
মুক্তিযুদ্ধ
পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণ
রফিকুল ইসলাম
যুদ্ধের শুরুতেই বিপর্যয়ের জন্যে জেনারেল নিয়াজী ৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সমস্ত পাকবাহিনীকে ‘পুল ব্যাক’ করে ঢাকার কাছাকাছি পদ্মা-মেঘনার মাঝামাঝি অঞ্চলে চলে আসতে নির্দেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সন্মিলিত বাহিনীর সর্বাত্মক আক্রমণের ফলে তা কার্যকর করা সম্ভব হয় নি। ৮ ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশের নানা অঞ্চলে পাকবাহিনী বিচ্ছিন্ন ও অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, দক্ষিণে একটি বাহিনী খুলনার কাছে, উত্তরে একটি বাহিনী হিলির কাছে, অন্যদিকে একটি বাহিনী জামালপুরে এবং ময়নামতি ও চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে দু’টি বাহিনী আটকে যায়। যুদ্ধের শুরুতেই ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মানেকশ বাংলাদেশে যুদ্ধরত পাকবাহিনীকে আত্মসমর্পণ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন, ৮ ডিসেম্বর থেকে বেতার মারফতে বিভিন্ন ভাষায় তা আকাশবাণীর সমস্ত কেন্দ্র থেকে প্রচার করা হতে থাকে। ৯ ডিসেম্বর গভর্নর ডা. মালিকের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী শর্তাধীনে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব করেছিলেন, কিন্তু জেনারেল নিয়াজী ফরমান আলীর প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। ১৩ ডিসেম্বর তারিখে জেনারেল ইয়াহিয়া খান আত্মসমর্পণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, জেনারেল নিয়াজী সেদিনও শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প ঘোষণা করেন। ১৪ ডিসেম্বর গভর্নর ডা. মালিক পরিস্থিতি বিবেচনার জন্য গভর্নর হাউজে এক উচ্চ পর্যায়ের সভা আহবান করেন। ঐ সভা চলাকালে গভর্নর হাউজের ওপর প্রচণ্ড ভারতীয় বিমান হামলা হয়। ফলে ডা. মালিক ও তাঁর মন্ত্রীসভার সব সদস্য পদত্যাগের ঘোষণা করে ঢাকা আন্তর্জাতিক রেডক্রসের নিরপেক্ষ এলাকা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। জেনারেল নিয়াজী তখনও যুদ্ধ চালিয়ে যেতে দৃঢ়সংকল্প এবং তা সম্ভবত বঙ্গোপসাগরের দিকে অগ্রসরমান মার্কিন সপ্তম নৌবহরের ভরসায়। কিন্তু ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে স্পষ্ট বোঝা গেল যে, সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করলেও সম্ভবত হস্তক্ষেপ করবে না।
জেনারেল মানেকশ দিল্লীর মার্কিন দূতাবাস এবং আকাশবাণীর মাধ্যমে নিয়াজীকে ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯ টার মধ্যে বিনাশর্তে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব মেনে নেবার সময়সীমা নির্দিষ্ট করে দেন। ১৬ই বিকেল ৪টা ২১ মিনিটে সোহরাওয়ারদী উদ্যানে সন্মিলিত বাহিনীর প্রধান জেনারেল অরোরা ও বাংলাদেশ বাহিনীর পক্ষ থেকে গ্রুপ ক্যাপ্টেন খন্দকারের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণ করেন। আত্মসমর্পণের দলিলের প্রথমাংশে ছিল:
The Pakistan Eastern Command agree to surrender all Pakistan Armed Forces in Bangladesh to Lieutenant General Jagjit Singh Aurora, General Officer Commanding in Chief of the INDIA and BANGLADESH forces in the Eastern Theatre. The surrender insludes all PAKISTAN land, air and naval forces as also all paramilitary forces and civil armed forces. These forces will lay down their arms and surrender and surrender at the places when they are currently located to the nearest troops under the command of Lieutenant-General JAGJIT SINGH AURORA.
ঐ দলিলে স্বাক্ষর করেন লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা এবং লে. জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ খান নিয়াজী। আত্মসমর্পণের এই দলিল অনুসারে প্রায় ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদের সহযোগি এবং পরিবারবৃন্দ আত্মসমর্পণ করেছিল। এই আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে শেষ হল বাংলাদেশের ওপর পঁচিশ বৎসরের পশ্চিম পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ আর নয় মাসের অবাধ গণহত্যা, লুন্ঠন, ব্যাপক নারী নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞ। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় যেমন ইউরোপ জুড়ে একদিকে হিটলারের সেনাবাহিনী যুদ্ধ করেছিল আর একদিকে গেস্টাপো এস এস ফোর্স ইহুদি নির্মূলে রত ছিল, একাত্তরের সময়ও তেমনি একদিকে বিভিন্ন রণাঙ্গনে পাকিস্তান বাহিনী যুদ্ধ করছিল আর অপরদিকে পাকবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালনায় তাদের দোসর ও দালাল রাজাকার, আল বদর, আল শামস্ ও তথাকথিত শান্তি কমিটির সদস্যরা বাঙালি নিধন এবং সর্বপ্রকার মানবতাবিরোধী বর্বর, নৃশংস ও পৈশাচিক কর্মকাণ্ডে উন্মত্ত ছিল।



