
প্রায় আধঘন্টা ধরে রুটি সেঁকার পর তাকিয়ে দেখি, এখনো আরো অনেকগুলো বাকি রয়ে গেছে। কৌতুহল হলো। সেঁকা রুটিগুলো চট করে গুনে তাররপর বাকিগুলো সেঁকতে সেঁকতে গুণে রাখতে লাগলাম।
আমার চোখমুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। বিন্দুগুলো ক্রমশ বড় আর ভারী হচ্ছে। যে কোনো সময় গড়িয়ে রুটিতে পড়তে পারে, এই আশঙ্কায় মুখটাকে ডান দিকে ঘুরিয়ে জামার হাতা দিয়ে নাক এবং থুতনিটা মুছে নিলাম।
রুটি তৈরি করছে এ বাড়ির ঠিকা কাজের বুয়া আমিনা। আমিনা এ বাড়িতে সকাল আটটায় আসে আর বারোটায় বেরিয়ে যায়। আজই প্রথম আমিনার সাথে গল্প করতে করতে তার স¤পর্কে বিস্তারিত জানলাম।
দুই সপ্তাহ হলো বিয়ে হয়ে এ বাড়ি এসেছি। আজই প্রথম রান্নার কাজ দেওয়া হয়েছে আমাকে। এ ক’দিন পর হয়ত আমার গা থেকে নতুন বউয়ের তকমাটা গেছে। শাশুড়ি আম্মা সকালে ঘুম থেকে ডেকে বললেন, ‘আমিনা রুটি করছে, ওকে একটু সাহায্য করতে পারবে? কালকের গরুর মাংসের ভুনা বেশ অনেকটাই রয়ে গেছে, তাই জেবু আর লাবুদের আমাদের সাথে খেতে বলেছি সকালে।’
জেবু আর লাবু শাশুড়ি আম্মার একমাত্র বোন এবং একমাত্র ভাই। সতেরো শ’ স্কয়ার ফিটের তিনতলা এ ফ্ল্যাটটির নিচতলায় লাবু মামা আর তার পরিবার আর দোতলায় জেবু খালা তার পরিবার নিয়ে থাকেন। তিন ভাই বোনের পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া তাদের এ ফ্ল্যাটটি। তিন তলা পেয়েছেন আমার শাশুড়ি আম্মা। আমার শ্বশুর মারা গেছেন, কয়েক বছর হলো।
এই তিন পরিবারের সকল সদস্যরা প্রায়ই যে একসাথে খাওয়া দাওয়া করে এবং সেটা তিন তলাতেই বেশি সেটা এই ক’দিনে তা বেশ বুঝে গেলাম। ব্যাপারটি এতদিন খারাপ না লাগলেও আজ পঞ্চাশটির মতো রুটি একা হাতে সেঁকতে গিয়ে এতগুলো মানুষের প্রায় প্রায় একসাথে খাওয়ার বিলাসিতাকে বড্ড বাড়াবাড়িই ঠেকল। তার ওপর সকালে এক ধরনের শারীরিক দুর্বলতা আর খাওয়ার অরুচি আমার বরাবরের সমস্যা।
কাজ শেষ করে চোখেমুখে পানি ছিটিয়ে দ্রæত নিজের ঘরে চলে এলাম। বালিশ ছাড়াই কাত হয়ে শুয়ে পড়লাম বিছানায়। রুটি সেঁকার শেষ দিকটায় বেশ বমি বমি ভাব হচ্ছিল।
শুক্রবার হওয়ায় রাজীব আজ বাসায়। ঘুম ছেড়েছে ওর, কিন্তু তবু চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। চোখ খুলে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কোথায় ছিলে এতক্ষণ?
রুটি ভাজছিলাম।
এত সময়?
হুম। রুটি অনেক। মামা আর খালারা এখানে খাবেন!
রাজীব এবার ভালো করে আমার দিকে তাকাল। এরপর আর কথা না বাড়িয়ে পাশ ফিরে চোখ বন্ধ করল আবার। শরীর একটু ঠিক লাগতেই উঠে পড়লাম। বাইরে কোলাহল শোনা যাচ্ছে। বাড়ির সবাই এসে পড়েছেন তাহলে। এসময় ঘরে থাকাটা দৃষ্টিকটু।
টেবিলে রুটি, মাংস, সব্জি আর সেমাই দেওয়া হয়েছে। সবাই নিজ দায়িত্বেই নিজ নিজ প্লেটে খাবার তুলে নিয়ে ডাইনিংয়ের চেয়ারে, সোফায় বসে পড়ল। রাজীব উঠে এসে একটা সিঙ্গেল সোফায় গম্ভীরমুখে বসে আছে। শাশুড়ি আম্মা দু’বার তাড়া দেওয়ায় সে ফ্রেশ হয়ে এসে খাবার নিয়ে বসল।
আমি সাধ্যমত লক্ষ্য রাখছি সবার দিকে, খাবার এগিয়ে দিচ্ছি। আমি আর আমার শাশুড়ি একটু পরেই বসলাম খেতে। খাওয়ার শেষ দিকে রাজীব হঠাৎ আমিনাকে কিছু বলার জন্য ডাকল। তারপর ওর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি এখন থেকে আরও এক ঘন্টা কাজ বেশি করবে আমাদের বাসায়, বেতন বাড়িয়ে দেওয়া হবে তোমার। সকালে রান্নার যাবতীয় কাজ তুমিই করবে। কারণ সকালের দিকটায় নিঝুমের শরীরটা একটু খারাপ থাকে। ও ওই সময় টুকিটাকি কাজ ছাড়া বেশি পরিশ্রমের কাজ করতে পারবে না।’
আমিনা সশব্দে তার সম্মতি জানাল। রাজীব চলে গেল নিজের ঘরে। সবাই হতভম্ভ হয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছিল। আমার একই সাথে অস্বস্তি, রাগ এবং প্রচÐ বিস্ময় কাজ করছিল। রাজীব হুট করে এমন একটা ঘোষণা কিভাবে দিয়ে ফেলল কে জানে! সবাই তো এখন ভাববে এক-দিন কাজ করেই নাজেহাল স্ত্রী তার স্বামীকে এই রুল জারী করতে বলেছে!
পরিবেশটা বেশ গম্ভীর হয়ে উঠল। বিশেষ করে শাশুড়ি আম্মার চেহারার দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। রাগে, ক্ষোভে তার চেহারার রঙ বদলে গেছে। থমকে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তিনি নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন। এরকম একটা পরিস্থিতিতে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে আমি ও নিজের ঘরে চলে এলাম। ততক্ষণে অন্যরা সবাই খাওয়া শেষ করে নিচে চলে গেছে।
আমি ঘরে ঢুকে দেখি রাজীব নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে টিভির চ্যানেল পরিবর্তন করছে।
কিঞ্চিত বিরক্তির সুরে আমি বললাম, ‘আচ্ছা তুমি এমন করলে কেন? আমি কি তোমার কাছে কোনো অভিযোগ করেছি? ছি ছি সবাই কি মনে করল! আর মা তো আমাকে কতটা খারাপ ভাবল কে জানে! তোমার একটুও বাধল না এসব বলতে? এমন কথা বলে খারাপ লাগছে না তোমার?
নাহ, লাগছে না তো! এটা প্রয়োজনীয় কথা ছিল। না বললেই বরং খারাপ লাগত।
আজ প্রথম এ বাড়িতে কাজ করেছি। আজই এটা বলতে হলো তোমাকে?
শোনো নিঝুম, দরকারি কথা সঠিক সময়ে বলতে হয়। ভুল সময়ে বলে লাভ নেই।
কথাগুলো শেষ করে রাজীব একই ভঙ্গিতে টিভি দেখছে। আমি ওর দিকে ভালো করে তাকালাম। এমন অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরির জন্য অনুশোচনার লেশমাত্র নেই ওর চেহারায়। আমার এক ধরনের বিস্ময় থাকলেও টের পেলাম, রাজীবের আমার প্রতি এমন যতœবান আচরণ আমাকে আসলে খুশি ও করছে। হঠাৎ রাজীবকে জড়িয়ে ধরে আমার বলতে ইচ্ছে হলো, ‘এমন থেকো সবসময়।’
খানিক বাদে রাজীব বাজারে যাবার উদ্দেশ্যে তৈরি হয়ে মায়ের ঘরের দিকে গেল। মা ও ছেলের কথোপকথন আমি এ ঘর থেকে শুনতে পেলাম। কারণ তারা দু’জনই একটু চড়া গলায় কথা বলছিল।
শাশুড়ি আম্মা রাজীবকে বলছেন, ‘আমি তো এই কাজ করে আসছি অনেক বছর হলো। তোমার মামা,খালাদের নিজের হাতে রান্না করে সকাল বেলাতে খাইয়েছি, তখন তো একথা বলোনি তুমি!’
রাজীবের তাৎক্ষণিক জবাব, ‘ মা, তোমাকে এ কাজটি করতে কেউ বাধ্য করেনি, তুমি নিজের ইচ্ছায় আনন্দ পেতে কাজটি করেছ। কিন্তু নিঝুম সেটা করলে ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাধ্য হয়ে করবে কারণ সকাল বেলাটায় তার শারীরিক দূর্বলতার সমস্যা রয়েছে। এজন্য ডক্টর ও দেখিয়েছে সে।’
তো, এই কথাটি আত্মীয়দের সামনে বলাটা কি খুব জরুরী ছিল?
কেন নয় মা? খাওয়াদাওয়ার ক্ষেত্রে তাদেরকে তুমি তোমার পরিবারের সদস্য ভাবছ, অথচ পারিবারিক সমস্যা শোনার বেলায় তাদেরকে তুমি আত্মীয় নাম দিয়ে দূরে ঠেলে দিতে চাইছ কেন?
তাঁদের এটা শোনার প্রয়োজন ছিল মা।নইলে পরবর্তীতে তাদের মধ্যে কিছু ভুল ধারণার জন্ম নিত নিঝুম স¤পর্কে। সেটা শোভন হত না।
আমার সাথে সাথে ওদেরকে ও অপমান করলি তুই আজ!
মা, এখানে কারোরই অপমান হয়নি। তুমি ওভাবে ভাবছ তাই।
এত বছর ধরে আমি এই সংসারের কাজ নীরবে করলাম, তাতে তোমাদের কোনো অসুবিধে হয়নি। এখন যত অসুবিধে! তাই কাজের লোকের রান্না খাওয়া লাগবে!
মা শোনো, তখন তোমরা সাংসারিক কাজ ছাড়া আর কিছু করার কথা ভাবতে পারোনি। এখনকার মেয়েরা ভাবছে। আর এটা আমিও বিশ্বাস করি, সাংসারিক যে কাজ গুলো টাকার বিনিময়ে কাজের লোকেরা করে দিতে পারে, সেসব কাজে কেন এ যুগের মেধাবী মেয়েরা অযথা অধিক সময় নষ্ট করবে? বরং সে সময়টায় তাদের মেধাকে কাজে লাগিয়ে অন্য কোনো সৃজনশীল কাজ তাদের করা উচিত, বই পড়া উচিত। তবে হ্যাঁ, যাদের কাজের লোক রাখার সামর্থ্য নেই তাদেরকে তো একসাথে সবকিছু ম্যানেজ করতেই হবে । আমাদের তো সামর্থ্য আছে মা। আর আমার সে সামর্থ্য আছে বলেই আমি কখনোই চাইনি তুমিও কষ্ট করে সংসারের কাজ করো। অনেক বার বলেছি ও তোমাকে। তুমি শোনোনি।
কারণ কি জানো? এই যে সুন্দর করে গুছিয়ে সংসার করা, নিজের হাতে রান্না করে সবাইকে খাওয়ানো, এসবের মধ্যে তোমাদের মতো অধিকাংশ মায়েরা অনেক তৃপ্তি এবং আনন্দ খুঁজে পান। তাই আমি কখনো জোর করিনি এ ব্যাপারটিতে। এ কথার পর দুজনই কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপর টের পেলাম, রাজীব বের হয়ে বাইরে চলে গেল!
ওই দিনের পর থেকে শাশুড়ি আম্মা গম্ভীর হয়ে আছেন। বাড়ির কোনো কাজই আমাকে করতে বলছেন না। এই শীতল পরিবেশে আমি খুব বিরক্ত হয়ে উঠছিলাম। তার ওপর গত তিনদিন থেকে রাজীবের আচরণে আরও অতিষ্ঠ হয়ে উঠলাম। সে অফিস থেকে ফিরে মায়ের ঘরে গিয়ে মায়ের সাথে বসে অনেকক্ষণ টিভি দেখে। এসময়টায় আমি একা থাকি ঘরে। করার মতো কিছুই পাই না। কিছুই ভালো লাগে না। তবে রাজীব আমাকে প্রতিদিন ওদের সাথে গিয়ে বসতে অনুরোধ করে। কিন্তু মা ছেলে দুজনে বসে টিভির যে প্রোগ্রাম দেখে, তা আমার কাছে ভীষণ অরুচিকর। তাই আমি যাই না ওখানে। আমি ভেবে পাই না, এ যুগের একজন উচ্চশিক্ষিত পুরুষ কোন্ রুচিতে এমন নিম্নমানের টিভি সিরিয়ালগুলো এত সময় ধরে এতটা মনোযোগের সাথে দেখতে পারে! এ বিষয়ে আজ রাজীবকে কিছু বলার প্রস্তুতি নিয়ে ফেললাম।
মায়ের ঘর থেকে ফিরে নিজের ঘরের দরজাটা বন্ধ করেই রাজীব আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আমি কিছু বলতে উদ্যত হতেই আমার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। কিন্তু অল্পক্ষণেই ও আমার শীতলতা টের পেয়ে গেল। রাজীব নিজেকে শিথিল করল আর আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ কি হয়েছে তোমার? গম্ভীর হয়ে আছো কেন এমন?’
তুমি প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরেই অন্য ঘরে চলে যাও, আমি একা থাকি, এটা কেমন আচরণ তোমার?
নিঝুম, অন্য ঘর আর মায়ের ঘর বিষয় দুটো আলাদা!
আচ্ছা, আমার বলতে ভুল হয়েছে, কিন্তু তোমার কি নতুন বিয়ে করা বউয়ের প্রতি কোনো দায়িত্ব নেই?
অবশ্যই দায়িত্ব রয়েছে এবং আমি তা যথাযথভাবে পালন করছি বলেই আমার বিশ্বাস।
আমাকে সময় না দেওয়া,এটা তোমার দায়িত্ব পালন?
এই ভর সন্ধ্যে থেকে শুরু করে সারা রাত এখন তোমার সেবায় নিয়োজিত থাকব, এটা দায়িত্ব পালন।আর তাছাড়া আমি তোমাকে আমার থেকে আলাদা রাখি নি তো। তুমি ইচ্ছে করে এ ঘরে একা থেকেছো।
তুমি ভাবলে কি করে ওইসব কুরুচিপূর্ণ সিরিয়াল আমি ওখানে গিয়ে দেখব? তোমার মতো রুচিহীন হতে পারব না। আর আমি অবাক হই তোমার মায়ের ও কেমন বিবেক, এসব বস্তা পচা সাংসারিক কলহের সিরিয়াল তোমায় নিয়ে বসে দেখেন!
নিঝুম, শোনো, কাউকে সম্মান করার অর্থ হলো তার ভালো লাগাগুলোকেও সম্মান করা। তুমি মাকে বিবেকহীন আর রুচিহীন বলে তাকে সরাসরি অসম্মান করলে আজ। তুমি এখন মার ঘরে গিয়ে তার কাছে ক্ষমা চাইবে, আর নেক্সট টাইম তাকে অসম্মান করে আর কখনো কথা বলবে না।
আমি বিস্ময়ে হা হয়ে রইলাম। আমার মনে হলো রাজীব নিশ্চয় নরমাল নয়। তার মধ্যে অ্যাবনরমালিটি আছে। বিস্ময় চেপে রাজীবের চোখে তাকিয়ে বললাম, ‘আমি কি উনার সামনে বলেছি নাকি, বা এমন কি অন্যায় বলেছি যে ক্ষমা চাইতে হবে?
আড়ালে কারোর স¤পর্কে নিন্দা করলে কি অপরাধ হালকা হয়ে যায়?
আর আজ তুমি আমার কথা অনুযায়ী তাঁর কাছে ক্ষমা না চাইলে ভবিষ্যতে তাঁকে তুমি আবারও অপমান করবে এবং প্রত্যক্ষভাবেই সেটা করবে।
আমি ক্ষমা চাইতে পারব না। আমি এমন কিছুই বলি নি।
সেটা তোমার ব্যাপার। তবে ক্ষমা চাইলে কেউ কারো দৃষ্টিতে ছোট হয়ে যায় না। বরং অনেক বড় প্রমাণিত হয়। আমি তোমাকে বড় বানাতে চাইছিলাম।
তোমাকে বোঝা কঠিন। এই তো সেদিন কি বেপরোয়া হয়ে সবাইকে তুচ্ছ করে আমার পক্ষ নিলে, আর আজ সেই আমাকে অপমান করতে চাইছ কি নির্দয়ভাবে।
তুমি বুঝতে ভুল করেছ। সেদিন আমি তোমার পক্ষ নিয়ে কথা বলি নি। ন্যায়সঙ্গত বিষয়ের পক্ষে বলেছিলাম। আর আজও তোমার বিপক্ষে যাই নি আমি। অন্যায়ের বিপক্ষে বলছি।
এটুকু বলে রাজীব আর কথা বাড়ায় নি। কিন্তু এরপর থেকে সে আমার সাথে কোনো ব্যাপারেই আর কথা বলছে না। তবে রাগী চেহারা নিয়েও সে ঘুরছে না। স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই চলছে তার সবকিছু।এমনকি মায়ের সাথে বসে দু’ঘন্টা সিরিয়াল দেখাও তার বন্ধ হয় নি।
রাজীবের এমন অস্বাভাবিক আচরণ দেখে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। দু’দিন পর সকালে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে রাজীবকে বললাম, ‘আমি চলে যাচ্ছি। এখানে এভাবে থাকতে পারব না। ‘
ওয়েট করো, আমি রেডি হয়ে নিই। আমিই পৌঁছে দিব তোমাকে।
বিস্ময়ের সীমা পার হলো আমার। রাজীব আমাকে আটকাতে চেষ্টা ও করল না এতটুকু!
জোরেসোরে নিষেধ করার পরও রাজীব আমার সাথে বের হলো আর আমাকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল।
মা, ভাইয়া, ভাবী আমাকে দেখে যারপরনাই অবাক হলো। ভাবী আমার এভাবে আসার কারণ বের করতে যে মরিয়া হয়ে উঠল, তা তার প্রত্যেক কথায় স্পষ্ট হচ্ছিল।
মা কে অবশ্য খুব মনমরা দেখছি। নিজের জটিলতা ক্ষণিকের জন্য ভুলে গেলাম। মার কাছে গিয়ে তার কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই মা ডুকরে কেঁদে উঠল। এরপর শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বলল, ‘বাড়িতে কুরুক্ষেত্র চলছে। ছেলের বউ একটা কাজে হাত দেয় না। সকাল নয়টার পরে ঘুম থেকে ওঠে। কাজ করতে করতে আমি মরি, এ কথা বলতে গেছি, তো তারা দুজনই কি অপমানটাই না করল আমাকে। বলে, কাজের লোক দিয়ে অধিকাংশ কাজ করে নিলে সমস্যা কোথায়! রোজ রোজ এই কাজ নিয়ে ঠেলাঠেলি করা নাকি আমার স্বভাব হয়ে গেছে। ইচ্ছে করে নাকি আমি কাজের লোক রাখি না, যাতে বউকে জব্দ করা যায়।
মা, আসলেই কি তুমি ভাবীকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়ার জন্য ইচ্ছে করে রাখো না কাজের মানুষ?
তুই ও এ কথা বলছিস? একটা কাজের লোক রেখে কত্তগুলো টাকা খরচ। সামান্য কাজ, সবাই মিলেমিশে করলে কি শরীর ক্ষয় হয়?
আমি মৃদু হেসে জবাব দিলাম, মা শোনো, কাজ করলে শরীর ক্ষয় হয় না, বরং শরীরের জন্য ভালো। তবে কেউ যদি স্বেচ্ছায় তা না করতে চায়, তাকে আমরা জোর করতে পারি না। কারণ আমরা ভাইয়ের জন্য বউ নিয়ে এসেছি, দাসী নয়। শ্বশুরবাড়িতে সবার নির্দেশ অনুযায়ী একজন বউয়ের সাংসারিক কাজ করাটা বিয়ের উদ্দেশ্য নয় মা। ভাবী কাজ করতে না চাইলে, মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে কাজের লোক রাখো। তোমার তো চিন্তা নেই। তোমার ছেলের আয় তোমার জন্য এবং তোমার ছেলের বউয়ের জন্য খরচ হবে, এতে তোমার অত হিসেবনিকেশ কেন? তোমাদের যুগ এখন নেই মা, এখন মেয়েদের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য সাংসারিক কাজকর্ম নয়। তাদের আরও অনেক লক্ষ্য থাকে। সেগুলো বুঝতে হবে মা!
মা একটু থেমে আবার সশব্দে কেঁদে বলল, আর আমি একটা মানুষ সন্ধ্যার পরটা একদম একা থাকি। টিভিই তখন আমার সঙ্গী। ছেলে, ছেলের বউ কেউ আমার ঘরে ভুলেও আসে না। সারাদিনেও তেমন আসে না। আমার খুব অসহায় লাগে। আজ তোর বাবা বেঁচে থাকলে এত অসহায় হতাম না। এতই কি খারাপ আমি? আমার কি কোনো অধিকার নেই ছেলের সঙ্গ পাবার? নাকি সে অধিকার শুধু তার বউয়ের এখন?’
মায়ের এই কথাগুলো শুনে আমার বুকের ভেতরে ভীষণ ধুকপুকানি শুরু হলো। মা সেটা টের পেল না। স্বার্থপর সন্তানদের স্বার্থপরতায় জর্জরিত প্রতিটি অসহায় মায়ের আর্তনাদ যেন এখন আমার সামনে গুঞ্জরিত হতে লাগল। মনে মনে ভীষণ লজ্জিত হচ্ছিলাম। মায়ের সামনে বসে থাকতে পারছিলাম না। ও বাড়িতে যে অপরাধ করে এসেছি, তা যেন ও বাড়ির অপরাধ নয়, যেন নিজের মায়ের সাথেই করেছি সে জঘন্য পাপ।
ঘর থেকে বের হতেই সামনে ভাবীকে দেখে থতমত খেলাম। পাশ কাটিয়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াতেই ভাবী পরম মমতায় আমার হাত ধরল, আমি দুঃখিত। তোমার আর মায়ের সব কথা আমি শুনেছি, আমায় ক্ষমা করো। কিন্তু নিঝুম, তোমার মধ্যে যে এত চমৎকার এবং আধুনিক একটা মন আছে, জানতামই না আমি। আজ থেকে আমার মধ্যেও শাশুড়ি, ননদ এসব নিয়ে আর কোনো টিপিক্যাল মনোভাব পাবে না তোমরা। সবাই মিলেমিশে থাকব আমরা। আর শোনো, তুমি চিন্তা করো না। মাকে আমরা অনেক সময় দেব এখন থেকে। এতদিন অনেক ভুল করেছি, আর নয়।
ভাবীকে আমার বলতে ইচ্ছে করছিল, ‘এই আমিটার মস্তিষ্কে নতুন প্রোগ্রাম সেট করা হয়েছে ভাবী, তাই এমন আউটপুট। এতে তোমার ননদিনীর কোনো কৃতিত্ব নেই। কৃতিত্ব একজন মানুষের। মানুষের বড্ড অভাব পৃথিবীতে ভাবী। আমি সৌভাগ্যক্রমে নিজের জন্য একজন মানুষ পেয়েছি।
কিন্তু আমার সেসব বলা হয় না ভাবীকে। শুধু ভাবীর হাতে আলতো করে একটু চাপ দিয়ে নিজের রুমে চলে যাই। পরক্ষণেই ব্যাগ হাতে করে বের হয়ে এসে মা কে বলি, মা, আমাকে এক্ষুনি আবার ফিরে যেতে হবে।
মা কপালে চোখ তুলে বলেন, কি বলিস এসব! তাহলে এলি কেন?
মা, যা খুঁজতে এখানে আসি নি, তা পেয়ে গেলাম এখানে এসে।
কী যে সব বলিস, মাথায় কিছু ঢোকে না।
আমি আসি মা। রাজীবকে নিয়ে দু একদিনের মধ্যে আবার আসব।
ফিরে আসার লজ্জায় নত হয়ে বাড়িতে ঢুকলাম না, একটা গর্বিত ভাব আর অটুট এক দৃঢ়তা নিয়ে ঢুকলাম। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে এবং আনন্দে বাড়ির কাজকর্ম করতে শুরু করলাম। শাশুড়ি আম্মার হাত থেকে সব্জির ঝুড়িটা কেড়ে নিয়ে কপট অভিমানে বললাম, আমি কি খুব খারাপ রান্না করব ভেবেছেন মা?
শাশুড়িকে জবাব দেয়ার সুযোগ না দিয়েই আবার বললাম, আর খারাপ হলে হবে, মেয়ে ভালোবেসে রান্না করলে তা খারাপ হলেও মা সেটা তৃপ্তি নিয়েই খায়, আমি জানি।
দুপুরের রান্না শেষ করে বিকেলের কিছু ø্যাকস তৈরি করেই রান্নাঘর থেকে বের হলাম। গোসল সেরে একটা সি- বøæ রঙের শাড়ি পরে নিলাম। রাজীবের এ রঙ খুব পছন্দ। রাজীব বিকেলে ফিরে আমাকে দেখে তার স্বভাবসুলভ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে শুধু বলল, কখন এলে?
সেটার জবাব না দিয়ে বললাম, ফ্রেশ হয়ে মায়ের ঘরে এসো। আমি তোমার পছন্দের কিছু স্ন্যাকস করেছি। আর তোমার কড়া লিকারের চা করে ফ্ল্যাক্সে নিয়ে আসছি। আশা করছি, টিভি দেখতে দেখতে বেশ খেতে লাগবে ওগুলো।
কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে লজ্জায় রাজীবের মুখের দিকে না তাকিয়ে বেরিয়ে রান্নাঘরের দিকে গেলাম।
অত্যন্ত অবাক হয়ে আমি লক্ষ্য করলাম, শাশুড়ির ঘরের পরিবেশটা আমার কাছে উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। আর সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার যেটা ঘটল, তা হলো টিভি সিরিয়াল দেখতে মন্দ লাগছে না আমার। আগের পর্বে কী হয়েছে শাশুড়ি আম্মা আমাকে মাঝেমধ্যে নিজ উদ্যোগে আর নিজের অজান্তেই বুঝিয়ে দিতে লাগলেন।
নিঝুম অন্ধকারে রাজীবের বুকের ওপর মাথা রেখে শুয়ে আছি আমি নিঝুম। রাতের নীরবতার অনুপাতে নিচু আওয়াজে ওকে বললাম, আমি খুব শীঘ্রই মায়ের কাছে স্যরি বলে নেব সেদিন ওভাবে তাঁর সম্পর্কে বলার জন্য।
রাজীব আমার কপালের চুলগুলো সরিয়ে দিতে দিতে বলল, স্যরি তো তুমি বলেইছো।
কখন বললাম?
নিঝুম, স্যরি দু’ভাবে হওয়া যায়। একটা মুখে বলে, আরেকটা আচরণ বা কাজের মাধ্যমে। তুমি দ্বিতীয়টা করেছ।
আমি চুপ করে রইলাম। রাজীবের এমন এমন গুছিয়ে কথা বলে, আমি ওর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে কেমন যেন এক নেশায় বুঁদ হয়ে থাকি।
এরপর মৃদু কৌতুকের সুরে রাজীব ফিসফিস করে বলল, ‘ শোনো,বস্তাপচা নাটক কষ্ট করে হজম করার জন্য ধন্যবাদ তোমায়।
ধ্যাত! ওগুলো নাটক বস্তাপচা নয় আসলে। মজাই লাগে দেখতে। আমি দেখি না বলে এমন ভাবতাম।
ওগুলো বস্তাপচাই মিসেস নিঝুম। তুমি আসলে বোঝো নি, আমি প্রতিদিন আমার জীবনের কিছুটা সময় শুধুমাত্র আমার মাকে দেই, টিভি নাটক দেখার জন্য যাই না তাঁর কাছে।
আসলে কি জানো, টিভি সিরিয়াল দেখার অভ্যাস টা আসলে খারাপ নয়। এতে লাইফের একটা রুটিন তৈরি হয়। প্রতিদিনের একটা রিক্রিয়েশন। আর সে রিক্রিয়েশনের লোভে সব কাজ নিয়মমাফিক জলদি জলদি সেরে নেয় গৃহিণীরা। এতে তাদের হতাশাও বাসা বাঁধে না শরীরে। একটা নির্দিষ্ট সময়ের বিনোদনের অপেক্ষায় সারাটা দিনের কাজেই তাদের প্রাণচাঞ্চল্য থাকে।’
আরিব্বাস! এসব তুমি কিভাবে টের পেলে? তুমি তো সে দলের গৃহিণী নও। তুমি তো একজন ইন্টেলেকেচুয়াল রমণী।
আমায় বলেছেন কোনো একজন মনীষী।
আর সে মনীষীর নাম বেগম রোকেয়া নিশ্চয় নয়, নামটা নিশ্চয় বেগম নিঝুম।
হুম বটে! আর সে মনীষী আরও একটি কথা বলেছে আমাকে।
জ্বি, ধন্য করুন বলে।
বলেছে, সংসার সুখের হয় পুরুষের গুণে।
রাজীব সশব্দে হেসে ফেলল। আমি নিঃশব্দে হেসে মনেতেই বললাম, তোমার হাসি এত সুন্দর কেন?



