
বাংলাদেশের পথেমুক্তিযুদ্ধ
বাংলাদেশের পথে- ৫ ও ৬ জানুয়ারি ১৯৭১
৫ জানুয়ারি ১৯৭১
ঢাকায় সংবাদপত্রসূত্রে প্রকাশ পূর্ব পাকিস্তান এবং ত্রিপুরার (ভারত) ভূমি রেকর্ড ও জরিপ ডিরেক্টররা গত শনিবার এখানে সমাপ্ত চারদিনের সম্মেলনে প্রদেশের চারটি জেলার সাথে ত্রিপুরার সীমান্ত চিহ্নিতকরণ ও অন্যান্য প্রশ্ন আলোচনা করেন। ত্রিপুরার ভূমি রেকর্ড ও জরিপ ডিরেক্টর টি. হোসেন পকিস্তানি দলের নেতৃত্ব করেন। সরকারি সূত্রে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানের ভূমি রেকর্ড ও জরিপ ডিরেক্টর সম্মেলনে ফেনী নদী বরাবর চট্টগ্রাম/পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং মাতামুহুরী নদী এলাকার নোয়াখালী/ কুমিল্লার সঙ্গে ত্রিপুরার সীমানা চিহ্নিতকরণ প্রশ্ন উত্থাপন করেন। ভারতীয় পক্ষ সংশ্লিষ্ট মানচিত্রসমূহ পরীক্ষা করেন এবং পরীক্ষাকার্য সমাপ্ত করার জন্য আরও সময় চান। পূর্ববর্তী বছর সম্পাদিত খণ্ড জরিপ সংক্রান্ত ১২টি সিটের প্রাথমিক প্রমান সমীক্ষাও বিনিময় করা হয়।
রাওয়ালপিন্ডিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে ১৯৭০-৭১ সালের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি পর্যালোচনা করা হয়ে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। এনইসির এই বৈঠকে যোগদান করেন পিন্ডিতে উপস্থিত কেন্দ্রীয় মন্ত্রীগণ, পাদেশিক গভর্নরগন, প্রেসিডেন্টের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এসজিএমএম পীরজাদা, অর্থনৈতিক উপদেষ্টা এম.এম. আহমদ ও পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান এম এইচ সুফী। আলোচনা প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলে।
৬ জানুয়ারি ১৯৭১
শেখ মুজিবুর রহমান দলীয় অফিসে অনুষ্ঠিত সভায় গণ-বিরোধী চক্রান্তকারীদের যে কোনও পদক্ষেপের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাসেবকদের সজাগ থাকার আহবান জানান। যে কোনও উস্কানির মুখে সুশৃঙ্খল থেকে বিগত নির্বাচনের সময়ের মতো ঐতিহ্য বজায় রাখতে বলেন। তিনি তাদেরকে জনগণ বিরক্ত হয় এমন কাজ না করতে উপদেশ দেন। তিনি বলেন, জনগণ আওয়ামী লীগের কর্মসূচির প্রতি যে রায় দিয়েছে বিশ্ব ইতিহাসে তা বিরল। অতএব দলীয় কর্মীদের সদা সতর্ক থাকতে হবে। আত্মরক্ষার্থে আপনারা লাঠি তৈরি রাখুন, তবে হাই কমান্ডের অনুমতি ছাড়া আপনারা লাঠির ব্যবহার করতে পারবেন না। সহ্যের সব সীমা অতিক্রম হলে সঠিক নির্দেশ দেওয়া হবে। সভায় দলের সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও সম্পাদক জনাব তাজউদ্দিন আহমদও বক্তৃতা করেন।
প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান রাওয়ালপিন্ডিতে বলেন, শীঘ্রই তিনি আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে বৈঠকে মিলিত হবেন। ইসলামাবাদ বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, কানাডার প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ট্রুডো ও বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের পাকিস্তান সফরের পরই শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যেই পিপলস্ পার্টির চেয়াম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হয়েছেন।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ট্রুডো চারদিনব্যাপী পাকিস্তান সফরের উদ্দেশ্যে অপরাহ্নে রাওয়ালপিন্ডি এসে পৌঁছান। বিমানবন্দরে প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান তাঁকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন। এরপর প্রেসিডেন্ট পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চীফ অব জেনারেল স্টাফ আবদুল হামিদ খান, পাকিস্তান বিমান বাহিনী ও নৌবাহিনীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। বিমানবন্দরে এক বিবৃতিতে কানাডীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও পাকিস্তানি অফিসারদের সাথে দ্বি-স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বহু বিষয়ে মতামত বিনিময়ের তিনি আশা রাখেন। তিনি বলেন, পাকিস্তান ও কানাডার মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব সম্পর্ক রয়েছে। উভয় দেশই কলম্বো পরিকল্পনা ও কমনওয়েলথভুক্ত রয়েছে। আগামীকাল তিনি ইয়াহিয়ার সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠকে মিলিত হবেন।
পাকিস্তানস্থ হাঙ্গেরীয় দূতাবাসের বাণিজ্যিক উপদেষ্টা পি. ইগারভেরি বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনা পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে বর্তমানে ঢাকা সফর করছেন। রাতে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে তাঁকে সংবর্ধনা জানানো হয়। বেগম ও জনাব এ. সালাম আয়োজিত উক্ত অনুষ্ঠানে নেতৃস্থানীয় ব্যবসায়ী, কূটনৈতিক মিশনসমূহের সদস্যবর্গ, শিল্পপতি এবং শহরের বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ যোগদান করেন।
পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ের প্রায় ১৮ হাজার শ্রমিক ও কর্মচারি তাদের ১৯ দফা দাবি আদায়ের জন্য ‘ইপরেল’ পাহাড়তলী শাখা ও ওপেন লাইন শাখার উদ্যোগে ভোর ছয়টা থেকে ধর্মঘট শুরু করে। উল্লেখ্য, তাদের ১৯ দফার মধ্যে বন্যা-বাবদ দুই মাসের অগ্রিম বেতনের দাবিও রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সৌজন্যে- মুখা



