উপন্যাসসাহিত্য

তবুও ভ্যালেন্তিনা (চতুর্থ পর্ব)

তাহমিদ হাসান


ভ্যালেন্তিনাকে নিয়ে রাস্তা পার হয়ে একটা সিগারেটের মেশিনের সামনে দাঁড়ায় হাসান। নিজের জন্য এক প্যাকেট মার্লবরো এবং ভ্যালেন্তিনার জন্য এক প্যাকেট (যেটা ভ্যালেন্তিনা দেখিয়ে দেয়) সিগারেট বের করে সে।
এই পথ ধরে আগে বহুবার বীচে গেছে হাসান, কিন্তু আজকের মতো এতো সুন্দর মনে হয়নি পথটারাস্তার ল্যামপোস্টের নরম আলো, ভূমধ্যসাগরের নোনা দখিন হাওয়া, পাশে হাঁটতে থাকা ভ্যালেন্তিনা, আর মগজে মদিরার মাদকতাসব মিলিয়ে এই বাস্তব জগত যেন কোন পরাবাস্তব পৃথিবী তার কাছে। এটা কি স্বপ্ন নাকি অন্য কিছু? দ্বিধার দোলাচলে দুলতে থাকে হাসান। আজ বিকালে যখন সে ঘুম থেকে উঠেছিল, তখন সে কল্পনাও করতে পারেনিরাতে তাকে নিয়ে পাশা খেলবে নান্দনিক নিয়তি; আর সে ভেসে যাবে ভ্যালেন্তিনার ভালবাসায়। হাসানের হাত জড়িয়ে ধরে পরম নিশ্চিন্তে হাঁটতে থাকে ভ্যালেন্তিনা; আর বহুদিন পর হাসান আবৃত্তি করে তার প্রিয় কবিতা-

‘সোনার দিনার নেই, দেনমোহর চেয়ো না হরিণী
যদি নাও, দিতে পারি কাবিনবিহীন হাত দু’টি, ’

হাসান, কী বলছো?

ভ্যালেন্তিনা, এটা আমার প্রিয় একটা কবিতা।

আমাকে বুঝিয়ে দাও।

যতোটা সম্ভব ইতালিয়ান ভাষায় অনুবাদ করে শোনায় হাসান। আবেগের আতিশয্যে হাসানকে জড়িয়ে ধরে, তার গালে একটা চুম্বন এঁকে দিয়ে ভ্যালেন্তিনা বলে, চমৎকার।

কিংকর্তব্যবিমূঢ? হাসান, ভ্যালেন্তিনার নরম শরীরের ছোঁয়ায় তার রক্তে শিহরণ ওঠে; তবু নিজেকে সামলে নিয়ে ভ্যালেন্তিনাকে প্রশ্ন করে, তুমি যদি বাসায় যেতে দেরি করো, তবে এ্যালেনার কোন অসুবিধা হবে না?

সমস্যা নেই, মা ওকে ঘুম পাড়িয়ে দেবে।

কিছু খেতে পারলে ভাল হতো, আমার খুব ক্ষুধা পেয়েছে।

হাসান, আমার কাছে বেশি টাকা নাই।

তোমাকে দিতে হবে না, টাকা আমার কাছে আছে। চলো, আমরা ম্যাকডোনাল্ডসে যাই।

আপনার মর্জি, জনাব (মোঘল স্টাইলে হাসানকে কুর্নিশ করে)।

আমি আপনার গোলাম, মহারানী (বুকে হাত দিয়ে হাসান উত্তর দেয়)।

আহা, মদিরাময় এই নৈশবিহারে আবেগের উচ্ছাসে উচ্ছসিত একজোড়া কপোত-কপোতী!

পথে অনেক বন্ধুদের সাথে দেখা হয়, সবার সাথে হাই-হেলো করে ম্যাকডোনাল্ডসে ঢোকার মুখে দেখা হয় ওবুদুর সাথে; ওবুদু বুঝতে পারে হাসান আজ অন্য জগতে, তাই কথা না বাড়িয়ে হাসানকে জড়িয়ে ধরে অভিনন্দন জানায়। দুইটা বিফ বার্গার, আর দুই গ্লাস কোক নিয়ে একটা ফাঁকা টেবিলে বসে তারা।

হাসান, তোমার বন্ধুরা খুব ভাল। সবাই কি তোমার দেশী?

না, আমার দেশী আছে, সেনেগালি, পাকিস্তানি, মরোক্কি সবাই আমার বন্ধু।

তুমি তো দেখছি আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলের বাসিন্দা।

তা তুমি বলতে পারো।

খাওয়া-দাওয়া সেরে বের হবার সময় যথারীতি ওবুদুর জন্য একটা বার্গার ও এক গ্লাস কোক নেয় হাসান।

এটা কার জন্য?

চলো, দেখতে পাবে।

বাইরে গিয়ে ওবুদুর হাতে প্যাকেটটা ধরিয়ে দেয় সে।

গ্রাচ্চে, হাসান।

প্রেগো। সি ভেদিয়ামো দোমানি (আগামীকাল দেখা হবে)।

যা বোঝার, বুঝে নেয় ওবুদু। ভ্যালেন্তিনাকে নিয়ে রাস্তা পার হয়ে যায় হাসান।

হাসান, চলো বীচে গিয়ে বসি।

বিয়ার নেবো?

নিতে পারো।

সামারের তিনটা মাস (জুন থেকে আগস্ট) সমগ্র ইতালি জুড়ে দিন-রাত বীচের ব্যবসা জমজমাট থাকে। দিনে চলে সূর্যস্নান, আর সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রতিটি বীচের নিজস্ব বার ঘিরে চলে হালকা মিউজিক ও পান উৎসব। সাগরের ব্রীজের পাশের একটা বীচে নেমে সাগরের খুব কাছে গিয়ে বসেছে দু’জনে। সমগ্র বীচ জুড়ে জোড়ায় জোড়ায় প্রেমিক-প্রেমিকারা বসে আছে। কারো প্রতি কারো ভ্রুক্ষেপ নাই, যে যার জগৎ নিয়ে ব্যস্ত। ছোট ছোট ঢেউগুলো তীর স্পর্শ করে আবার ফিরে যাচ্ছে সাগরে, ঢেউয়ের অবিরাম আওয়াজ, মাথার উপরে নক্ষত্রখচিত আকাশ, নিচে শুকনো বালির উপর পাশে বসে থাকা ভ্যালেন্তিনা, আর হাতের মুঠোয় বিয়ারের বোতলচিত হয়ে শুয়ে আকাশের তারাদের দিকে তাকিয়ে আছে হাসান; সে এখন আক্ষরিক অর্থেই চোখে তারা দেখছে। জুলিয়েটের বাড়ীর দেওয়ালে তার নামের পাশের খালি জায়গাটার কথা মনে পড়ছেওখানে কি ভ্যালেন্তিনার বসবাস?

কী ব্যাপার, হাসান?

আকাশের তারা দেখছি, ভ্যালেন্তিনা।
আমাকে দেখবে না?

আমি তো তোমাকেই খুঁজছি।

জনাব গ্যালিলিও, ঐ তারাদের মাঝে আমাকে খুঁজে পাবে না; কারণ আমি তোমার পাশে বসে আছি।

ও আচ্ছা, আমার পাশে বসে আছে আমারই ভ্যালেন্তিনা।

দেরি হলে তোমার কোন অসুবিধা হবে না, হাসান?

না, আমার কোন সমস্যা নেই।

হাসান উঠে বসে নীরবে বিয়ার পান করতে থাকে।

বীচের বার থেকে ভেসে আসছে মধুর সঙ্গীত‘সিয়ামো ফিলি দেল্লা স্তেল্লে’ (আমরা তারকার সন্তান)। সুর মূর্ছনায় মগ্ন হয়ে, হাসানের কাঁধে মাথা রেখে নিঃশ্বব্দে কাঁদতে থাকে ভ্যালেন্তিনা; হাসান তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। দু’জনার মুখে কোন শব্দ নেইনীরবতাও অনেক সময় অনেক কথা বলে যায়, যা হাজার কথায়ও ব্যাখ্যা করা যায় না। হাসান শুধু মনে মনে ভাবতে থাকে, রমণীর মন এই রাতের তারার মতোই রহস্যময়!

ভ্যালেন্তিনা, চলো বাসায় যাই, অনেক রাত হয়েছে।

চলো যাই।

দু’জনে উঠে দাঁড়ায়, শরীর থেকে বালি ঝেড়ে, মাথার গার্ডার খুলে চুলগুলো ঠিক করে আবার গার্ডার লাগায় ভ্যালেন্তিনা; আর অবাক হয়ে তাকে দেখতে থাকে হাসান।

কী দেখছো, হাসান?

তোমাকে। তুমি খুবই সুন্দরী, ভ্যালেন্তিনা।

ধন্যবাদ হাসান। কিন্তু সব পুরুষই প্রথমে এমন কথাই বলে।

তাই, কী জানি।

বিভ্রান্ত হাসান উত্তর দেয়; আর হাসানের মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে হাসতে হাসতে ভ্যালেন্তিনা বলে, আমি তোমাকে বলিনি হাসান, তুমি সবার চেয়ে আলাদা।

আমিও মিথ্যা বলিনি, ভ্যালেন্তিনা।

তুমি খুব চালাক, হাসান।

হাত ধরাধরি করে গল্প করতে করতে ভ্যালেন্তিনার এপার্টমেন্ট বিল্ডং এর নিচে চলে আসে তারা। রাত প্রায় দুইটা, শেষ সিগারেট ধরায় দু’জনে।

হাসান, তুমি খুব খারাপ।

কেন?

বীচে আমি এতো কাঁদলাম, তুমি তো কোন সান্তনা দিলে না আমায়!

কেন? তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম না! আমাদের দেশে এভাবে সান্তনা দেয় মানুষ।

তাই, তবে আর একটু সান্তনা দাও।

হাসতে হাসতে মাথাটা হাসানের দিকে এগিয়ে দেয় ভ্যালেন্তিনা। আর হাসানও হাসতে হাসতে বলে, আাজকের মতো শেষ, আবার আগামীকাল।

বনো নত্তে (শুভ রাত্রি), হাসান।

বনো নত্তে, ভ্যালেন্তিনা।

হাসান, সি ভেদিয়ামো দোমানি (হাসান, আগামীকাল দেখা হবে)।

চেরতো (অবশ্যই)।

ভ্যালেন্তিনা ভিতরে চলে যায়, আর হাসান বাসার দিকে রওনা দেয়।

এগারো.
বিকালে হাসানের আসতে একটু দেরি হয়ে যায়। বাচ্চাদের একটা ট্রলি নিয়ে পার্কের একটা বেঞ্চে বসে আছে ভ্যালেন্তিনা; হাত দিয়ে ট্রলিটা সামনে-পিছনে দোলাচ্ছে সে।

স্কুজাতে মি, ভ্যালেন্তিনা। ছোনো ফাত্তো উম পো তারদি (আমি দুঃখিত, ভ্যালেন্তিনা। একটু দেরি হয়ে গেল)।

নো, ফা নিয়েন্তে (কোন ব্যাপার না)।

হাসান এ্যালেনাকে দেখার জন্য মাথা নিচু করে ট্রলির ভিতরে তাকায়। ভ্যালেন্তিনা খুব সাবধানে এ্যালেনাকে বের করে হাসানের কোলে দিয়েছে। হাসান কোলে নিয়ে আদর করে, ভাল করে দেখে ছোট্ট এ্যালেনাকে; চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে সে। এ্যালেনার কপালে একটা চুমু দিয়ে ভ্যালেন্তিনার কোলে ফিরিয়ে দিয়ে হাসান বলে, দোলচে বামবিনা (মিষ্টি শিশু)।

সিডির ব্যাগ নিয়ে সকালে বাহির হয়েছিল হাসান। কারণ, অনেক সিডি জমে গেছে; আবার আজ সন্ধ্যায় ব্যবসায় বাহির হওয়া না ও হতে পারে। সবকিছু মিটিয়ে, সান্দ্রার জন্য কয়েকটা সিডি নিয়ে বিকালে বের হতে তাই একটু দেরি হয়ে যায়। কিন্তু ভ্যালেন্তিনাকে তো এসব কথা এখন বলা যাবে না; হাসানের ভয় হয়, ভ্যালেন্তিনা হয়তো এটা স্বাভাবিক ভাবে না ও নিতে পারে। হাসান ঠিক করে, যদি জানাতেই হয় তবে ভ্যালেন্তিনাকে ভাল করে বোঝার পরে জানাবে, আগে নয়। আপাতত দেখাই যাক ভ্যালেন্তিনা কী চায়! কারণ, ইতালিয়ান মেয়েরা সাধারণত বিদেশী, বিশেষ করে হাসানের মতো এশিয়ান অভিবাসীদের সাথে সহজে সম্পর্কে জড়াতে চায় না; অথচ জার্মানে এটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। এ জন্যই হাসান দ্বিধাগ্রস্তকী চায় ভ্যালেন্তিনা? এটা কি ওর সাময়ীক সময় কাটানো, নাকি অন্য কিছু? যদিও ভীষণ সুন্দরী সে, যদিও একটা মেয়ে আছে তার; তবু এটা ওর কোন দূর্বলতা বা অযোগ্যতা নয়‘নিজেকে এতোটা ছোট ভাবার দরকার নেই হাসান; তুমি ভ্যালেন্তিনার হাত ধরেছো, পা নয়।’ নিজেকে সান্তনা দেয় হাসান।

তুমি কি অনেকক্ষণ বসে আছ, ভ্যালেন্তিনা?

আমি তো তোমার জন্যে বসে আছি।

চলো, কফি পান করি।

পার্কের উল্টো দিকের রাস্তা ধরে দু’জনে হাঁটছে। খুব সাবধানে ট্রলি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে ভ্যালেন্তিনা।

দাও ভ্যালেন্তিনা, আমি ট্রলি নিয়ে যাই।

থাক, তুমি পারবে না।

ঠিক আছে, আমাকে এখন এটা শিখে নিতে হবে।

সব পুরুষের এটা শেখা উচিত।

বিশেষ করে আমার জন্য তো এটা শেখা এখন জরুরী।

হাসান (হাসতে থাকে ভ্যালেন্তিনা)। আমি ভেবেছিলাম তুমি কোন কথাই জান না।

কী কারণে?

কারণ, গতকাল তুমি যে ভাবে চুপচাপ বসে বিয়ার পান করছিলে, আমার মনে হয়েছিল…

কী মনে হয়েছিল?

না, থাক।

কেন থাকবে, বলো।

হাসান, তুমি খুব নাছোড়বান্দা। ঠিক আছে, পরে বলবো (ভ্যালেন্তিনা হাসে)।

কিছু দূর গিয়ে একটা বারে বসে তারা।

কী খাবে, ভ্যালেন্তিনা?

শুধু কফি।

শুধু কফি! আমি কি এ্যালেনার জন্য কিছু নিতে পারি?

শুধু একটা মিল্ক চকলেট, তা না হলে মা কিন্তু সন্দেহ করবেআমি টাকা কোথায় পেলাম?

ঠিক আছে।

হাসান ভিতরে গিয়ে দুইটা ফ্রুট কেক, দুইটা কফি, এক বোতল পানি ও একটি মিল্ক চকলেট অর্ডার দিয়ে আসে। কফি শেষ করে ভ্যালেন্তিনা জানতে চায়, হাসান আমরা কি আজ সন্ধ্যায়ও বের হতে পারি?

অবশ্যই, তুমি যদি চাও।

তুমি চাও না?

আমি তো তোমার গোলাম, মহারানী।

আবার ফাজলামো, হাসান।

আমি তোমার অপেক্ষায় থাকবো, ভ্যালেন্তিনা।

ঠিক আছে, তা হলে আমি এখন যাই। ঠিক সাতটার সময় আসবো; কিন্তু তুমি কোথায় থাকবে?

বার আমিগোসে।

কিন্তু সাবধান, আমি না আসা পর্যন্ত তুমি বিয়ার ছোঁবে না, বুঝেছো?

জো হুকুম, মহারানী।

ভ্যালেন্তিনার শাসন খুব উপভোগ করে হাসান। কারণ, আগে সে কখনও এই ভাবে শাসিত হয়নি। ভ্যালেন্তিনা বিদায় নিয়ে চলে গেলে একটা সিগারেট ধরায় হাসান; ভ্যালেন্তিনার যাবার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। কিছু দূর গিয়ে পিছনে ফিরে ভ্যালেন্তিনা দেখে, হাসান তার দিকে তাকিয়ে আছে।

বার আমিগোসের একটা ফাঁকা টেবিলে বসে হাসান। এখনও সন্ধ্যা হয়নি, তাই বার ফাঁকা। হাসি মুখে সান্দ্রা এসে বলে, হাসান, আমি তোমার অপেক্ষায় ছিলাম।

আমি জানি, সান্দ্রা।

জ্যাকেটের পকেট থেকে সিডিগুলো বের করে দেয় সে; সান্দ্রার পছন্দেরটা সহ মোট পাঁচটা। সান্দ্রা খুশী হয়ে হাসানের গালে চুমু খায়। সান্দ্রা জানে, বিনিময়ে হাসান কিছুই নেবে না; তবু বলে, হাসান, বলো কী খাবে? আজ আমি তোমাকে খাওয়াবো।
ধন্যবাদ, সান্দ্রা। তোমাকে কিছুই খাওয়াতে হবে না।

তো কাল রাতে কী করলে?
দুস্টুমির হাসি দিয়ে জানতে চায় সান্দ্রা।

তেমন কিছু না। ম্যাকডোনাল্ডসে বার্গার খেলাম, বীচে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলাম, তারপর বাসায় চলে আসলাম। হাসতে হাসতে হাসান উত্তর দিল। চোখ দুটো কপালে তুলে সান্দ্রা বল্লো, ব্যাস, এই টুকুই। আর কিছু না!

না, আর কিছুই না।

তুমি কি জান, ভ্যালেন্তিনার একটা মেয়ে আছে?

হাঁ, জানি। একটু আগে আমাকে দেখাতে এনেছিল।

হাসান, আমাকে তো কোন দিন বিয়ার খাওয়ালে না।

প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে সান্দ্রা বলে।

তুমি তো কোনদিন খেতে চাওনি।

আর ভ্যালেন্তিনা?

ও নিজেই এসেছিল গতকাল।

আমার দুর্ভাগ্য!

আমারও।

দু’জনে একসাথে হাসে; আর সান্দ্রাকে হাসান সান্তনা দেয়।

আচ্ছা বাদ দাও। বলো, কী আনবো তোমার জন্য।

একটা ত্রামাজ্জিনো ও একটা কমলার জুস দাও, পরে একটা কফিও দিও।

ঠিক আছে, তুমি বসো, আমি আনছি।

সান্দ্রা খাবার নিয়ে এলে হাসান জানতে চায়, সিডিগুলো তোমার পছন্দ হয়েছে?

সবগুলো পছন্দ হয়েছে, একটা মার্কোকে দিয়েছি।

মার্কো সান্দ্রার কলিগ; সে বার কাউন্টারের ভিতরে থেকে সব তৈরী করে, আর সান্দ্রা বইরে সব সামলায়।

আচ্ছা হাসান, মার্কো তোমাকে প্লেবয় বলে কেন?

ও মজা করে।

জার্মানে থাকতে হাসানের মনে একটা শান্তি ছিল। ভয় যে ছিল না, তা নয়; তবে সেটা দেশে ফেরত যাবার, জেলে যাবার নয়। অথচ এখন সার্বক্ষণিক জেলে যাবার আতংকে ভোগে সে। জার্মানে তার বিরুদ্ধে কোন ক্রিমিনাল কেস ছিল না, আবার এখনকার মতো পকেটে এতো পয়সাও ছিল না। তবুও হাসি-তামাশায় সময় কেটে যেতো; মাঝে মধ্যে সুন্দরী মেয়ে দেখলে হাই-হেলো করতো, তাম্মীও এই ব্যাপারে তাকে যথেষ্ট সাহায্য সহযোগিতা করতো; তবুও হাসানের মনের দরজায় কেউ ঘন্টা বাজায়নি। এখন তার পকেটে টাকার অভাব নাই এবং তার বিরুদ্ধে কেসেরও শেষ নাই। খেতে খেতে হাসান ভাবেতার বিরুদ্ধে কোসগুলোর কী হবে? ইতালিতে থাকবে, নাকি অন্য কোন দেশে চলে যাবে সে? হাসান চাইলে এখন খুব সহজে হল্যান্ড অথবা বেলজিয়াম চলে যেতে পারে। হায় ভ্যালেন্তিনা, এটাই কি তোমার আসার সময়? পুলিশের কাছে এখন সে একজন চিহ্নিত মাফিয়া; অথচ হাসানের রক্তে মিশে আছে দর্শন ও কবিতা। কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল, কিছুতেই সেই হিসাব মিলাতে পারছে না হাসান। এক সময়ের রোমান্টিক কবি এখন ক্রিমিনাল হয়ে বসে আছে। থানা-পুলিশ, মামলা, আর জেলখানা এই জাল থেকে বের হবার পথ খুঁজতে খুঁজতে সে আবার পথ হারিয়ে ফেলে ভ্যালেন্তিনার ভালবাসার জালে। অদ্ভুত নিয়তির এই পাশা খেলা; একদিকে ভ্যালেন্তিনার বাহুডোর, অন্যদিকে সান্দ্রার হাতছানিকোথায় পালাবে হাসান?

চাও, হাসান।

চাও, ভ্যালেন্তিনা।

আমি কি দেরি করে ফেললাম?

মোটেও না।

আজ আরও সুন্দর পরিপাটি করে সেজেছে ভ্যালেন্তিনা। জিন্সের প্যান্টের উপরে সাদা শার্ট, আর হাতে একটি পাতলা পুলোভার; রাতে লাগতে পারে। বসার পরে ভ্যালেন্তিনা জানতে চায়, এ্যালেনাকে কেমন লেগেছে?

খুবই চমৎকার।

হাসান, আজ আমি তোমাকে খাওয়াবো; বাবার কাছ থেকে দশ ইউরো এনেছি।

ধন্যবাদ ভ্যালেন্তিনা, ওটা তোমার কাছে রাখো; প্রয়োজন হলে তোমাকে বলবো।

আজ আমাকে কেমন লাগছে? বললে না তো।

বললেই তো তুমি বলবে, বাজে কথা বলছি।

হাসান হাসতে থাকে, সাথে ভ্যালেন্তিনাও। গতকালের জড়তা আজ কারো মধ্যে নেই, দু’জন স্বাভাবিক ভাবে আলাপ করছে। সান্দ্রা এসে দু’জনকে এক সাথে অভিবাদন জানায়; ওরা দু’জনও এক সাথে প্রতি উত্তর দেয়। তারপর সান্দ্রা বলে, আমি কি তোমাদের কোন সাহায্য করতে পারি?

দুইটা বিয়ার দিতে পারো।

হাসানের জবাব শুনে সান্দ্রা বারের ভিতরে বিয়ার আনতে চলে যায়।

হাসান, তোমার মোবাইল নাম্বার কিন্তু এখনও আমাকে দাও নি।

ও তাই তো।

হাসান উঠে গিয়ে কাউন্টার থেকে একটা কাগজ ও কলম নিয়ে আসে; নিজের নাম্বার লিখে ভ্যালেন্তিনাকে দেয়। ভ্যালেন্তিনা ওর বাসার ল্যান্ড ফোন নাম্বার বলে, হাসান সেটা মোবাইলে সেভ করে নেয়।

আমি ফোন করলে যদি তোমার বাবা-মা রিসিভ করে, তবে তোমার সমস্যা হবে না?

না, আমি তোমার কথা ওদের বলেছি।

উনারা কী বলেছে?

কিছু না।

তুমি মোবাইল ব্যবহার করো না?

না, আমার বিরক্ত লাগে; তা ছাড়া তেমন প্রয়োজনও নাই।

গ্রীষ্মের সন্ধ্যার মোলায়েম আলোয় বার আমিগোসে বসে ভ্যালেন্তিনার সাথে মদিরাময় মুহূর্তগুলো উপভোগ করতে চায় হাসান। কিন্তু যে আতংক তাকে সারাক্ষণ কুরেকুরে খাচ্ছে, যেটা থেকে তার মুক্তি নেইভুলে থাকতে চাইলেও যেটা ভুলে থাকা যায় নাসেটাই বারবার চিন্তায় ফিরে এসে তাকে এলোমেলো করে দিয়ে যায়; হৃদয়ের কোন এক গহীন গ্বহর থেকে গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। আসলে প্রতিটি মানুষের জীবনে এমন একটা সময় আসে, যখন নিজের গালে নিজেকেই কষে দুইটা থাপ্পর মারতে ইচ্ছা করে; হাসানের এখন সেই অবস্হা। তার চোখের সামনে ডান হাত দিয়ে একটা তুড়ি মেরে ভ্যালেন্তিনা জানতে চায়, হাসান তুমি কোথায়?

কেন? আমি তোমার কাছে।

না, তুমি আমার কাছে নাই।

তাহলে আমি কোথায়?

তা আমি জানি না; তবে তুমি অনেক দূরে।

ভাল করে তাকিয়ে দেখো ভ্যালেন্তিনা, তোমার সামনে বসে আছে তোমারই হাসান।

হাসান তো নাই, আমার সামনে বসে আছে একজন কবি, তার নাম ভার্জিল।

ধন্যবাদ ভ্যালেন্তিনা, আমাকে ভার্জিলের সাথে তুলনা করার জন্যে। কিন্তু তুমি জানো, আমি ভার্জিলের জগতে হারিয়ে যেতে চাই!

তবে তো তোমাকে কয়েক হাজার বছর পিছনে চলে যেতে হবে।

আমি তো যেতে চাই। আজও আমি চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাইকার্থেজের সমুদ্র সৈকতে দাউদাউ করে জ্বলছে প্রেমে প্রত্যাখ্যাত দিদোর চিতা; আর পলাতক ইনিয়াসের তরী দেবাদেশে ভেসে চলেছে ইতালির পানে।

হাসান, তুমি কি আমাকে কাঁদাতে চাও?

না ভ্যালেন্তিনা, কিন্তু বিচ্ছেদ আমাদের পরম নিয়তি; তাই সে যে রূপেই আসুক, মৃত্যু অথবা পালিয়ে যাওয়া। আমরা নিয়তি নিয়ন্ত্রিত খেলার পুতুল মাত্র; আর দিদো তার একটা সামান্য উদাহরণ।

হাসান, তুমি যে এতোটা রোমান্টিক তা আমি কল্পনাও করিনি। তুমি শুধু কবি নও, তুমি দার্শনিক।

আমি দার্শনিকও নই, কবিও নই। আমি হাসান।

দু’জনে হেসে ওঠে, আর সিগারেট ধরিয়ে প্যাকেটটা ভ্যালেন্তিনার দিকে এগিয়ে দেয় হাসান।

বিয়ার শেষ হয়ে গেলে ভ্যালেন্তিনা বলে, হাসান, চলো আমরা হাঁটি।

ঠিক আছে, চলো যাই।

সান্দ্রাকে বিল মিটিয়ে ভ্যালেন্তিনার হাত ধরে বীচের পথ ধরে হাঁটতে থাকে হাসান। ভ্যালেন্তিনার হাসি তখনও শেষ হয় না।

ভ্যালেন্তিনা, এতো হাসছো কেন?

তোমার মতো রোমান্টিক কবির পাল্লায় পড়লে, না হেসে কি পারা যায়।

হাসানকে জড়িয়ে ধরে ভ্যালেন্তিনা, আর তার দেহের মিষ্টি সুবাস হাসানের আত্মায় মিশে যায় চিরদিনের মতো; হাসান অনুভব করে, এই পাগল করা সৌরভ তাকে আর মুক্তি দেবে না কোন দিন; হয়তো এই গন্ধ আমৃত্যু দোলা দেবে তার চেতনায়। খুব ধীরে ঠোঁট জোড়া হাসানের ঠোঁটের কাছে নিয়ে ভ্যালেন্তিনা আবার বলে, তো কবি, শোনাও তোমার প্রেমের কবিতাখানি।

যদিও ভ্যালেন্তিনা প্রস্তুত ছিল, তবু বুকে সাহস নিয়ে নিজের ঠোঁট জোড়া আলতো করে তার ঠোঁটে ছোঁয়ায় হাসান। ঝড় তোলে ভ্যালেন্তিনা; দু’জনার নিঃশ্বাস ভারি হয়ে ওঠেসে ঝড় এমনই প্রগাঢ? যে, না থামলেই ভাল হতো; তবু এক সময় ঝড় থেমে যায়। ফুটপাথে দাঁড়িয়ে তারারাস্তা দিয়ে গাড়ি যায় আর আসে, তাদের পাশ কাটিয়ে মানুষও হেঁটে যাচ্ছে; কিন্তু দু’জনার কোন ভ্রুক্ষেপ নাই। হাসানের বুকে মুখ গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকে ভ্যালেন্তিনা। তারপর হাসানের মনে হলোসাগরের ওপার হতে খুব ধীরে এক মায়াবিনী কন্ঠস্বর তার কানে ভেসে এলো, এটাই কি তোমার কবিতা?

হাঁ, ভ্যালেন্তিনা; শব্দহীন, বর্ণনাহীন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতা।

এই কবিতার নাম কি?

আমোরে (ভালবাসা)।

যেভাবে নিঃশব্দে ভোরের সূর্য আলোকিত করে চারিদিক, সেই ভাবে মাথা উঁচু করে হাসানের চোখে চোখ রেখে তাকায় ভ্যালেন্তিনা; আর ঠোঁটে ঠোঁট রেখে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতায় আবার এমনই মগ্ন হয়ে পড়ে যে, ভুলে যায় স্হান-কাল; সময় চলে যায় ওদের পাশ কাটিয়ে।

হাসান, আমরা কোথায়?

স্বর্গে, তুমি কি পিজ্জা খাবে?

স্বর্গে কি পিজ্জা পাওয়া যায়?

হাঁ, বিয়ার ও পাওয়া যায়!

তবে দুটোই খাবো।

ঠিক আছে, চলো যাই।

ম্যাডোনার ‘লা ইসলা বনিতা’ গাইতে গাইতে হাসানের হাত ধরে হাঁটতে থাকে ভ্যালেন্তিনা; বলা যায় প্রজাপতির মতো উড়তে থাকে ভ্যালেন্তিনা, হাসান শুধু তাল মেলাতে থাকে। বীচের ব্রীজের কাছে একটা পিজ্জার দোকানে ঢোকে তারা।

ভ্যালেন্তিনা, কী পিজ্জা নেবো?

তোমার খুশী, হাসান।

পিজ্জা কন মোসারেল্লা (চিজ পিজ্জা)?

নিতে পারো।

একটা পিজ্জা, আর দুই গ্লাস কোক পার্সেল নিয়ে ব্রীজের পাশে বসানো সারিসারি সুন্দর বেঞ্চগুলোর একটিতে বসে তারা আয়েশ করে পিজ্জা খেতে থাকে।

সাগরের সীমাহীন শূন্যতার দিকে তাকিয়ে পিজ্জা খেতে খেতে হাসান ভাবেএই যাত্রার শেষ কোথায়? বিভ্রান্ত হাসান জানে না গন্তব্য কোথায়; হতাশা ঘিরে ধরে তাকে, আর হাতছানি দেয় রহস্যময় রাতসব ভুলে ভ্যালেন্তিনার মুখে পিজ্জা তুলে দেয়।
সামারের সমস্ত সময় জুড়ে ইতালিয়ানরা যেন সৈকতে সংসার সাজায়; সবাই সন্ধ্যায় বেরিয়ে পড়েকেউ পার্কে, কেউ বারে, কেউ সৈকতেএই হলো ইতালির সংস্কৃতি। জোড়ায় জোড়ায় মানুষ আসা-যাওয়া করছে, কিন্তু প্রায় অধিকাংশই ভ্যালেন্তিনার সাথে হাসানকে দেখে চেহারায় একটা অদ্ভুত অভিব্যক্ত ফুঁটিয়ে চলে যাচ্ছে; হাসানের কাছে ব্যাপারটা অস্বস্তিকর। আরও অস্বস্তিকর এই ভেবে যে, এই সব বাঁকা চোখের চাহনি ভ্যালেন্তিনা কীভাবে গ্রহণ করবে?

ভ্যালেন্তিনা, তোমার সঙ্গে আমাকে মানাচ্ছে না।

কেন, হাসান?

দেখছো না, সবাই কেমন করে তাকাচ্ছে?

হাসান, মন খারাপ করছো কেন? ওদের কাজ ওদের করতে দাও; আমরা আমাদের কাজ করি।

তোমার জন্য আমার খারাপ লাগছে, ভ্যালেন্তিনা।

হাসান, নিজেকে এত ছোট ভাবছো কেন? তা ছাড়া তুমি খুব স্মার্ট, আর আমি তোমাকে ভালবাসি; এটাই শেষ কথা।

ঠিক আছে, চলো বিয়ার নিয়ে বীচে গিয়ে বসি।

চলো তাই করি।

দু’জনে উঠে ব্রীজের চত্তরটা পেরিয়ে বিয়ার নিয়ে সৈকতে নেমে যায়; যাবার পথে অনেক বন্ধুদের সাথে হাই-হেলো করে হাসান। সবাই এখন ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত।

সাগরের খুব কাছে, নির্জন কোলাহল মুক্ত জায়গায় বসেছে দু’জনে; হাসানের মন খারাপ, উদাস হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে সে। কিছুক্ষণ খোঁজার পর সপ্তর্ষি মন্ডলী দেখতে পেয়ে তার মনে হলো, এই অপরিচিত মানুষের ভীড়ে যেন প্রাণের স্বজন খুঁজে পেয়েছে; তার মনের কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়। দেশে থাকতেও বহু বিনিদ্র রাত সে কাটিয়েছে এই তারকা মন্ডলীর দিকে চেয়ে।

হাসান, এখনও কি তোমার মন খারাপ?

না, ভ্যালেন্তিনা।

তবে কি এতো ভাবছো? আমার দিকে তাকাও, আমি তো তোমার পাশেই আছি।

ভ্যালেন্তিনার কোলে মাথা রেখে হাসান সিগারেট ধরায়; একবার নিজে টানে, একবার ভ্যালেন্তিনার ঠোঁটে ধরে, সে টানে; আর হাত দিয়ে হাসানের চুলে বিলি কাটতে থাকে ভ্যালেন্তিনা।

হাসান, দেশে কি তোমার কেউ আছে?

হাসান ইঙ্গিত বুঝতে পারে, তবু পাল্টা প্রশ্ন করে, কেউ মানে?
কেউ মানে, বউ অথবা বান্ধবী।

না ভ্যালেন্তিনা, কেউ নেই। কিন্তু কেন জিজ্ঞাসা করছো?

কারণ, তোমার অধিকাংশ বন্ধুরা দেশে একটা বউ রেখে আসে, আর এখানে একটা বান্ধবী নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

তা আমি জানি না, ভ্যালেন্তিনা; কিন্তু তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই।

গভীর একটা আবেগ নিয়ে কথাটা বলে হাসান।ভ্যালেন্তিনা নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না, আত্মসমর্পন করে সেই আবেগের কাছে; মাথা নিচু করে পাগলের মতো চুমু খেতে থাকে হাসানের গালে; হাসানও দুই হাত দিয়ে ভ্যালেন্তিনাকে জড়িয়ে ধরে। সাগর শান্ত, কিন্তু আবেগের প্লাবনে ভেসে যায় দুটি নিঃসঙ্গ হৃদয়। কিছুক্ষণ পরে হাসান নিজেকে আবিস্কার করে ভ্যালেন্তিনার বুকের উপরে; ভ্যালেন্তিনা দুই হাতে জড়িয়ে ধরে হাসানকে, সেও চায় ভ্যালেন্তিনা তাকে এই ভাবে জড়িয়ে থাকুক চিরকাল। সাগরের এই বিশালতার মাঝে মায়াবী রাতের আঁধারে দু’জনে হারিয়ে যায়; রহস্যময়ী ভ্যালেন্তিনা উন্মুক্ত করে তার কামনার কুহকিনী পেয়াল; তৃষ্ণার্ত হাসান পান করে প্রাণ ভরে; আর হারিয়ে যায় ভ্যালেন্তিনার গভীর থেকে গভীরে। যেমন কোন দুঃসাহসী অভিযাত্রী আবিস্কারের নেশায় হারিয়ে যায় পর্বতের গহীন গুহায়, তেমনি হাসান হারিয়ে যায় ভ্যালেন্তিনার শরীরের শাশ্বত আঁকে-বাঁকে, গভীর গিরিখাদে, অন্তিমে ডুবে যায় চিরন্তন চোরাবালিতে।

এখন কেউ নেই পৃথিবীতে; রাতের বুকে কোটি কোটি বছর ধরে জ্বলতে থাকা তারকামন্ডলী, সাগরের অপার জলরাশি, আর বিধাতার বৃহৎ বিস্ফোরণের আলো ষুষে নেওয়া জগৎকে জড়িয়ে থাকা আদিম অন্ধকার এবং এই দুইজন যুবক-যুবতী ছাড়া।
প্রকৃতির প্রেমিকার মতো সাগরের স্রোত যেমন শান্ত হয় সৈকতের ছোঁয়ায়, তেমনি এক সময় অতৃপ্ত আকাঙ্খার এই দুই যুবক-যুবতীর কামনার ঢেউ থেমে যায়। গভীর রাতের হিমেল হাওয়ার মধ্যেও দু’জনে ঘেমে একাকার। ভ্যালেন্তিনার বুকের উপর থেকে উঠে সাগরের জলে হাত-মুখ ধুয়ে পবিত্র হয়ে আসে হাসান। ভীষণ তৃষ্ণা পেয়েছে, ফিরে গিয়ে দেখে ভ্যালেন্তিনা সিগারেট টানছে; বিয়ারে চুমুক দেয় হাসান; মদিরা এখন আক্ষরিক অর্থে তেষ্টা মেটায়। সন্ধ্যার মন খারাপের কথাটা এখন আর হাসানের মনে নেই; নিজেকে এখন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি মনে হয়। ভ্যালেন্তিনার পাশে বসে বিয়ারে চুমুক দিয়ে জীবনের এতটা বছর পরে গভীর ভাবে উপলব্ধি করে তার প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশের লেখা তার প্রিয় কবিতা,
‘সময়ের উর্দ্ধতনে উঠে এসে বধূ
মধু আর মননের মধু
দিয়েছে জানিতে;’

মন ভরে ভ্যালেন্তিনার মধু আর মননের মধু পান করে তৃপ্ত হাসান; তার কোন আকাঙ্খা অপূর্ণ রাখেনি ভ্যালেন্তিনা। গভীর আনন্দে দুই হাত মাথার নিচে দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে হাসান। ঘুরতে থাকে সময়ের চাকা, ঘুরতে থাকে সপ্তর্ষিমন্ডলী; হাসানের বুকে দুই হাতের উপরে মুখ রেখে ভ্যালেন্তিনা বলে, তো জনাব, এখনও কি তোমার মন খারাপ?

না, ভ্যালেন্তিনা। সাক্ষী এই রাতের তারা, সাক্ষী ভূমধ্যসাগর, সাক্ষী এই পৃথিবী: আমি তোমাকে ভালবাসি ভ্যালেন্তিনা।

আমি ক্লান্ত হাসান, আমাকে মিথ্যা স্বপ্ন দেখিও না।

যে চলে গেছে, সে গেছে; বেদনা বাড়ায়ে কী লাভ?

হাসান, তুমিও কি ইনিয়াসের মতো পালিয়ে যাবে?

না, ভ্যালেন্তিনা। প্রতারক প্রেমিক আমি নই; আমি আজীবন তোমার কারাগারে বন্দি থাকতে চাই।

তা তুমি চাইলে থাকতে পার; কিন্তু তার জন্য ভ্যালেন্তিনাকে খুশী রাখতে হবে তোমাকে।

আমি আমার জীবনটা ভ্যালেন্তিনার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত, বলো ভ্যালেন্তিনা কী চায়?

কিছু না, আপাতত একটা বিয়ার!

মায়াবী হাসিতে ফেটে পড়ে খালি বোতলটা দেখিয়ে বলে ভ্যালেন্তিনা। হাসান উত্তর দেয়, জো হুকুম, মহারানী।

হাসান উঠে দাঁড়িয়েছে, ভ্যালেন্তিনা দুই হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তার দিকে; হাসান উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করে ভ্যালেন্তিনাকে। হাসান তার জ্যাকেট আগেই ভ্যালেন্তিনার পিঠের নিচে বিছায়ে দিয়েছিল, তাই ভ্যালেন্তিনার পিঠে এবং চুলে কোন বালি লাগেনি, পিছনে যেটুকু লেগেছিল হাসান হাত দিয়ে ঝেড়ে তা পরিস্কার করে দেয়। হাত ধরাধরি করে দু’জনে রাস্তায় গিয়ে ভ্রাম্যমান দোকান থেকে দুইটা বিয়ার নিয়ে একটা বেঞ্চে গিয়ে বসে। প্রচুর মানুষ ঘোরাঘুরি করছে, সামারে এটা কেবল সন্ধ্যা।

হাসান, কয়টা বাজে?

রাত বারোটা।

আমাদেরও তো বারোটা বাজে, হাসান।

এলোমেলো একগোছা চুল মুখের উপর থেকে সরাতে সরাতে দুষ্টমির হাসি হাসতে থাকে ভ্যালেন্তিনা।

না, ভ্যালেন্তিনা; এটা আমাদের জন্য নয়, এটা অন্যদের জন্য। আমাদের সময় থেমে গেছে।

তো আমাদের জন্য কী?

আমাদের জন্য শুধু ভালবাসা, আর বিয়ার পান করা।

দু’জনে হাসতে থাকে, কিন্তু ভ্যালেন্তিনা হাসি আর থামতেই চায় না; অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে সে বলে, হাসান, তোমার এই হেয়ালি বন্ধ করো; না হলে আমি হাসতে হাসতে মরে যাবো।

বুকের ভিতরে আজন্ম লালিত ছাই চাপা আবেগ বিয়ারের শীতল স্রোতের স্পর্শে মিশে গিয়ে হৃদয়ের আগ্নেয়গিরিতে বিস্ফোরণ ঘটায়; ভ্যালেন্তিনার ভালবাসার তপ্ত লাভার স্রোতে হাসান ভেসে যায়। এই কি সেই কাঙ্খিত মানবীআজন্ম যার ছবি হাসান এঁকেছে তার কবিতা ও কল্পনায়? তবে কি জার্মানির সেই অবিরাম বরফ পড়ার বিষণ্ণ দিনগুলোতে ভ্যালেন্তিনার কথাই ভাবতো হাসান! বাম হাত দিয়ে ভ্যালেন্তিনাকে কাছে টেনে নেয় হাসান। আসলে সে অনুভব করতে চায়, এটা বাস্তব, নাকি কল্পনা? না, এই নক্ষত্রখচিত রাত, সাগরের গর্জন, মদিরা ও মানবী সবই বাস্তব; আর বাস্তব হাসানের হৃদয়ের হাহাকার!

হাসান?

বলো।

কী ভাবছো? চুপ হয়ে গেলে কেন?

কিছু না। তুমি কিছু বলো।

চলো, আবার বীচে যাই!

আবার!

কেন? আমাদের সময় তো থেমে গেছে। চিন্তা কিসের?

না, কোন চিন্তা নেই; চলো।

হাত ধরাধরি করে আবার দু’জনে বীচে নেমে যায়। তাহাদের কামনার ভালবাসার কাছে জগতের সব কিছু যেন তুচ্ছথাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার হাসান আর বনলতা সেন (ভ্যালেন্তিনা) এবং পায়ের কাছে এসে শূন্যে মিলিয়ে যাওয়া সাগরের ঢেউগুলো।

আবারও কামনার কুহকিনী পেয়ালা উজাড় করে দেয় ভ্যালেন্তিনা; আর হাসানের কামনা: তার জীবনের স্মরণীয় এই রাত যেন শেষ না হয়ে যায়; যদিও সে জানে আর দশটা সাধারণ রাতের মতো এই রাতও এক সময় শেষ হয়ে যাবে।

বীচ থেকে উঠে বাসার পথে যেতে থাকে দু’জনে; গভীর আবেগ নিয়ে একটা ইতালিয়ান গান গাইতে গাইতে হাঁটতে থাকে ভ্যালেন্তিনা। হাসান অনুভব করে হৃদয়ের কোন শোক-সাগরের অপার্থিব পার হতে ভেসে আসছে এই গানের করুণ সুর। তবে কি মউরিচ্ছিও এখনও ভ্যালেন্তিনার জীবনের জীবন্ত যন্ত্রণা? হাসান বুঝতে পারে না, মৌরিচ্ছিওকে সে হিংসা করবে, ঘৃণা করবে, নাকি করুণা করবে; সে কি এক অদৃশ্য ত্রিভুজ প্রেমে জড়িয়ে গেল? এই সব ভাবতে ভাবতে বার আমিগোসের সামনের পার্কে চলে আসে তারা। পার্কের ঝরনার ঝিরিঝিরি শব্দ, গানের সুর, আর মগজে মদিরার মায়াবী ক্রিয়াএখান থেকে উঠতে মন চাইছে না, তবু তো যেতে হবে ঘরে।

ভ্যালেন্তিনা, চলো অনেক রাত হয়েছে; তোমাকে পৌছে দিয়ে আসি।

হাসান, একটু বসি!

বাচ্চা মেয়েদের মতো আব্দার করে ভ্যালেন্তিনা। হাসানের খুব মায়া লাগে। একটা সিগারেট ধরিয়ে ভ্যালেন্তিনা বলে, হাসান, তুমি তো এই সব সস্তা সিগারেট টানো না।

কে বলেছে, ভ্যালেন্তিনা; এটা তো সামান্য, তুমি দিলে বিষও খেয়ে নেবো আমি।

আমাকে মিথ্যা স্বপ্ন দেখাচ্ছো, হাসান।

আমি তোমাকে কী মিথ্যা স্বপ্ন দেখাবো, আমি তো নিজেই স্বপ্নের ঘোরে আছি।

চলো হাসান, বাসায় যাই।

হাসানের হাত ধরে হাঁটা শুরু করে ভ্যালেন্তিনা;এবং তার বাসার সামনে এসে সিগারেট শেষ হয়। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে হাসানের কাঁধে হাত দিয়ে ভ্যালেন্তিনা জানতে চায়, রাত কয়টা বাজে, হাসান?

দুইটা।

তবে তো যেতে হয়। কাল ফোন দেবো, তুমি বিরক্ত হবে না তো?
তোমার ফোনের অপেক্ষায় থাকবো।

হাসানকে জড়িয়ে ধরে তার ঠোঁটে ভ্যালেন্তিনা এঁকে দেয় দ্বিতীয় প্রেমের প্রথম প্রগাঢ? চুম্বন, আর হাসান টের পায় ভ্যালেন্তিনার হৃদয়-স্পন্দন।

বনো নত্তে, হাসান।

বনো নত্তে, ভ্যালেন্তিনা।

দুই রুমের একটা ফ্লাটে হাসানরা মোট আটজন থাকে, এটা নিচ তলায়। ছোট রুমটাতে দুইজন, বড় রুমটাতে পাঁচজন, আর কিচেনের এক পাশে পার্টিশন দিয়ে হাসান একাই থাকে; কিচেনটা বেশ বড়। কিচেনে একা থাকে বলে যতো রাতেই সে বাসায় আসুক না কেন, কারো কোন অসুবিধা হয় না। বরং সাধারণত হাসান যখন গভীর রাতে নিঃশব্দে বাসায় ফেরে, তখন কেউ না কেউ উঠে এসে হাসানকে সঙ্গ দেয়; আর গভীর রাতে হাসানকে সঙ্গ দেবার মানে হলোফ্রি কফি ও সিগারেট। হাসান যেমন প্রচুর উপার্জন করে, তেমনি সবার পিছনে উদার ভাবে খরচও করে; তাই সবাই মিলে একা থাকার এই বাড়তি সুবিধাটুকু হাসানকে দিয়েছে।

বাথরুমে গিয়ে লম্বা একটা গোসল করে আসে হাসান; বেশ তরতাজা লাগছে এখন। আস্তে আস্তে খাবারের পাতিলগুলোর ঢাকনা উঠিয়ে দেখেকী খাবার আছে? ভাত আছে প্রচুর, আর মাছের তরকারি। কী মাছ তা জানে না সে, জানার দরকারও নাই; কারণ, মাছের ব্যাপারে কোন কালেই কোন আগ্রহ ছিল না তার। শুধু তরকারি দিয়ে সামান্য একটু ভাত খেয়ে, কফিমেশিনে কফি বসিয়ে দেয় হাসান; এটা তার অভ্যাস। বিয়ার পান করে রাতে বাসায় ফিরে একটা ব্লাক কফি সে পান করবেই। কফি খেয়ে বালিশে হেলান দিয়ে একটা সিগারেট ধরায় হাসান, আর ভ্যালেন্তিনার কথা ভাবতে থাকে। রাত অনেক হয়েছে কিন্তু তার চোখে ঘুমের কোন লেশমাত্র নাই, ভ্যালেন্তিনার শরীরের মিষ্টি গন্ধটা অনুভবে টের পায়; যেন ভ্যালন্তিনা ফিরে এসে জড়িয়ে ধরেছে তাকে। দু’চোখ বন্ধ করে হাসান উপভোগ করে এক স্বর্গীয় সৌরভ; আর তার আত্মা উপলব্ধি করে, তার অবচেতন মনের অভ্রান্ত ধারণাএই মায়াবী সুবাস তাকে তাড়া করে ফিরবে সারাটা জীবন, এর হাত থেকে তার মুক্তি নেই। তার কাছে বারবার ফিরে ফিরে আসবে ভ্যালেন্তিনার শরীরের সুগন্ধি সৌরভ!

বারো.
কয়েকজন বাঙালী সিডি ব্যবসায়ী এসে হাসানকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে; যদিও সকাল দশটা বাজে, তবু সে গভীর ঘুমে মগ্ন ছিল। এক সাথে চারজন এসেছে; সবাই এই অস্টিয়াতে থাকে, এবং খুচরা ব্যবসা করে। লুকিয়ে রাখা জায়গা থেকে বিশাল দুইটি ব্যাগ ভর্তি সিডি এনে তাদের সামনে রাখে হাসান; সবাই সিডি বাছাই করতে ব্যস্ত হয়ে যায়। হাসান শুধু বাঙালীদের বাসায় এসে সিডি নেবার সুযোগ দেয়; অন্যদের ক্ষেত্রে, বাসার কাছে একটা বার আছে, সেখানে বসে লেনদেন করে। এটা সে করে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে। যেহেতু অবৈধ ব্যবসা, তাই চোখ-কান খোলা রেখে সাবধানতার সাথে লেনদেন করাই ভাল।

হাসান বাথরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে আসে। সকালে নাস্তার জন্য পর্যাপ্ত পরিমানে রুটি-বিস্কুট কিনে রাখে সে; চিজ এবং জেলি মাখিয়ে এক পিস রুটি খেয়ে, সবার জন্য কফি বানিয় কফিতে চুমুক দেয় হাসান। সবাই মিলে মোট পাঁচ শত সিডি নিয়েছে; সকালেই ভাল একটা ব্যবসা হয়ে যায়। আসলে সামারে সব সময় ভাল সিডি বিক্রি হয়, তখন সারাদিন খুচরা এক-দেড় শত সিডি বিক্রি করা কারো জন্য খুব একটা কঠিন কিছু না। দুই হাজার পাঁচ শত ইউরো গুনে পকেটে রেখে একটা সিগারেট ধরিয়ে প্যাকেটটা টেবিলে রাখে হাসান, যাতে কেউ টানতে চাইলে সিগারেট নিতে পারে। সিগারেট টানতে টানতে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করে সবাই; কিন্তু সব আলাপ শেষ হয় ভ্যালেন্তিনাতে এসে। সবাই একবাক্যে বলে, ‘ভাই আপনার রাজ কপাল, ভ্যালেন্তিনা খুব সুন্দরী।’ সাদিক ভাই জানতে চায়, ভাই, ভ্যালেন্তিনাকে পটালেন কীভাবে?সবই তার ইচ্ছাদার্শনিকের মতো উত্তর দেয় হাসান। কিছুক্ষণ গল্প-গুজোব করে দুই ব্যাগের সিডি এক ব্যাগে ভরে, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে বাসা থেকে বের হয় হাসান।

হাসানের বাসার গলির মুখে একটা বার, এই বারের মালিকের সাথে হাসানের খুব ভাল সম্পর্ক। হাসান ব্যাগটা বারের এক কোণে লুকিয়ে রেখে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এখানে কাটিয়ে দেয়; তার সব ক্রেতাই জানে তার এই আস্তানার কথা। সবাই এখানে এসে সিডি কেনে; হাসান সবাইকে আপ্যায়ন করে, এবং সে নিজেও টুকটাক খাওয়া-দাওয়া করে; ফলে বার মালিক সিনিওরে রবের্তোর ভাল বেচা-কেনাও হয়, বিশেষ করে সন্তানের বয়সী বলে উনি হাসানকে স্নেহও করেন। উনার সম্মতি না থাকলে এখানে বসে এতো আরামে ব্যবসা করতে পারতো না হাসান; কৃতজ্ঞতা স্বরূপ হাসান মাঝে মাঝে উনার মেয়েকে সিডি উপহার দেয়।
[চলবে]

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension