উপন্যাসসাহিত্য

তবুও ভ্যালেন্তিনা (তৃতীয় পর্ব)

তাহমিদ হাসান


[পূর্ব প্রকাশের পর]
তিন মাস হয়ে গেছে বৈধতার কাগজ এখনো হাসান পায়নি; এদিকে কাজ ছাড়া বসে থাকতে থাকতে সে ক্লান্ত। আবার কবে যে গ্রিন কার্ড পাবে তারও কোন নিশ্চয়তা নাই; সব মিলিয়ে একটা অস্হিরতায় ভুগতে থাকে সে। ব্রিক্সেন ছোট শহর, তাছাড়া বৈধ কাগজ ছাড়া এখানে কাজের কোন অনুমতি নাই। মামা পরামর্শ দেয় রোমে যেতে; কিন্তু রোমে বাঙালিদের যে পরিস্হিতি দেখে এসেছে সে, তাতে করে রোমে যাবার জন্য হাসানের মন সায় দিতে চায় না। হাসান মামাকে বলে, আবার জার্মানে ফিরে যাই। বৈধতার কাগজ দেওয়া শুরু হলে, আপনি ফোন করলে তখন আসবো!

ঠিক আছে।

এখন সমস্যা হচ্ছে সে যাবে কীভাবে? ট্রেনে অস্ট্রিয়ার উপর দিয়ে গেলে এরফুর্তের দূরত্ব বেশি নয়; কিন্তু এই পথে ট্রেনে চেক অনেক বেশি। আবার ফ্রান্স হয়ে গেলে ট্রেনে চেক নেই বললেই চলে; কিন্তু পাড়ি দিতে হবে কয়েক হাজার কিলোমিটার, তবু হাসানের কাছে ফ্রান্স হয়ে যাওয়াই নিরাপদ মনে হয়। ঠিক হয় ফ্রান্স হয়ে জার্মানি যাবে সে, আর হাসান মনে মনে বল, ভালোই হলো, এই ফাঁকে আইফেল টাওয়ার দেখে নেওয়া যাবে।

মামা প্যারিসে তার এক বন্ধুকে ফোন করে দেয়, উনিও পাকিস্তানি; হাসান খেয়াল করে মামার প্রায় সব বন্ধুই পাকিস্তানি। মামার আর এক বন্ধু থাকে স্টুটগার্টে, নাম ইফতেখার। তার নাম্বার হাসানকে দিয়েছে মামা। অতএব ঠিক হয়, প্যারিসে কয়েক দিন থেকে হাসান প্রথমে যাবে স্টুটগার্ট; ওখানে ইফতেখার সাহেবকে পাওয়া গেলে হাসান স্টুটগার্ট থাকবে, আর যদি না পাওয়া যায়, তবে সে সোজা চলে যাবে এরফুর্ত; হাসানের পুরাতন জায়গায়। হাসানের মনে আরও একটা আকাংক্ষা উঁকি দেয়, আর তা হলো সুইজারল্যান্ডের জুরিখ; এই বাড়তি আকাংক্ষার কথা হাসান মামাকে কিছু বলে না, যদি মামা রাগ করে। যাই হোক সমস্ত চিন্তা মাথায় নিয়ে আবার অজানার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে হাসান; আর মনে মনে ঠিক করে প্যারিস গিয়েই সিদ্ধান্ত নেবে কোথায় যাবে সে?

তো প্রথমে রোমে যায় হাসান; ওখানে মামার একটা জরুরী কাজ মিটিয়ে, এক সন্ধ্যায় সে প্যারিসের ট্রেনে উঠে বসে।

আট
নির্ধারিত সময় অনুযায়ী রাত নয়টায় স্টুটগার্ট ট্রেন স্টেশনে নেমে প্রথমে মামার বন্ধু ইফতেখার সাহেবকে ফোন দেয় হাসান। কিন্তু উনাকে পাওয়া যায় না কিছু দিনের জন্য পাকিস্তান গিয়েছেন উনার স্ত্রী ফোন ধরে বললেন। অতএব কী আর করা, এখন এরফুর্তই শেষ ভরসা। কিন্তু ট্রেন তো চলে গেছে, পরের ট্রেন রাত দুইটায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই পাঁচ ঘন্টা কাটাবে কোথায়? কারণ, পাঁচ ঘন্টা একটানা স্টেশনে বসে থাকলে একবার না একবার পুলিশ ডকুমেন্ট চেক করবেই; তখন ধরা পড়ে যেতে হবে কপাল সব সময় ভালো নাও হতে পারে। বর্ডারের পুলিশটি অভিবাসী কাগজ সম্পর্কে বেশি কিছু জানতো না বলে হাসান বেঁচে গেছে, কিন্তু যদি কোন অভিজ্ঞ পুলিশের পাল্লায় পড়তো, তবে হাসানকে অবশ্যই ফ্রান্সে ফেরত পাঠাত; আর এখন যদি সে ধরা পড়ে তবে তাকে আবার ইতালি পাঠিয়ে দেবে এত কষ্টের যাত্রা তখন বিফলে যাবে। তাই এ যাত্রায় যখন সে বেঁচে গেছে, তখন সাবধান থাকা ভালো।

ক্ষুধা পেয়েছে প্রচুর, সারাদিনের খাবার বলতে শুধু একটা বার্গার; বাকী সব অখাদ্য, যেমন কফি, সিগারেট ও বিয়ার। অবশ্য এগুলো সব হাসানের একাকীত্বের সঙ্গী, এগুলো না থাকলে হাসান দম বন্ধ হয়ে মারা যেতো। হাতে প্রচুর সময়, স্টেশন থেকে বেরিয়ে শহরের প্রধান চত্তরের ম্যাকডোনাল্ডস্ এর দোকানে ঢোকে হাসান। একজন শ্রীলঙ্কান যুবক ক্যাশ কাউন্টারে দাঁড়িয়ে অর্ডার নিচ্ছে; একটা ডবল বার্গার ও এক গ্লাস কোক নিয়ে, এক কোঁণে বসে আরাম করে খাওয়া শুরু করে সে। যেহেতু হাতে অফুরন্ত সময়, কোন তাড়া নেই, তাই আস্তে-ধীরে খেতে থাকে। আশেপাশে একটা ডিস্কোটেক খোলা পেলে ব্যাপারটা মন্দ হতো না, চমৎকার সময় কাটানো যেতো, মনে মনে ভাবে আর বার্গারে কামড় দেয় হাসান। খাওয়া শেষ করে কাউন্টারে গিয়ে শ্রীলঙ্কান অর্ডার টেকারকে জিজ্ঞাসা করে, বন্ধু, আশেপাশে কোন ডিস্কো আছে?

কাছেই একটা আছে, কিন্তু আজ সাপ্তাহিক বন্ধ; তোমার দুর্ভাগ্য বন্ধু।

মনের দুঃখে টেবিলে ফিরে এসে কোক পান করতে থাকে হাসান। হয়ত শ্রীলংকান হাসানের সমস্যা বুঝতে পারে; যেহেতু সে-ও এক সময় হাসানের মতো ছিল। ভিড় একটু কমলে সে হাসানের কাছে এসে বলে, আমরা রাত বারটা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখবো, তুমি চাইলে সে পর্যন্ত বসতে পারো।

ধন্যবাদ।

হাসানের কাছে অনেকগুলো ফরাসি কয়েন ছিল, যেটা এখন আর তার প্রয়োজন নাই; বরঙ কাছে থাকাটাই বিপদজনক। কারণ, এই কয়েনগুলো প্রমাণ করে সে সম্প্রতি ফ্রান্স থেকে এসেছে; বন্ধুত্বর নিদর্শন স্বরূপ হাসান কয়েনগুলো শ্রীলঙ্কান যুবককে উপহার দেয়।

বিনিময়ে শ্রীলঙ্কান বন্ধুটি হাসানকে আর এক গ্লাস কোক অফার করে।

ম্যাকডোনাল্ডস্ থেকে বেরিয়ে কিছুক্ষণ চত্তরে হাঁটাহাঁটি করে স্টেশনে ঢুকে এরফুর্তের টিকিট কেটে একটা বেঞ্চে বসে হাসান। শহরের অনেক ভবঘুরে সারাদিন শহরে ঘোরাঘুরি করে রাতে স্টেশনে আশ্রয় নেয়, তাই রাতে পুলিশ নিয়মিত টহল দেয় স্টেশনগুলোতে; হাসান এটা জানে বলেই মনে মনে একটা নিরাপদ জায়গা খুঁজছে, যাতে ট্রেনটা প্লাটফর্মে না আসা পর্যন্ত সময়টা কাটিয়ে দেওয়া যায়। তিন নাম্বার প্লাটফর্ম থেকে ট্রেন ছাড়বে, কিন্ত প্লাটফর্ম এখনো খালি। সে খেয়াল করে স্টেশনের এক কোণে ক্রুশচিহ্ন আঁকা একটা ঘরে গির্জার ব্রাদারদের পোষাক পরিহিত একজন যুবক বসে আছে। হাসান বুঝতে পারে এটা অবশ্যই কোন দাতব্য প্রতিষ্ঠান হবে। সে এগিয়ে গিয়ে সম্ভাষণ জানায়, গুটেন মর্গেন (শুভ সকাল)।

গুটেন মর্গেন। ব্রাদার উত্তর দেয় এবং জানতে চায়, হাসান ক্ষুধার্ত কি না? এবং সে বার্গার ও গরম কফি পান করতে চায় কি না?

আমি কি ভিতরে বসে তোমার সাথে কিছু সময় কাটাতে পারি?

অবশ্যই।

ব্রাদার হাসানকে ভিতরে আসার জন্য অনুরোধ করে; হাফ ছেড়ে বাঁচে হাসান; আর এটা হচ্ছে গরীব এবং অসহায় মানুষকে সাহায্য করার জার্মান স্টাইল গভীর রাতে গরম বার্গার ও গরম কফি, বিনামূল্যে!

কফি পান করতে করতে দু’জনে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গল্প করে, কিন্তু তার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে ধর্ম। ব্রাদার বাইবেল থেকে কিছু পাঠ করে শোনায়; মন দিয়ে শোনে হাসান, তারপর বলে, শুনতে বেশ ভালোই লাগে, কিন্তু কী জানো গত দুই হাজার বছর যাবত তোমরা এতবার বাইবেলের পরিবর্তন ঘটিয়েছ যে, ওটা এখন শিশুতোষ বই ছাড়া আর কিছু নয়। যীশুর সবচেয়ে বিশ্বস্ত চারজন শিষ্যের (মার্ক, ম্যাথু, লুক ও জন) গসপেল পড়লেই বোঝা যায়; কিন্তু তোমরা সেটা স্বীকার করো না। বরঙ বিশাল জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন দ্বারা এটাকে লুকিয়ে রাখতে চাও; ব্রাদার অবাক হয়ে হাসানের দিকে তাকিয়ে থাকে। ইতিমধ্যে প্লাটফর্মে ট্রেন চলে এসেছে, পথে খাবার জন্য কয়েকটা বার্গার প্যাকেট করে দেয় ব্রাদার; তারপর আন্তরিক শুভ কামনা জানিয়ে হাসানকে বিদায় জানায়।

বিকালে এরফুর্তে পৌছে সবাই কে পেয়ে আস্বস্ত হয় হাসান। বাট অনেক আগেই কাগজ জমা দিয়ে চলে এসেছে। অতএব আবার তারা একসাথে কাজ শুরু করে দেয়। বাট কাগজ জমা দিয়েছে পাদোভা নামক এক শহরে, ওখানে তার এক আত্মীয় থাকে, সে সব ব্যাবস্থা করে দিয়েছে। তারা প্রতিদিন মার্কেটে কাজ করে, আর চাতক পাখির মতো ইতালির দিকে চেয়ে থাকে; কবে হাতে পাবে আকাঙ্খিত সেই পারমেসস্ োদি সোজর্ন! হাসানের প্রতীক্ষার প্রহর শেষ হতে চায় না, অথচ ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে থাকে তার অলক্ষ্যে। হাসান একদিন খান সাহেবের শালা আলীর সাথে হোফ নামক এক শহরে যায় দোকান লাগাতে; একটা উৎসব উপলক্ষ্যে মেলা বসেছিল সেখানে। কোন স্হান খালি না থাকায়, দোকান লাগাবার অনুমতি পায় না তারা, তাই বাধ্য হয়ে ফিরে আসতে হয়। কিন্তু ফেরার সময় গাড়ি যখন হাইওয়েতে উঠবে ঠিক তখন পুলিশ গাড়ি থামানোর সিগনাল দেয়। আলী গাড়ি থামায়; তার কাছে জার্মানের ডকুমেন্ট থাকায় পুলিশ তাকে ছেড়ে দেয়, কিন্তু হাসানকে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে গিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা শুরু করে; যেহেতু তার কাছে পাওয়া গেছে ইতালির ডকুমেন্ট। তন্নতন্ন করে হাসানের শরীর এবং জামা-কাপড় চেক করে পুলিশ যা পায়, তা হচ্ছে, তিন হাজার জার্মান মার্ক, এক হাজার ইতালিয়ান মিলা লিরা এবং তার মায়ের পাসপোর্ট সাইজের এক কপি সাদা-কালো ছবি!

পুলিশ আসলে জানতে চায়, হাসান কী কারণে জার্মানে এসেছে? তারা হাসানকে বড় কোন ক্রিমিনাল (অস্ত্র অথবা মাদক চোরাকারবারী) হিসাবে ভাবতে শুরু করেছিল, কিন্তু পকেটে মায়ের ছবি দেখে তারা স্বাভাবিক আচরণ করে তার সাথে, তবু নিয়তির নিষ্ঠুর রসিকতায় হাসান হাসবে না কাঁদবে তা বুঝে উঠতে পারে না; সে না ঘাবড়িয়ে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে। তার দুশ্চিন্তা অন্য এক জায়গায়; সে এখন এখানে ইতালির কাগজ নিয়ে ধরা পড়েছে, কিন্তু সে তো ভিন্ন নাম ব্যবহার করে গত দুই বছর জার্মানে ছিল, এবং জার্মান সরকারের নির্দেশনা উপেক্ষা করে সে ইতালি গিয়েছিল। পুলিশ যদি এই সত্যতা খুঁজে বাহির করতে পারে, তবে হয়ত পরিচয় জালিয়াতির অপরাধে এখান থেকেই হাসানকে জোরপূর্বক দেশে পাঠিয়ে দিতে পারে; তখন সোনালী স্বপ্নের সমাপ্তি হবে অপ্রত্যাশিত ভাবে এই হোফ শহরে, যেটা সে কল্পনাও করেনি। যদিও ভিতরে ভিতরে হাসান বিচলিত, কিন্তু আত্মবিশ্বাসের সাথে পুলিশের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে থাকে। পুলিশ জানতে চায় সে জার্মান ভাষা কোথায় শিখেছে; অর্থাৎ জার্মান ভাষায় কথা বলছে কীভাবে? হাসান বুঝিয়ে দেয়, সে ইতালির সুদ টিরোলে থাকে; আর সেখানকার স্হানীয় ভাষা জার্মান। পুলিশ ও এটা জানে, তাই এযাত্রায় বেঁচে গেলো সে। ব্রিক্সেন পুলিশের সাথে যোগাযোগ করে হোফ পুলিশ হাসানের হাতে একটি চিঠি ধরিয়ে দেয় এবং বলে, ব্রিক্সেন পুলিশ স্টেশনে এটা জমা দিতে হবে; তাহলে ব্রিক্সেন পুলিশ হাসানের ইতালি ফিরে আসাটা হোফ পুলিশকে নিশ্চিত করবে। এইসব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। হাসানের টাকায় টিকিট কেটে পুলিশ তাকে ট্রেনে উঠিয়ে দেয় এবং ট্রেন না ছাড়া পর্যন্ত প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকে। এখান থেকে প্রথমে মুনসেন (মিউনিখ), তারপর ট্রেন পাল্টিয়ে অন্য একটা ট্রেনে করে ইতালি। শত দুঃখের মাঝে সান্তনা একটাই, এখন আর পুলিশের ভয় নেই; তবু এক কাপড়ে ইতালি যেতে হচ্ছে বলে মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়।

হাসান খুব হতাশ। প্রথমত, জার্মানে আসার তিন মাসের মধ্যে ইতালি ফিরতে হচ্ছে বলে; দ্বিতীয়ত, ইতালি গিয়ে সে কী করবে; রোমে গিয়ে তো রাস্তায় রাস্তায় ফুল বিক্রি করতে পারবে না সে। কিন্তু কিছু তো একটা করতে হবে দেখা যাক,মামা কী বলে? একটা কামরায় এঁকা বসেছিল সে; মিউনিখ থেকে একজন ইতালিয়ান উঠে হাসানের মুখোমুখি বসে। হাসান ভাবে ভালোই হলো, গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে। ইতালিয়ান ভদ্রলোকের নাম লুকা, মিউনিখের একটা রেস্টুরেন্টে পিজ্জা সেফ হিসাবে কাজ করেন; বাড়ি নাপলি (নেপলস্)। হাসানের গল্প শুনে তাকে সান্তনা দিয়ে লুকা বলে, ‘দেখো, এক সময় সমস্ত ইউরোপ রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল; অথচ আমরা এখন ইউরোপের অন্য দেশে, এমন কী আমেরিকাতে তোমাদের মতো অভিবাসী হিসাবে কাজ করতে যাই, তাই তোমাদের দুঃখ আমরা বুঝি।’

লুকার সান্তনায় মনের দুঃখ কিছুটা লাঘব হয় এবং গল্পে মেতে ওঠে তারা দু’জনে। লুকা বলে, দেশ হিসাবে জার্মানি এতো সমৃদ্ধ কেন জানো? কারণ, ওরা শিশুকাল থেকে বাচ্চাদের শিক্ষা দেয়, স্কুলে কিছু পেলে যেন সেটা বাড়ি না নিয়ে এসে, ক্লাস টিচার কে জমা দেয়। আর আমরা শিক্ষা দেই, কিছু পেলে সেটা যেন ফেরত না দেয়; এটাই জার্মানদের সাথে আমাদের পার্থক্য।

লুকার কথা শুনে হাসান হাসে। লুকা বলে, এখানে হাসির কিছু নেই। এটাই বাস্তবতা। হাসান তার একটা অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে লুকার সাথে (একবার এক ট্রেন স্টেশনে ঢোকার মুখে কয়েকজন নাৎসিকে আড্ডা মারতে দেখে, তাদের সামনে দিয়ে ট্রেনে না উঠে পিছন দিয়ে ট্রেনে ওঠে হাসান। কিছুক্ষণ পরে একজন রেলওয়ে পুলিশ এসে তাকে বলে, তুমি রেলওয়ে আইন ভঙ্গ করেছো, নিয়ম অনুযায়ী তোমার জরিমানা ত্রিশ মার্ক।

আমি তো নাৎসিদের ভয়ে ট্রেন লাইনের উপর দিয়ে এসেছি।

তবুও তোমাকে জরিমানা দিতে হবে।

আচ্ছা, ত্রিশ মার্ক সরকারকে দিয়ে তোমার কী লাভ? তারচাইতে দশ মার্ক নিয়ে তুমি কফি খাও; এতে তোমারও লাভ, আমারও লাভ।

তুমি কি জার্মানি নষ্ট করতে এসেছো?

এখানে নষ্ট করার কী আছে? আমাদের দেশের পুলিশের কাছে তো এমন ব্যাপার খুবই সাধারণ।
জরিমানা নিয়ে পুলিশ চলে যায়; কিন্তু তার মুখের অভিব্যক্ত দেখে হাসানের মনে হয় এমন কথা সে আগে কখনো শোনেনি)। সব শোনার পর লুকা হাসতে হাসতে বলে, তুমি তো আমাদের মতোই সেয়ানা।

দু’জনে হাসতে থাকে। ভোরবেলা হাসান ব্রিক্সেন শহরে নেমে যায়।

সকাল সকাল কলিং বেলের আওয়াজ শুনে মামা দরজা খুলে হাসানকে দেখে অবাক হয়ে বলে, কিরে, হঠাৎ কী সমস্যা?

হাসান সব খুলে বলে; (আবার যদি সে অবৈধ ভাবে জার্মানে যায় এবং ধরা পড়ে, তবে তাকে সরাসরি দেশে পাঠিয়ে দেবে) পুলিশের এই সতর্কবাণী ও বলতে ভোলে না। অতএব, জার্মানে আর যাওয়া যাবে না। সব শুনে মামা বলে, আপাতত রেস্ট নে, দেখি কী করা যায়!

সন্ধ্যায় মামার বন্ধু ইসলাম মামা আসে। ইসলাম মামা বলে, রোমের খুব কাছে ছোট একটা শহর আছে, নাম লিদো দি অস্টিয়া; সমুদ্র বেষ্টিত খুব সুন্দর নিরিবিলি শহর। সাগর সৈকতের কারণে সারা বছর প্রচুর টুরিস্ট যায় সেখানে; আর গ্রীষ্মের সময় তো পা ফেলার জায়গা থাকে না। ওখানে ছোট-খাট অনেক ব্যবসা করা যায়, চাইলে কাজ ও পাওয়া তেমন সমস্যা নয়। মামার এক বন্ধু অনেক বছর ধরে সেখানে থাকে, নিজের বাসা আছে। উনি বাংলাদেশী, বাড়ি নোয়াখালী; উনার বাসায় যারা থাকে সবাই বাংলাদেশী, তাই হাসানের কোন অসুবিধা হবে না।

রবি মামা বলে, কিরে, গিয়ে দেখবি নাকি একবার?

যদি ভালো লাগে থাকবি, না হয় চলে আসিস।

ঠিক আছে মামা। হাসান উত্তর দেয়।

ইসলাম মামা তার বন্ধুকে ফোন করে; হাসান রোমে যাবার প্রস্তুতি নেয়। মানুষকে তার নিয়তি নির্দিষ্ট গন্তব্যে যেতেই হবে; সে না যাবার যতো চেষ্টাই করুক না কেন। হাসান জানে না, রোম তাকে ডাকছে দু’হাত বাড়িয়ে; আর তার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে স্বপ্নের রোমান সুন্দরী। তাই অনিচ্ছা সত্বেও রোমের ট্রেনে উঠে বসে একদিন; আরও একবার সে অনুভব করে All Roads Lead to Rome.

নয়
গ্রীষ্মের সময় বার এবং রেস্টুরেন্টগুলো তাদের দোকানের সামনের ফাঁকা জায়গা ও ফুটপাথে টেবিল-চেয়ার সাজিয়ে রাখে, যাতে কাস্টোমাররা খোলা আকাশের নিচে বসে সময় উপভোগ করতে পারে। বার আমিগোস এমনই একটা বার। সামনে বারের আঙ্গিনা এবং ফুটপাথ মিলিয়ে একটা খোলামেলা জায়গায় গ্রীষ্মের সমস্তটা সময় জুড়ে চার-পাঁচটা টেবিল সাজিয়ে রাখে বার কর্তৃপক্ষ। রাস্তার বিপরীতে একটি শিশুপার্ক এবং সুন্দর একটি ঝরনা ঘিরে থিয়েটার স্টাইলে লোহার ফ্রেমের উপর কাঠের পাটাতন লাগানো বেঞ্চ। শিশুদের কোলাহল, আর ঝরনার ঝিরিঝিরি শব্দ মিলিয়ে বিকালগুলোতে পার্কটার পরিবেশ ভীষণ মনোরম হয়ে ওঠে। সবকিছু মিলিয়ে লিদো দি অস্টিয়াতে বার আমিগোস খুব জনপ্রিয় ও পরিচিত বার। হাসানের বাসা এই বারের কাছে, হেঁটে গেলে সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিটের পথ। তাই অবসর পেলেই হাসান এই বারে বসে সময় কাটায়। এখানে যারা কাজ করে হাসান তাদের পরিচিত মুখ; এক কথায় বলা যায় হাসান এই বারের নিয়মিত কাস্টোমার।

বার আমিগোসের একটা টেবিলে বসে বিয়ার পান করছে, আর আনমনে পার্কে বাচ্চাদের ছোটাছুটি দেখছে হাসান। এখন সন্ধ্যা সাতটা, কিন্তু সামার বলে সূর্যের আলো এখনো স্পষ্ট। বিকালে বাসা থেকে বাহির হবার সময় একটা পাতলা চামড়ার সামার জ্যাকেট নিয়ে এসেছে; বাসায় ফিরতে ফিরতে কতো রাত হবে তার তো কোন ঠিক নেই। গ্রীষ্মকাল হলেও ইউরোপে রাতে হালকা ঠাণ্ডা পড়ে, তাই রাতে ঘোরাঘুরি করার জন্য সবাই সামার জ্যাকেট নিয়ে বের হয়। এই সময় ঠাণ্ডা বিয়ার পান করতে খুব ভালো লাগে। বিয়ারে একটা চুমুক দিয়ে হাসান ভাবে, দেখতে দেখতে কীভাবে দিন চলে যায়! এখানে এই লিদো দি অস্টিয়াতে এসেছে প্রায় তিন বছর হতে চললো; অথচ মনে হয় যেন গতকাল। এখানে আসার প্রথম দিনেই হাসান সাগর দেখতে গিয়েছিল। সেটা ছিল হাসানের জীবনের প্রথম সাগর দর্শণ ভূমধ্যসাগর। যদিও বাংলাদেশও সাগর বেস্টিত, তবুও দেশে থাকতে সাগর দেখতে যাওয়া হয়নি কখনো। সান্দ্রা (বার ওয়েটার) এসে জিজ্ঞাসা করে, হাসান, কিছু লাগবে?
কিছু বাদাম দিতে পার।

আর একটা বিয়ার দেই?

এটাতো আগে শেষ করতে দাও, তা ছাড়া তুমি খুব ব্যস্ত নাকি আজ?

হাসানের তির্যক কথা শুনে একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বাদামের বাটিটা নিয়ে সান্দ্রা বারের ভিতরে চলে যায়।

এখানে আসার পর প্রথম এক সপ্তাহ হাসান শহরটা ঘুরে ঘুরে খেয়াল করে তার মতো অবৈধ অভিবাসীরা কে কী করছে, কী ব্যবসা করছে? আর ভাবতে থাকে সে কী করবে। শহরের কেন্দ্রে কংক্রিটের একটা ব্রিজ আছে, সাগরের গভীরে প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রতিদিন বিকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রচুর মানুষ এখানে ঘুরতে আসে। এই ব্রিজটা এই শহরের প্রধান দর্শণিয় স্হান; আর এই ব্রিজকে কেন্দ্র করে অবৈধ অভিবাসীরা নানান রকম জিনিস বিক্রি করে এবং সবার ব্যবসাই বেশ ভালো। হাসান খেয়াল করে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় বিভিন্ন ধরণের অবৈধ সিডি (মিউজিক, হলিউডের ফিল্ম ও প্লে স্টেশন)। এই সিডিগুলো হট কেকের মতো বিক্রি হয়; কিন্তু এ ব্যবসা আবার খুব ঝুঁকিপূর্ণ। যেহেতু এগুলো কপিরাইট বিহীন (অরিজিনাল সিডির কপি করা), তাই গুয়ার্দা দি ফিনান্স (ফিনান্স পুলিশ) হঠাৎ হঠাৎ এসে ব্লক রেড দিয়ে মালামাল তো নেয়-ই, সাথে বিক্রেতাকেও ধরে নিয়ে যায়। ফলে দু’এক রাত তো জেল খাটতেই হয়, বোনাস হিসাবে থাকে বিশাল অংকের জরিমানা (জরিমানার টাকা কারো পক্ষে পরিশোধ করা সম্ভব নয় এবং কেউ করেও না)। কিন্তু অর্থনীতির সূত্র অনুযায়ী যে ব্যবসায় ঝুঁকি যত বেশি, তাতে লাভও ততো বেশি। অধিকাংশ পাকিস্তানি, মরক্কী, সেনেগালী সিডির ব্যবসা করে, বাঙালীরা সাধারণত ভয়ে এই ব্যবসা করে না, হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া। হাসান ঠিক করে সে এই অবৈধ সিডির ব্যবসাই করবে। হাসান যে বাসায় থাকে সেখানকার সবাই হাসানকে সাবধান করে ও ভয় দেখায়, ধরা পড়লে তাকে দেশেও পাঠিয়ে দিতে পারে। হাসান বলে, যদি অন্যদের না পাঠায়, তবে শুধু আমাকে কেন পাঠাবে? শুরু হয় হাসানের সিডির ব্যবসা; রুটি-রুজির ব্যাপারে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।

কিছুদিন খুচরা ব্যাবসা করার পরে এক নাপলিয়ান মাফিয়ার হাত ধরে পাইকারী ব্যবসা শুরু করে হাসান। এটাকে ব্যবসার তুলনায় কমিশন এজেন্ট বলাই সংগত। কারণ, এখানে হাসানকে কোন অর্থ বিনিয়োগ করতে হয় না; শুধু বিক্রিত সিডির একটা কমিশন পায় সে। পাইকারী হিসাবে প্রতিটা সিডি বিক্রি হয় তিন ইউরো (হাসান পায় এক ইউরো, বাকীটা আন্দ্রেয়ার); খুচরা ব্যবসায়ীরা প্রতিটি সিডি বিক্রি করে পাঁচ ইউরো হিসাবে। আগে আন্দ্রেয়া যেটা করতো, এখন তার হয়ে সেটা হাসান করে; এটাতে দু’জনারই লাভ। নেপথ্যে চলে যায় আন্দ্রেয়া, আর হাসানের উপার্জন বেড়ে যায় প্রচুর পরিমানে। প্রতিদিন গড়ে পাঁচ শত সিডি বিক্রি করতে পারে হাসান; কোন কোন দিন এক হাজারও বিক্রি হয়ে যায়। একদিন সাহস করে হাসান এই পাইকারী ব্যবসার প্রস্তাব দেয় আন্দ্রেয়াকে।

আন্দ্রেয়া, তুমি যদি সাহায্য করো, তবে আমি পাইকারী ব্যবসা করতে চাই।

ভেবে দেখ, ব্যাপারটা তুমি যত সহজ ভাবছো, তা কিন্তু নয়।

জানি।

জ্যাকেটটা উঁচু করে কোমরের বেল্টের সাথে আটকানো অস্ত্রটা দেখিয়ে আন্দ্রেয়া আবার বলে, বেঈমানী করলে কী হবে বুঝতেই পারছো?

তোমার ঐ অস্ত্রের ব্যাপারে আমার কোন মাথাব্যাথা নেই; আর তাছাড়া আমি ব্যবসায়ী, বেঈমান নই।

হাসানের দৃঢতায় আশ্বস্ত হয় আন্দ্রেয়া। দু’একদিন পর পর হাসানের কাছে সিডির চালান পৌছে দেয় আন্দ্রেয়া; কয়েক দিনের মধ্যে সেগুলি বিক্রি করে মোটা অংকের ইউরো আন্দ্রেয়াকে বুঝিয়ে দেয় হাসান। এর মধ্যে দু’এক চালান ধরা পড়ে, দু’একদিন জেল খেটে আবার বেরিয়ে আসে হাসান; এবং লোকসান পুষিয়ে নিতে আরও বেশি সিডি বিক্রি করে সে। হাসানের সাহস ও বিশ্বস্ততায় মুগ্ধ আন্দ্রেয়া; এই ব্যবসায় হাসান এখন তার প্রধান সহযোগী। রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিডি বিক্রি অনেক আগেই বাদ দিয়েছে হাসান; এখন পকেট ভর্তি ইউরো নিয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে চলাফেরা করে সে। পয়সা উপার্জনে সে যেমন পাকা খেলোয়াড়, তেমনি খরচের ক্ষেত্রেও সাগরের মতো বিশাল হৃদয়ের অধিকারী সে। বন্ধুদের সাথে বারে কোন আড্ডায় বসলে বিল সাধারণত হাসান মিটিয়ে দেয়, অন্যদের দিতে দেয় না; মোটকথা নিজের মত করে জীবনকে উপভোগ করছে সে।

সান্দ্রা আর একটা বিয়ার নিয়ে আসে; মুখটা খুলে হাসানের সামনে রাখে। হাসান দাম মিটিয়ে দেয়। সান্দ্রা জানে হাসান কখনো খুচরা টাকা বা পয়সা ফেরত নেয় না, তাই হাসানকে একটা ধন্যবাদ দিয়ে সে চলে যায়। বিয়ারে একটা চুমুক দিয়ে, একটা সিগারেট ধরায় হাসান; আনমনে পার্কের শিশুদের ছোটাছুটির দিকে তাকিয়ে সিগারেট টানে সে। যদিও সে এখন বারে বসে আছে, কিন্তু আসলে সে এখানে নেই; এইসব কোলাহল, সামারের মিষ্টি রোদ, গ্লাসে সোনার বরণ তরল বিয়ারের মাদকতা মাড়িয়ে দূরে, অনেক দূরে চলে গেছে সে। জীবনের হিসাবটাকে সহজে মিলাতে গিয়ে এমন জটিল করে তুলেছে সে, এখন আর তা মেলার নয়। এখন যে আয়েশী ভঙ্গিতে বসে বিয়ার পান করছে সে, তা দেখে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না যে, কত বড় বিপদ ঝুলে আছে তার মাথার উপর। তার বিরুদ্ধে ভেরোনা ট্রাইবুনালে চলছে অবৈধ মানব পাচারের মামলা। এটা সেই ভেরোনা, যেখানে ইতালিতে প্রথম আসার পর মামার সাথে জুলিয়েটের বাড়ি দেখতে গিয়েছিল। এই মামলায় তার সহযোগী মিখাইল। হাসানই এই কাজে মিখাইলকে উদ্ভুদ্ধ করে, এখন তারা দু’জনেই বিপদে। এই ঘটনার পর মামা হাসানের উপর ভীষণ ক্ষেপে গিয়েছে; তাই ভয়ে হাসান মামার সাথে যোগাযোগ করা বন্ধ করে দিয়েছে। যদিও হাসানের ধারণা, এই কেস পুলিশ কখনই প্রমান করতে পারবে না; তাই তাদেরও কিছু হবে না। কিন্তু কেস তো চলতেছে। সবচেয়ে বড় কথা, ইতালিয়ান ক্রিমিনাল পুলিশের (কেরাবিনিয়েরি) খাতায় হাসানের নামে ফাইল চালু হয়েছে, যেটা আর কখনই বন্ধ হবে না। তবু হাসানের কাছে যেটা গর্বের, তা হলো, ভেরোনা ক্রিমিনাল পুলিশের মার্শাল তাকে বলেছেন, ‘তোমার মত ক্রিমিনাল আমি জীবনে দেখিনি। আমি জানি তুমি অপরাধী, কিন্তু প্রমান না থাকায় তোমাকে আমি ছাড়তে বাধ্য হলাম।’

এদিকে ভুয়া তথ্য দিয়ে গ্রিন কার্ড নবায়ন করতে যাওয়ার অপরাধে, তার বিরুদ্ধে আর একটি মামলা চলছে রোম ট্রাইবুনালে। তার গ্রিন কার্ড ও পাসপোর্ট আটকে রেখেছে। আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ, আদালতের অনুমতি ছাড়া সে ইতালি ছাড়তে পারবে না; অবশ্য সে যদি চিরদিনের জন্য যেতে চায়, সেটা আলাদা কথা। আসল ব্যাপার হচ্ছে, নিউইয়র্ক টুইন টাওয়ারে হামলার পর থেক ইউরোপ এবং আমেরিকার নিরাপত্তা ব্যাবস্থা অনেক কঠিন হয়ে গেছে; আগে যেনতেন কাগজ জমা দিয়ে গ্রিন কার্ড নবায়ন করা যেতো, কোন সমস্যা ছিল না। কিন্তু এখন সবকিছু নিখুঁত ভাবে তদন্ত করার পরই কেবল পুলিশ ছাড়পত্র দেয়। হাসানের ধারণা, মানব পাচারের মামলাতে তাকে কিছু করতে না পেরে হয়ত পুলিশ তার গ্রিন কার্ড আটকে রেখেছে; আর অবৈধ সিডি ব্যবসার অসংখ্য অভিযোগ তো আছেই। তার উকিল যদিও বলেছে তার কিছু হবে না, তবু আশংকার কালো মেঘ দূর হয় না হাসানের মন থেকে। বিয়ারে চুমুক দিয়ে হাসান হিসাব করে, যদি কোন একটি মামলায় তার সাজা হয়ও, কম করে হলেও পাঁচ বছর তো হবেই; কপাল খারাপ হলে ত্রিশ বছরও হতে পারে। এই কি ছিল তার নিয়তি? এই জন্য কি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এত পথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপে এসেছে সে। তার স্বপ্ন ছিল একটা পরিচ্ছন্ন জীবন, কিন্তু সে এখন রীতিমত একজন মাফিয়া।

হাসান সবচেয়ে অবাক হয় এটা ভেবে, যে জেল-জুলুম ও কোর্ট-কাছারি থেকে বাঁচতে এবং একটা পরিচ্ছন্ন জীবনের আশায় এক বুক স্বপ্ন নিয়ে ইউরোপে এসেছিল, সেটা তো হলোই না; বরঙ দেশের চাইতে আরও জটিল ভাবে ইউরোপের আইনের জালে জড়িয়ে গেছে সে; এর থেকে মুক্তি পাওয়া এক কথায় অসম্ভব। হাসান অনুভব করে কেউ একজন দূর থেকে তাকে অনুসরণ করে। তার মোবাইল ফোনে পুলিশের আঁড়ি পাতা আছে; এবং ভেরোনা ট্রাইবুনালের স্পষ্ট নির্দেশ, মোবাইল ফোন বন্ধ রাখা যাবে না; বন্ধ রাখলেই তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করা হবে। তাই সে বাধ্য হয়ে আর একটা মোবাইল ব্যবহার করে ব্যবসা ও যোগাযোগের জন্য। এই ভাবে চোর-পুলিশ খেলতে খেলতে হাসান ক্লান্ত; মাঝে মাঝে ভালোও লাগে, আবার সবকিছু ছেড়ে দেশে চলে যেতে ইচ্ছা করে। বিয়ার এবং মনের এই টানাপোড়েন এখন তার নিত্য সঙ্গী। তবুও তার সান্তনা একটাই, এই মাফিয়াদের দেশে সেও মাফিয়াদের মতো যথেষ্ট পরিমান ইজ্জত-সন্মান পায়। দ্বিতীয় বিয়ারও ইতিমধ্যে শেষ, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে, এখন রাত নয়টা; বীচের ব্রিজটির উপর থেকে একটা চক্কর মেরে আসা যেতে পারে। ফলে সাগর পাড়ে হাওয়া খাওয়াও হবে, আবার সবার ব্যবসার খোঁজ-খবরও নেওয়া যাবে; বিশেষ করে সিডির ব্যবসা। বার থেকে বেরিয়ে একটা সিগারেট টানতে টানতে ব্রিজের দিকে হাঁটতে থাকে হাসান।

প্রথমেই দেখা হয় সেনেগালের বন্ধু ওবুদুর সাথে। ব্রিজটির বিপরীত দিকের রাস্তায় একটা ম্যাকডোনাল্ডস্ আছে, তার সামনে দাঁড়িয়ে সিডি বিক্রি করে ওবুদু এবং সে প্রচুর বিক্রি করে সবসময়; সে হাসানের একজন ভালো কাস্টোমার। দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ওবুদুর সাথে গল্প করে এবং সামনের চালানে কোন কোন সিডি আনতে হবে তার একটা লিস্ট বানায় দু’জনে মিলে। এখন ইংলিস গায়িকা জেনিফার লোপেজ, শের, সেলেন দিওন ও ম্যাডোন এবং ইতালিয়ান শিল্পী ভাসকো রসি, পিয়েরে পেলু, রামাসত্তি, লাউরা পাউজিনির গান সুপার হিট, বিক্রিও হচ্ছে প্রচুর। বিশেষ করে শেরের দোভে লা আমোরে (কোথায় ভালোবাসা), ভাস্কো রসির সিয়ামো সলি (আমরা একা), এই গানের এলবাম প্রতিদিন হাজার কপির উপরে বিক্রি হচ্ছে। ঘন্টা খানেক ব্রিজটার উপরে ঘোরাঘুরি করে, সবার কাছ থেকে সিডির অর্ডার নিয়ে একটা ফাঁকা জায়গায় গিয়ে আন্দ্রেয়াকে রিং দেয় হাসান; চাহিদাগুলো আন্দ্রেয়াকে বুঝিয়ে দেয় সে। আন্দ্রেয়া বলে, সব মিলিয়ে পাঁচ হাজার কপি পাঠাই আগামীকাল? চলবে?

অসুবিধা নাই, চলে যাবে, কিন্তু যে সিডিগুলোর ডিমান্ড বেশি সেগুলোর কপি বেশি করে পাঠিও। তোমার জন্য বিশ হাজার ইউরো রেখেছি, আগামীকাল দেবো।

ব্রাভো, হাসান।

কাজের আলাপ শেষ করে কিছু খাবার জন্য ম্যাকডোনাল্ডসে ঢোকে হাসান। নিজে একটা বিফ বার্গার ও এক গ্লাস কোক খায়, আসার সময় একই রকম একটা পার্সেল ওবুদুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে আসে। ওবুদু ধন্যবাদ দেয়, আর হাসানের মাথায় ঘুরতে থাকে আগামীকালের চালানটা দু’একদিনের মধ্যে বিক্রি করে ফেলতে হবে; কারণ আগামী সপ্তাহে রোম ট্রাইবুনালে গ্রিন কার্ডের কেসের শুনানি। এইসব চিন্তা করতে করতে বাসার পথে পা বাড়ায় সে।

দশ
রোম ট্রাইবুনাল। রোম শহরের এক কোণে ছিমছাম পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন একটি ভবন। ভবনে ঢোকার মুখে মূল ফটকে বিশাল একটি বডি স্কানার বসানো। সবাইকে এই চেক পার হয়ে মূল ভবনে প্রবেশ করতে হয়। এটাকে বাংলাদেশে কোর্ট বিল্ডিং বলা হয়। এখানে কোন দেয়ালের কোণায় পান খেয়ে ফেলা লাল রঙ নাই, অথবা নাই কোন দেয়ালে চুন মোছার দাগ। দালাল, ভ্রাম্যমান পতিতা, হাজার রকমের হকার, অহেতুক ভীড়, অপ্রয়োজনীয় জটলা এই জাতীয় কোন কিছুই এখানে নাই; এমন কী অবাঞ্চিত একজন মানুষও এখানে নাই। মামলার বাদী-বিবাদী, উকিল, কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিচারক এবং বিচারের সাথে সম্পৃক্ত পুলিশ সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত।

প্রথম হাজিরার দিন দেশীয় আইন-আদালতের সাথে এখানকার এই পার্থক্য দেখে হাসান খুবই অবাক হয়েছিল। কিন্তু নিজস্ব বিচার-বিশ্লেষণ অনুযায়ী সে হিসাব করে সিদ্ধান্তে উপনিত হয় যে, এটাই স্বাভাবিক এবং এটাই হওয়া উচিত। বিগত দুই শত বছরের ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের ফলশ্রুতি আমাদের আইন-আদালত। বিশাল বিশাল লাল ভবনগুলোর ভিতরে সাধারণ মানুষ ঢুকলেই তাদের মাঝে একটা ভীতিকর অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে; ফলে সাধারণ মানুষ নিজেদের অসহায় ভাবতে শুরু করে। বিশাল এক উঁচ্চ আসনে আসীন বিচারক মহোদয়, আর কাঠগড়ায় বাদী-বিবাদী, অথবা সাক্ষী, যে-ই হোক না কেন করজোড়ে দাঁড়ান এই আমাদের পরিচিত আদালত। অথচ এখানে একই সমান্তরালে মুখোমুখি বিচারক ও বিচার প্রার্থী বসে থাকে; সবার মুখের সামনে মাইক্রোফোন; বিচারক মহোদয় পরিচালনা করছেন যাবতীয় কার্যক্রম, কে কখন ফ্লোর পাবে তিনি তা ঠিক করে দিচ্ছেন; সেই অনুযায়ী মাইক্রোফোন চালু হচ্ছে। এখানে কোন ভীতির পরিবেশ নাই; বরঙ ভয়ানক দুশ্চিন্তা সত্বেও এক ধরণের স্বস্তি অনুভব করে হাসান; এবং অনাড়ম্বর, কিন্তু খুবই কার্যকর একটা বিচার বিভাগের সাথে অনাকাঙ্খিত ভাবে সে পরিচিত হয়। এক সময় সমগ্র সভ্য সমাজের বিশাল একটা অংশ সরাসরি রোমান শাসনাধীন ছিল (এশিয়ার মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অংশ, ইউরোপ এবং ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী সমগ্র ইউরোপ ও আফ্রিকা এবং অবশ্যই ইংল্যান্ড), কিন্তু এখন রোম শহরে ইতালির পার্লামেন্ট ভবন খুঁজে বের করা সত্যি কঠিন। সেই তুলনায় কী বিশাল এক পার্লামেন্ট ভবন আমাদের গরীব দেশে; আর এই ভবনে যারা বসেন তাদের সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা না করাই শ্রেয়।

যে পুলিশ অফিসার হাসানের বিরুদ্ধে ভুয়া কাগজ-পত্র জমা দিয়ে গ্রিন কার্ড নবায়নের অভিযোগ এনেছে, তিনি হাসানকে বলেছিলেন, ‘কোন সমস্যা হবে না। এটা একটা সাধারণ অভিযোগ।’ কিন্তু আজ অভিযোগের বর্ণনা দেবার সময় হাসানের বিরুদ্ধে তার আগ্রাসী আচরণ দেখে হাসান ঘাবড়ে যায়। তার আত্মপক্ষ সমর্থন এবং তার উকিলের বক্তব্য শোনার পর বিচারক মহোদয় ছয় মাস পরে বিচারের পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেন। আদালত ভবন থেকে বেরিয়ে হাসান তার উকিলের কাছে জানতে চায়, এই মামলায় তার জেল হবার সম্ভাবনা আছে কিনা? উকিল তাকে আশ্বস্ত করে বলে, ‘কোন সমস্যা হবে না।’

তবু এক অজানা আশংকায় হাসানের মন খচখচ করতে থাকে।

আজ হাসানের মামলার সিরিয়াল তিন নাম্বারে থাকায় সব কাজ মিটিয়ে সে বিকালের মধ্যে বাসায় চলে আসে; ভীষণ ক্লান্ত থাকায় জামা-কাপড় না খুলেই সে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘন্টাখানেক ঘুমিয়ে ফ্রেশ হয়ে ফুরফরে মেজাজে বেরিয়ে পরে হাসান। বার আমিগোস্ েনিজের প্রিয় টেবিল খালি পেয়ে আরাম করে বসে হাসান। যথারীতি সান্দ্রা এসে অনুযোগের সুরে বলে, কী ব্যাপার হাসান, এতদিন আসোনি যে?

অনেক কাজ ছিল, ঝামেলাতে ছিলাম, তাই আসতে পারিনি।

সান্দ্রার সাথে হাসানের একটা আন্তরিকতার সম্পর্ক তৈরী হয়েছে, এখানে বসতে বসতে। সান্দ্রাকে সে মাঝে মাঝে সিডি উপহার দেয়। বেচারী সান্দ্রা, কতই বা বেতন পায়? খুব বেশি হলে প্রতিদিন পঞ্চাশ ইউরো; এক শিফটে কাজ করার জন্য। তুলনায় নিজের কথা ভাবে হাসন; সান্দ্রার তুলনায় অগাধ তার উপার্জন। যদিও সবই অবৈধ এবং কাল টাকা, কিন্তু তবুও তো টাকা। একটি ত্রামাজিনো (স্যান্ডউইচের মতো), এক বোতল পানি ও একটি কফি অর্ডার দেয় সে।

হাসান, আমাকে একটা সিডি দিতে পারবে?

কোনটা?

ভাস্কো রসির হোটেল স্টুপিডো (এ মাসে রিলিজ হয়েছে অ্যালবামটি। এর মধ্যে ‘সিয়ামো সলি’ গানটা প্রচুর জনপ্রীয়তা পেয়েছে; হাসানের ও ভালো লাগে গানটি)।

ঠিক আছে, কাল বা পরশু আবার যখন আসবো, তখন ওটা সহ আরও কয়েকটা নিয়ে আসবো তোমার জন্যে।
সান্দ্রা খুশী হয়ে হাসানের গালে একটা চুমু দিয়ে অর্ডারটা আনতে যায়।

উহ্‌, খুব ব্যাথা পেলাম সান্দ্রা!

পারাকুলো (ফাজিল)।

কফি শেষ করে হাসান একটা সিগারেট ধরিয়ে আয়েশ করে টানতে থাকে, আর সারা দিনের ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে ভাবতে থাকে আপন মনে। ইতিমধ্যে একটা বিয়ার দিয়ে যায় সান্দ্রা; কারণ সে জানে, হাসান বিয়ার পান করবেই। বিয়ারে চুমুক দিয়ে হাসান তার এলোমেলো হয়ে যাওয়া ভাবনাগুলো আবার একসূত্রে গাঁথার চেষ্টা করে। সে গভীর ভাবে খেয়াল করে দেখেছে, বিয়ারের প্রথম চুমুকের স্বাদ অতুলনীয়, তারপর সারারাত বিয়ার পান করলেও প্রথম চুমুকের টেস্ট আর পাওয়া যায় না; কেবল সিগারেটের শেষ টানের সাথে এর তুলনা চলে; এই দুটোর অভিজ্ঞতা অবর্ণনীয়। যদিও এটা একান্তই হাসানের ব্যক্তিগত অভিমত। বিয়ার পান করতে করতে সকালের সেই জেলে যাবার আশংকা আবার তাকে পেয়ে বসে।

জেলে যে হাসান যায়নি তা নয়। সামরিক স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় নেতৃত্ব দেবার কারণে সে জেল খেটেছে প্রায় দুই মাস। মনে পড়ে বিপ্লবী ছাত্র নেতা হিসাবে জেলখানায় একটা সন্মান পেত সে। ভৈরব নদীর পাড়ে খুলনা জেলা কারাগার; আর তার পশ্চিম দিকে, রাস্তার বিপরীতে খুলনা জেলা হসপিটাল। জেলে বসে হাসান এই হসপিটালের অসুস্হ মানুষগুলোর প্রতি এক ধরণের সহানুভূতি অনুভব করতো। সে ভাবতো, জেলে বন্দি থাকলেও সে তো সুস্হ; অথচ হাসপাতালের বিছানায় অসুস্হ মানুষগুলো এখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে! কিন্তু নিয়তির পরিহাস হচ্ছে, জেলে যাবার মাসখানেক আগে বুকে ব্যাথা নিয়ে হাসান হসপিটালে ভর্তি হয়; এবং পনেরো দিন হাসপাতালে কাটাতে হয় তাকে। তখন অসহায় মানুষগুলোর চাঁপা কান্না, আর ধুকে ধুকে মৃত্যু দেখেছে হাসান। সন্ধ্যায় হসপিটালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে জেলখানার দিকে তাকিয়ে সে ভাবতো আহা, আমি অসুস্হ হলেও তো স্বাধীন, কিন্তু জেলখানার মানুষগুলো সুস্হ হলেও কত পরাধীন; ইচ্ছা হলেও কোথাও যাবার উপায় নেই তাদের; শুধু জানালার গরাদ ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া অন্য কোন গতান্তর নাই। অথচ তখন সে কল্পনাও করেনি, কিছু দিনের মধ্যে জেলখানার গারদ ধরে দাঁড়িয়ে ঠিক এই ভাবে হসপিটালের মানুষগুলোকে নিয়ে হাহুতাশ করতে হবে! এই হাসপাতালে খুব কাছ থেকে জীবনে প্রথম মৃত্যু দেখেছিল হাসান। সে হসপিটালে আসার দুইদিন পরে তার পাশের বেডে একটা ছেলে আসে, তার সমবয়সী হবে হয়ত; ছেলেটার পেট ফোলা ছিল। ছেলেটির মায়ের কাছ থেকে হাসান জানতে পারে ছেলেটির জন্ডিস হয়েছে। ছেলেটি ঘুমাতো না, সারারাত মাগো মাগো বলে বিলাপ করতো। তাই হাসানেরও রাতে ভালো ঘুম হতো না। হসপিটালে আসার তিনদিন পরে এমনই বিলাপ করতে করতে ভোর রাতে ছেলেটি মারা যায়; হাসান তাকিয়ে ছিল তার মুখের দিকে; হাসানের সামনেই মারা যায় সে। তার কষ্টে ভরা মুখখানি হাসান জীবনেও ভুলতে পারবে না। ছেলেটি মারা যাবার পর তার আত্মীয়-স্বজনেরা তার বিছানায় আগরবাতি জ্বালিয়ে দেয়; হাসান চোখ বন্ধ করে আগরবাতির পবিত্র গন্ধ অনুভব করে, আর ভাবে, এটা বুঝি তারই মৃত্যু উপলক্ষে জ্বালিয়ে রাখা শোক। এই ভাবে ছেলেটির লাশ না নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত হাসান ছেলেটির পাশে শুয়ে ছিল আর একটা লাশ হয়ে।

বন সিয়েরা (শুভ সন্ধ্যা)।

মেয়েলি সম্ভাষণ শুনে হাসান খুলনা হসপিটাল থেকে ফিরে আসে নিজের মধ্যে, বার আমিগোস্।ে কবি কালিদাসের নায়িকা যক্ষপ্রিয়ার মতো ভরাট বুকের এক রোমান সুন্দরী হাসানের দিকে হাত বাড়িয়ে উত্তরের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।

বন সিয়েরা। হাসান হাত বাড়িয়ে দেয় এবং সৌজন্য সহকারে চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বসার জন্য অনুরোধ করে।

ছোনো ভ্যালেন্তিনা (আমি ভ্যালেন্তিনা)।

ছোনো হাসান।

মি অফরি উনা বিইররা (আমাকে কি একটা বিয়ার অফার করবে?)।

পের পিয়াশেরে (এটা করতে পারলে খুশী হবো)। হাসান সান্দ্রার দিকে হাতের ইশারা করে। সান্দ্রা আর একটি বিয়ার ও গ্লাস নিয়ে আসে।

চাও, ভ্যালেন্তিনা।

চাও, সান্দ্রা।

সান্দ্রা চলে গেলে গ্লাসে বিয়ার ঢেলে হাসান ভ্যালেন্তিনার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, প্রেগো (দয়া করে)।

বিয়ারে চুমুক দিয়ে ভ্যালেন্তিনা বলে, গ্রাচ্চে, হাসান (ধন্যবাদ, হাসান)।

তুমি কি সান্দ্রাকে চেনো?

হ্যাঁ, ও আমার বান্ধবী।

ও, আচ্ছা।

মায়াবী সন্ধ্যায় মায়াবী আলোর নিচে দু’জনে মুখোমুখি বসে বিয়ার পান করতে থাকে। এমন সুন্দর সন্ধ্যা হাসানের জীবনে আগে আসেনি; এই বিয়ারের মতো মধুর স্বাদ আগে কোন বিয়ারে পায়নি সে। হালকা লাল লিপিস্টিক লাগানো ঠোঁটের ফাকে ভ্যালেন্তিনার মুক্তার মতো সাদা দাঁত ঝিলিক মারছে, এক কথায় সুন্দরী বলতে যা বোঝায়, ভ্যালেন্তিনা তাই; মনে হয় রোমান্টিক বিধাতা সময় নিয়ে, যত্নসহকারে তাকে গড়েছেন। গৌর বর্ণের মাঝে ভ্যালেন্তিনার কালো চুল ও চোখের কালো তারা হাসানকে টানছে কৃষ্ণগহ্বরের মতো; কালো রঙ যে এতো অদ্ভুত সুন্দর তা হাসান আগে কখনও এভাবে খেয়াল করেনি এ যেন গ্রীক গডেস আফ্রোদিতি। কালো স্কার্টের উপরে বডি টাইট টি শার্ট, কাঁধে ঝোলানো পাতলা একটা কালো পুলোভারে ভালেন্তিনাকে বর্ণনা করার ভাষা হাসানের নেই। চুলগুলো একটা গার্ডারে টাইট করে বাঁধা, ঠিক অ্যাথলিটদের মতো। একগোছা চুল ভ্যালেন্তিনার শৃঙ্খল ছিন্ন করে মুখের উপরে ঝুলছে। বয়স কতো হতে পারে ভ্যালেন্তিনার? পঁচিশ? মনে মনে হিসাব করে হাসান; তবে যাই হোক; হাসানের মনে হলো ভ্যালেন্তিনার বুকের দিকে তাকিয়ে একটা যৌবন পার করে দেওয়া যায়। একদিকে মদিরা, অন্যদিকে যুবতী কন্যার যৌবনের রঙ , হাসানের মাথা এলোমেলো হয়ে যেতে চায়; মনের গভীর থেকে কেউ একজন বলে ওঠে, ‘হাসান, পালিয়ে যেওনা, এটাই তোমার সময়; সময়কে উপভোগ করো।’

কোথা থেকে এসেছো?

বাংলাদেশ।

কোথায় থাকো?

ভিয়া লরেঞ্জো কুস্সানো ভিসকনতি। এসমা মার্কেটের সামনের রাস্তায়।

ও তাই, আমার বাসা এসমা মার্কেটের পিছনের রাস্তায়। আমরা এতো কাছে থাকি, কিন্তু আগে তো আমাদের দেখা হয়নি।

হয়ত আজ দেখা হবে তাই।

তুমি তো চমৎকার কথা বলো, হাসান।

ধন্যবাদ।

তোমার বান্ধবী নাই।

না।

আমার কিন্তু একটা মেয়ে আছে, বয়স আট মাস।

কী নাম ওর?

অ্যালেনা।

আর ওর বাবা?

আমার বন্ধু ছিল, নাম মৌরিচ্ছিও। অ্যালেনা পেটে আসার পর ও আমাকে ছেড়ে চলে যায়।

ও আচ্ছা (হাসান আর গভীরে যেতে চায় না, অনধিকার চর্চা হতে পারে এই ভয়ে; নিঃশব্দে বিয়ারে চুমুক দেয় সে)।

তুমি কি প্রায় এখানে আসো?

কাজ না থাকলে আসি।

হাসান সিগারেট ধরায়। প্যাকেটটি ভ্যালেন্তিনার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে অনুরোধ করে চাইলে ধরাতে পারো।

বাবা, মার্লবোরো রোসো (লাল মার্লবোরো)। সবচেয়ে কড়া সিগারেট।

ভ্যালেন্তিনাও একটা সিগারেট ধরায়।

ইতিমধ্যে দু’জনার বিয়ার শেষ হয়েছে; সান্দ্রা খালি বোতল নিয়ে টেবিল পরিস্কার করে দিয়ে গেছে। ভ্যালেন্তিনার কাছে হাসান জানতে চায়, আমরা কি আর একটা করে বিয়ার পান করতে পারি?

আমার কোন সমস্যা নাই, ধন্যবাদ।

হাসান উঠে বারের ভিতরে যায়। তার ইচ্ছা সান্দ্রাকে আরও দুইটা বিয়ার অর্ডার দিয়ে, ফ্রেশ রুম থেকে একটু ফ্রেশ হয়ে আসবে। সান্দ্রা হাসানকে বলে, আজকের সন্ধ্যাটা খুব সুন্দর, হাসান?

হাসান হাসে, সাথে সান্দ্রাও।

ওয়াশ রুম থেকে ফিরে হাসান দেখে সান্দ্রা বিয়ার দিয়ে গেছে; ভ্যালেন্তিনা চুপচাপ বসে আছে। হাসান দু’জনার গ্লাস পূর্ণ করে একটি ভ্যালেন্তিনার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, প্রেগো।

গ্রাচ্চে, হাসান। আমি প্রতিদিন বিকালে অ্যালেনাকে নিয়ে এই পার্কে ঘুরতে আসি। তুমি চাইলে কাল বিকালে আসতে পারো। অ্যালেনার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো।

ঠিক আছে, কাল বিকালে আমি অ্যালেনাকে দেখতে আসবো।

সত্যি তুমি আসবে?

অবশ্যই, ভ্যালেন্তিনা। আমি যখন কথা দিয়েছি, তখন আসবই।

ধন্যবাদ, হাসান। আমি তোমার অপেক্ষায় থাকবো।

নিয়তির নাটকীয়তায় হাসান কিংকর্তব্যবিমূঢ; কী করবে, কী বলবে কিছু বুঝতে পারে না; মুখে কোন ভাষা নেই, নীরবে বিয়ারে চুমুক দেয়, আর সিগারেট ধরায়।

তুমি কি সিগারেট ধরাবে?

আমি কি তোমার হাতটা আর একবার স্পর্শ করতে পারি?

হাসানের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে অপেক্ষা করে ভ্যালেন্তিনা। হাসান খেয়াল করে ভ্যালেন্তিনার চোখের কোণে টলমল করছে স্বচ্ছ জল; এখনই বুঝি বৃষ্টি নামবে। অবাক হয়ে সে ভাবে, কিন্তু কী কারণে এই চোখের জল তা বুঝতে পারে না। এটা কি ফেলে আসা মৌরিচ্ছিও, নাকি সামনে বসে থাকা হাসান? নাকি অ্যালেনার প্রতি হাসানের মমত্ববোধ? তবে যাই হোক, ইউরোপের আবহাওয়া এবং যুবতীর মন, এই দুইটা জিনিস খুবই রহস্যময়; তাই কোন অনুমান কোন কাজে আসে না। হাসান কোন কথা না বাড়িয়ে হাতটা ভ্যালেন্তিনার দিকে এগিয়ে দেয়।

ভ্যালেন্তিনার সুন্দর ফর্সা হাতের ভিতর তার তামাটে হাতটা খুব বেমানান মনে হয় হাসানের কাছে। মনে হয় এটা যেন বিউটি এন্ড দা বিস্ট গল্পের কোন আধুনিক সংস্করণ। অথচ ভ্যালেন্তিনার ললাটে লাবন্যতা ফুঁটে উঠেছে; তাকে আরও মায়াবী মনে হচ্ছে। মনে হয় ওরা এই ভাবে আছে হাজার বছর ধরে; কিন্তু না, ওদের পরিচয় ঘন্টা দুই আগে। অথচ ওরা দু’জন দু’জনাতে এতই মগ্ন যে, পারিপার্শিকতা ভুলে গেছে তারা; মনে হয় এই পৃথিবীতে ওরা, আর বিয়ারের গ্লাস দুইটি ছাড়া কোন কিছুর কোন অস্তিত্ব নেই। কিছু একটা ছিল ভ্যালেন্তিনার ছোঁয়ায়; এ এক নতুন অনুভূতি, যে অভিজ্ঞতা আগে ছিল না হাসানের। অপ্রস্তুত হাসান হাতটি ছাড়িয়ে নেয়। দু’জনে হাসতে থাকে; এই হাসি দু’জনের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা সংকোচ এবং সৌজন্যের দেয়াল ভেঙে, এক নতুন সম্পর্কের সেতু হিসাবে কাজ করে। এই হাসিটাই নিঃসঙ্গ এক জোড়া যুবক-যুবতীকে একই পথে মিলিয়ে দেয়, যে পথ ধরে তারা হাঁটবে আগামী দিনগুলো হাতে হাত রেখে।

হাসান তোমার হাত বরফের মতো ঠাণ্ডা।

পরিবেশ স্বাভাবিক করে ভ্যালেন্তিনা বলে।

ঘটনা দ্রুতগতিতে ঘটতে থাকে। তাল মেলাতে হিমশিম খেয়ে যায় হাসান। বিয়ার শেষ হয়ে গেলে ভ্যালেন্তিনা বলে, চলো হাসান, আমরা বীচ থেকে ঘুরে আসি।

সান্দ্রা বিল নিয়ে এলে হাসান বিল মিটিয়ে উঠে দাঁড়ায়।

আগুরি, হাসান (তোমার শুভ কামনায়)।

গ্রাচ্চে, সান্দ্রা।

চলবে

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension