
বামদের সঙ্গে বৃহত্তর ঐক্য চায় আওয়ামী লীগ
জাকির হোসেন
হঠাৎ পাল্টে গেছে রাজনীতির চালচিত্র। বেশ কিছুদিন ধরে যুক্তফ্রন্ট, গণফোরাম ও বিএনপি নেতারা ‘জাতীয় ঐক্যে’র নামে যে ‘বৃহত্তর ঐক্য’ গঠনের কথা বলে আসছিলেন ‘সেই জাতীয় প্রক্রিয়া’ গেছে থেমে, উল্টো এই ঐক্য প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হয়েছে নানা জটিলতা। আর এমন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবার জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন খোদ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের বাইরে থাকা অপরাপর বাম, গণতান্ত্রিক এবং অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৃহত্তর ঐক্য গড়তে চান তারা। এ লক্ষ্যে দলের বিভিন্ন স্তরের নেতারা অনেকদিন থেকেই জোটের বাইরে থাকা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। অতিসম্প্রতি গঠিত বাম গণতান্ত্রিক জোটের নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলের নেতারা।
যদিও বাম গণতন্ত্রিক জোটের নেতারা বরাবরই বলে আসছেন তারা আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে কোন জোটে যাবেন না। তারা দ্বিদলীয় জোটের বাইরে স্বতন্ত্র অবস্থানে থেকে আন্দোলন এবং নির্বাচন করতে চান। তবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বাম গণতান্ত্রিক জোটের দলগুলোর যেহেতু একটি আদর্শিক মিল আছে, যেহেতু এই দলগুলো অসম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, সেহেতু তাদের সঙ্গে ঐক্যের ব্যাপারে ১৪ দলের নেতারা আশাবাদী। এছাড়াও বাম গণতান্ত্রিক জোটের বাইরে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের যে সকল রাজনৈতিক দল আছে তাদের সঙ্গেও ঐক্য করতে চায় আওয়ামী লীগ।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গতকাল ১৪ দলের অন্যতম নেতা, ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারন সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা রূপসী বাংলাকে বলেন, ‘আমরা মনে করি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, অসাম্প্রদায়িতক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে ১৪ দলের পরিধি বাড়ানো যেতে পারে। এ নিয়ে ১৪ দলে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এখনও বাস্তব কোন অগ্রগতি নেই। তবে প্রচেষ্টা চলছে।
এদিকে গতকাল এক প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ‘মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু প্রশ্নে’ অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে বামপন্থি দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য গড়তে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আজকে একটা বিষয় ভালো লাগছে যে, বামপন্থিরা এক সুরে কথা বলছে। সেটা হচ্ছে সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে আমরা নেই- এই উচ্চারণ অনেকেই করেছে। তাহলে, এই উচ্চারণ যারা করেছেন, আসুন না আমরা মিনিমাম পয়েন্টে ম্যাক্সিমাম ইউনিটি গড়ে ফেলি, অসুবিধাটা কোথায়?
ওবায়দুল কাদের বলেন, কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন আট দলীয় জোটের অনেকের সঙ্গে আমরা একসঙ্গে ছাত্র রাজনীতি করেছি। তাদের আদর্শের প্রতি আমার কোন অশ্রদ্ধা নেই। এখানে মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু- এই প্রশ্নে আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধ হই।’
ওবায়দুল কাদের দাবি করেন, তাঁরাও জাতীয় ঐক্য চান। তাঁরা একটা অর্থবহ, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন চান। ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার কোন চিন্তা তাঁদের নেই।
এদিকে ড. কামাল হোসেন ও অধ্যাপক বদরুদ্দৌজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার দেয়া আল্টিমেটাম শেষ হলেও পরবর্তী কর্মসূচির বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত হয় নি। ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতারা বলছেন ড. কামাল হোসেন বিদেশ থেকে না ফেরা পর্যন্ত কোন সিদ্বান্ত নেওয়া হবে না।
বৃহত্তর ঐক্যের ডাক দিয়ে ২২ সেপ্টেম্বর মহানগর নাট্যমঞ্চে জমায়েত হয় গণফোরাম, যুক্তফ্রন্ট ছাড়াও বিএনপি ও তাদের শরিক দলগুলো। সমাবেশে সরকারের নানান কর্মকান্ডের সমালোচনা করে কয়েকটি দাবি তুলে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আল্টিমেটাম দেওয়া হয়।
তবে আলটিমেটাম শেষ হলেও, এখন কী কর্মসুচি দেওয়া হবে সে বিষয়ে কেউই কিছু জানেন না। এ বিষয়ে বিকল্পধারা বাংলাদেশ এর সভাপতি ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, ‘এটা ছিল ড. কামাল হোসেনের পার্টি, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া এবং তারা কীভাবে সংগঠিত করেছে আমি জানি না।’
নাগরিক ঐক্যের আহ্ববায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘যুক্তফ্রন্ট এবং জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় যৌথভাবে আগামি কর্মসূচি দেওয়ার ব্যাপারে ঘোষণাটা দিয়েছিল কিন্তু এটা ওনারা ওনাদের মত করে বলেছেন। এখন এটার জবাব ওনারা দিতে পারবেন, আমি পারব না।’
গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন ও তার দলটির নির্বাহী সভাপতি এডভোকেট সুব্রত চৌধুরী দু’জনই বাইরে আছেন। দলের আরেক নেতা জানান, এই দুই নেতা ফিরলেই আলোচনা করে সিদ্বান্ত নেয়া হবে।
গণফোরামের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ও ম শফিউল্লাহ বলেন, ‘ড. কামাল হোসেন ওনার শারীরিক চিকিৎসার জন্য গেছেন, উনি অবিলম্বে চলে আসবেন। এলে আমরা আলাপ করে একটা মতৈক্যে পৌঁছবো। হয়ত একসঙ্গে, নয়ত বা আলাদা আলাদা করে বসব। এই জন্য আমরা একটা লিয়াজোঁ কমিটি করব।’
তবে, আসছে ৭ অক্টোবর ঢাকায় তাদের একটি মানববন্ধন কর্মসুচি রয়েছে। সে কর্মসুচি গণফোরামের না ঐক্য প্রক্রিয়ার তাও স্পষ্ট করা হয় নি।
এদিকে নেতৃত্ব ও জামায়াত প্রশ্নে ছাড় দিয়ে বৃহত্তর ঐক্য করবে না বিএনপি। যারা এই দুই বিষয়ে শর্ত আরোপ করছে, তাদের সঙ্গে কোন ঐক্য হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন দলটির নেতারা। তবে ঐক্য না হলেও যুগপৎ আন্দোলনের কথা ভাবছে দলটি।
বৃহত্তর ঐক্যের জন্য ক্ষমতায় ভারসাম্য আনতে ১৫০ আসন এবং স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গ ছাড়ার শর্ত ছিল যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরাম নেতাদের। এতে শুরুতেই হোঁচট খেলো ঐক্য প্রক্রিয়া। বিএনপি বলছে, শর্ত মেনে কারও সঙ্গে ঐক্য করবে না তারা।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘ডানে বামে কে কি কথা বলল তা আমরা শুনতে চাই না। জন-আকাঙ্ক্ষায় কারা থাকবে আর কারা থাকবে না সে বিষয়ে যার যার সিদ্ধান্ত সে নেবে।’
আর বিএনপি ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান বলেন, ‘যে আন্দোলন করতে গিয়ে আমরা এত ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি, এত মূল্য যে আমাদের দিতে হয়েছে! তাই আন্দোলনের পথে আমরা কি করব- না করব সেটা কারও নির্দেশে করব না।’
গত রবিবার বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভা থেকেও এমন বার্তা দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, বিএনপি এই অবস্থানে অনড় থাকলে বৃহত্তর ঐক্য সম্ভব নয় বলে মনে করেন নাগরিক ঐক্যের আহ্ববায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না।
তিনি বলেন, কোনভাবেই শয়তানের সঙ্গে ঐক্য করতে আমরা রাজি নই। জাতীয় ঐক্যের নামে এ ঐক্য প্রক্রিয়াটা গড়ে উঠেছিল বা অনেকখানি এগিয়েছিল। এটি মানুষের ব্যাপক আস্থাও অর্জন করতে পেরেছিল। আমি মনে করি এটা বিএনপির নেতারা বুঝেছেন। আজকে যদি তারা বলেন যে, সেটাও দরকার নেই, রাজপথে আমরা যুদ্ধ করব। যদি শয়তানও আসে আসুক। শয়তানে আসক্ত এ লড়াইয়ে জেতা যাবে না।’
ঐক্য না হলে কোন পথে হাঁটবে বিএনপি? এমন প্রশ্নে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘এটা একটা যুগপৎ আন্দোলন। কাজেই যে যার প্লাটফর্ম থেকে একই কর্মসূচি ঘোষণা করবে। একই লক্ষ্য অর্জন করার জন্য কাজ করবে। একটি রাজনৈতিক দল অন্য একটি রাজনৈতিক দলকে এ কথা বলতে পারে না যে, অমুকের সঙ্গে আপনি থাকতে পারবেন না।’



