নিউ ইয়র্ক

ড্রাগ ওভারডোজে মৃত্যুহার ২৮ শতাংশ কমেছে — তবুও নিউ ইয়র্কে শেষ হয়নি আসক্তির লড়াই

‘প্রতি চার ঘণ্টায় একজন নিউ ইয়র্কার হারাচ্ছে জীবন”— ড্রাগ সংকটে শহরের অসম বাস্তবতা

শাহ্ জে. চৌধুরী

নিউ ইয়র্ক | নিউ ইয়র্ক সিটিতে ড্রাগ ওভারডোজে মৃত্যুর হার গত এক বছরে ২৮ শতাংশ কমেছে — যা এক দীর্ঘ ও অন্ধকার অধ্যায়ের মাঝে আশার আলো দেখাচ্ছে।
কিন্তু আশার এই আলোয় ছায়া রয়েছে বাস্তবের— কারণ শহরের অনেক দরিদ্র, সংখ্যালঘু ও অভিবাসী সম্প্রদায় এখনও ড্রাগ সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী।

নতুন পরিসংখ্যান যা বলছে

নিউ ইয়র্ক সিটি হেলথ অ্যান্ড মেন্টাল হাইজিন ডিপার্টমেন্টের সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ড্রাগ ওভারডোজে মৃত্যুর সংখ্যা গত বছরের তুলনায় ২৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উন্নতির পেছনে কাজ করেছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ—
• ন্যালক্সন (Naloxone) নামের জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ব্যাপক বিতরণ,
• “হর্ম রিডাকশন সেন্টার” সম্প্রসারণ,
• মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কর্মসূচির বাড়তি তহবিল ও সাপোর্ট,
• এবং পুলিশের পরিবর্তে স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সচেতনতা অভিযান।

তবে রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই হ্রাসের সুফল সব জায়গায় সমানভাবে পৌঁছায়নি।
বিশেষ করে ব্রঙ্কস, ইস্ট হারলেম ও ব্রুকলিনের কিছু এলাকা এখনও ড্রাগ ওভারডোজের উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে রয়ে গেছে।

“ফেন্টানিল”— শহরের সবচেয়ে ভয়াবহ হুমকি

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, সামগ্রিক মৃত্যুহার কমলেও ফেন্টানিল (Fentanyl) নামের সিন্থেটিক ড্রাগের ভয়াবহতা কমেনি।
• ২০২৫ সালে ওভারডোজে মৃত্যুর ৮০ শতাংশেরও বেশি ঘটনায় ফেন্টানিল পাওয়া গেছে।
• খুব অল্প পরিমাণ ফেন্টানিলই একজন মানুষের প্রাণনাশ করতে পারে, যা বাজারে কোকেইন বা হেরোইনের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে।
• “এক চিমটি ফেন্টানিল পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দিতে পারে,” বলেন ড. ক্যারোলিন মেন্ডোজা, সিটি হেলথ অফিসার।

তিনি আরও যোগ করেন, “ড্রাগের সহজলভ্যতা, সামাজিক হতাশা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাই এই সংকটের মূল জ্বালানি।”

মানবিক দিক: এক মায়ের কান্না

ইস্ট হারলেমের বাসিন্দা মেলিসা গার্সিয়া তার ২৩ বছর বয়সী ছেলেকে হারিয়েছেন ওভারডোজে।
“আমার ছেলে কখনও বুঝতেই পারেনি সে কী নিচ্ছে। সে চেয়েছিল কেবল একটু ঘুমাতে,” কাঁদতে কাঁদতে বললেন তিনি।
তার মতো হাজারো পরিবার আজও নীরবে লড়ছে এক অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গে — যার নাম ড্রাগ আসক্তি।

করণীয় ও ভবিষ্যতের পথ

নিউ ইয়র্ক সিটির স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, মৃত্যুহার কমলেও যুদ্ধটা এখনো চলছে।
• প্রতিটি বরোতে হর্ম রিডাকশন সেন্টার বাড়াতে হবে।
• স্কুল ও কমিউনিটি পর্যায়ে ড্রাগ শিক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্য সেবা জোরদার করতে হবে।
• আসক্তি থেকে ফিরে আসা মানুষদের জন্য চাকরি ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়াতে হবে।
• আইন প্রয়োগের পাশাপাশি চিকিৎসা ও সহানুভূতির দৃষ্টিভঙ্গি জোর দিতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধুমাত্র শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, বরং “ড্রাগ ব্যবহারের মানবিক ও সামাজিক মূল কারণ” চিহ্নিত করলেই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।

ভবিষ্যতের সতর্কবার্তা

২০২৫ সালের এপ্রিলে শহরের ওভারডোজ প্রতিরোধ ইউনিট জানায়, “যদি ফেন্টানিলের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তবে আগামী বছর এই অগ্রগতি টিকে থাকবে না।”
তারা আরও সতর্ক করেছে— গৃহহীন, মানসিকভাবে অসুস্থ ও দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত না করলে সংকট আবার ভয়াবহ হয়ে উঠবে।

উপসংহার

নিউ ইয়র্ক সিটি আজ সামান্য এগিয়েছে, কিন্তু পথ অনেক বাকি।
ড্রাগ ওভারডোজের মৃত্যুহার কমে যাওয়া নিঃসন্দেহে এক ইতিবাচক সংবাদ,
তবে এই যুদ্ধে জয় মানে শুধু মৃত্যুর সংখ্যা কমানো নয় — বরং প্রতিটি মানুষকে পুনরায় বাঁচার সুযোগ দেওয়া।

ড্রাগ-মুক্ত নিউ ইয়র্কের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে দরকার সাহস, সহানুভূতি ও একসাথে চলার অঙ্গীকার।
ভালো থাকবেন। ভালোবাসবেন। একে অপরকে রক্ষা করবেন।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension