
‘জনগণ ভোট দিলে আছি, না দিলে নাই কারও মুখাপেক্ষী হয়ে ক্ষমতায় আসতে চাই না’- সংবাদ সন্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

অমরেশ রায়, কারও মুখাপেক্ষী হয়ে ক্ষমতায় আসার আকাঙ্ক্ষা নেই জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ক্ষমতায় আসা কিংবা থাকার জন্য তিনি কারও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকেন না। জনগণই তার শক্তি। তিনি বলেন, জনগণ ভোট দিলে ক্ষমতায় আছি, না দিলে নাই। কারও সহযোগিতা নিয়ে যদি ক্ষমতায় আসতে হয়, তাহলে ওই ক্ষমতা তার দরকারও নেই। আগামি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর রাষ্ট্রপতি ও জোটভুক্ত দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষে ‘নির্বাচনকালীন সরকার’ গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন ফর্মুলা নেই। সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার পরই ঠিক করা হবে, এ সরকারের গঠন ও আকার কেমন হবে।
সব দলের অংশগ্রহণে আগামী নির্বাচন হবে- এমন আশাবাদ ব্যক্ত করলেও বিএনপিকে ওই নির্বাচনে আনতে কোন উদ্যোগ নেওয়ার কথা নাকচ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচন নির্বাচনের মতই হবে। দেশের মানুষও নির্বাচনমুখী। সব দলই এ নির্বাচনে আসবে বলে মনে করি। কিন্তু কোন দল নির্বাচনে আসবে কি আসবে না, সেটি তাদের বিষয়। কেউ না এলে সেটিও তাদের দলীয় সিদ্ধান্ত। এখানে সরকারের কিছু করার নেই। আগামী নির্বাচনে ইভিএম পদ্ধতি বিষয়ে তার আপত্তি নেই বলেও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
গতকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রীর তার সরকারি বাসভবন গণভবনে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৩তম অধিবেশনে যোগদান উপলক্ষে তার নিউইয়র্ক সফরের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরতেই এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তরে বরাবরের মত এবারও সাম্প্রতিক রাজনীতির বিভিন্ন প্রসঙ্গই প্রাধান্য পেয়েছে। আগামী নির্বাচন ঘিরে বিভিন্ন জোট গঠন প্রক্রিয়া, নির্বাচনকালীন সরকার, ইভিএম ব্যবহার, আলোচিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিলসহ সমসাময়িক বিভিন্ন প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের খোলামেলা জবাব দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।
সংবাদ সম্মেলন মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী এবং জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা ছাড়াও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী জানান, জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক অবস্থানকালে তার সঙ্গে যতজন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের বৈঠক হয়েছে, তাদের সবাই তিনিই আবার ক্ষমতায় আসবেন এমন আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন। তবে তিনি তাদের বলেছেন, জনগণের ভোটে বিশ্বাসী তিনি। জনগণ ভোট দিলে আছি, না দিলে নাই।
আগামি নির্বাচনে দেশের জনগণ আবারও নৌকায় ভোট দেবে- এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক কষ্ট করে তো আমরা গণতন্ত্রটা ফিরিয়ে এনেছি। গণতন্ত্রের ধারাটা অব্যাহত থাকবে, উন্নয়নের ধারাটা অব্যাহত থাকবে; সেটাই তো মানুষ চায়। এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে মানুষ নৌকায় ভোট দেবে। কারণ, একমাত্র নৌকা ক্ষমতায় থাকলেই দেশের উন্নয়ন হয়। দেশ সব দিক থেকে এগিয়ে যায়।
কোটা চাইলে আন্দোলন করতে হবেঃ
সরকারি চাকরিতে কোটা তুলে দেওয়া ঠিক হলো কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোটা থাকলেই শুধু আন্দোলন। তাই কোটার দরকার নেই। কোটা না থাকলে আন্দোলন নেই, সংস্কারও নেই। তিনি বলেন, যদি কেউ কোটা চায়, তাহলে এখন কোটা চাই বলে আন্দোলন করতে হবে। সেই আন্দোলন যদি ভালোভাবে করতে পারে, তখন ভেবেচিন্তে দেখা হবে কী করা যায়? এরপর যদি কেউ কোন কোটা চায়, তাহলে তাকে আন্দোলন করতে হবে। আন্দোলন ছাড়া কোটা দেওয়া হবে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর কোটা দেওয়া হল। যারা মুক্তিযোদ্ধা, নারী ও অনগ্রসর তাদের জন্য এটা জাতির পিতা করে গিয়েছিলেন। এজন্য আন্দোলন লাগে নি। এরপর আমরা ক্ষমতায় আসার পর যখনই কোটা পূরণ হত না, আমি প্রতি বছর রিলাক্স করে দিতাম। সেভাবেই কিন্তু হচ্ছিল। তারপর একবার বললাম যে এটা বারবার না এনে একটা স্ট্যান্ডার্ড নিয়ম করে ফেল। যেখানে কোটা পূরণ না হবে জায়গা যেন খালি না থাকে সেটা ওই তালিকা থেকে পূরণ করা হবে। সেভাবেই কিন্তু চলছিল। এই অবস্থায় হঠাৎ আন্দোলন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন মেয়েরাও কোটা চাই না বলে আন্দোলন করে, মুক্তিযোদ্ধার নাতি-পুতিরাও কোটা চায় না। তাহলে কোটা রাখব কার জন্য? যদি কারও কোটা লাগে তাহলে আন্দোলন করুক। তখন ভেবে দেখব।
আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে :পদত্যাগী প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের বিচার প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ল’ উইল টেক ইটস ওউন কোর্স। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। আর কিছু বললে তো বলবেন, বেশি বলি।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত সাবেক প্রধান বিচারপতি সিনহা তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে সরকারের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ‘পদত্যাগে বাধ্য করে নির্বাসনে’ পাঠানোর অভিযোগ তুলেছেন। এক সাক্ষাৎকারে বিচারপতি সিনহা বলেছেন, তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে অনুরোধ করেছিলেন, যেন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আসার বিষয়ে সমর্থন না করেন।
এ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমরা কারও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকি না। সাবেক প্রধান বিচারপতি সিনহার মতো বিএনপিসহ অনেকেও ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে আওয়ামী লীগকে সমর্থন না দেওয়ার কথা বলেছেন। এখন কেউ সমর্থন করবে কি করবে না, বাইরে থেকে কেউ ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে কি-না এ বিষয়ে চিন্তাও করেন না তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে বিচারপতি সিনহাকে বিচারাঙ্গনের সর্বোচ্চ পদে নিলেও তিনি তার মান রাখতে পারেন নি। এটাতে সরকারের কী করার আছে? আর ওই রকম মুখাপেক্ষী হয়ে ক্ষমতায় আসার আকাঙ্ক্ষা থাকলে ২০০১ সালেই ক্ষমতায় আসতে পারতাম। যখন আমেরিকার তরফে বলা হয়েছিল, ভারতের কাছে গ্যাস বিক্রি করতে রাজি হলে ক্ষমতায় আসব। আমি বলেছিলাম, দেশের গ্যাস দেশের জন্য ব্যবহারের পর উদ্বৃত্ত থাকলেই কেবল বিক্রি করব। নচেৎ নয়।
আবার যেন ক্ষমতায় আসি- বিশ্বনেতাদের প্রত্যাশাঃ
জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগদানকালে বিশ্বনেতারা আগামি নির্বাচন নিয়ে কোন পরামর্শ দিয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের রাজনীতি কিংবা নির্বাচন নিয়ে বিশ্বনেতারা তাকে কোন পরামর্শ দেন নি। তবে বিশ্বের বড় বড় দেশের রাষ্ট্র কিংবা সরকারপ্রধান- যার সঙ্গেই কথা বলেছি, তারা বলেছেন, তারা চান আগামিতেও যেন আমার সঙ্গে দেখা হয়। আমি যেন পুনরায় ক্ষমতায় আসি। তখন আমি তাদের বলে আসি নি- আপনারা একটু আসেন, আমাকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিয়ে যান। আমি তাদের জবাব একটাই দিয়েছি, দেশের মানুষ যদি ভোট দেয়, তবে আছি; না দিলে নাই।
পুড়িয়ে মানুষ হত্যাকারীদের নিয়ে এত মায়াকান্না কেনঃ
আগামি নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রসঙ্গে অপর এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সঠিক সময়ে নির্বাচন হবে এবং দেশের মানুষও ভোট দেবে। দেশে অনেক রাজনৈতিক দল। নির্বাচনে কোন দল আসবে আর কোন দল আসবে না এবং নির্বাচনে আসা বা না আসা সেই দলটির সিদ্ধান্তের ব্যাপার। তবে আমাদের আশা, সব দলই নির্বাচনে আসবে।
বিএনপিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে তার চেষ্টা ছিল, সবাই অংশ নিক। কিন্তু সেই নির্বাচন ঠেকানোর নামে পুড়িয়ে পুড়িয়ে মানুষ মারা হলো। যাদের নির্বাচনে চাইছেন, তারা শত শত মানুষকে নিষ্ঠুর কায়দায় পুড়িয়ে মেরেছে। আর যারা মানুষ পুড়িয়ে মারে, এতিমের টাকা পর্যন্ত মেরে খায়, তাদের জন্য এত মায়াকান্না, এত দরদ, এত সহানুভূতি ও এত কান্নাকাটি কেন?
শত ফুল ফুটতে দিনঃ
রাজনীতিতে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া নামে নতুন জোট গঠন এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, একেকটা জোট হচ্ছে, এতে তিনি খুব খুশি। তাদের জোট করার জন্য যদি সহযোগিতা লাগে, সেটাও করব। এসব জোট জনসভা করতে মানুষ চাইলে তার ব্যবস্থাও আওয়ামী লীগ করে দিতে প্রস্তুত।



