যুক্তরাষ্ট্র

একটু একটু করে পরাজিত আমেরিকা

আনিসুজ্জামান মুহাম্মদ


যুক্তরাষ্ট্র ও তার নেটো মিত্ররা এক বিধ্বংসী সামরিক অভিযানে ২০০১ সালে তালেবানকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর গত ২০ বছর ধরে আফগানিস্তানের সামরিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিল। কিন্তু আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টে গেছে।

এ বছর জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে রাতের অন্ধকারে অনেকটা চুপি চুপিই যখন মার্কিন সৈন্যদের শেষ দলটি কাবুলের নিকটবর্তী বাগরাম বিমানঘাঁটি ত্যাগ করে। এরপর দেড় সপ্তাহের মধ্যেই আফগানিস্তানের অধিকাংশ ভূথণ্ড দখল করে করে নেয় তালেবানরা। আফগানিস্তান এখন তালেবানের নিয়ন্ত্রণে। মার্কিন পত্রপত্রিকায় খবর বেরিয়েছে যে তাদের দূতাবাসটি বিমানবন্দরের মধ্যে বা কাছে কোথাও সরিয়ে নেয়া যায় কিনা সে বিকল্পটিও আলোচনা করেছে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের প্রশাসন।

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আজ (১৯ আগস্ট) বলেছেন, এবিসি নিউজ চ্যানেলে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন কাবুলে এই বিশৃঙ্খলা অবশ্যম্ভাবী ছিল। জো বাইডেন চাইছেন আগস্ট মাস শেষ হওয়ার আগেই আমেরিকান সৈন্যরা আফগানিস্তান ছেড়ে যাক। আফগানিস্তানে এখনও আটকে রয়েছেন ১৫ হাজারের মতো মার্কিন নাগরিক।

১৪ আগস্ট নিউ ইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তালেবান যেন কাবুলের মার্কিন দূতাবাসে হামলা না চালায় সে জন্য মার্কিন আলোচকরা এর মধ্যেই তালেবানের সাথে যোগাযোগ করেছে। মার্কিন রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা এখন বলছেন যে, ১৯৭৫ সালে যেভাবে ভিয়েতনামের সায়গন থেকে যেভাবে আমেরিকানদেরকে হেলিকপ্টারে করে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল, ২০২১ সালের কাবুলে এখন সেই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি কিনা, সেটি নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট বাইডেন সৈন্য প্রত্যাহারের কথা ঘোষণা করার পর তালেবানের কিছু নেতা বলেছেন, তারা এ যুদ্ধে জিতেছেন, আমেরিকা হেরে গেছে।

অনেক বিশ্লেষকও আমেরিকার এ ‘পরাজয়’ ও ‘পশ্চাদপসরণ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এটা ঠিক যে আল-কায়েদাকে উৎখাতের কথা বলে এ অভিযান শুরু হয়েছিল, ওসামা বিন লাদেনও নিহত, কিন্তু তাদের আশ্রয়দাতা তালেবান এখন প্রবলভাবে ফিরে এসেছে। মার্কিন রিপাবলিকান সিনেটর মিচ ম্যাককনেল বলেছেন, ‘বাইডেন প্রশাসনের স্ট্রাটেজি যুক্তরাষ্ট্রকে এক লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে ফেলবে।’ তার মতে ‘প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রকে ১৯৭৫ সালের সায়গনের অপমানজনক পতনের চাইতেও খারাপ অবস্থায় নিযে যাচ্ছে।’

২০০১ থেকে শুরু হওয়া আফগান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি হিসেবমতে ৭৭ হাজার ৬০০ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ ব্যয় করেছে। এ যুদ্ধে নিহত হয়েছে তাদের ২ হাজার ৩১২ জন সৈন্য। আহত হয়েছে ২০ হাজারের বেশি। আনুমানিক ৬৪ হাজার আফগান সৈন্য ও পুলিশ নিহত হয়েছে। আর বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে অন্তত ১ লক্ষ ১১ হাজার।

কাবুলের এই পতন আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ প্রয়াসের পরাজয়ের চরম মুহূর্ত হিসেবেই দেখছেন অনেকে। মার্কিন বিশ্লেষকরা বলছেন, আমেরিকার এ ‘পরাজয়’ আসলে আকস্মিক কিছু নয়, এটা ঘটেছে বহু বছর ধরে – একটু একটু করে।

সিএনএনের এক অনুষ্ঠানে মার্কিন সাংবাদিক ও বিশ্লেষক ফরিদ জাকারিয়া বলেছেন, তালেবানের এই পুনরুত্থান আকস্মিক নয়, বরং গত ১০-১৫ বছর ধরেই তালেবানের ধীরে ধীরে শক্তিবৃদ্ধি হচ্ছিল। আফগানিস্তানে ২০০১ সালের অক্টোবর মাসে শুরু হওয়া মার্কিন বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণে তালেবানের পতনের পর কাবুলে অনেক তরুণের দাড়ি কামিয়ে ফেলার দৃশ্য টিভির পর্দায় দেখানো হয়েছিল। কিন্তু আসলে তালেবান কখনোই সম্পূর্ণ পরাজিত হয় নি। আফগানিস্তানে বিপুল পরিমাণ বিদেশি সৈন্যের উপস্থিতি সত্ত্বেও তালেবান আবারও সংগঠিত হয়ে ক্রমাগত তাদের শক্তি বাড়ায়, আফগানিস্তানের নানা অঞ্চলে আবার তাদের প্রভাব বিস্তার করে।

২০১৭ সালে বিবিসির এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানায়, মার্কিন ও নেটো সেনাবাহিনী ও আফগান সরকারি বাহিনী কখনোই তালেবানের বিদ্রোহী তৎপরতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে নি।

ওয়াশিংটন পোস্ট দৈনিকে সাংবাদিক-বিশ্লেষক ইশান থারুর লিখেছেন, তালেবানের আক্রমণের মুখে আফগানিস্তান যেভাবে এত দ্রুতগতিতে ভেঙে পড়ছে – তা ‘যুক্তরাষ্ট্রের এক দীর্ঘ ও ধীরগতির পরাজয়।’

যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষক এবং আফগান রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. আসিম ইউসুফজাই বিবিসিকে বলেছেন, আমেরিকানদের কৌশল ছিল আফগানিস্তানের প্রধান শহরগুলোকে কব্জায় রাখা। কিন্তু শহরের বাইরে গ্রাম-গঞ্জ তালেবানের নিয়ন্ত্রণে থেকে গিয়েছিল।

কিন্তু মার্কিন রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব তা স্বীকার করতে চান নি।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক ক্রেগ হুইটলক এক সাড়া জাগানো প্রতিবেদনে মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ বহু দলিলপত্রের বয়ান প্রকাশ করে।

“আফগানিস্তান পেপার্স: এ সিক্রেট হিস্ট্রি অব দ্য ওয়ার – এ্যাট ওয়ার উইথ দ্য ট্রুথ” শিরোনামের ওই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তিনি দেখিয়েছিলেন যে মার্কিন কর্মকর্তারা মুখে যতই বলুন না কেন যে তারা আফগানিস্তানের পরিস্থিতির অগ্রগতি ঘটাচ্ছেন, তা আসলে সঠিক ছিল না। ওই কর্মকর্তারাও জানতেন যে কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না। ক্রিগ হুইটলক লিখেছিলেন, একের পর এক মার্কিন প্রশাসন এটা স্বীকার করে নিয়েছিল যে তালেবানকে হারানো সহজ হবে না, আফগান রাষ্ট্রটি দুর্বল এবং দুর্নীতিতে ভরা, – তাই কোন সমন্বিত নীতি ছাড়া এগিয়ে যাওয়াটাও “পরাজয় স্বীকার করে নেয়ার চাইতে ভালো।”

হুইটলক ব্যাখ্যা করেছিলেন যে বহু অপ্রকাশিত দলিলপত্র ও সাক্ষাৎকার থেকে এটা বোঝা যায় যে তিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ, বারাক ওবামা ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনগুলো দুই দশক ধরে এ সত্যকে লুকিয়ে রেখেছিল।

আমেরিকার কোনো প্রেসিডেন্টই আফগানিস্তানে বিপর্যয়ের কথা স্বীকার করেন নি।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension