
পরমাণু পরীক্ষা চালুর নির্দেশ ট্রাম্পের, ৩০ বছর পর মার্কিন নীতিতে নাটকীয় মোড়
তিন দশকের বেশি সময় পর যুক্তরাষ্ট্রে পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা পুনরায় চালুর নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ‘সমতা’ বজায় রাখার যুক্তি দেখিয়ে তিনি সামরিক বাহিনীকে এ নির্দেশ দিয়েছেন। দক্ষিণ কোরিয়ায় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের ঠিক আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘অন্যান্য দেশের পরীক্ষার কর্মসূচির কারণে আমি যুদ্ধবিষয়ক দপ্তরকে সমান ভিত্তিতে আমাদের পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা শুরু করতে বলেছি।’
ট্রাম্পের ভাষ্যে, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক ভাণ্ডার রয়েছে; রাশিয়া দ্বিতীয়, আর চীন ‘অনেক পিছিয়ে তৃতীয়’। তবে চীনের কর্মসূচি ‘পাঁচ বছরের মধ্যেই সমান হয়ে যাবে’ বলেও তিনি সতর্ক করেন। ১৯৯২ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র আর কোনো পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্ফোরণমূলক পরীক্ষা চালায়নি—শীতল যুদ্ধের অবসানকালে সাবেক রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের আরোপিত স্থগিতাদেশে (মোরাটরিয়াম) সেই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। ট্রাম্পের নতুন নির্দেশ সেই দীর্ঘদিনের নীতিরই উল্টো মোড় নির্দেশ করছে।
পোস্টে ট্রাম্প পারমাণবিক অস্ত্রের ‘অসীম ধ্বংসক্ষমতা’ স্বীকার করে লিখেছেন, প্রথম মেয়াদে তিনি বাধ্য হয়ে ভাণ্ডার ‘আপডেট ও পুনর্গঠনের’ কাজ শুরু করেন। এবার তিনি জানান, পরীক্ষা ‘অবিলম্বে শুরু হবে’। যদিও কীভাবে পরীক্ষা চলবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি। পরে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘পরীক্ষাস্থল পরে নির্ধারিত হবে; তবে অন্যান্য দেশের পরীক্ষার সঙ্গে তাল মেলানো এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উপযুক্ত” পদক্ষেপ।’
সপ্তাহখানেক আগে মস্কো জানায়, তারা দুটি নতুন অস্ত্র পরীক্ষা করেছে—এর একটি ক্ষেপণাস্ত্রকে ক্রেমলিন এমনভাবে বর্ণনা করেছে যে সেটি নাকি মার্কিন প্রতিরক্ষাবেষ্টনী ভেদ করতে সক্ষম, আরেকটি হলো ‘পোসাইডন’ নামের পানির নিচের ড্রোন, যা মার্কিন পশ্চিম উপকূলে আঘাত হেনে তেজস্ক্রিয় জলোচ্ছ্বাস তুলতে সক্ষম। তবে রাশিয়ার এই পরীক্ষাগুলোতে কোনো পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটেনি।
চীনের সক্ষমতা নিয়ে মার্কিন থিংক ট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ (সিএসআইএস) বলছে, গত পাঁচ বছরে দেশটি তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার প্রায় দ্বিগুণ করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সংখ্যা এক হাজার ছাড়াতে পারে। অপরদিকে ‘আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশন’-এর হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে প্রায় ৫ হাজার ২২৫টি ওয়ারহেড আছে, রাশিয়ার আছে প্রায় ৫ হাজার ৫৮০টি।
যুক্তরাষ্ট্রের শেষ পারমাণবিক বিস্ফোরণমূলক পরীক্ষা হয়েছিল ১৯৯২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর—পশ্চিমাঞ্চলীয় নেভাডায় ভূগর্ভস্থ কেন্দ্রটিতে। ‘ডিভাইডার’ নামে কোডনেম দেয়া সেটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ১ হাজার ৫৪তম পারমাণবিক পরীক্ষা। লাস ভেগাসের উত্তরে ৬৫ মাইল দূরের নেভাডা টেস্ট সাইট আজও মার্কিন সরকারের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত। প্রয়োজন মনে হলে সাইটটি আবারও পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত হতে পারে।
এর আগে ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক যুগের সূচনা ১৯৪৫ সালের জুলাইয়ে নিউ মেক্সিকোর আলামোগোর্দোর মরুভূমিতে ‘ট্রিনিটি’ পরীক্ষার মধ্য দিয়ে। সেই বছরের আগস্টেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষপ্রান্তে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে দুটি পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের একমাত্র দেশ হয়ে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। যা পারমাণবিক রাজনীতির নৈতিকতা ও মানবিক মূল্য নিয়ে আজও গভীর বিতর্ক ডেকে আনে।



