
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাগরিকত্ব
হুমায়ূন কবীর ঢালী
“শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে দেশে এনে নাগরিকত্ব দিয়েছিলেন”—এই কথা শুনে হয়তো অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে এটি কি কোনো প্রলাপ, নাকি ঐতিহাসিক সত্য। সাম্প্রতিক সময়ে এমন একটি দাবি করা হলেও ঐতিহাসিক সত্য এর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশেষ উদ্যোগে এবং ভারত সরকারের সাথে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে ১৯৭২ সালের ২৪ মে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সপরিবারে কলকাতা থেকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। কবিকে বাংলাদেশে এনে অত্যন্ত সম্মানজনকভাবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রাখা হয় এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ‘জাতীয় কবির’ মর্যাদা দেওয়া হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ার মূল চালিকাশক্তি ও পথপ্রদর্শক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন, যা একটি অনস্বীকার্য ঐতিহাসিক সত্য। কেউ যদি দাবি করেন যে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু বা তাঁর সরকার নজরুলকে আনেননি বা জাতীয় কবি ঘোষণা করেননি, তবে সেটি হবে চরম ইতিহাস বিকৃতি।

অন্যদিকে, কাজী নজরুল ইসলাম জন্মসূত্রে এবং জীবনের দীর্ঘ সময় ভারতের নাগরিক থাকায় আন্তর্জাতিক নিয়মের কারণে তাঁকে আইনগতভাবে নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়টি সম্পন্ন হতে কিছুটা সময় নেয়। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালের ২৪ মে এক সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম (যিনি ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর থেকে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন)। সে সময় জিয়াউর রহমান উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও পরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান (চিফ অব আর্মি স্টাফ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
সুতরাং, ১৯৭৬ সালের আইনি নাগরিকত্ব দেওয়ার কাগজপত্রের ওপর ভিত্তি করে ১৯৭২ সালের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক অবদানকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা যেমন অন্যায়, তেমনই তৎকালীন দাপ্তরিক প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক কৃতিত্বের সাথে গুলিয়ে ফেলাও সঠিক নয়। ইতিহাসের মূল ধারাবাহিকতা হলো—১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক ও মানসিকভাবে কবিকে বাংলাদেশে এনে জাতীয় কবির মর্যাদা ও আসন নিশ্চিত করেছিলেন, আর ১৯৭৬ সালে আইনি ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়া হিসেবে তাঁর নাগরিকত্ব চূড়ান্ত করা হয়েছিল। ইতিহাসের এই দুই অধ্যায়কে সঠিক প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করাই সত্যনিষ্ঠ ইতিহাস চর্চার একমাত্র পথ।



