
কদর্য ডাক্তার ও হলিফ্যামিলি হাসপাতাল
'... আটদিনে একজন ডাক্তারও স্ত্রীকে দেখেন নি। আমার দুই পুত্র পালাক্রমে তাদের মায়ের পাশে ছিল। ২৮ মে প্রথম প্রহরে, ভোর ৩টা থেকে আমার স্ত্রীর শ্বাস কষ্ট শুরু হয়। তিনটি ঘন্টা অবর্ণনীয় কষ্টে সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় কাতরাতে কাতরাতে বলছিলেন, 'একজন ডাক্তার ডাক্, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, আমি সহ্য করতে পারছি না।'
বর্তমান প্রেক্ষাপটে গভীর ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমার একটি উপলব্ধির দেশবাসী, বিশেষ করে দেশ সৃষ্টিকারী মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ভাগ করে নিজের মনটাকে একটু হালকা করতে, একটু প্রশান্ত করতেই এ প্রয়াস ।
আমার স্ত্রী নুরুন নাহার বেগম (খুকু) একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। তিনি করোনা আক্রান্ত হয়ে ২০ মে থেকে বিকেল থেকে ২৮ মে সকাল ৬টা ২০ মিনিট পর্যন্ত ৮ দিন হলিফ্যামিলি হাসপাতালে শুধুমাত্র কথিত চিকিৎসাধীনে ভর্তি অবস্থায় ছিলেন।
এই আটদিনে একজন ডাক্তারও স্ত্রীকে দেখেন নি। আমার দুই পুত্র পালাক্রমে তাদের মায়ের পাশে ছিল। ২৮ মে প্রথম প্রহরে, ভোর ৩টা থেকে আমার স্ত্রীর শ্বাস কষ্ট শুরু হয়। তিনটি ঘন্টা অবর্ণনীয় কষ্টে সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় কাতরাতে কাতরাতে বলছিলেন, ‘একজন ডাক্তার ডাক্, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, আমি সহ্য করতে পারছি না।’
আমার ছেলেরা ডাক্তারের জন্যে হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে দৌড়ে বেড়িয়েছে। কেউ আসে নি। এরপরে একজন ডাক্তারকে দেখে দূর থেকে অনেক অনুনয় বিনয়ে অনুরোধ করে বলেছে, ‘আমার মায়ের প্রচন্ড শ্বাস কষ্ট হচ্ছে, একটু দেখেন। আইসিইউতে নেওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।’
এর আগে তারা খোঁজ নিয়ে জেনেছে আইসিইউ-তে কয়েকটা বেড খালি ছিল।
কিন্তু ডাক্তার শুধু বললেন, ‘দেখছি।’
একই ওয়ার্ডে পাশের বেডে এক বৃদ্ধা ভর্তি ছিলেন। তার দৃশ্যমান তেমন কোনও কষ্ট বা সমস্যা দেখা না গেলেও তার পুত্রবধু একই হাসপাতালের ডাক্তার হওয়ার কারণে অন্য এক ডাক্তার এসে তাকে আইসিইউতে পাঠানোর ব্যবস্থা করে দেয়।
আমার ছেলে দ্রুত এগিয়ে ওর মাকে একটু দেখতে অনেক অনুনয় করেছে। আইসিইউতে নেওয়ার জন্যে যারপরনাই অনুরোধ করেছে। কিন্তু ডাক্তার নামক জীবটি আমার স্ত্রীর ধারেকাছেও যায় নি। আমার স্ত্রীর দিকে না তাকিয়েই দূর থেকে ‘ঠিক হয়ে যাবে, ঠিক হয়ে যাবে’ বলতে বলতে চলে গেল।
‘…আমার ছোট ছেলের কোলে মাথা রেখে এ দেশের ডাক্তার নামের হৃদয়হীন প্রাণীদের প্রতি চরম ঘৃণা ও প্রচন্ড শ্বাসকষ্টে আমার স্ত্রী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। আমি বা আমার সন্তানেরা কি কোনদিনও সংশ্লিষ্ট ডাক্তার নামক প্রাণীদের ক্ষমা করতে পারব?…’
এর কিছুক্ষণ পর সকাল ৬টা ২০ মিনিটে আমার ছোট ছেলের কোলে মাথা রেখে এ দেশের ডাক্তার নামের হৃদয়হীন প্রাণীদের প্রতি চরম ঘৃণা ও প্রচন্ড শ্বাসকষ্টে আমার স্ত্রী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
আমি বা আমার সন্তানেরা কি কোনদিনও সংশ্লিষ্ট ডাক্তার নামক প্রাণীদের ক্ষমা করতে পারব? আমি রাষ্ট্রীয় সন্মান ও ভাতাপ্রাপ্ত একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। আমার শ্বশুর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এস এম নুরুল হুদা মিয়া কমনওয়েল্থ স্কলারশিপে লন্ডনে পিএইডি করছিলেন। ‘৭১ সালের শুরুতে ওই অবস্থাতেই স্কলারশিপ সারেন্ডার করে মুক্তিযুদ্ধের আগমুহুর্তে দেশে ফিরে আসেন। তারপর বরিশাল সরকারি বিএম কলেজের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। তার তিন মাস পর পাঁচ সন্তানকে এতিম করে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন।
আমি নিজের শরীরে তাজা রক্ত দিয়ে যে দেশ সৃষ্টি করলাম, সে দেশে আমার স্ত্রী আট দিন হাসপাতালে ভর্তি রইলেন। অথচ হাসপাতালে চিকিৎসার পর্যাপ্ত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসা পেলেন না। আইসিইউতে খালি বেড থাকা সত্ত্বেও একটি বেড পেলেন না। কেবলমাত্র ডাক্তরদের অবহেলা, অমমত্ববোধ, নিষ্ক্রিয়তা, দায়িত্বহীনতা, আর অমানবিকতার কারণে বিনা চিকিৎসায় অপরিসীম কষ্ট পেতে পেতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন।
মৃত্যুর পরও হাসপাতালের একজন স্টাফকেও ডেকেও পাওয়া যায় নি। কেউ আসে নি। এমনকি আমার মৃত স্ত্রীর হাতে লাগানো ক্যানোলাটিও কোনও ডাক্তার, নার্স বা কোনও স্টাফ খুলে দেয় নি। আমার ছেলেকে ক্যানোলাটি খুলতে হয়েছে। ওয়ার্ড থেকে মৃতদেহ নামাতে হাসপাতালের কোনও ট্রলি পাওয়া যায় নি। হাসপাতালের সামনের রাস্তায় থাকা লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের ট্রলি এনে বেড থেকে মৃতদেহটি আমার দু ছেলে বের করে করেছে।
হাসপাতালে লাশ গোসলের ব্যবস্থা আছে। ছয় হাজার টাকা খরচ করতে হয়। ছয় হাজার টাকার বিনিময়ে হাসপাতালের মধ্যেই গোসল করিয়ে নিজেরাই মায়ের মৃতদেহটি নিয়ে এসেছে।
আল্লাহ্ আমি তোমার কাছে বিচার চাই। আট দিনের আরও বহু ঘটনা রয়েছে। এখানে খুব সংক্ষেপে ঘটনার মূল অংশটি উপস্থাপন করলাম। আল্লাহ যদি তৌফিক দেন তবে এ সম্পর্কে বিস্তারিত লিখে জাতির কাছে, মানবতার দুয়ারে ও আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে চুলচেরা বিচার চাইব। এখানে আমি শুধু আমার মর্মবেদনা, অতিকষ্টের অনুভূতি ব্যক্ত করলাম। কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আঘাত করতে লিখি নি। তারপরও যদি কারও খারাপ লেগে যায় তাহলে আমি কিইবা করতে পারতাম?
তেপ্পান্ন বছর আগে থেকে, ৮ মে ১৯৬৭ থেকে আমি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রেডক্রস সোসাইটির আজীবন সদস্য। বর্তমানে বাংলাদেশে জীবিত আজীবন সদস্যদের মধ্যে হয়ত আমিই সবচেয়ে জেষ্ঠতম সদস্য। একাধিকবার জাতীয় বোর্ড সদস্য ও হলিফ্যামিলি হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির সদস্যও ছিলাম। আমার স্ত্রীকে ভর্তির আগে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির একজন সিটিং পরিচালক এবং একজন সাবেক উপ-পরিচালক একাধিকবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের কথা মতো রোগী নিয়ে হাসপাতালে পৌছেছি দুপুর ১ টায়। তারপরও প্রায় ৫ ঘন্টা জরুরী বিভাগে ফেলে রেখেছে।
রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির বর্তমান চেয়ারম্যান জনাব হাফিজ আহমদ মজুমদার এমপি ও ট্রেজারার হেলাল সাহেব দু জনেই সাত আটবার ফোন করে হাসপাতাল পরিচালকে তাগাদা দিয়ে সন্ধা ৬ টার পর ভর্তি করাতে সক্ষম হয়েছেন। এরপর প্রায় প্রতি দিনই চেয়ারম্যান ও ট্রেজারার সাহেব উর্যুপরি হাসপাতাল পরিচালকের কাছে খোঁজখবর নিয়েছেন। হেলাল সাহেব নিজেও আমার স্ত্রীর সাথে একাধিকবার ফোনে কথা বলেছেন।
গেল ২৩ মে চেয়ারম্যান সাহেব আমাকে ফোন করে হাসপাতাল পরিচালক ডা. মুর্শেদের নাম ও মোবাইল ফোনের নম্বর (০১৭১৪ ২১৮ ১০৬) এসএমএস করে পাঠিয়ে জানিয়েছেন, হাসপাতাল পরিচালক বলেছেন, যে কোনও প্রয়োজনে আমি যেন নিজের পরিচয় দিয়ে তাকে সরাসরি ফোন করে জানাই। চেয়ারম্যান সাহেবের মেসেজ অনুযায়ী ক্রান্তিকালে আমি অসংখ্যবার হাসপাতাল পরিচালক ডা. মুর্শেদকে ফোন করেছি, কিন্তু তিনি কখনও ফোন ধরেন নি। ⛘




