প্রধান খবরবাংলাদেশ

টানা বৃষ্টিতে নাকাল রাজধানীবাসী

টানা বৃষ্টিতে গতকাল রোববার রাজধানী ঢাকার বেশির ভাগ সড়ক-অলিগলিতে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস হওয়ায় অনেকে হেঁটে, রিকশা বা গণপরিবহনে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। জলাবদ্ধতার কারণে দোকানপাট, রেস্তোরাঁ, বাজার, শপিংমল, স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কার্যত বন্ধ ছিল।

গতকাল ঘর থেকে বের হওয়ার পর থেকেই মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। যানবাহন পাওয়া যাচ্ছিল না। পেলেও কয়েক গুণ বেশি ভাড়া দিতে হয়। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয় কর্মজীবী মানুষকে। এদিকে গতকাল বৃষ্টিতে তেজগাঁও, মগবাজার এলাকার রেলপথ ডুবে যায়। এতে ট্রেন চলাচল বন্ধ না হলেও ধীরগতিতে চালানো হয়। এতে সব ট্রেন গতকাল কিছুটা বিলম্বে পৌঁছায়।

কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি

টানা বৃষ্টিতে বনানী, বিজয় সরণি, কারওয়ান বাজার, শান্তিনগর, ধানমন্ডি-২৭, নিউমার্কেট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, গ্রিন রোড, মতিঝিল এবং মিরপুরের শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় কোথাও হাঁটুপানি আবার কোথাও কোমরপানি জমে যায়। এসব এলাকার রাস্তায় চলতে গিয়ে মানুষকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়। নিউমার্কেটসহ ব্যবসায়িক এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়া হয়। নিউমার্কেট থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নিউমার্কেটের সবখানে কোমরপানি। সেই সঙ্গে সকাল থেকে এলাকায় বিদ্যুৎ নেই।

আরামবাগের অবস্থা ছিল ভয়াবহ। আরামবাগ মোড় থেকে ফকিরাপুল-কাকরাইল পর্যন্ত সড়কের কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোমরপানি ছিল। বঙ্গভবন, গুলিস্তান, সূত্রাপুর ও এলিফ্যান্ট রোডেও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এসব এলাকার বিভিন্ন দোকান ও শোরুমে পানি ঢুকে যায়। মালিকদের বালতি দিয়ে পানি সেচতে দেখা যায়। রাজধানীর মালিবাগে প্রধান সড়ক-ফুটপাত ছাপিয়ে পানি দোকানে ঢুকে পড়ে। খিলগাঁওয়ের সিপাহীবাগসহ বিভিন্ন সড়ক কোমরপানিতে তলিয়ে যায়।

মতিঝিল এলাকার রিকশাচালক মোতালেব হোসেন বলেন, পানি এতই বেশি যে প্যাডেল মারা যায় না। কোনো কোনো জায়গায় পানি রিকশার গদি পর্যন্ত উঠে গেছে।

মধুবাগের শহীদ লেফটেন্যান্ট সেলিম শিক্ষালয় সংলগ্ন এলাকায় টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় চরম ভোগান্তিতে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দা ও কর্মজীবীরা। সকালে বৃষ্টির পরপরই এলাকার বিভিন্ন সড়ক তলিয়ে যায়। যানবাহন চলাচল একদম কমে যায়। অনেককে পানি ভেঙে গন্তব্যে যেতে দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দা মো. রাশেদ বলেন, ‘প্রায় ১ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও রিকশা পাইনি। পেলেও স্বাভাবিক ভাড়ার দ্বিগুণের বেশি চাইছিল।’

পুরান ঢাকার বঙ্গবাজার, চানখাঁরপুল, বকশীবাজার, বংশাল, মকিমবাজার, সাতরওজা, আগা সাদেক রোড, মাজেদ সরদার রোড, নাজিরাবাজার, কাজী আলাউদ্দিন রোড ও সিদ্দিকবাজারে জলাবদ্ধতায় মানুষকে দিনভর সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হয়।

কাজী আলাউদ্দিন রোডের বাসিন্দা ইমরান হোসেন (৩২) সমকালকে বলেন, বৃষ্টি হলেই পুরান ঢাকায় পানি জমে। ঘর থেকে বের হওয়া উপায় থাকে না। একরকম ঘরবন্দি থাকতে হয়। তিনি বলেন, ‘ছোটকাল থেকেই এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখছি। দিন দিন বাড়ছে বৈ কমছে না। এর কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। কয়েক বছর আগেও এলাকায় পানি নিষ্কাশনের বড় বড় পাইপ বসানো হয়েছে। কিন্তু বৃষ্টি হলেই পানি জমছে। এর মূল কারণ এসব পাইপলাইন কখনও পরিষ্কার করতে দেখা যায় না। মানুষজনও প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ব্যাগসহ সব আবর্জনা রাস্তাসহ যত্রতত্র ফেলে দেয়। এসব আবর্জনা পাইপলাইনে ঢুকে যাচ্ছে। এগুলো কেউ পরিষ্কার করে না। যেন দেখারও কেউ নেই।’

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল খালেক বলেন, ‘ঠিকাদাররা কোনো রকমে পানি নিষ্কাশন লাইন তৈরি করেই দায় সারছেন। চালু করার আগে লাইনের ময়লাও পরিষ্কার করার প্রয়োজন বোধ করেন না। এতে নতুন নতুন লাইন বা নালা নির্মাণ করা হলেও নগরবাসী এর সুবিধা পাচ্ছে না। এ ছাড়া খোলা ডাস্টবিনের ময়লা বৃষ্টির পানির সঙ্গে পাইপলাইনে ঢুকে লাইন বন্ধ করে দিচ্ছে।’

এদিকে মিরপুরের পীরেরবাগের বাসিন্দা আশরাফ হোসেন বলেন, পীরেরবাগের ৬০ ফুট থেকে শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত পুরো সড়কে হাঁটুপানি। পীরেরবাগ খালের পানি উপচে আশপাশে ছড়িয়ে পড়ছে।

পানির কারণে কাজীপাড়া, মিরপুর ১০, ১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশনের লিফট ও এস্কেলেটর বন্ধ রাখা হয়। কয়েকটি এস্কেলেটর পরে চালু করা হলেও লিফট ছিল। বিমানবন্দর সড়কে ছিল পানি আর পানি। কালশী মোড়ে বুকসমান পানি জমে যায়। কাজীপাড়া থেকে মিরপুর পল্লবী পর্যন্ত সড়কে পানি থাকায় যানচলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। অনেক স্থানে পানির মধ্যে সিএনজি অটোরিকশা ও প্রাইভেটকারগুলো বিকল হয়ে পড়ে ছিল।

ভারী বর্ষণের মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শহীদ মিনারসংলগ্ন এলাকায় একটি বিশাল গাছ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বাসের ওপর ভেঙে পড়ে। এতে কেউ আহত না হলেও বাসটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পানি সরাচ্ছেন স্থানীয়রা

মধুবাগের শহীদ লেফটেন্যান্ট সেলিম শিক্ষালয় সংলগ্ন এলাকার আবদুল করিম বলেন, ‘সকালের দিকে পানি বের হওয়ার কোনো পথ ছিল না। পরে আমরা কয়েকজন মিলে ড্রেনের মুখে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করি। এরপর ধীরে ধীরে পানি নামতে শুরু করে। যদি নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার রাখা হতো, তাহলে এত বড় জলাবদ্ধতা তৈরি হতো না।’

সকাল থেকে শুরু হওয়া এই জলাবদ্ধতা কাটতে দুপুর গড়িয়ে যায়। এরই মধ্যে স্থানীয়দের উদ্যোগে ড্রেনের মুখ পরিষ্কার ও পানি চলাচলের পথ স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা চলে। এতে কিছু সময় পর এলাকার পরিস্থিতির উন্নতি হয়।

এক্সপ্রেসওয়ের র‍্যাম্পের নিচে জলাবদ্ধতা-যানজট

টানা বর্ষণে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাকলী র‍্যাম্পের নিচের অংশসহ বনানী, খিলক্ষেতে ব্যাপক জলাবদ্ধতা হয়। এতে এক্সপ্রেসওয়েতে যানজটের সৃষ্টি হয়। নয়াপল্টন এলাকা কোমরপানির নিচে চলে যায়।

ঢাকা ওয়াসার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম শহীদ উদ্দিন সমকালকে বলেন, ঢাকা শহরের বিদ্যমান ড্রেনেজ সিস্টেমটা মূলত আশির দশকের। সেটারও অনেক স্থানে ক্যাচপিটগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। বুয়েট ক্যাম্পাসে সাধারণত পানি জমে না। কিন্তু গতকাল বুয়েট ক্যাম্পাসও ডুবে গেছে। এই ড্রেনেজ ব্যবস্থা আধুনিক না করলে জলাবদ্ধতা হতেই থাকবে।

গুলশান লেকের পানি উপচে সড়কে

টানা বৃষ্টিতে গুলশান লেকের পানি উপচে গুলশান-শাহজাদপুর সংযোগ সড়কের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে সড়কটির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানির প্রবাহ অব্যাহত থাকায় সড়কে ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দেয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, টানা বর্ষণের কারণে লেকের পানি বেড়ে গতকাল বেলা ১১টার দিকে সড়কের ওপর উঠে আসে।

গণপরিবহন কম, বাড়তি ভাড়া

সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে সরকারি অফিসগুলো খুললেও বেসরকারি অনেক অফিস, দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। বৃষ্টিতে যোগাযোগ ব্যবস্থা এতই ভেঙে পড়ে যে কর্মীরা আর কর্মস্থলে পৌঁছতে পারেননি। মেট্রোরেল ছাড়া কোনো গণপরিবহন রাজধানীতে স্বাভাবিকভাবে চলতে পারেনি। রিকশা চলাচলও ছিল হাতেগোনা।

মিরপুরের বাসিন্দা আফজাল হোসেন বলেন, ‘মিরপুর-২ নম্বর মসজিদ মার্কেট থেকে ১০ নম্বর মেট্রো স্টেশনের ভাড়া ৩০ থেকে ৪০ টাকা। আজকে চাচ্ছে ১০০ টাকা।’

সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক আব্দুর রহমান বলেন, ‘ইঞ্জিনে পানি ঢুকলে পুরো দিনই মাটি। তার পরও ভাড়া একটু বেশি চাইলে যাত্রীদের নানা কথা শুনতে হয়।’

স্কুলে ছুটি, পরীক্ষা স্থগিত

বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে রাজধানীর একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গতকাল ছুটি ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে চলমান অর্ধবার্ষিক, প্রাক-নির্বাচনী ও ব্যবহারিক পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়।

বৃষ্টির কারণে রাজধানীর সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং সেন্ট গ্রেগরি হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ সকালেই পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়ে দেয়, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে রোববারের সব ক্লাস ও নির্ধারিত পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। সেন্ট গ্রেগরি হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের সব শ্রেণির ক্লাস এবং চলমান পরীক্ষা স্থগিত রাখা হয়েছে।

দুই সিটির কুইক রেসপন্স টিম

জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন অঞ্চলভিত্তিক কুইক রেসপন্স টিম গঠন করেছে। তাদের কার্যক্রম মনিটরিং করতে সকাল থেকেই মাঠে নামেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম।

শফিকুল ইসলাম বিমানবন্দর রোড, মিরপুর, সংসদ ভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এলাকার জলাবদ্ধতা ঘুরে দেখেন এবং ডিএনসিসির কর্মীদের জলাবদ্ধতা দ্রুত নিরসনের নির্দেশ দেন।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নগরীর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমরা জলাবদ্ধতা ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছি, যাতে দ্রুত স্বাভাবিক নাগরিক জীবন ফিরে আসে।’
ডিএসসিসি থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জলাবদ্ধতা দূর করতে কমলাপুরে দুটি এবং ধোলাইখালে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পাম্পের সাহায্যে পানি নিষ্কাশন শুরু করা হয়েছে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension