
তথ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সামাজিক মূল্যবোধের গুরুত্ব
মোঃ জাহিদুল ইসলাম
প্রযুক্তি সমাজের কাজে লাগবে, নাকি মানুষের জন্য বাধা তৈরি করবে, মূলত তা নির্ভর করে মানুষের মূল্যবোধ, নৈতিকতা, সততা ও সুবিবেচনার ওপর। মানব সভ্যতার অন্যতম প্রতিচ্ছবি হলো- সমাজ। সমাজ থেকে মানুষ সভ্যতার ছোঁয়া নিয়ে থাকে। সমাজে কারো ক্ষতি না করা, কারো মনে কষ্ট না দেয়া, কটুক্তি না করা প্রভৃতি হচ্ছে নীতি ও ঔচিত্যবোধ। তথ্য প্রযুক্তির অবাধ প্রসারের যুগে সঠিক ও সুস্থ সামাজিক মূল্যবোধ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে দ্রুত ও সহজ করলেও, মূল্যবোধ ছাড়া এর ব্যবহার সমাজকে ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে। যেহেতু প্রযুক্তির আবিষ্কার নির্দিষ্ট কোনো স্থান বা পাত্রের জন্য নয় তাই এর অপব্যবহারের মাধ্যমে যেকোনো ব্যক্তি ও সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর অপব্যবহার পৃথিবীর সব জায়গায়ই কম বেশি ঘটে | যার দরুন একটি দেশের নাগরিকদের আর্থিক, সামাজিক ও মানসিক অবক্ষয়ের হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে । এর প্রতিকার হিসেবে ইন্টারনেট ও অনন্য প্রযুক্তি ব্যবহারের ব্যাপারে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। অপরদিকে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করে এবং উদ্ভাবনীমূলক ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে আনন্দের সাথে জীবনকে উপভোগ করা সম্ভব। মানুষ সামাজিক জীব। এই মানুষ একা বাস করতে পারে না। সুষ্ঠুভাবে বেঁচে থাকার প্রয়োজনেই তাকে সংঘবদ্ধ হয়ে সমাজে বসবাস করতে হয়। মূলত আমাদের এই মানব সমাজ গড়ে উঠেছে আমাদেরই নিরাপত্তা, সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির জন্য। কিন্তু বর্তমান সামাজিক ব্যবস্থায় আমরা বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অবক্ষয় প্রত্যক্ষ করছি যা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। মানুষের ভেতর যখন আর মনুষ্যত্ব থাকে না, মানবিকতা থাকে না কিংবা মানুষের আচরণ যখন পশুর মতো ভয়ানক হয়ে ওঠে, তখনই সমাজে ক্রমাগত ঘটতে থাকে বিনাশ। মানুষের এই নৈতিক অবক্ষয়ই মূলত সমাজের অবক্ষয়। একটা সমাজের সব লোকই খারাপ তা নয়। সংখ্যায় অতি নগণ্য হলেও আমাদের এই সমাজে মানবিক মানুষও আছে। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যতটা না যোগাযোগের মাধ্যম তার চেয়ে বেশি অন্যের জীবন নিয়ে চর্চা ও মাথা ঘামানোর মাধ্যম হয়ে উঠেছে। যা আমাদেকে শারীরিক এবং মানসিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যক্তিজীবনের দর্পণই শুধু নয় বরং এটি সমাজেরও দর্পণ। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বিশ্ব এখন গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে । মিডিয়ার কল্যাণে পুরো বিশ্বের খবর এখন সবার হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। পৃথিবীর যে প্রান্তেই কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটুক না কেন তা আর কারো অজানা থাকে না। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট ইত্যাদি ফিচার আর কন্টেন্ট নিয়ে বর্তমান তরুণ সমাজের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো। এসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আয়ের ৯৮-৯৯ শতাংশ আসে ব্যবহারকারীরা তাঁদের ডিভাইসের স্ক্রিনে যে বিজ্ঞাপন দেখেন, তার মাধ্যমে। ফলশ্রুতিতে ব্যবহারকারীরা যত বেশি সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করবে, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো তত অর্থ আয় করতে পারবে। এর ফলে সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে আগামী প্রজন্মেকে। এসবের বদৌলতে কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে তরুণদের চোখ আটকে যাচ্ছে মোবাইল স্ক্রিনের কয়েক ইঞ্চির পর্দায়। এটা একরকম আধুনিক “নার্সিসিজম” যা এক ধরনের আত্মমগ্ন বা আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য। এই নার্সিসিজমে ডুবতে ডুবতে একসময় তরুণ প্রজন্ম এক সময় হয়ে ওঠেন এককেন্দ্রিক আর একঘেঁয়ে। এই সোশ্যাল মিডিয়ার ভয়াল খাবার কারণে তারা বাস্তবের সমাজ থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। বাস্তব এবং অবাস্তব এই দ্বৈত দুনিয়া সমালাতে গিয়ে অনেকেই হারিয়ে যান নিজের অজান্তেই। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেউ যদি কারো সাথে প্রতারণা বা ছলচাতুরী করতে চাইলে সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহারই হলো সবচেয়ে সহজ পন্থা। এর মাধ্যমেই কাউকে কাছে টানা যায় আবার দূরেও ঠেলা যায়। সাম্প্রতিক বেশকিছু ঘটনা ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনেক খবর বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে যে, অনেক সামাজিক অস্থিরতা ও সম্পর্ক বিচ্ছেদের মতো ঘটনাগুলোতে প্রভাবক হিসেবে উচ্চারিত হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নাম। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী বিবাহিত নারী পুরুষও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রভাবিত নানা সমস্যায় জড়িয়ে যাচ্ছেন। আর এখনই এসব বিষয়ে সচেতন না হলে এসব মাধ্যমই হতে পারে সামাজিক অবক্ষয়ের মূল কারণ। তথ্য প্রযুক্তির যুগে সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতা প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও মানবকল্যাণ নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাত্রাকে দ্রুত ও সহজ করলেও, এটি সঠিক মানবিক ও সামাজিক নীতির সাথে পরিচালিত হওয়া আবশ্যক। বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সঠিক ও উপযুক্ত ব্যবহারই পারে আমাদের একটি সুন্দর সমাজ উপহার দিতে।



