
নূরু পাগলের মানবধর্ম ও সমকালীন বাস্তবতা
মামুন রেজা
মানবজাতির ইতিহাসে পরম সত্তাকে খোঁজার আকুতি কখনো সুনির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক সীমানা বা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের চারদেওয়ালে বন্দি থাকেনি। যখনই সমাজ ধর্মীয় গোঁড়ামি, সামাজিক বৈষম্য ও জাতিভেদের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছে, তখনই পরম প্রেম ও সুফিবাদের প্রদীপ জ্বালিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন কিছু পরমাত্মার সাধক। তেমনই একজন মুক্তিকামী সাধক ছিলেন নূরু পাগল। কেবল মরমি আধ্যাত্মিকতার জগতেই নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং প্রথাগত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এক সোচ্চার প্রদীপ হয়ে তিনি আলো ছড়িয়েছেন।
প্রথাগত ধর্মান্ধতা যেখানে সাধারণ মানুষকে ভীতি ও আচার-সর্বস্বতার শিকলে বাঁধে, সেখানে নূরু পাগল শিখিয়েছেন প্রেমের সহজ পাঠ। পরম সত্তাকে পেতে দূর-দূরান্তে ঘুরে বেড়ানো কিংবা ঘর সংসার ত্যাগ করার প্রয়োজন নেই—এই পরম সত্যটি তিনি অনুধাবন করেছিলেন।
তাঁর দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল: প্রেম ও সংগীত যা মানবমনকে দ্রবীভূত করে, সহজ ও নির্মল করে তোলে—তার মাধ্যমেই সৃষ্টিকর্তার উপস্থিতি অনুভব করা সম্ভব।
বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে হৃদয়ের শুদ্ধিই প্রধান। প্রেম ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমেই মানুষের অন্তরে স্রষ্টার সাক্ষাৎ মেলে।
এই প্রেমানুভূতির চরম শিখরে পৌঁছে মানুষ আর সাধারণ থাকে না; সে হয়ে ওঠে মহান স্রষ্টার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর দেখা, শোনা কিংবা বলা—সবকিছুই তখন মহাজাগতিক ও ঐশ্বরিক রূপ নেয়। তিনি সাধারণের সীমানা পেরিয়ে পরিণত হন মহামানবে।
নূরু পাগলের প্রাঙ্গণ কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা উচ্চবিত্তের স্থান ছিল না। সেখানে পরম শান্তি ও আলোর খোঁজে ভিড় জমাতেন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সব ধর্মের ও বর্ণের মানুষ। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সেখানে একই কাতারে এসে দাঁড়াতেন। সংঘাত ও সংকীর্ণতায় ভরা সমাজে এটি ছিল এক অভূতপূর্ব অসাম্প্রদায়িক ও সার্বজনীন মানবধর্মের উন্মেষ।
ইতিহাসের চিরাচরিত নিয়মেই আলো যখন অন্ধকারকে তারাতে চায়, তখন অন্ধকারের কারবারিরা হিংস্র হয়ে ওঠে। ধর্মের লেবাসধারী একশ্রেণীর স্বার্থান্বেষী ধর্মব্যবসায়ী ও ভণ্ড গোষ্ঠী নূরু পাগলের এই সত্য ও সরল পথ সহ্য করতে পারেনি। সত্যের এই ধারাকে স্তব্ধ করতে তারা পদে পদে বাধা সৃষ্টি করেছে।
এমনকি তাঁর ত্যাগের পরও এই বিপথগামী ও জ্ঞানপাপী গোষ্ঠী শান্ত হয়নি। কখনো তথাকথিত সংগঠনের নামে, আবার কখনো “ধর্ম অবমাননার” মিথ্যা অপবাদ তুলে তারা বারবার সত্যকে চিরতরে মুছে ফেলার অপচেষ্টা করেছে।
নূরু পাগলের মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ কবর থেকে তুলে মহাসড়কে এনে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে উল্লাস করার ঘটনাটি কেবল একটি অপরাধ নয়—তা মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক চরম কলঙ্কজনক অধ্যায়। এই ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে একশ্রেণীর ধর্মান্ধ নিজেদের চরম অসভ্য, নির্লজ্জ ও বিবেকহীন হিসেবে প্রমাণ করেছে।
তবে, দেহ বিনষ্ট করা গেলেও কি মুক্ত চিন্তার আদর্শকে পুড়িয়ে ছাই করা যায়? পাগলের রেখে যাওয়া আদর্শের যাত্রা থামেনি। তা বয়ে চলেছে নদীর নির্মল স্রোতের মতো, বাতাস যেমন ভেসে বেড়ায় এক পাড়া থেকে অন্য পাড়ায়, এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে, শহর থেকে শহরের সীমানা পেরিয়ে দেশ-বিদেশে।
শরীর মরণশীল, কিন্তু সত্য ও ভালোবাসার বাণী অমর। বাহ্যিক বর্বরতা দিয়ে নূরু পাগলের অস্তিত্বকে মুছে ফেলার যে চেষ্টা করা হয়েছিল, তা ব্যর্থ হয়েছে। নূরু পাগল তাঁর অসাম্প্রদায়িক মানবপ্রেমের আদর্শে কোটি মানুষের হৃদয়ে চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন—আজ এবং আগামীকালের মানবমুক্তির অনুপ্রেরণা হয়ে।
উৎসর্গ:
২৩ শে আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে সাধক নূরু পাগলের ১ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এই লেখাটি গভীর শ্রদ্ধা ও ভাবগাম্ভীর্যের সাথে উৎসর্গ করা হলো।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক



