আন্তর্জাতিক

আফগানিস্তানের নারী স্বাধীনতা: আগের অবস্থায় তালেবান

আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পাঁচ দিন না যেতেই আবার আগের চেহারায় ফিরছে তালেবান। নতুন করে শুরু করেছে নারী নিপীড়নের পুরোনো অত্যাচর। বাড়ি বাড়ি ঢুকে খাবার চাচ্ছেন। রান্নায় অপারগতা জানালে পুড়িয়ে মেরে ফেলছে নারীদের। শুধু তাই নয়, রান্না খারাপ হলেও একই পদ্ধতিতে মেরে ফেলা হচ্ছে তাদের। এমনকি জিহাদিদের বিয়ে করতে কিশোরী-তরুণীদের বাধ্য করছে তালেবান। তাদের বিরুদ্ধে এমন অনেক অভিযোগ এনেছেন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত আফগানিস্তানের সাবেক বিচারপতি নাজলা আইউবি। রোববার এ খবর জানিয়েছে দি ডেইলি মেইল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারী স্বাধীনতা থেকে শুরু করে অঙ্গীকার করা অন্য সব বিষয়ে ভোল পাল্টেছে তারা। দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় একটি প্রদেশে এক নারীকে বৃহস্পতিবার পুড়িয়ে মেরেছে তালেবান যোদ্ধারা। কারণ, ওই মহিলার রান্না যোদ্ধাদের পছন্দ হয়নি। অথচ তাদের জন্য রান্না করতে ওই মহিলাকে বাধ্য করা হয়েছিল-জানান নাজলা। স্কাই নিউজকে তিনি জানান, সেখানে এখনো অনেক নারী কফিনে ঢোকার অপেক্ষায় রয়েছে। উদ্বেগ নিয়ে অনেকে দেশ ত্যাগের আশায় বিমানবন্দরে ভিড় জমিয়েছেন। নইলে, তালেবানরা এদের যৌনদাসী করার আশঙ্কা রয়েছে।

ক্ষমতা দখলের পর তারা নারী অধিকার প্রশ্নে তাদের নীতি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতা দখলের পর এক সপ্তাহ না যেতেই শুরু হয়ে গেছে তাদের রূপ পরিবর্তন। হেরাতে সহশিক্ষা বন্ধ করে দিয়েছে তারা। শনিবার এক নির্দেশনায় তালেবান জানিয়েছে, নারীরা নারী শিক্ষক এবং পুরুষরা পুরুষ শিক্ষকের কাছে পড়াশোনা করতে পারবেন। ‘ছেলেমেয়ে একসঙ্গে পড়াশোনা’ সমাজে পচন ধরানোর মূল বলে ওই নির্দেশনায় আখ্যা দিয়েছে তারা।

তিনজন নারী সাংবাদিককে কাজে যেতে বাধা দিয়েছে তালেবান। একজনকে আত্মগোপনে যেতেও বাধ্য করেছে তারা। আফগানিস্তানের ন্যাশনাল টিভি নেটওয়ার্কের অফিসে ঢুকে সাংবাদিক মেহের মুরসাল আমিরিকে অফিস থেকে ঘরে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে তারা বলেছে, আর কখনো যেন অফিসে ফিরে না আসে। তার পাশাপাশি আরও দুই নারী সাংবাদিক শবনম দারওয়ান ও খাদিজা আমিনকেও তারা ‘শরিয়া আইনের পরিপন্থি কাজ’ বলে বাড়ি ফিরে যেতে নির্দেশ দিয়েছে।

মঙ্গলবার ক্ষমতা দখলের পর তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লা মুজাহিদ অঙ্গীকার করে বলেছিলেন, তারা সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন এবং কারও প্রতি প্রতিশোধ নেবেন না। কিন্তু ৪৮ ঘণ্টা না যেতেই মুখোশ খুলে আগের চেহারায় ফিরে এসেছে তালেবান। একে একে অনেকেই তাদের প্রতিশোধ প্রবণতার শিকার হচ্ছেন। রাইফেল দিয়ে সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সেই অভিযোগ অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। সংখ্যালঘুরাও সেখানে তাদের হাতে নির্যাতিত হচ্ছে। তাদের এ চেহারা নব্বই দশকের তালেবানকে স্মরণ করিয়ে দেয়। জাতিসংঘের অতিসাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, পশ্চিমাদের সহযোগীদের হত্যার উদ্দেশ্যে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালাচ্ছে তালেবান। তালেবান যোদ্ধারা বহু আফগানের বাড়ির সম্পদ লুট করেছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। এমন অভিযোগের পর তালেবান মুখপাত্র মুজাহিদ সাধারণ আফগানদের বাড়িতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিলেও সেটা নিতান্তই লোক দেখানো বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। আফগানিস্তানের সর্বশেষ চিত্র বলছে, প্রতিশোধপ্রবণতার আগুনে অঙ্গার হবেন অনেক আফগান। কারণ, আফগান পতাকাবাহীদের আক্রমণ করা হচ্ছে-এমন ডজনখানেক ঘটনা ঘটেছে কাবুলে। মানবাধিকার গ্রুপ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্বের প্রশ্নে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গত মাসে গজনী প্রদেশ দখলের পর তালেবানরা হাজারাদের ওপর কী তাণ্ডবই না চালিয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা হত্যাকাণ্ডের বিব্রতকর বিবরণ দিয়েছে। শুধু তাই নয়, সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা এড়িয়ে গিয়ে কাবুল বিমানবন্দরে তীক্ষ্ম নজর রেখেছে তারা। যেন তাদের বিরোধীরা দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে। এমনকি বিমানবন্দরে অবস্থানরত নারী-শিশুদের দিকে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়েছে তারা। জাতিসংঘের ফাঁস হওয়া এক নথি বলছে, তালেবানরা সাবেক সরকার এবং পশ্চিমা সহযোগীদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছে নইলে তাদের পরিবারের সদস্যদের গ্রেফতারের হুমকি দিচ্ছে। হেরাতের কাছে জেনারেল হাজি মোল্লা আচাকজাইকে হত্যার ভিডিও প্রকাশের পরের প্রতিবেদন ছিল এটি।

আচাকজাইকে হত্যার পর লাগমান প্রদেশের গভর্নর এবং পুলিশপ্রধানকেও আটক করেছে তালেবান। তাদের ভাগ্যে কী ঘটছে, সেই সিদ্ধান্ত নেবে তালেবান হাইকমান্ড। এ সময় যুদ্ধ করার বয়সি বহু যুবককে আটক করে নিয়ে গেছে তালেবান, এমন বহু অভিযোগ রয়েছে।

সরকারি অফিস খুলতে দিচ্ছে না তালেবান : আফগানিস্তানের কাবুলে বিভিন্ন সরকারি অফিসে ঢুকতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তালেবানের বিরুদ্ধে। শনিবার সাপ্তাহিক কর্মদিবসের প্রথম দিনে এমন ঘটনা ঘটেছে। রাজধানী কাবুলের অধিকাংশ সড়ক যেন মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। সেখানে এখন শুধু তালেবানের চেকপয়েন্ট ও টহল দেখা যায়। তালেবানরা আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকেই দেশটির অধিকাংশ সরকারি ভবন, ব্যাংক, পাসপোর্ট অফিস, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রয়েছে। একজন সরকারি কর্মচারী বলেন, ‘আমি সকালে অফিসে গিয়েছিলাম। এ সময় অফিসের মূল দরজায় দাঁড়ানো তালেবান সদস্য জানায়, সরকারি অফিস খোলার বিষয়ে তারা এখন পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা পায়নি।’

আফগানিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মচারী বলেন, কাবুলে মন্ত্রণালয়ে যাওয়ার রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘তারা কাউকেই ভবনের ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না। তাদের একজন আমাদের জানায়, নতুন মন্ত্রী নিয়োগ না হওয়া বা নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের অফিসে প্রবেশের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।’

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension