অগ্নিঝরা মার্চমুক্তিযুদ্ধস্বাধীনতা

কারো বাপের শক্তি নাই স্বাধীনতা ঠেকায়: ভাসানী

জাকির হোসেন

একাত্তরের ৯ মার্চ ঢাকা মহানগরী ছিল মিছিল ও সমাবেশে উত্তাল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সর্বাত্মক অসহযোগে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো প্রশাসন। স্বাধিকার আন্দোলনের কর্মসূচি অনুযায়ী সচিবালয়, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিস, হাইকোর্ট, জেলা কোর্টসহ বিভিন্ন অফিস-আদালতে হরতাল পালিত হয়। মার্চের একেকটি দিন যাচ্ছিল আর বীর বাঙালির একেকটি নতুন ইতিহাস রচনা হচ্ছিল।

একাত্তরের এই দিনে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পল্টন ময়দানে ন্যাপের বিশাল সমাবেশে ২৫ মার্চের আগেই বাংলাদেশকে স্বাধীনতা দেয়ার জন্য ইয়াহিয়া খানের প্রতি আহ্বান জানান। জনসভায় ইয়াহিয়ার উদ্দেশে ভাসানী বলেন, “২৫শে মার্চের মধ্যে ‘স্বাধীনতা’ দেওয়া না হলে আমি ও শেখ মুজিব একযোগে আন্দোলন করিব- আমরা প্রধানমন্ত্রী হতে যাব না। কারো বাপের শক্তি নাই স্বাধীনতা ঠেকায়।” এ জনসভায় বক্তব্য দানকালে জাতীয় লীগ সভাপতি, পূর্ববাংলার সাবেক আওয়ামী লীগ দলীয় মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান অবিলম্বে ‘বাংলায় জাতীয় সরকার’ গঠনের জন্য আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘বাঙালীর আজ আর কোনো দাবি নাই- সে চায় মুক্তির স্বাদ’। জনসভার আগে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর সঙ্গে টেলিফোনে আলোচনা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সার্জেন্ট জহুরুল হক (ইকবাল) হল ক্যান্টিনে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের জরুরি সভায় গৃহীত স্বাধীন বাংলাদেশ ঘোষণার প্রস্তাব অনুমোদন এবং আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশে জাতীয় সরকার গঠনের অনুরোধ করা হয়।
বাংলার সার্বিক স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা ও মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আহুত অসহযোগ আন্দোলনের দ্বিতীয় দিনে (৯ মার্চ, মঙ্গলবার) ঢাকায় সরকারি, আধা-সরকারি ও সকল আদালত কর্মচারী কার্যে যোগ দিতে বিরত থাকেন। স্বাধিকার সংগ্রামে গত কয়েকদিনে নিহত শহীদদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধায় শোকাভিভূত নগরবাসী এদিন ঘরে ঘরে কালো পতাকা উত্তোলন করে। সকল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও যানবাহনেও কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। গত কয়েকদিনের সংগ্রামী ব্যস্ততার পর এদিন (৯ মার্চ, মঙ্গলবার) সকাল থেকেই নাগরিক জীবনে পুনরায় স্বাভাবিক তৎপরতা শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত কর্মসূচি বাণিজ্যিক ব্যাংক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সকল ক্ষেত্রে পূর্ণভাবে পালিত হয়।

পরদিন ১০ মার্চ (বুধবার) প্রকাশিত বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় এসব ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়। এ দিন (১০ মার্চ, বুধবার) দৈনিক ইত্তেফাক ‘ লা-কুম্ দ্বী’নুকুম অল্ইয়াদ্বীন- পশ্চিমে মার্চের পর শেখ মুজিবের সহিত মিলিয়া আন্দোলন করিব: পল্টনের জনসভায় মওলানা ভাসানীর ঘোষণা’ শিরোনামে প্রধান খবর হিসেবে ৪ কলামে প্রকাশ করে। এছাড়া ইত্তেফাক ‘মুজিব-ভাসানী আলোচনা’, ‘প্রয়োজন বোধে বাংলা হইতে জাতিসংঘ স্টাফদের অপসারণের নির্দেশ’, ‘রাজশাহীতে কারফিউ জারির প্রতিবাদ: আওয়ামী লীগ নেতা জনাব কামরুজ্জামানের বিবৃতি’ শিরোনামে ৯ মার্চের (মঙ্গলবার) কয়েকটি ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে।

আজাদ এদিন ‘পল্টনের জনসমুদ্রে মওলানা ভাসানী ঐতিহাসিক ঘোষণা: মুজিবের সহিত একযোগে মুক্তি সংগ্রাম করিব’ শিরোনামে প্রধান খবর হিসেবে ৮ কলামে প্রকাশ করে। আজাদ-এ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত অন্য সংবাদগুলোর শিরোনাম ছিল, ‘রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বিবৃতি: মুজিবের ঘোষণার প্রতি অভিনন্দন’, ‘রাজশাহীতে ৮ ঘণ্টা কারফিউ’, ‘ জাতীয় সরকার গঠনের আহ্বান’, ‘প্রেসিডেন্টের শ্রীঘ্রই ঢাকা সফর’, ‘মুজিব আমার ছেলে মতো’ ইত্যাদি।

আর সংবাদ এদিন ‘২৫ তারিখের মধ্যে না দিলে মুজিবের সঙ্গে একযোগে আন্দোলন করিব: ভাসানী’ শিরোনামে প্রধান খবর হিসেবে ৮ কলামে প্রকাশ করে। এ ছাড়াও সংবাদ এদিন‘ ‘মুজিব ভাসানী আলোচনা’, ‘ইয়াহিয়া শিঘ্রই বাংলাদেশে সফর করিবেন’, ‘স্বাধীকার আদায়ে মুজিবের আহ্বানে অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি বিভিন্ন মহলের সমর্থন’ ‘রাজশাহীতে আবার কারফিউ’ ‘রাজনৈতিক পরিস্থিতি: ওয়ালী খান মুজিবের সহিত আলোচনা করিবেন’ ‘প্রেসনোটে তথ্যগত ভুল রহিয়াছে: মোজাফফর, রক্তচক্ষু ও বেয়নেট দিয়া দমান যাইবে না’ শিরোনামে কয়েকটি খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে।

’৭১-এর ১০ মার্চ (বুধবার) দৈনিক ইত্তেফাক, সংবাদে ও আজাদে -এ প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদন তুলে ধরা হল:

২৫ তারিখের মধ্যে না দিলে
মুজিবের সঙ্গে একযোগে আন্দোলন করিব : ভাসানী
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক:
অশীতিপর বৃদ্ধ রাজনৈতিক নেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী গতকাল (৯ মার্চ মঙ্গলবার) পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত এক বিরাট জনসভায় বক্তৃতাকালে অবিলম্বে বাংলার স্বাধীনতা প্রদানের জন্য প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের প্রতি আহ্বান জানান। মওলানা বলেন, ২৫শে মার্চের মধ্যে যদি ‘স্বাধীনতা’ দেওয়া না হয় তাহা হইলে আমি ও শেখ মুজিব পুনরায় ‘৫২-সালের মতো একযোগে আন্দোলন করিব- প্রধানমন্ত্রী হইতে আমরা যাইব না।

পাক-ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাস উল্লেখ করিয়া মওলানা সাহেব বলেন, ‘বৃটিশেরা যখন বুঝিল যে, তাহাদের আর শাসক হইয়া থাকার অধিকার নাই, কিন্তু‘ সেই সঙ্গে ভাবিল যে মার্কেটও না হারাইতে হয় সে জন্য তাহারা দুই বছর পূর্বেই ঘোষণা করিল তোমরা স্বাধীন। তোমার কাছে সেই আদর্শ মহামূল্যবান। কাজেই নিজে উপলব্ধি করিতে না পারিলে ভুট্টো প্রমুখের সঙ্গে আলোচনা করিয়া দুই দিন পরেই না হয় আস (ঢাকায়)’। মওলানা সাহেব ছাড়াও জনসভায় ন্যাশনাল লীগ প্রধান আতাউর রহমান খান বক্তৃতা করেন।…

মওলানা সাহেব তাহার বক্তৃতায় বলেন, দুনিয়ার ইতিহাস না জানিলে, পড়িতে ইচ্ছা না করিলে পাক-ভারতের ইতিহাস পাঠ করিবার অনুরোধ জানাই। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ জালিয়ান-ওলাবাগে গুলী চালাইয়া নিরীহ ভারতবাসীকে হত্যা করার পর তাহার পতন হয়। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের মতো দোর্দণ্ড প্রতাপশালী যাহার সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যাইত না সে-ও নিরস্ত্র মানুষের উপর গুলী করিয়া টিকিয়া থাকিতে পারে নাই।

