটলান্টায় থাকেন। এক কন্যা নিউ ইয়র্কে ও এক কন্যা কানাডায় এবং তিন কন্যা ও এক পুত্র বাংলাদেশে থাকেন। এক কানাডা প্রবাসী পুত্র ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে গত বছর মারা যান। মরহুমের সহধর্মিণী দুই বছর আগে ইন্তেকাল করেন।
মিন্টু বলেন, “বাবা মুলত আমার ওই মারা যাওয়া ভাইয়ের স্ত্রী-সন্তানদের দেখার টানেই ছুটে গিয়েছিলেন দেশে। এতিম বাচ্চাদের খোঁজ খবর নেয়া ও ওই সংসারের সাচ্ছন্দ ফিরিয়ে আনার একটি স্থিতিশীল ব্যবস্থা করে দিতেই গিয়েছিলেন তিনি। এরপরও উনার আরও কিছু কাজ ছিল সেখানে। বিভিন্ন সময়ে লেখা কবিতাগুলির বই প্রকাশেরও একটা ইচ্ছা ছিল তাঁর”।
মিন্টু আরও জানান, তাঁর বাবা অনেক ভালো এবং ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন দেশে। নিজের প্রতিষ্ঠিত স্কুল ও কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটি তাঁকে সম্বর্ধনা দিয়েছে। দীর্ঘদিনের দেখা না পাওয়া অনেক বন্ধু আত্মীয়স্বজনের দেখা পেয়েছেন। মূলত পুরো সময়টাতে এতটাই ব্যস্ত ও এক্সাইটেড ছিলেন যে, সময়মত ওষুধ পত্র খাননি, খাবার দাবারেও ছিল অনিয়ম। সব মিলিয়েই শরীর তাঁর শুকিয়ে গিয়েছিল। পরে আমিই ভাই বোনদের বলেছি, আটলান্টায় পাঠিয়ে দিতে যদিও তাঁর আরও একমাস পরে আসার কথা ছিল।

ছাত্রজীবন থেকেই গোলাম রহমান তেভাগা আন্দোলনের সৈনিক হিসেবে মেহনতি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। স্কুল জীবনে তিনি কৃষকদের ভাত কাপড়ের আন্দোলনে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেছেন। পরবর্তীকালে কলেজে পড়ার সময় থেকে ক্ষেত মজুর সমিতির অন্যতম সংগঠক হিসেবে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। কবিতায় হাতে খড়ি ছিল তাঁর শৈশব থেকে।
আটলান্টা থেকে ২০১৫সালে বাংলাধারা কর্তৃক সর্বপ্রথম আলোকিত মানুষ হিসেবে আজীবন সম্মাননা পদক পান কবি গোলাম রহমানএকাত্তর সালে ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সেই ভাষনের মধ্য দিয়ে দেশকে স্বাধীন করার আন্দোলনে উজ্জীবিত হয়েছিলেন। নিজে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে না পারলেও নিজের ১৫ বছরের সন্তান মিন্টু রহমানকে রণাঙ্গনে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সেসময় পুত্রকে বলেছিলেন, ‘দেশ স্বাধীন করতে পারলে বাড়ী আসিস’। নয়মাসের যুদ্ধকালীন সময়ে তাঁর লেখালেখি থেমে থাকেনি। তার অপ্রকাশিত ৪টি বইয়ের পান্ডুলিপি বদর-রাজাকার বাহিনীর ভয়ে লুকিয়ে রেখেছিলেন গ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়িতে। দেশ স্বাধীন হলে মিন্টু বিজয়ীর বেশে মুক্ত মাটিতে ফিরে এলেও তিনি তাঁর লুকিয়ে রাখা পাণ্ডুলিপি আর ফিরে পান নি। এরপরও তাঁর লেখালেখি ছিল অব্যাহত।

১৯৯২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাস জীবনে আসার পর থেকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে কবিতা লিখে গেছেন তিনি। প্রয়াত এই কবির কবিতার সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। তার অধিকাংশ কবিতা নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ঠিকানা, বাংলা পত্রিকা, এখন সময়, সাপ্তাহিক বর্ণমালাসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। আটলান্টা থেকে প্রকাশিত অন লাইন পোর্টাল জর্জিয়া বাংলা ডট কমে গত কয়েক বছরে তাঁর বেশ কয়েকটি কবিতা প্রকাশিত হয়েছে।
২০০৯ সালে ঢাকার বিশাকা প্রকাশনী থেকে কবির দুইটি কবিতার বই “ভালবাসা” ও “এসো যুদ্ধের ময়দানে” প্রকাশিত হয়।
২০১৫ সালে বাংলাধারার পক্ষ থেকে গোলাম রহমান আলোকিত মানুষ হিসেবে আজীবন সম্মাননা পদকে ভূষিত হন। আটলান্টা থেকে তিনিই ছিলেন এধরনের বিরল সম্মাননা প্রাপ্তির প্রথম গুণী ব্যক্তি। আটলান্টার সর্বস্তরের মানুষের সাথে খুবই আন্তরিক ছিলেন তিনি। লেখালেখির সাথে সম্পৃক্ত কবি, লেখক, সাংবাদিকদের সাথে তাঁর ছিল মধুর সম্পর্ক।

গোলাম রহমানের মৃত্যুর খবরটি ফেস বুক, ইমেইল ও টেক্সটিং এর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আটলান্টার বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের ছায়া নেমে আসে। সোমবার বিকেলে দুই ঘণ্টার জন্যে মরহুমকে এক নজর দেখার জন্যে ফিউনারেল হোমে ব্যবস্থা করে দেয়া হয়।
আজ মঙ্গলবার জোহর নামাজের পর লরেন্সভিলস্থ ইসলামিক ইন্সটিটিউট মসজিদে মরদেহের জানাজা সম্পন্ন হয় এবং একই মসজিদের নিজস্ব গোরস্থানে সমাহিত করা হয়। জর্জিয়া রাজ্যের অসংখ্য বাংলাদেশিসহ অন্যান্য অভিবাসী মুসল্লীগণ জানাজায় অংশ নেন। মরহুমের আত্মার মাগফেরাত কামনায় দোয়া করার জন্যে সকল প্রবাসী মুসলমানদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছে পরিবারের পক্ষ থেকে।



