
পথে কি একা!
মাহমুদ রেজা চৌধুরী
মানুষের দেখা এবং অনুভবের দুইটা স্তর আছে। একটাকে বলি, সজ্ঞা- পূর্ব স্তর আর অন্যটা সজ্ঞা স্তর। দার্শনিক কবি ইকবাল তাই-ই বলেছেন তাঁর দর্শনের রূপরেখার বর্ণনাতে। সেই দেখার এক স্তরে অনেকেই কখনো কখনো নিজেকে জীবনের মহাসড়কে খুবই একা বলেও মনে করি। জীবনে যখন বড় কোন সংকট আসে, কষ্ট পাই যদি। তখন মনে হয়, হয়ত এই কষ্টটা আমার একার। মনে হয়, জীবনের এই কঠিন দুর্গম পথে একাই হাঁটছি আমি। পাশে নাই কেউই।
অনেক সময় অনেক স্মৃতি আমাদের কাঁদায়। রবীন্দ্রনাথের কথায়, “… কত নব জগতের কুসুমকানন,/কত নব আকাশের চাঁদের আলোক।/কত দিবসের তুমি বিরহের ব্যথা,…[গ্রন্থ: সঞ্চয়িতা, কবিতা: স্মৃতি]
এমনি আরো অনেক কথা মনে হয় আনেক স্মৃতিচারণ নিয়ে। চোখের আড়াল হয়ে যাওয়া অনেককে নিয়ে। প্রিয় মানুষ হারানোর কষ্ট নিয়ে। সন্তান হারানোর ব্যথা নিয়ে। সেই সব বিরহের স্মৃতিচারণায় অনেক সময় দুর্বল মন যাদের, তারা আমরা ভেঙে যাই। মনে হয়, পথে যেন আমি একা!
তবে তা কিন্তু না। চলার পথে কেউ না কেউ পাশে থাকে, কেউ কাছে থাকে। কেউ দূরে থাকে, কেউ অনুভবে। অনুভবে যে থাকে সে সবার উপরে থাকে। যেমন আমাদের সবার এক সৃষ্টিকর্তা অনুভবে আছেন। তাঁকে কোনদিন দেখিনি। কিন্তু যারা তাঁকে বিশ্বাস করি, তাঁরা তাকে পাই অনুভবেও। তাই আমরা কিন্তু একা না।
সৃষ্টিকর্তা আছেন প্রতি মুহূর্তে আমাদের সাথে। তাঁকে যারা বিশ্বাস করি, যারা করি না। যারা তাঁর ব্যাপারে সংশয়বাদী। যারা তাঁকে অহরহ গালাগালিও করি। সমালোচনা করি। এই আমাদের সবার সাথেই আছেন তিনি সবার এক সৃষ্টিকর্তা প্রতি মুহূর্তেই। কেউ সেটা বুঝি কেউবা বুঝি না। কেউ দেরি করেও বুঝি।
আবার কেউ সেটা বোঝার কোন প্রয়োজন আছে বলেও মনে করি না। কিন্তু তবুও তিনি আছেন সবার খুবই নিকটে।
তাই আমরা কেউই একা না। এই পার্থিব জীবনেও যে আমাদের অনুভবে থাকে সে যেই হোক না কেন, তাঁর দৃশ্য বা অদৃশ্য অস্তিত্ব রক্তের প্রতি কণায় সজ্ঞার প্রতিটা স্তরে অনুভব করি। এই পরানুভূতি স্বাভাবিক। সেই কারণে নিজেকে একা মনে করার কোন কারণ নাই। এছাড়া মানুষ সামাজিক প্রাণী। তার পক্ষে একা থাকা কি সম্ভব! কিছু না কিছু পরিমাণে হলেও কেউ না কেউ তাঁকে অনুভব করি, যে সে আছেন। সেই “সে” ব্যক্তির সৃষ্টিকর্তা থেকে শুরু করে যে কেউই হতে পারেন। নির্ভর করে ব্যক্তির ব্যক্তিগত ইন্দ্রিয় প্রজ্ঞা কি বলে।
ব্যক্তির প্রজ্ঞা একটা সমগ্র স্বতন্ত্র সত্তা। এটা অসীমের প্রকল্পনাকে অবগত হতে প্রণোদনাও যোগায়। প্রজ্ঞার দ্বারা বস্তুর খন্ড খন্ড রূপ না, বরং বস্তুর অখণ্ড বা সমগ্রকে জানতে পারা যায়। তাই প্রজ্ঞা যা চায়, কল্পনা তা দিতে পারে না। কিন্তু কল্পনার শক্তি যখন মানুষের অন্তর্নিহিত অতীন্দ্রিয় ভাবের দৃশ্য রূপ প্রদান করতে ব্যর্থ হয়ে পড়ে, সেই সময় মানুষ সকল প্রকার অতীন্দ্রিয় ভাবের মাধ্যমে সাবলাইমের বোধ উপলব্ধি না করে পারে না।
এই কারণে মনে হয়, কেউ আমরা একা না। যদি প্রজ্ঞায় বোঝা যায় চলার পথে আমি একা না, আমার অতীন্দ্রিয় জগতে কেউ না কেউ আছে আমার সাথে। তাঁকে সার্বক্ষণিক হয়ত বাইরের চোখে দেখিনা বা দেখব না। কিন্তু অন্তরের চোখে দেখি। এই দেখার রূপ ও বস্তু একেকজনের একেক রকম, হতেই পারে। তবে এই দেখার আত্মিক প্রশান্তির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ আমার মতো অতি সাধারণের পক্ষে অসাধ্য ব্যাপার।
একজন লেখক যখন কোন কিছু দেখেন তা হৃদয়ের গভীরে ধ্রুপদী সুরে বাজতেই থাকে সর্বক্ষণ। তিনি কোন কিছুকে দেখার সাথে সাথে সেখানে খুঁজে পেতে চান শৈল্পিক আধারের কোন অবয়বকে। অর্থাৎ দেখার অনুভূতি আর হৃদয়ের অনুভূতির মিথস্ক্রিয়ায় সৌন্দর্য বিষয়ক অদ্ভুত এক বোধ কাজ করে সবসময় তার হৃদয়ের অতলান্তে। একজন লেখকের অন্যতম দায়িত্ব, কোন জিনিস বা শব্দের দৃশ্যমান রূপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অন্তর্নিহিত রূপ বা যথার্থ রূপকে চিহ্নিত করা তথা আবিষ্কার করা। বিখ্যাত লেখক এবং দার্শনিকদের রচনায় আমরা তার কিছু কিছু সুগন্ধ পাই।
ব্যক্তিগত জীবনের এক কঠিন সময়ে এসে যতবার নিজের অদৃশ্য অস্তিত্ব মুখ থুবড়ে পড়ে যায় মাটির ওপরে, আমি বাকহারা হয়ে যাই। চোখের পানিতে ভিজে যায় মাটি বা পাথর। হঠাৎ মনে হয় আমি বুঝি খুবই একা এই পৃথিবীতে বেঁচে আছি। তখন দিশেহারা হই। পরক্ষণেই চিন্তা হয়, এই পথ চলাতে আমি কি একা! আমার চাইতেও অনেক বেশি একা লক্ষ লক্ষ মানুষ আছেন যাদের অনেককে জানি, অনেককে জানিও না। তাঁদের কথাও মনে হয়।
তখন অন্তর বলে, না এই আমরা কেউই একা না। আমাদের সাথে আমাদের সৃষ্টিকর্তা আছেন। আমাদের সাথে আমাদের অদৃশ্য কিছু না কিছু আছে, যা আমার মত অতি সাধারণ মানুষ বুঝিনা কিন্তু অনুভবে পাই ও দেখি। কোন কিছুর দৃশ্য বলতে কোন স্বতন্ত্র পারমার্থিক বস্তু বুঝায় না। এটা একটা দৃশ্য অবভাস (ফেনোমেনন) মাত্র। এটা কোন রসবোধের ব্যাপার না। তাছাড়া যে কোন রসবোধের ব্যাপার অনুভবের ব্যাপার। ব্যক্তির কেবল বাইরের অনুভূতিই না, তার অতীন্দ্রিয় অনুভূতি বলে দেয় যে সে একা না।
আমাদের রোজকার কাজে এবং দেখায় আমাদের অতীন্দ্রিয় দেখা যেন আমাদের সঠিক পথে চলতে সাহায্য করে। এই পৃথিবীকে আমরা যেভাবে পেয়েছি, চেষ্টা করি যেন তার চাইতে আরেকটু ভালো অবস্থায় সমাজকে রেখে যেতে পারি যদি! কাজে না পারলেও যেন চিন্তায় পারি। চিন্তায় না পারলেও যেন জীবন বোধের আচার-আচরণে পারি। জীবনের এই মহাসড়কে প্রত্যেকের জন্য আমাদের প্রত্যেকের একটা নির্দিষ্ট দায়িত্ব আছে।
একা আমরা কেউই না, একে অন্যের জন্য আমরা প্রত্যেকেই। মহান সৃষ্টিকর্তা এক আল্লাহ, আমাদের সংকটে, বিপদে, ব্যথায়, কান্নায়, হতাশায়; শক্তি দিন। আমরা যেন কখনো মনে না করি এই আমি একা, এই পথে আমি একা।