পাকিস্তান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকালে মুসলিম লীগ সরকার ছাত্র জনতার উপর গুলী চালায়। ফলে তাহার ধ্বংস হয়, পতন হয়, সে কবরস্ত হয়। আবু হোসেনের মন্ত্রিসভা সদরঘাটে ভুখা মানুষের উপর গুলী চালাইয়া হত্যা করে- তাহার পতন হয়। আইয়ুব খান এই ঢাকায় মিলিটারী দিয়া গুলী চালাইয়া শুধু ধ্বংস হয় নাই, তাহার নাম নিশানাও আজ প্রায় নিশ্চিহ্ন। তুমি তোমার পতন নিজেই ডাকিয়া আনিয়াছে। ২৩ বছর পশ্চিমারা যে শোষণ করিয়াছে, উহার বিচার না করিয়া তুমি গুলী করিয়াছ। অথচ তোমার আমলেই ঘুষ, দুর্নীতি, চোরকারবারী, টাউট, জুয়াড়ী, মদখোর বাড়িয়াছে।…

মওলানা সাহেব বলেন, আর গুলী চালাইয়া লাভ নাই। আমেরিকার ষড়যন্ত্রে ইন্দোনেশিয়ার ১৭ লাখ মানুষকে হত্যা করিয়া সমুদ্রের পানি লাল করিয়াছে। কিন্তু সেখানেই শেষ নহে। রক্তের পুরস্কার হাসিল তাহার করিবেই। ৭ কোটিকে হত্যা করা যাইবে না। ৭ কোটির মুক্তির দাবি দাবাইয়া রাখা যাইবে না। আমরা যদি মাছ, দুধ, বেগুন, বকরী, পানি, ডাল, চাল না দেই পশ্চিম পাকিস্তান হইতে দুম্বা আনিয়া খাইতে হইবে। তোমাকে আমরা কেন দিব?

তোমরা রাজশাহীতে অসংখ্য ছাত্র গুলী করিয়াছ। আজ মা তাহার সন্তানের জন্য খালি বুকে হাহাকার করিতেছে। সকল মায়ের দুঃশ্চিন্তা: বুঝি তাহার ছেলেই গুলীতে মরিয়াছে। জানিয়ার রাখ মা’র মতো দরদী আর নাই। মা’র অভিশাপ বড় অভিশাপ।

মওলানা বলেন, ‘জালেমের জুলুম যে বরণ করে সেও মহাপাপী। জালেমের সহিত কোনো দিন কোনো আপোস নাই। আগে তওবা কর, তারপর বন্ধু’।

মওলানা বলেন, ‘তুমি কাশ্মীর দখল করিতে পার না- বাহাদুরী তোমার। ভারত দুনিয়ার রীতিনীতি না মানিয়া কাশ্মীর দখল করিয়া আছে। তাহা দখল না করিয়া তুমি বাংলার মানুষকে গুলী কর। তুমি নিজেই জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকিয়া নিজেই বন্ধ করিয়া দিয়াছ। গণতন্ত্র তুমি মান নাই। মতামত না হইলে সংখ্যালঘু দল ওয়াক আউট করে। ভারতের পার্লামেন্টে মুসলমানরা তাহাই করিত। বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ দল যে কোনো আইন পাশ করিবে। তাহাতে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা সংখ্যালঘু দলের নাই।…

মওলানা বলেন, ‘মুজিবুর রহমান- নিজের ছেলের মতো সে আমার। আমার ৩ ছেলের চেয়ে তাহাকে বেশি ভালোবাসি। সে আমার বেশি খেদমত করিয়াছে।…

মওলানা বলেন, ‘মুজিব রেসকোর্সে সংগ্রাম চালাইয়া যাওয়ার কথা বলিয়াছে। কেহ কেহ বলে যে মুজিব ইহাহিয়ার সহিত আপোষ করিবে। আপোষের দিন চলিয়া গিয়াছে। তোমরা তাহাকে নয়নমনি, নয়নমনি যাহাই বল না কেন, ভাসানীরও রান ছিড়িয়া লইবে। মুজিব বঙ্গবন্ধু হোক বা যা-ই হোক, আপোষ করিলে তাহার গায়ের চামড়া ছিড়িয়া লইবে। আপোষের সেই পর্যায় চলিয়া গিয়াছে। আপোষের আর পথ নাই। এখন ‘লাকুম দিনু কুম ওয়ালিয়া দিন’- কাহারো বাপের শক্তি নাই স্বাধীনতা ঠেকায়। মারামারি কাটাকাটি ভালো নহে- তারাতাড়ি ফয়সালা কর।

স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাংলা স্বাধীন হইবে, তারপর কি হইবে। খাদ্যাভাব, লবণের দাম একটাকা চার আনা, কেরোসিন সাড়ে ৩ টাকা, জিরা ১৫ টাকা, সিমেন্টের বস্তা সাড়ে ২২ টাকা, টিনের বান্ডিল ২৪২ টাকা- ইহার প্রতিকার কী? প্রত্যেক গ্রামে সংগ্রাম পরিষদ কর। মুখে আমার মতো দাড়ি আর কপালে হাতাজ্জুত পড়ার দাগ লাগাইয়া মিথ্যা কথা বল। স্বাধীনতার নামে চাঁদা আদায় কর আর ক্যাপেস্টেন সিগারেট খাও। চরিত্র ঠিক কর, চীনের মানুষ মিথ্যা কথা বলে না। অথচ তাহারা আল্লাহ আল্লাহও করে না। স্বাধীনতা হইলেই চলিবে না- উহাকে রক্ষা করিতে হইবে। সব ভেদাভেদ ভুলিয়া মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান সব ভাই ভাই, কাহারো ঘর পোড়ানো যাইবে না। তবে দেখ পশ্চিম পাকিস্তানে যেন একটি পয়সাও না যায়, যদি কেহ চেষ্টা করে তাহার মাথার চুল ধরিয়া পিটাও’।

পরিশেষে মওলানা বলেন, ‘মুজিবুর, তোমরা খামাখা তাহাকে অবিশ্বাস কর। ২৫ তারিখের মধ্যে যদি স্বাধীনতা না দেয় তাহা হইলে আমিও মুজিবুর আবার ১৯৫২ সনের মতো একমত হইবো- প্রধানমন্ত্রী হইতে যাইবো না।

প্রস্তাবাবলী: জনসভার শুরুতে ভাসানী ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক জনাব মসিহুর রহমান প্রস্তাবাবলী পেশ করেন। প্রস্তাবে সাম্প্রতিক গুলী বর্ষণের নিন্দা, হতাহতের পরিবাবের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ ও সর্বত্র গায়েবানা জানাজার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান হয়। প্রস্তাবে ৯ জানুয়ারী সন্তোষ সম্মেলন ও ১০ই জানুয়ারী পল্টনের জনসভায় গৃহীত ‘স্বাধীন সার্বভৌম পূর্ব বাংলা’ প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জানানো হয়। প্রস্তাবে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও একচেটিয়া পুজিবাদ বিরোধী কৃষক-শ্রমিক রাজ কায়েম এবং সকল নাগরিকের সমান অধিকার ঘোষণা করা হয়। প্রস্তাবে বাংলাদেশে উৎপাদিত সকল পণ্যের বিকল্প বর্জন, শেখ মুজিবুর রহমানের খাজনা-ট্যাক্স বর্জনের আহ্বান কার্যকরকরণ, গুলীবর্ষণে দায়ী কর্মচারীদের বিচার, সীমান্তে চোরাচালানী বন্ধ, ৩০ লাখ টন খাদ্য ঘাটতি পূরণের জন্য কৃষকদের খাদ্য উৎপাদনে উৎসাহ দান, ভূমিহীনদের ভূমি বণ্টন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, সকল প্রকার সাম্প্রাদয়িক সম্প্রীতি রক্ষা, বিদেশী সৈন্য যাহাতে অবতরণ করতে না পারে তজ্জন্য চালনা ও চট্টগ্রাম বন্দরের উপর সজাগ দৃষ্টি রাখা, সকল খেতাব বর্জন এবং বাংলার সর্বস্তরে সংগ্রাম কমিটি গঠনের আহ্বান জানান হয়।
(সংবাদ, ১০মার্চ বুধবার, ১৯৭১)

ভাসানী-মুজিব আলোচনা
ঢাকা ৯ই মার্চ (এ পি পি)-
আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান আজ মওলানা হামিদ খান ভাসানীর সহিত টেলিফোনে আলোচনা করেন বলিয়া আওয়ামী লীগ সূত্রে প্রকাশ। পল্টনের জনসভায় বক্তৃতা করার জন্য মওলানা ভাসানী সন্তোষ হইতে ঢাকা পৌছিবার অব্যবহিত পরেই উভয় নেতার এই আলোচান অনুষ্ঠিত হয় বলিয়া ভাসানী ন্যাপ সূত্র হইতে জানা যায়। আরো জানা যায় অন্য দুই জন আওয়ামী লীগ নেতা জনৈক ভাসানীপন্থী ন্যাপ নেতার সহিত আড়াই ঘণ্টাব্যাপী এক বৈঠকে মিলিত হন।
(সংবাদ, ১০ মার্চ বুধবার, ১৯৭১)

জাতীয় সরকার গঠনের আহ্বান
স্টাফ রিপোর্টার:
জাতীয় লীগ সভাপতি জনাব আতাউর রহমান খান গতকাল ( ৯ মার্চ, মঙ্গলবার) পল্টনের ঐতিহাসিক জনসভায় অবিলম্বে ‘বাংলায় জাতীয় সরকার’ গঠনের জন্য আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি উদার্ত আহ্বান জানান। মজলুম জননেতা মওলানা হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বিশাল জনসভায় পূর্ববাংলার সাবেক আওয়ামী লীগ দলীয় মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান বলেন, ‘বাঙালীর আজ আর কোনো দাবি নাই- সে চায় মুক্তির স্বাদ’।
(আজাদ: ১০ মার্চ বুধবার, ১৯৭১)

ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় পরিষদের জরুরী সভায়
‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ ঘোষণা প্রস্তাব অনুমোদন
গতকাল (৯ মার্চ, মঙ্গলবার) সার্জেন্ট জহুর (ইকবাল) হল ক্যান্টিনে ছাত্র লীগের কেন্দ্রীয় সংসদের এক জরুরী সভা সংগঠনের সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়।…

সভায় গৃহীত রাজনৈতিক প্রস্তাবে গত ২রা মার্চ বটতলায় অনুষ্ঠিত ছাত্রলীগ ও ডাকসু’র নেতৃত্বে গঠিত ‘স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের’ সভায় গৃহীত ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ ঘোষণার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। অপর এক প্রস্তাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বাংলাদেশে জাতীয় সরকার’ গঠনের জন্য অনুরোধ করা হয়। সভায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী, সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ, ডাকসু’র সহসভাপতি আসম আব্দুর রব এবং সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুস মাখনকে লইয়া গঠিত ‘স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উপর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।…
(ইত্তেফাক: ১০ মার্চ বুধবার, ১৯৭১)

অসযোগ আন্দোলন
গতকালের ঢাকা নগরী
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক:
বাংলার সার্বিক স্বাধীকার প্রতিষ্ঠা ও মুক্তির জন্য আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক আহুত অসহযোগ আন্দোলনের দ্বিতীয় দিবসে গতকাল (৯ মার্চ মঙ্গলবার) ঢাকায় সরকারী, আধাসরকারী ও সকল আদালত কর্মচারী কার্যে যোগ দিতে বিরত থাকেন। এদিকে স্বাধীকার সংগ্রামে গত কয়েকদিনে নিহত শহীদদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধায় শোকাভিভূত নগরবাসী গতকাল ঘরে ঘরে কালো পতাকা উত্তোলন করে। সকল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও যানবাহনেও কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। গত কয়েকদিনের সংগ্রামী ব্যস্ততার পর গতকাল সকাল হইতে নাগরিক জীবনে পুনরায় স্বাভাবিক তৎপরতা শুরু হয়। বাংলার স্বাধীকার আন্দোলনে শেখ মুজিব ঘোষিত কর্মসূচি বাণিজ্যিক ব্যাংক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ সকল ক্ষেত্রে পূর্ণভাবে পালিত হয়।

যোগাযোগ ও যানবাহন চলচলের ক্ষেত্রে একমাত্র পি, আই, এ-এর অভ্যন্তরীণ সার্ভিস সমূহ গতকাল কর্মচারীদের ধর্মঘটের জন্য চলাচল করে নাই। ইহা ছাড়া ট্রেন, লঞ্চ, স্টিমার ইত্যাদি স্বাভাবিক চলাচল করে। শহরের দোকানপাট, হোটেল রেস্তোরা ও প্রধান প্রধান বিপনীকেন্দ্রগুলি গতকাল খোলা হয়। শহরে যানবাহন ও লোকজন চলাচল স্বাভাবিক পরিলক্ষিত হয়।
(সংবাদ: ১০ই মার্চ, বুধবার, ১৯৭১)

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension