প্রধান খবরভারত

টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন: ঝাড়খণ্ডে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুতে বিভাজন সৃষ্টির কৌশল বিজেপির

ঝাড়খণ্ডের প্রায় প্রতিটি চৌরাস্তার কাছে বিজেপির বিশাল বিশাল ব্যানার-হোর্ডিং। এগুলোতে ভোটারদের সামনে দুটি বিকল্প দেওয়া হয়েছে। একটিতে লেখা, ‘হয় অনুপ্রবেশকারীদের আশ্রয় দাও অথবা আদিবাসীদের বাঁচাও।’ অন্যান্য ব্যানার-হোর্ডিংগুলোতেও একই বার্তা। এর সবই মূলত রাজ্যে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে ভয় ছড়ানোর কৌশল।

এই ব্যানার-হোর্ডিংগুলোর পটভূমির রং গেরুয়া ও সবুজ। যা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত। আরও স্পষ্ট করে বললে, গেরুয়া বিজেপির হিন্দু জাতীয়বাদের রং এবং সবুজ মুসলমানদের। ঝাড়খণ্ড বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রধান প্রচারণা এটি। তাদের দাবি, ‘ইন্ডিয়া’ জোট বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের রক্ষা করছে। এই অনুপ্রবেশকারীরা ঝাড়খণ্ডের আদিবাসীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে বলে অভিযোগ বিজেপির।

ঝাড়খণ্ড থেকে বাংলাদেশে যাওয়ার সবচেয়ে কাছের পথ পাকুড় জেলা হয়ে। রাজ্যের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে এই জেলা। এর মাঝে ৯ কিলোমিটারের বেশি আবাদি জমি ও গঙ্গা নদী, যা পশ্চিমবঙ্গে পড়েছে। এরপরই বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সীমান্ত।

ঝাড়খণ্ডে মুসলিম জনসংখ্যা ১৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ হলেও রাজ্যের বিধানসভায় এই জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি আসন অনুপাতে পাঁচ শতাংশের। কোনো জেলাতেই তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। তবে সাঁওতাল পরগনায় পাকুড় ও সাহেবগঞ্জ জেলায় তাদের সংখ্যা বেশি। এখানে মুসলিম জনসংখ্যা ৩৪ শতাংশের বেশি।

সাঁওতাল পরগনা ঝাড়খণ্ডের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল মুক্তি মোর্চার (জেএমএম) ঘাঁটি। বেশির ভাগ আদিবাসী, বিশেষ করে সাঁওতালরা, জেএমএমকে সমর্থন করে। তবে বিজেপির বাংলাদেশি বিরোধী প্রচারণা নিয়ে সতর্ক রয়েছেন তারা।

জামতাড়া জেলার নালার জেএমএম ঘাঁটিতে গোমেশ্বর সরেন নামে এক প্রার্থী পলাজোরি গ্রামে সমর্থকদের সমাবেশে ব্যস্ত ছিলেন। এ সময় বিজেপির একটি প্রচারণা গাড়ি সেই সমাবেশকে পাশ কাটিয়ে যায়। ভ্যানে লেখা, ‘রুটি, মাটি, বেটি (খাবার, জমি, মেয়ে) ’ বাঁচানোর ডাক।

এই স্লোগান ভোটারদের প্রভাবিত করে কি না জানতে চাইলে গোমেশ্বর বলেন, ‘গ্রামে মুসলমানদের সঙ্গে কিছু তর্কাতর্কি তো হয়ই, তবে তা আমরা নিজেরাই মিটিয়ে নিই। কোনো বাংলাদেশিকে আমি চিনি না। কেন্দ্র সীমান্ত পাহারা দেয়। পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশের সীমান্ত। মমতা দিদিকে প্রশ্ন করুক, আমাদের কেন?’

নালার কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার (সিপিআই) কার্যালয়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা নিয়ে একটি সমাবেশে কথা বলার সময় প্রবীণ নেতারা বাধা দেন। স্থানীয় নালা ডিগ্রি কলেজে বিজেপির উসকানিমূলক প্রচার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে কলেজের ছাত্র বিধান মণ্ডল দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘কিছু ছাত্র এমনটা ভাবছে।’

তবে সিপিআইয়ের প্রবীণ নেতা নিমাই মাহাতো তাঁকে থামিয়ে বলেন, ‘এগুলো অর্থহীন কথা! বিজেপি মানুষের মন বিষিয়ে তুলছে। সিপিআই এখানে নয় বার এই আসন জিতেছে। মানুষ বুদ্ধিমান। আমরা চাকরি ও ভালো শিক্ষার দাবি করি।’

সমাবেশে সাবেক শিক্ষক দিলীপ হেমব্রম বলেন, ‘গণমাধ্যম এই বিভাজনমূলক রাজনীতি বাড়াচ্ছে। আদিবাসী, হিন্দু ও মুসলিম একসঙ্গে শান্তিতে ছিলাম। এখনো পুরোপুরি ঐক্য নষ্ট হয়নি। আমরা ঝাড়খণ্ড তৈরি করেছি আদিবাসীদের কল্যাণের জন্য। ঐক্য তৈরি কঠিন কিন্তু এখনো আমরা বিজেপিকে ঠেকানোর মতো ঐক্যবদ্ধ।’

কেডুয়ে গ্রামের রামচন্দ্র মাধাইয়া মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সরেনের সরকারের কল্যাণমূলক কাজের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘জেএমএম-ই এখানে জিতবেই। তবে কখনো মনে হয়, বিজেপি যা বলছে, তাতে সত্যতা থাকতে পারে। বিজেপি ক্ষমতায় থাকলে মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে রাখা হতো। মমতা এই সমস্যা তৈরি করেছেন।’ তিনি কি কখনো মুসলমানদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছেন—এমন প্রশ্নে তিনি মাথা নাড়িয়ে বলেন, ‘না, তবে তারা একটু রূঢ়।’

পাকুড় জেলার বারহাইত মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সরেনের নিজের কেন্দ্র। এখানে বিজেপির পতাকা কম দেখা যায়। আর ভোগনাডিহি গ্রাম সাঁওতাল নেতা সিধু-কানু মুর্মুদের ঐতিহাসিক বিদ্রোহের কেন্দ্র। সিধু-কানুর গোত্রের বংশধর মণ্ডল মুর্মু প্রথমে হেমন্ত সরেনের পক্ষে ছিলেন। পরে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, বাংলাদেশিরা ভোগনাডিহিতে আধিপত্য বিস্তার করেছে এবং একমাত্র একটি দলের পতাকা ওড়ায় তারা।

তালবারিয়া চকে জেএমএম—এর পতাকার আধিক্য আছে। এই জায়গায় তরুণেরা রাতের আড্ডায় ডিম ভাজা আর চায়ের দোকানে বসে। দোকানিরা সাঁওতালি, বাংলা ও হিন্দি অনায়াসে বলতে পারেন। এই বিষয়টিকে বাঙালি, সাঁওতালসহ আদিবাসী গোষ্ঠী ও হিন্দুদের মধ্যকার ঐক্যের প্রকাশ বলেই মনে করেন ফরিদ আনসারি। কংগ্রেসের এই সমর্থক বলেন, ‘ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রার পর আমাদের ঐক্য আরও দৃঢ় হয়েছে।’

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension