মুক্তমত

নূরু পাগল: আলো, সত্য ও অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীক

মামুন রেজা

সূর্য অস্ত গেলে এক স্তব্ধ আঁধার নেমে আসে এই ধরণীতে। কিন্তু আলো যখন নিভে যায় সত্যের প্রদীপ জ্বালানো কোনো মহাপুরুষের, তখন সেই অন্ধকার শুধু প্রকৃতির থাকে না—তা ছেয়ে যায় মানুষের আত্মায়, গ্রাস করে আস্ত এক সভ্যতাকে। ঠিক তেমনই এক অমাবস্যার অন্ধকার নেমে এসেছিল আমাদের মাঝে, যখন নিভে গিয়েছিল প্রেম ও ভালোবাসার মশালবাহী সুফি সাধক নূরুল হক (নূরু পাগল)-এর জীবনপ্রদীপ। আর তারচেয়েও বড় কলঙ্ক ও বিষাদের ইতিহাস রচিত হয়েছিল, যখন মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে হার মানিয়ে কবর থেকে তাঁর পবিত্র দেহ তুলে এনে আগুনে পুড়িয়ে উল্লাস করেছিল একদল হিংস্র মানব রূপী দানব।
এই ধরণীতে কিছু মানুষের আগমন ঘটে স্বর্গীয় আলোর মশাল হাতে নিয়ে। যাঁদের প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি উচ্চারণ নিবেদিত থাকে সৃষ্টির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার অমৃত বিলায়। যুগের আবর্তে ইমাম মেহেদী (আ.)-এর প্রেমবাণী ও সময়োপযোগী সত্যের বার্তা ছড়িয়ে দিতে এসেছিলেন তেমনই এক মহান পথপ্রদর্শক—নূরুল হক (নূরু পাগল)।
এমন মহামানবেরা কখনো বিলীন হন না, বিলীন হতে পারেন না। পরকালের অমোঘ টানে তাঁরা কেবল শরিয়তের নশ্বর পোশাকটি খুলে আধ্যাত্মিক জগতের অনন্ত যাত্রায় পাড়ি জমান। ভক্তদের ব্যাকুল হৃদয়ে তাঁরা জ্বলে থাকেন চিরন্তন, অনির্বাণ এক প্রেমের শিখা হয়ে।
তাঁর হৃদয়ে ছিল ভালোবাসার অপার, অলৌকিক এক ক্ষমতা। এমন এক স্বর্গীয় মায়ায় তিনি সবাইকে বুকে জড়িয়ে রাখতেন যে, হাজারো মানুষের ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি ভক্তের মনে হতো—‘দয়াল বুঝি আমাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন!’ সেখানে কোনো শর্ত ছিল না, ছিল না কোনো ভেদাভেদ বা বৈষম্যের দেয়াল। কেবল অকৃত্রিম আত্মিক টানে তিনি জয় করেছিলেন হাজার হাজার দিকভ্রান্ত হৃদয়। তাঁর সেই প্রীতিময় স্পর্শে আলোকিত হয়ে উঠেছিল পথহারানো অগণিত মানুষের জীবন।
আজ আমরা চাইলেই আর তাঁর নূরানী মুখখানি দেখতে পারি না, ছুঁয়ে দেখতে পারি না তাঁর স্নেহপরশ। পরম মমতায় জড়িয়ে ধরার সেই হাত দুটি আজ আর মেলে না। কিন্তু তিনি যে মুক্তিকামী বাণী, আত্মশুদ্ধির মন্ত্র ও সত্যের দিশা রেখে গেছেন, তা যুগে যুগে অন্ধকারে পথচলা মানুষকে দেখাবে পরম আলোর দিশা।
আধ্যাত্মিক সাধনা ও অসাম্প্রদায়িক সাম্যবাদ
মরমি আধ্যাত্মিকতার শান্ত প্রাঙ্গণেই শুধু নয়, সমাজের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতায় নূরুল হকের উপস্থিতি ছিল প্রখর ও অমলিন। সমাজে প্রচলিত ধর্মীয় গোঁড়ামি, কৃত্রিম জাতিভেদ আর অমানবিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠ ছিল সর্বদা সোচ্চার।
তিনি বারবার স্মরণ করিয়ে দিতেন—পরম পরমাত্মাকে পেতে সুদূর অচিনপুরে ঘুরে বেড়ানোর প্রয়োজন নেই। অকৃত্রিম ভালোবাসা, পরম ব্যাকুলতা এবং সংগীত—যা মনকে নির্মল করে ও দ্রবীভূত করে—তার মধ্য দিয়েই মেলে স্রষ্টার দেখা। তাঁর দর্শনের মূল সুরই ছিল আত্মশুদ্ধি ও সর্বজনীন মানবপ্রেম।
প্রেমানুভূতির এই চরম শিখরে পৌঁছে মানুষ আর সাধারণ অনুভূতির কাঠামোয় আটকে থাকে না; সে হয়ে ওঠে মহীয়ান স্রষ্টার এক অভেদ অংশ। তার দেখা, শোনা কিংবা বলা—সবকিছুর মাঝেই তখন ফুটে ওঠে এক মহাজাগতিক রূপ ও দিব্য দ্যুতি।
নূরু পাগলের এই প্রথাভাঙা, প্রেমময় জীবনদর্শন গভীর অনুভূতির সাথে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন তাঁর কাছে আসা দর্শনার্থীরা। আর সে কারণেই খেটে খাওয়া দিনমজুর থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ, সব ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে তাঁর প্রাঙ্গণে ছুটে আসতেন। সেখানে ধনী-দরিদ্র, জাত-পাতের কোনো প্রাচীর ছিল না; সবাই এক কাতারে এসে দাঁড়াতেন। আর এভাবেই সমাজদেহে রচিত হয়েছিল এক অভূতপূর্ব অসাম্প্রদায়িক সাম্যবাদের ধারা।
প্রাঙ্গণের কড়া অনুশাসন ও অলৌকিক দূরদৃষ্টি
বাহ্যিকভাবে তিনি ভালোবাসার নদী হলেও অন্যায়ের প্রশ্নে ছিলেন বজ্রকঠিন। নূরু পাগলের দরবারে পান, সিগারেট, গুল, জর্দা, মদসহ সব ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্য কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। কালিমালিপ্ত, নেশায় আসক্ত কোনো মানুষের সেখানে স্থান হতো না, যতক্ষণ না সে নিজেকে শুধরে নিত। দয়াল পাকের এই কঠোর অনুশাসনের কারণে অনুভবেও কেউ কোনো অপকর্ম করার সাহস পেতো না।
দরবারে যখন নতুন কোনো অভাগা মানুষ এসে দাঁড়াত—সে যদি জেনা, নেশা কিংবা জন্মদাতা পিতা-মাতার ওপর অত্যাচারের মতো ভয়াবহ পাপে লিপ্ত থাকত—নূরু পাগল তাঁর আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞায় মুহূর্তে তা অনুধাবন করতেন। পরম মমতায় অথচ ধিক্কার জানিয়ে তাকে চিহ্নিত করতেন এবং পাপমুক্ত হয়ে ফিরে আসার পথ দেখাতেন। তিনি অতীত ও ভবিষ্যতের বহু জটিল বার্তা অত্যন্ত সহজ ভাষায় ব্যক্ত করতেন। দেশ-বিদেশের বড় বড় ঘটনা ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের বহু আগেই দিতেন অলৌকিক আগাম ইঙ্গিত।
তবে তাঁর হৃদয়ের সবচেয়ে বড় আকুতি ও বাণী ছিল—‘এখন ইমাম মেহেদী (আ.)-এর জামানা; এই সত্য ও ভালোবাসার পথ ছাড়া আগামী দিনে আধ্যাত্মিক ও নৈতিকভাবে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।’ সুরের মায়াজালে, গান ও কবিতার ছন্দে ছন্দে তিনি এই পরম বাণী পৌঁছে দিতেন গণমানুষের দ্বারে দ্বারে।
সত্যের আলো ও অন্ধকারের জঘন্যতম হিংস্রতা
ইতিহাসের নির্মম নিয়মেই আলো যখন অন্ধকারকে দূর করতে চেয়েছে, তখনই অন্ধকারের প্রেতাত্মারা হিংস্র থাবা বসিয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক অন্ধত্ব ও সংকীর্ণতার গণ্ডি পেরিয়ে নূরু পাগল যখন সুফিবাদভিত্তিক মানবধর্মের জয়গান গেয়েছেন, ঠিক তখনই একশ্রেণীর ধর্মব্যবসায়ী ও স্বার্থান্বেষী হিংসুটে গোষ্ঠী তাঁর বিরুদ্ধে চরম বিদ্বেষে মেতে ওঠে।
বিশেষ করে তাঁর ভৌত প্রয়াণের পর, কিছু বিপথগামী নরপশু কখনো “ইসলাম হেফাজত কমিটি”, আবার কখনো “ধর্ম অবমাননার” মিথ্যা অপবাদ তুলে সত্যের এই সুফি ধারাকে ধরণীর বুক থেকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।
আগামী ৫ সেপ্টেম্বর পূর্ণ হতে চলেছে মানবজাতির ইতিহাসের সেই পরম কলঙ্কজনক অধ্যায়ের এক বছর। তাঁর মৃত্যুর ১৩ দিন পর, যখন তিনি কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত, তখন সেই নরপশুরা তাঁর পুণ্যময় মরদেহ কবর থেকে খুঁড়ে বের করে। টেনে-হিঁচড়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মহাসড়কের দিকে। হায় নিষ্ঠুরতা! ঘাতকেরা যখন তাঁর নশ্বর দেহে আঘাত করছিল, তখনো তাঁর নূরানী মুখমণ্ডল থেকে তাজা রক্ত বেরিয়ে আসছিল—যে ভয়াবহ দৃশ্য ভিডিও চিত্রে দেখে শিউরে উঠেছিল গোটা বিশ্ব, স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল মানুষের বিবেক!
এরপর ব্যস্ত মহাসড়কে সেই মরদেহে আগুন ধরিয়ে দিয়ে পৈশাচিক উল্লাসে মেতে ওঠে তারা। মানবসভ্যতার ইতিহাসে লেখা হয় বর্বরতার এক চরমতম, করুণতম অধ্যায়।
আদর্শের অমরত্ব
কিন্তু ঘাতকের দল কি জানতো—অগ্নিশিখায় কেবল নশ্বর মাংসপিণ্ড আর হাড় চূর্ণ করা যায়, সত্য ও ভালোবাসার অবিনশ্বর আদর্শকে কখনোই পুড়িয়ে ছাই করা যায় না?
নূরু পাগলের প্রদীপ জ্বালানো সেই আদর্শিক যাত্রা থামেনি। তা আজও বয়ে চলেছে নির্মল নদীর স্রোতের মতো—পাড়া থেকে পাড়ায়, গ্রাম থেকে গ্রামে, সীমানা ছাড়িয়ে সুদূর দিগন্তে।
শরীর তো মরণশীল, আজ আছে কাল মাটির নিচে বিলীন। কিন্তু সত্য, অহিংসা ও অকৃত্রিম ভালোবাসার যে অমর সুর তিনি বাজিয়ে দিয়ে গেছেন, তা কোনোদিন নিভবে না। নূরু পাগল তাঁর অসাম্প্রদায়িক মানবপ্রেমের মহিমায় কোটি কোটি ব্যথিত হৃদয়ে চিরভাস্বর হয়ে জ্বলবেন—আজ, আগামীকাল এবং অনন্তকালজুড়ে মানবমুক্তির এক অনির্বাণ ও পবিত্র প্রেরণা হয়ে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension