মুক্তমত

শিক্ষক থেকে রাষ্ট্রপ্রধান: মির্জা ফখরুল ও বিনম্রতার এক অনন্য রাজনৈতিক অধ্যায়

আকবর হায়দার কিরন

রাজনীতি। উত্তাল তরঙ্গ, বহু বছরের দীর্ঘ সংগ্রাম, কারাবরণ আর প্রতিকূলতার শত ঝড়ের মধ্যেও যে কজন মানুষ নিজেদের বিনয়, ভদ্রতা এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখতে পেরেছেন—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিঃসন্দেহে তাঁদের মধ্যে অন্যতম।

২১ আগস্ট ২০২৬, শুক্রবার এক ঐতিহাসিক সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সংবিধান রক্ষার শপথ গ্রহণ করেছেন। এর মাধ্যমেই সমাপ্তি ঘটলো তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বর্ণাঢ্য এক অধ্যায়ের।

রাজনীতিবিদদের পথ সাধারণত শুরু হয় সরাসরি সভা-সমাবেশ কিংবা রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু জনাব মির্জা ফখরুলের পথটি ছিল ভিন্ন ও বহুমাত্রিক। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে তরুণ বয়সের নাট্যচর্চা ও সংস্কৃতিমনস্কতা—তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনে গভীর ছাপ ফেলেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাঠ চুকিয়ে তিনি বেছে নিয়েছিলেন শিক্ষকতার মতো মহান পেশা, ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে প্রভাষক হিসেবে যাঁর সূচনা। পরবর্তীতে সরকারি প্রশাসন ও ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনে দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার चेयरमैन হিসেবে তিনি মূলধারার নির্বাচনী রাজনীতিতে পা রাখেন।

সংসদ সদস্য, একাধিক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব সামলে পরবর্তীতে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দলটির মূল মুখপাত্রের গুরুদায়িত্ব পালন করেন। দলীয় মহাসচিব পদে দীর্ঘ পথচলার ইতি টেনে এবার তিনি স্থলাভিষিক্ত হলেন দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শত কারাবরণ ও নাজেহাল অবস্থার মধ্যেও তাঁর পরিমিত ও শালীন বাচনভঙ্গি তাঁকে অন্য সবার থেকে আলাদা এক মর্যাদায় তুলে ধরেছে।

দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে বহু ব্যক্তিত্বের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ হলেও জনাব ফখরুলকে আমি দূর থেকেই পর্যবেক্ষণ করেছি। কয়েক মাস আগে তিনি যখন নিউ ইয়র্ক সফরে এসেছিলেন, তখনও আর ১০জনের মতো ভিড় ঠেলে তাঁর কাছে যাওয়ার বা একটি সেলফি তোলার তাগিদ অনুভব করিনি। একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে তাঁর দূরদর্শিতা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে দূর থেকেই অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখেছি।

৩৫ বছর পর জাতীয় সংসদে সংসদীয় প্রতিযোগিতামূলক ভোটে বিজয়ী হয়ে রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে তাঁর এই শপথ গ্রহণ কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়; বরং একজন শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, সাংস্কৃতিক কর্মী ও জননেতা থেকে রাষ্ট্রের অভিভাবক পদে আরোহণ এক অনন্য রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো।

রাষ্ট্রপতির শীর্ষ আসনে বসেও তিনি তাঁর চিরচেনা সততা, পরিমিতি ও বিনয়ের ধারা অক্ষুণ্ন রাখবেন—একজন প্রবীণ সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিক হিসেবে এটাই আমার প্রত্যাশা। প্রথাগত রাজনীতির সীমা পেরিয়ে ব্যতিক্রমী ও কল্যাণকর কাজের মধ্য দিয়ে তিনি দেশের মানুষের হৃদয়ে এক স্মরণীয় রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে অম্লান হয়ে থাকবেন।

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আপনাকে জানাই আমার আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভকামনা।

নিউ ইয়র্ক, ২১ অগাস্ট

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension