বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিআন্তর্জাতিক

সিএনএনের প্রতিবেদন: মহাকাশে প্রথম ‘সবুজ’ নক্ষত্রের সন্ধান পেলেন বিজ্ঞানীরা

মহাকাশের বুকে এক অবিশ্বাস্য এবং অভূতপূর্ব দৃশ্য উন্মোচিত করেছেন মহাকাশ বিজ্ঞানীরা। তারা প্রথমবারের মতো এমন একটি ব্যতিক্রমী নক্ষত্রের সন্ধান পেয়েছেন, যার সামনে মানুষ দাঁড়ালে তারকাটিকে স্পষ্ট সবুজ রঙের দেখতে পাবে। ইংল্যান্ডের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী মার্ক হোল্যান্ডসের নেতৃত্বে একদল গবেষক মৃত তারার ছাই বা শ্বেত বামন নক্ষত্রগুলো নিয়ে গবেষণা করার সময় এই বিরল নক্ষত্রটি আবিষ্কার করেন।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, সাধারণ নক্ষত্রের রঙ মূলত এর তাপমাত্রার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয় এবং তা সচরাচর কমলা, সাদা কিংবা নীল রঙের হয়ে থাকে। কিন্তু বিশেষ কিছু শ্বেত বামন নক্ষত্রের ওপরের আবহাওয়া ও ভৌত পরিবেশ এতটাই অদ্ভুত যে তাদের আলো একেবারেই আলাদা মাত্রা পায়, যা বিজ্ঞানীদের কাছে এক দারুণ চমক হয়ে এসেছে।

নক্ষত্রটির এই সবুজ রঙের পেছনে মূল রহস্য হলো এর বায়ুমণ্ডলে থাকা হিলিয়ামের সঙ্গে অন্য কিছু উপাদানের অদ্ভুত বিক্রিয়া। কোনো নক্ষত্র তার জীবনকালে চারপাশের কী কী বস্তুর সংস্পর্শে এসেছে, তার ওপর নির্ভর করে এর বাহ্যিক রঙের পরিবর্তন ঘটে। এই সবুজ নক্ষত্রটিতে মূলত প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম এবং লিথিয়াম জাতীয় ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। নক্ষত্রটি কীভাবে এসব পেল, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এক মজার ব্যাখ্যার কথা বলেছেন। তাদের মতে, কোনো পাথুরে গ্রহাণু বা ধ্বংসপ্রাপ্ত গ্রহ যখন এই মৃত নক্ষত্রের খুব কাছে চলে আসে, তখন নক্ষত্রের প্রচণ্ড টানে তা ভেঙে গুঁড়ো ধূলিকণায় পরিণত হয়। পরে সেই ধূলিকণাগুলো নক্ষত্রের গ গায়ে মিশে যায়।

বিজ্ঞানীরা এই পুরো বিষয়টিকে মহাশূন্যের এক থ্রিলার ‘অপরাধস্থল’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। কারণ একটি শ্বেত বামন নক্ষত্র যেন চারপাশের গ্রহগুলোকে দুমড়ে-মুচড়ে গিলে ফেলে, আর বিজ্ঞানীরা তার গায়ের কেমিক্যালের চিহ্ন দেখে শত কোটি বছর আগের সেই মহাজাগতিক কাহিনীর সূত্র খুঁজে বের করেন। পৃথিবীর অবস্থান থেকে প্রায় ৬৫ আলোকবর্ষ দূরত্বের মধ্যে থাকা বেশ কিছু শ্বেত বামন নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করে এই সবুজ নক্ষত্রের পাশাপাশি চমৎকার গোলাপী বা ‘স্যামন পিঙ্ক’ রঙের আরেকটি নক্ষত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে, যার গায়ে ঘন কার্বনের স্তর রয়েছে।

যেহেতু এত দূর থেকে খালি চোখে বা সাধারণ টেলিস্কোপে এগুলো দেখা সম্ভব নয়, তাই নক্ষত্রগুলো থেকে ছিটকে আসা আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বা রঙিন বর্ণালী মেপে বিজ্ঞানীরা হিসাব করে বের করেছেন যে মানুষের চোখ সরাসরি দেখলে এগুলোকে ঠিক কেমন দেখাত। বহু দূরের বৈজ্ঞানিক তথ্যের সঙ্গে মানবীয় অনুভূতির এমন সুন্দর মেলবন্ধন মহাকাশপ্রেমীদের মধ্যেও নতুন শিহরণ জাগিয়েছে। খুব শীঘ্রই নতুন সব বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের মাধ্যমে আরও হাজার হাজার নক্ষত্রের আলো বিশ্লেষণ করা হবে। বিজ্ঞানীদের আশা, ভবিষ্যতে হয়তো আরও এমন অন্তত দশ-বারোটি বিরল সবুজ রঙের নক্ষত্র আমরা খুঁজে পাব। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘আরএএসটিআই’-তে এই চোখ ধাঁধানো গবেষণার সমস্ত তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension