
বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত নীতি বাতিল: ট্রাম্প প্রশাসনকে আদালতের বড় ধাক্কা
শাহ্ জে. চৌধুরী:
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের আইনি ধাক্কা দিয়েছে নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালত। বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের ইমিগ্র্যান্ট ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার নীতিকে অবৈধ ঘোষণা করে তা বাতিল করেছেন আদালত।
শুক্রবার দেওয়া রায়ে ইউএস ডিস্ট্রিক্ট জাজ জ্যানেট ভার্গাস বলেন, জাতীয়তার ভিত্তিতে ইমিগ্র্যান্ট ভিসা প্রক্রিয়া ব্যাপকভাবে স্থগিত করার ক্ষেত্রে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তাঁর আইনগত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির ভিসা পাওয়ার যোগ্যতা কেবল তাঁর জাতীয়তার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা যায় না। প্রতিটি আবেদনকারীর যোগ্যতা, আর্থিক পরিস্থিতি ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় পৃথকভাবে মূল্যায়নের জন্য মার্কিন আইনে নির্ধারিত ব্যবস্থা রয়েছে।
বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ রায়
আদালতের এই সিদ্ধান্ত নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ ছিল সেই ৭৫টি দেশের তালিকায়, যাদের নাগরিকদের ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে স্থগিত রাখা হয়েছিল।
এই নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকদের পরিবারের সদস্যদের স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে আসার প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিশেষ করে পরিবারভিত্তিক ইমিগ্র্যান্ট ভিসার আবেদনকারীদের দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে পড়তে হয়।
নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা, ব্রুকলিন, ব্রঙ্কস, কুইন্স ও আশপাশের এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্য আদালতের এই রায় তাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কেন ৭৫ দেশের ভিসা স্থগিত করা হয়েছিল?
ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি ছিল, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কিছু নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। সেই আশঙ্কার ভিত্তিতে ৭৫টি দেশের নাগরিকদের ইমিগ্র্যান্ট ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়।
তবে আদালত মনে করেছেন, একটি দেশের সব নাগরিককে একই মানদণ্ডে বিচার করে ইমিগ্র্যান্ট ভিসা প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেওয়া আইনসঙ্গত নয়।
আদালতের মতে, আবেদনকারীর যোগ্যতা ও পরিস্থিতি ব্যক্তিভেদে মূল্যায়ন করতে হবে। কেবল কোনো দেশের নাগরিক হওয়ার কারণে একজন আবেদনকারীকে ইমিগ্র্যান্ট ভিসা প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া যায় না।
পরিবার পুনর্মিলনে নতুন আশার আলো
ভিসা স্থগিতের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা অনেক বাংলাদেশি নাগরিকের স্বামী-স্ত্রী, সন্তান ও অন্যান্য পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে আসার প্রক্রিয়া আটকে যায় বা দীর্ঘায়িত হয়।
অনেক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে সাক্ষাৎকার, কাগজপত্র ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেও ভিসা ইস্যুর অপেক্ষায় ছিল।
আদালতের এই রায় সেই পরিবারগুলোর মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে যারা বৈধ ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে আনার অপেক্ষায় রয়েছেন, তাঁদের জন্য সিদ্ধান্তটি গুরুত্বপূর্ণ।
৭৫ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ
ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিতের আওতায় থাকা ৭৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ ছিল।
তালিকায় আফগানিস্তান, ইরান, পাকিস্তান, রাশিয়া ও সোমালিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এই নীতির ফলে এসব দেশের নাগরিকদের স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের জন্য ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।
ভিজিটর ভিসা নিয়ে বিভ্রান্তির সুযোগ নেই
বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য একটি বিষয় বিশেষভাবে পরিষ্কার করা জরুরি—এই নির্দিষ্ট নীতিটি ছিল ইমিগ্র্যান্ট ভিসা নিয়ে।
অর্থাৎ যারা স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের উদ্দেশ্যে ভিসা চাইছেন, তাঁদের ভিসা প্রক্রিয়াই মূলত এই স্থগিতাদেশের আওতায় ছিল।
পর্যটন, ব্যবসা বা অন্যান্য নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এই নির্দিষ্ট স্থগিতাদেশের আওতায় ছিল না।
এখন কী হবে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের?
ফেডারেল আদালতের রায়ের ফলে ৭৫ দেশের ইমিগ্র্যান্ট ভিসা প্রক্রিয়া পুনরায় চালুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ আইনি পথ তৈরি হয়েছে।
তবে আদালতের রায়ের পর কত দ্রুত কনস্যুলার পর্যায়ে ভিসা প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হবে, সেটি এখন বড় প্রশ্ন। মার্কিন প্রশাসন এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে আপিল করবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তাই বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য রায়টি নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর হলেও, আটকে থাকা আবেদনগুলো কখন থেকে কার্যকরভাবে প্রক্রিয়াকরণ শুরু হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নির্দেশনার দিকে নজর রাখতে হবে।
ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে আরেকটি বড় আইনি ধাক্কা
ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় ফিরে অভিবাসন ও ভিসা ব্যবস্থায় একাধিক কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ৭৫ দেশের ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত নীতি বাতিলের এই রায় সেই নীতিগুলোর বিরুদ্ধে আদালতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে সামনে এসেছে।
এই রায়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে ব্যক্তিগত যোগ্যতা, পৃথক মূল্যায়ন এবং আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে ভিসা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নীতি।
বাংলাদেশি পরিবারগুলোর এখন অপেক্ষা
আদালতের সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশি কমিউনিটির অনেক পরিবার নতুন আশার আলো দেখছে। বিশেষ করে যেসব পরিবার দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে থাকা স্বজনদের যুক্তরাষ্ট্রে আনার অপেক্ষায় রয়েছে, তাদের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আটকে থাকা ইমিগ্র্যান্ট ভিসার আবেদনগুলো কবে থেকে আবার স্বাভাবিকভাবে এগোবে।
নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিসহ যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বসবাসরত হাজারো বাংলাদেশি পরিবার এখন মার্কিন প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।



