নির্বাচিত কলাম

সুবর্ণচরের ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হোক

 

ডিসেম্বর ৩০ তারিখ, ২০১৮। এই দিন সারা দেশে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন হয়েছে। দিন শেষে নির্বাচনের ফলাফল আমরা জেনেছি, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন, আর অন্যরা ধরাশায়ী হয়েছেন। সারা দিন এটাও জেনেছি, ভোটাররা ভোট দিতে গিয়েও দিতে পারেননি। তাদের বলা হয়েছে, ‘আপনার ভোট দেয়া হয়ে গেছে।’ কেউ কেউ ভোটকেন্দ্রে গিয়েও ঢুকতে পারেননি। তবু নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়েছে বলে সবাই স্বস্তিতে ছিলেন। যদিও নির্বাচনের ফল অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলো মেনে নেয়নি। এসব ভিন্ন আলোচনা। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে যে বিষয়টি এখনো নির্বাচনের জয়ের কপালে একটা কলঙ্ক চিহ্ন হয়ে আছে তা হচ্ছে, নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায় ভোট প্রয়োগ করতে আসা নারীর ওপর হিংস্র আক্রমণ। পালাক্রমে ধর্ষণ।

পাঠক নির্বাচনের পর থেকেই প্রতিদিন পত্রিকায় বিষয়টি নিয়ে কোনো না কোনো খবর দেখছেন বা পড়ছেন। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের সারমর্ম করে ঘটনাটি আবার উল্লেখ করছি। ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের দিন দুপুরের দিকে একজন নারী ভোটার তার স্বামীসহ স্থানীয় ভোটকেন্দ্র চরজুবলীর ১৪ নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট দিতে যান। একই এলাকার চরজুবলী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য রুহুল আমিনের লোক নির্বাচনে নৌকার পক্ষে কাজ করেছিল। ভোটের দিন তারা সেই নারী (৩২) ভোটারকে তাদের পছন্দের প্রতীকে (অর্থাৎ নৌকায়) ভোট দিতে বলেন। তিনি তাতে রাজি না হলে এ নিয়ে তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে সেই লোকেরা তাকে দেখে নেয়ার হুমকি দেয়। সেই নারী ভোট দিয়ে ফেরার পথে রুহুল আমিন তাকে অনুসরণ করে এবং উত্ত্যক্ত করে। নারী এর প্রতিবাদ জানিয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরে আসেন। এরপর রুহুল আমিন ও তার লোকজন নারীর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং গভীর রাতে রুহুল আমিনের নেতৃত্বে ৮-১০ জনের একদল সন্ত্রাসী দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে স্বামী-সন্তানকে বেঁধে রেখে নারীকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে চলে যায়। এতে নারী অচেতন হয়ে পড়েন। সন্ত্রাসীরা চলে যাওয়ার পর পরিবারের অন্য সদস্যদের চিত্কারে আশপাশের লোকজন এসে তাদের উদ্ধার করে। গুরুতর আহত অবস্থায় ওই গৃহবধূকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ডে পরদিন দুপুরে ভর্তি করা হয়।

সুবর্ণচরের সেই নারীকে ডাক্তারি পরীক্ষার পর সংঘবদ্ধ ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মো. খলিল উল্যাহ। ডাক্তারি পরীক্ষার প্রতিবেদন জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। ওই নারীর শরীরের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতনের চিহ্ন আছে। বিষয়টি এখন প্রমাণের অপেক্ষায় নেই যে ধর্ষণ হয়েছে কিনা, কিন্তু কিছুদিন ব্যয় হয়েছে কে এবং কেন করেছে তা নিয়ে।

এখন সুবর্ণচর পত্রিকার শিরোনামের অংশ হয়ে গেছে। প্রতিদিন কিছু না কিছু খবর ছাপা হচ্ছে, তাতে জানা যাচ্ছে অপরাধীরা ধরা পড়ছে কিনা। তাদের রিমান্ডে নেয়া হচ্ছে, তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথাও বলছে। যদিও মূল আসামি রুহুল আমিনকে মামলায় আসামি রাখা নিয়ে পুলিশ অনেক গড়িমসি করেছে। সেই নারীর স্বামী বাদী হয়ে মামলা করলেও তিনি জানেন না কেন রুহুল আমিনকে আসামি করা হয়নি। তার ভাষায়, ‘আমি অশিক্ষিত মানুষ, থানায় গিয়ে ঘটনা খুলে বলেছি। পুলিশকে বলেছি সব লিখে নিতে। তারা কেন রুহুল আমিনের নাম লেখে নাই, বলতে পারি না।’ অন্যদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে তা অস্বীকার করা হচ্ছে। তারা বলছেন, ‘বাদী যার যার নাম উল্লেখ করেছে তাদেরই আসামি করা হয়েছে। এখানে পুলিশের কিছুই করার নেই।’ এ ব্যাপারে স্থানীয় পর্যায়ে দলের পক্ষ থেকে আজ পর্যন্ত কোনো ব্যাখ্যা আসেনি। প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটবে, এটাই সবাই জানে।

কাজেই এ সংঘবদ্ধ ধর্ষণ অন্যান্য নারী নির্যাতনের ঘটনার মতো বিবেচনা করার বিষয় নয়। এ ঘটনা সরাসরি নির্বাচনে সহিংসতা ও ভোটারের নিরাপত্তার প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। এ ঘটনার সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক আছে। এ ঘটনা বুঝিয়ে দিয়েছে নির্বাচনে ভোটারের নিরাপত্তার যে দাবি তোলা হয়েছে, তা কত জরুরি ছিল। যদিও কেউ ঘুণাক্ষরে ভাবেনি নির্বাচনে ধর্ষণের বিষয়ে সাবধানতার কথাও বলতে হবে। ব্যবস্থা নিতে হবে তার বিরুদ্ধেও। আমরা জানি, ধর্ষণ প্রায় ক্ষেত্রেই ক্ষমতার প্রদর্শন হিসেবে করা হয়। নির্বাচন কমিশন কি বুঝতে পারছে একটি দলকে নির্বাচনের সময় অতিমাত্রায় ক্ষমতাধর করে ফেলা এবং নির্বাচন কমিশনের দুর্বল উপস্থিতি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে কত ভয়াবহ হতে পারে? তার প্রমাণ দিয়েছে সুবর্ণচরের এ ধর্ষণের ঘটনা। ভোটের অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে অন্যের নির্দেশে অন্য প্রতীকে সিল না মারার পরিণাম কী হতে পারে তা একজন নারীকে নির্মমভাবে বুঝিয়ে দেয়া হলো। এটাই ছিল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যেখানে জয় হয়েছে সেই প্রতীকের, যে প্রতীকে ভোট দেয়ার জন্য এ নারীকে বাধ্য করা হচ্ছিল এবং শেষ পর্যন্ত তাকে ধর্ষিত হতে হয়েছে।

সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার কারণে সুবর্ণচরের এ ঘটনা আড়াল করা যায়নি ঠিকই, কিন্তু লক্ষ করছি এরই মধ্যে পত্রিকার প্রথম, দ্বিতীয় বা পেছনের পাতা থেকে ধীরে ধীরে সরে গিয়ে ১২, ১৩ নম্বর পাতায় গিয়ে ঠেকছে। একসময় পাঠকও ভুলে যাবে। মামলাও খুব এগোবে না। যেমন এগোয়নি অন্যান্য চাঞ্চল্যকর ধর্ষণের ঘটনার ক্ষেত্রে। কিন্তু সারা জীবন ভুলতে পারবেন না সেই নারী ও তার পরিবার। কলঙ্ক চিহ্ন থেকে যাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া জয়ের কপালে।

আমরা এখনো সরকারপ্রধানের মুখে, যিনি একজন ক্ষমতাধর নারী, এ ঘটনার নিন্দা জানাতে শুনিনি। নোয়াখালীর প্রতিনিধি হিসেবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের মুখে কোনো দুঃখ প্রকাশ করতে শুনিনি, শুধু বলেছেন ‘কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।’ এটা দায়সারা কথা। ব্যস। তার দায়িত্ব শেষ। একাদশ জাতীয় সংসদে এবার রেকর্ডসংখ্যক নারী ‘নির্বাচিত’ হয়েছেন। তারা কেউ ছুটে যাননি সুবর্ণচরের নারীকে দেখতে। নোয়াখালীর কাছের নারী সংসদ সদস্য হচ্ছেন ফেনী-১ আসনের শিরীন আখতার। তিনি এককালে নারী আন্দোলনে বেশ সক্রিয় ছিলেন। আমরা একসঙ্গে মিছিল-মিটিং করেছি। দিনাজপুরের ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যার বিরুদ্ধে সম্মিলিত নারী সমাজে যারা সোচ্চার ছিলেন, তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম। কিন্তু তিনি এখন কেন নিশ্চুপ হয়ে আছেন! শিরীন আখতার ছাড়া নোয়াখালী-৬-এ আছেন আয়শা ফেরদৌস, চাঁদপুর-৩-এ ডা. দীপু মনি। তিনি শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন। নাকি তারা নিজেরাও নৌকায় ভোট না দেয়ায় সেই নারীর ওপর বিরক্ত হয়ে আছেন? তারা নিজেরাই কি নৈতিক শক্তি হারিয়েছেন? তাই যদি হয়, আগামী পাঁচ বছরে আরো যেসব ঘটনা ঘটবে এবং এরই মধ্যে প্রতিদিন ঘটে চলেছে, তখনো কি তারা চুপ থাকবেন? তাহলে রেকর্ডসংখ্যক নারী জাতীয় সংসদে গেলে সাধারণ নারীদের কী উপকার? তারা নৌকা মার্কায় ভোট পেয়ে জিতে সুবর্ণচরের নারীর কষ্ট বুঝতে অক্ষম হচ্ছেন। ঘটনার সঙ্গে নৌকা মার্কাও জড়িয়ে গেছে। তাই এ ধর্ষণের ঘটনা আর ১০টি গণধর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারছে না। নির্বাচন সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন আছে, ভোটাররা ভোট দিতে না পারলেও ৯৮ শতাংশ ভোট পড়েছে। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল করার ঘোষণা এসেছে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে।

কিন্তু নির্বাচনের দিন ও ভোটকেন্দ্রের ঘটনার জেরে নারী ধর্ষণ হলে তার বিচার কি শুধুই সাধারণভাবে অন্যান্য নারী নির্যাতনের ঘটনার মতো করা হবে? এর দায়দায়িত্ব কি নির্বাচন কমিশন নেবে না? কে জানে দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক নারী ভোটার এ ধরনের ভয় পেয়েছেন কিনা এবং ভোটকেন্দ্রে যাওয়া থেকে বিরত থেকেছেন কিনা। কে জানে গণধর্ষণের শিকার না হলেও নারীদের হেনস্তা করা হয়েছে কিনা। এসব বিষয় তদন্ত হওয়া দরকার। ঐক্যফ্রন্ট, বাম গণতান্ত্রিক জোটসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন যারা নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়েও তথ্য সংগ্রহ করুন। অবস্থা এমন থাকলে নারী ভোটার, নারী প্রার্থী সব হারিয়ে যাবে। এখন বড় দায়িত্ব নিতে পারেন নৌকা প্রতীকে জয়ী নারী সংসদ সদস্যরা। দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য আপনাদের ভূমিকা দেখতে চাই। সুবর্ণচরের নারীকে যারা ধর্ষণ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। সামনে সংরক্ষিত আসনের মনোনয়ন শুরু হবে। এখানে দৌড়ঝাঁপ করার আগে প্রমাণ করুন আপনারা একটি দলের নয়, নারীদের প্রতিনিধি হয়ে এ আসনে বসবেন। সুবর্ণচরে গিয়ে সেই নারীর প্রতি সংহতি প্রকাশ করুন। তাহলেই বুঝব আপনাদের প্রতিনিধিত্বের প্রতি ভরসা রাখা যায়।

সুবর্ণচরের ঘটনার সর্বশেষ আঘাত এসেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে, তারা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে ভিকটিমের মারপিট ও ধর্ষণের শিকার হওয়ার কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাননি। সারা দেশের মানুষ হতবাক হয়ে গেছে দেশের মানবাধিকার সংস্থার তদন্ত কমিটির এমন কানা চোখের বিচার দেখে। তারা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন, ‘ভিকটিমের স্বামীর দায়েরকৃত এজাহারের ভাষ্যমতে, এটি আসামিদের সঙ্গে ভিকটিমের পরিবারের পূর্বশত্রুতার জের।’ আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

লেখক: নারী নেত্রী; নির্বাহী পরিচালক, উন্নয়ন বিকল্পের নীতিনির্ধারণী গবেষণা (উবিনীগ)

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension