যুক্তরাষ্ট্র

ইরান যুদ্ধে প্রতি তিনজন মার্কিনে একজনের সমর্থন, ট্রাম্পের লক্ষ্য নিয়ে ধোঁয়াশা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তিনজন নাগরিকের মধ্যে মাত্র একজন ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধকে সমর্থন করছেন। পাঁচ মাস ধরে চলা এই যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সমর্থনের হার এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।

রয়টার্স/ইপসোসের সর্বশেষ জনমত জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
জরিপে অংশ নেওয়া বেশির ভাগ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন পর্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেননি, যুক্তরাষ্ট্র কেন এই যুদ্ধে জড়িয়েছে এবং যুদ্ধের মূল লক্ষ্য কী। শুক্রবার থেকে রবিবার পর্যন্ত পরিচালিত এই জরিপে আরো দেখা যায়, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা কিছুটা বেড়েছে। বর্তমানে তার অনুমোদনের হার ৩৭ শতাংশ।

গত মাসের তুলনায় এটি ৩ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। তবে এই হার এখনও তার প্রেসিডেন্ট থাকাকালের তুলনামূলক নিচের দিকের অবস্থানগুলোর একটি। ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্য তুলে ধরেছেন। কখনও তিনি বলেছেন, ইরানের জনগণকে তাদের বর্তমান নেতৃত্বের হাত থেকে মুক্ত করতে চান।

আবার কখনও বলেছেন, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করাই উদ্দেশ্য। অন্য সময় তিনি জোর দিয়েছেন, ইরানকে যেন কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না দেওয়া হয়।

তবে জরিপে দেখা গেছে, ৬৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের উদ্দেশ্য পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেননি। এমনকি রিপাবলিকান দলের সমর্থকদের মধ্যেও এই মত রয়েছে। প্রতি ১০ জন রিপাবলিকান সমর্থকের মধ্যে চারজনও একই কথা বলেছেন।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জনমত জরিপ দেখে সিদ্ধান্ত নেন না। তার ভাষ্য, ট্রাম্পের অবস্থান পরিষ্কার—ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এমন একজন প্রেসিডেন্ট থাকা, যিনি দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকে যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থন কখনোই ৪০ শতাংশে পৌঁছায়নি। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বড় যুদ্ধগুলোর তুলনায় অনেক কম। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় প্রায় ৭০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক সেই যুদ্ধকে সমর্থন করেছিলেন। আর ২০০১ সালে আফগানিস্তান যুদ্ধ শুরুর সময় সমর্থনের হার ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ। গ্যালাপের জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে। যুদ্ধের প্রতি মানুষের অনীহা আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প এবং তার রিপাবলিকান পার্টির জন্য নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে। ওই নির্বাচনে কংগ্রেসে তাদের অল্প ব্যবধানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার চেষ্টা করবে দলটি।

জর্জিয়ার স্টকব্রিজ শহরের বাসিন্দা এবং অবসরপ্রাপ্ত টারবাইন মেরামত বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স ওম্যাক বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কেন এই যুদ্ধে জড়িয়েছে, তা এখনও পরিষ্কার নয়। তার ভাষায়, ‘আমরা কেন যুদ্ধ শুরু করেছি, সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই।’ ওম্যাক একসময় যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন কোরে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি জানান, ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ. ডব্লিউ. বুশের নেতৃত্ব পছন্দ হওয়ায় তিনি রিপাবলিকান রাজনীতির প্রতি আগ্রহী হয়েছিলেন। তবে বর্তমান ইরান যুদ্ধ নিয়ে তিনি ট্রাম্পের ওপর আগের মতো আস্থা রাখতে পারছেন না। তার মতে, ট্রাম্প এই পরিস্থিতি ভালোভাবে সামাল দিতে পারছেন না।

এ পর্যন্ত এই যুদ্ধে ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইরান ও লেবাননে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। লেবাননে ইরান-সমর্থিত যোদ্ধারা ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও। দেশজুড়ে পেট্রলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম ৪ ডলারের কিছু বেশি। যুদ্ধ শুরুর আগে এই দাম ছিল প্রায় ৩ ডলার। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে এবং অনেক পরিবার আর্থিক চাপে পড়েছে।

রিপাবলিকান রাজনৈতিক কৌশলবিদ এবং সাবেক হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যালেক্স কোন্যান্ট বলেন, এই যুদ্ধ রিপাবলিকান দলের জন্য নানা ধরনের রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে। তার মতে, বছরের শুরু থেকে হোয়াইট হাউস অর্থনীতি নিয়ে জনমত নিজেদের পক্ষে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু এখন মানুষের মূল মনোযোগ চলে গেছে পররাষ্ট্রনীতি ও যুদ্ধের দিকে। ফলে অর্থনীতি নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরা কঠিন হয়ে পড়ছে। রয়টার্স/ইপসোসের জরিপে দেখা গেছে, নিবন্ধিত স্বতন্ত্র ভোটারদের ৩৬ শতাংশ আগামী কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে ভোট দিতে চান। রিপাবলিকান প্রার্থীকে সমর্থনের কথা বলেছেন ২০ শতাংশ। অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রেও স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের প্রতি সমর্থন রিপাবলিকানদের তুলনায় বেশি দেখা গেছে।

২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি কোনো যুদ্ধে জড়াবেন না। শুরুতে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে। তবে পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও যুদ্ধ চলছে। এ কারণে তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। ট্রাম্প অতীতে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করা হলে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। উল্লেখ্য, প্রায় দুই দশক ধরে চলা ভিয়েতনাম যুদ্ধে ৫৮ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা নিহত হয়েছিলেন।

জর্জিয়ার ফেয়ারবার্ন শহরের স্বতন্ত্র ভোটার রায়ান অ্যান্ডারসন ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন। তবে এখন তিনি মনে করেন, বিদেশে যুদ্ধের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানে সরকারের বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই দেশের মানুষের সমস্যার সমাধান করা।’ নিরাপত্তা ও তথ্য সংগ্রহ–সংক্রান্ত দুটি চাকরি করা অ্যান্ডারসন জানান, ২০২০ সালের নির্বাচনে তিনি জো বাইডেনকে ভোট দিয়েছিলেন। তার ভাষায়, “আমাদের মিত্র আছে, এটা ঠিক। কিন্তু আমাদের দেশেও অনেক মানুষ আছেন, যাদের এখনই সাহায্য দরকার।”

রয়টার্স/ইপসোস মার্চের মাঝামাঝি থেকে নিয়মিতভাবে মার্কিন নাগরিকদের কাছে জানতে চাইছে, তারা ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানকে সমর্থন করেন কি না। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে এই সমর্থনের হার ছিল ৩৭ শতাংশ। যুদ্ধ শুরুর দিন তা ছিল ২৭ শতাংশ। সে সময় ২৯ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছিলেন, তারা এ বিষয়ে নিশ্চিত নন। সর্বশেষ জরিপটি অনলাইনে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে পরিচালিত হয়। এতে ১ হাজার ২৪৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিক অংশ নেন। জরিপটির ত্রুটির সীমা দুই দিকেই ৩ শতাংশ পয়েন্ট।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension