মুক্তমত

আমাদের ক্ষমা করো নুসরাত

মুবিন খান

 
১.
নুসরাত। বাচ্চা একটা মেয়ে। মেয়েটা মরে গেল। খুব কষ্ট পেয়ে মরেছে মেয়েটা। আমার বোনটার মতোই। কষ্ট পেতে পেতে মরে গিয়ে বেঁচেছে। আমার বোনটাও আগুনে পোড়া শরীরটার অসহ্য যন্ত্রণা থেকে বেঁচেছিল মরে গিয়েই। পার্থক্য হলো আমার বোনটার গায়ে কোনও পাশবিক মানুষ আগুন দেয় নি। নুসরাতের গায়ে দিয়েছে।
 
খবরের কাগজে যেদিন নুসরাত মেয়েটাকে কেরোসিন ঢেলে জ্যান্ত পুড়িয়ে দেওয়ার খবরটা এল, খবরটা পড়ি নি। কেবল খবরের শিরোনামটা চোখে পড়েছিল। অনিচ্ছাতেই। খবরের কাগজে চোখ বুলানোর সময় চোখে পড়ে গিয়েছিল। অমন খবর আমার আগ্রহ জাগায় না। ভীতি জাগায়। দ্রুত চোখ সরিয়ে নিয়েছিলাম। মধ্যযুগীয় ওই বর্বরতার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা জানতে আমি আগ্রহী হতে পারি নি। অন্যদের কথোপকথনে কেবল বর্বরতা এড়িয়ে বর্বরদের সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছিলাম।
 
যতটুকু জানা গেল সেটা সত্যিই ভয়াবহ। বিশ্বাস হতে চায় না। আমি নিতে পারি নি সেটা। নুসরাত মেয়েটার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বেলে দিয়েছে প্রায় ওরই বয়সি আর চারটে মেয়ে! নুসরাতের অপরাধ তার সঙ্গে যৌন নিপীড়নের ব্যাপারটা সে গোপন রাখে নি। প্রকাশ করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রকাশ করে দিয়ে তার সঙ্গে এই অন্যায়ের বিচারও সে দাবি করেছে। দাবিটা আর দশজন সুস্থ স্বাভাবিক সভ্য মানুষের মতোই আইনের কাছেই করেছে।
 
ঠিক এইখানটাতেই আমাদের একটা কৌতূহল তৈরি হয়েছে। একটা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। নুসরাত মেয়েটার শ্লীলতাহানি করা লোকটা তার শিক্ষক। ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলা। নুসরাতের গায়ে যারা অবলীলায় কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিল, তারা ওই শিক্ষকের, ওই শিক্ষক যে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার নেতৃত্ব দেন সেখানকার শিক্ষার্থী। পাশবিক রুচির শিক্ষকের শিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষার্থীরা আগুনে জ্যান্ত মানুষ পুড়িয়ে দিতে পারা চারটে মেয়ে। নুসরাতের সহপাঠিও নাকি রয়েছে ওদের মধ্যে।
 
নুসরাত আগুনে দগ্ধ হয়ে যখন হাসপাতালে ধুঁকছে, ঘটনা খবরের কাগজে-টেলিভিশনে এসেছে, তখন পুলিশ গিয়ে শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে ফেলল। আর তখনই আমরা দেখলাম চরিত্রবিহীন ওই শিক্ষকের পেশাগত সফলতা। তাঁর পাশবিক আদর্শে উজ্জীবিত কেবল জ্যান্ত মানুষ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিতে পারা চারটে মেয়ে নয়; সংখ্যাটি চল্লিশও নয়। চারশ’কে ছাড়িয়ে চার হাজারকে অতিক্রম করে অগণিত হয়ে গেছে। সেই অগণিত সংখ্যার অনেক মানুষ ফেনীর রাজপথে নেমে গেল। মিছিল করল। মানববন্ধন করল। তাঁরা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলাকে নির্দোষ দাবি করতে লাগল। অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করতে লাগল।
 
এইখানেই কৌতূহলটা, প্রশ্নটা- এত এত পাশবিক মানুষের মাঝে বেড়ে উঠে, অগণন অসভ্য মানুষের মাঝে বাস করে, অসংখ্য ধর্ষকের সঙ্গে শিক্ষা গ্রহণ করে নুসরাত মেয়েটা আর দশজন সুস্থ স্বাভাবিক সভ্য মানুষের মতো হয়ে উঠল কেমন করে!
 
আমার বোনটার গায়ে আগুন লাগবার পর আমরা সকলে খুব কেঁদেছিলাম। সকলে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমরা সুদূর পরবাস থেকে ছুটে এসেছিলাম। কিন্তু আসতে আসতে শরীরের পঁচাশি ভাগ পুড়ে দগ্ধ হওয়ার কষ্ট বোনটা সহ্য করতে পারে নি। অসহ্য যন্ত্রণায় ধুঁকতে ধুঁকতে মরে গেল। আমরা সুদূর পরবাস থেকে ছুটে এসে পৌঁছুবার আগেই। মরবার আগে বারবার পানি খেতে চাইছিল। ডাক্তার নিষেধ করেছিল। কেউ পানি খেতে দেয় নি। আমার ভাগ্নিটা চা চামচে পানি তুলে ঠোঁটের ফাঁকে ঢেলে দিয়েছিল।
 
নুসরাতের ছোট্ট শরীরটার আশি-পঁচাশি ভাগ পুড়েছে। আমার বোনটার মতোই। নুসরাতও পানি খেতে চেয়েছিল। কেউ দেয় নি পানি খেতে। ডাক্তারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নি কেউ। মেয়েটা তার ছোট্ট বুকটার ভেতরে এক জীবনের তৃষ্ণা নিয়ে মরে গেল। নুসরাতের জন্যে আজকে পুরো বাংলাদেশ কাঁদছে। না, ভুল হলো। পুরো বাংলাদেশ নয়। যারা ওর গায়ে কেরোসিন ঢেলে জ্যান্ত পুড়িয়ে দিল, যারা ফেনীর রাজপথে সিরাজ উদ-দৌলার মুক্তি চেয়ে মানব বন্ধন করল, মিছিল করল- তাঁরা নয়। তাঁরা কাঁদছে না। বাংলাদেশ মাদ্রাসা বোর্ডের অধীন-পরাধীন মাদ্রাসার ছাত্র শিক্ষকেরাও নয়। তাঁরা নুসরাত নামের বাচ্চা এই মেয়েটার এইরকম নৃশংসভাবে খুন করে ফেলার খবরে টুঁ শব্দটিও করছে না।
 
২.
নুসরাত খুন হওয়ার জন্যে অনেকে রাষ্ট্রকে দায়ী করছেন। বলছেন রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার। রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়বার কথা বলছেন কেউ। অনেকে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে দায়ী করছেন। অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলার কঠিন বিচার চাইছেন অনেকে। অধ্যক্ষর সঙ্গে তাঁর মুক্তির দাবিতে মিছিল আর মানব বন্ধন করা লোকেদের শাস্তি চাইছেন কেউ কেউ। কেউ আবার ওই লোকেদের দিয়ে যারা মিছিল-মানব বন্ধন করিয়েছে সেসব গডফাদারদের ধরবার কথা বলছেন। আমার এক বন্ধু নুসরাতের খুন হওয়ার অনুভূতি জানাবার প্রক্রিয়া হিসেবে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলাকে আধ ঘণ্টার জন্যে একলা একটা ঘরে তার হাতে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছে।
 
না। এঁরা কেউ নুসরাত মেয়েটার খুন হওয়ার জন্যে দায়ী নয়। নুসরাত তার খুন হওয়ার জন্যে নিজেই দায়ী। এই ভূখণ্ডে মেয়েদেরকে মাদ্রাসায় পড়াশুনা করতে গেলে নিজের শরীরটাকে মাদ্রাসা শিক্ষকের সম্পদ বলে মেনে নিতে হয়। নিজেকে তাদের ভোগ্য সামগ্রী ভাবতে হয়। নুসরাত মেয়েটা সেটি মেনে নেয় নি। নিজেকে তাদের ভোগের সামগ্রী ভাবতে পারে নি। নুসরাত শিক্ষকের অবাধ্য হয়েছে। শিক্ষকের নামে প্রচলিত আইনে অভিযোগ করেছে। ফলে ওই মেয়ে চারটের রাগ হয়েছে। কই! ওই চারজন তো অবাধ্য হয় নি! অবাধ্য হয় নি ওই শিক্ষকের মুক্তির দাবিতে মিছিল আর মানব বন্ধন করা নারী-পুরুষেরাও। এরা সকলেই নিজেদেরকে ভোগ্য করে তুলতে পেরেছিল। সম্ভবত ছাত্রছাত্রীদের ভোগ করাটা গোপনে মাদ্রাসাগুলোয় স্বীকৃত বলেই মাদ্রাসা শিক্ষকেরা কেউ টুঁ শব্দটিও করে নি।
 
‘পবিত্র কুরআন মাজিদ ও হাদিসের পাকের আলোকে শিক্ষকের হক’ থেকে জানা যাচ্ছে, ‘মূর্খ লোকের উপর আলেমের হক এবং ছাত্রদের উপর শিক্ষকের হক এক ও অভিন্ন। শিক্ষকের হক হলো শিক্ষকের আগে কোন কথা বলবে না, তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর আসনে বসবে না, তাঁর কথা অমান্য করবে না, তাঁর আগে গমন করবে না।’
 
ধর্মগ্রন্থের মহান এই বাণীকে কেবল নয়, ধর্মটাকেই নিজেদের নোংরা ইহজাগতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে এরা। ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ আর কুপ্রবৃত্তিগুলো চরিতার্থ করবার কাজে। মূর্তি নাম দিয়ে ভাস্কর্য ভেঙে ফেলে। মহানবীর চীন দেশে গিয়ে পরামর্শর রূপকটি বেমালুম চেপে গিয়ে পাঠ্য পুস্তক থেকে উৎকৃষ্ট রচনা মুসলমান লেখকের নয় বলে সরিয়ে ফেলতে বাধ্য করে। নারীকে তেঁতুলের মতো উপভোগ্য বলে জনসভা করে ঘোষণা দেয়। নারীর লেখাপড়া করায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দেয়। ঘরের বাইরে বেরুতে না দিতে পরামর্শ দেয়।
 
এর দোষটা, এর দায়টা এদের নয়। এর দোষটা, এর দায়টা আপনার। আমার। আমাদের সকলের। আমরা এদের ভাস্কর্যকে মূর্তি ডাকা মেনে নিই। ভাস্কর্যকে ভেঙে ফেলতে দেই। সরিয়ে ফেলি। পাঠ্য পুস্তক থেকে উৎকৃষ্ট রচনা মুসলমান লেখকের নয় বলে সরিয়ে ফেলি। নারী বিষয়ক পরামর্শগুলো মেনে নিই। নারী তেঁতুলের মতোই স্বাদু মেনে নিয়ে খুব দ্রুত বিয়ে দিয়ে ফেলতে চাই। লেখাপড়া করতে দিতে চাই না। তেঁতুল পেকে খাওয়ার যোগ্য হয়ে গেছে ভেবে ঘরে আটকে রেখে দেই। আর যারা এই প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে লড়াই করে ঘরের বাইরে যায়, তাদের জন্যে বাইরেটা অনিরাপদ করে ফেলি। বিভিন্ন উপলক্ষ্য নির্মাণ করে তাদের শরীর ঘেঁষে দাঁড়াই। যত্রতত্র হাত আর প্রত্যঙ্গ দেই। তারা প্রতিবাদ করলে সদলবলে শক্তি আর স্থূল যুক্তি নিয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ি।
 
৩.
নুসরাত জাহান রাফি নামে বাচ্চা এই মেয়েটাকে খুন করে ফেলা একজন সিরাজ উদ-দৌলার ওপরে আজ আপনাদের সকল জেদ, রাগ, ক্ষোভ। সে খুনি তো বটেই কিন্তু খুনটা সে নিজের হাতে করে নি। করেছে তার অনুসারীরা। নিজের পাশবিকতা, হিংস্রতা, অমানবিকতাকে সিরাজ উদ-দৌলা ওই চারজন মেয়ের ভেতর প্রোথিত করে দিয়েছে। সফলভাবেই দিতে পেরেছে। দিয়েছে যারা তার মুক্তির দাবিতে মিছিল আর মানব বন্ধন করেছে তাদের ভেতরেও। এখন একবার ভাবুন তো এক পিশাচ সিরাজ উদ-দৌলা যদি এত এত অনুসারী তৈরি করে ফেলতে পারে তাহলে ভাস্কর্য ভাঙতে দিয়ে, সরিয়ে দিয়ে, পাঠ্য পুস্তক থেকে লেখা অপসারণ করে, নারী শিক্ষার বিরোধিতা মেনে নিয়ে, ঘরের বাইরেটা নারীর জন্যে অনিরাপদ করে দিয়ে আপনি, আমি, আমরা সকলে কি পরিমাণ দানব তৈরি করেছি?
 
অসংখ্য সিরাজ উদ-দৌলা এখনও চারপাশে থাবায় নখ লুকিয়ে ঘাপটি মেরে আছে। তাই, নুসরাতের মৃত্যুর দায়টা আমাদেরই। নুসরাত কি আমাদের ক্ষমা করবে?
 
আমাদের ক্ষমা করো নুসরাত।
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension