ভারত

মণিপুরে ফের সহিংসতায় নিহত ৯, নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে আবারও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। গত ৪৮ ঘণ্টায় সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনায় অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। নতুন করে প্রাণহানির ঘটনায় রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একই সঙ্গে আগামী বিধানসভা নির্বাচন নির্ধারিত সময়ে আয়োজন করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই খেমচাঁদ সিং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। রাজ্যে শান্তি ও স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাতে মণিপুরের কামজং জেলার চাসাদ গ্রামে একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি চলাকালে এক নারীকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সংঘর্ষ ও সহিংসতায় অন্তত ৯ জন নিহত এবং আরও তিনজন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শনিবার চাসাদ পুলিশ গেট মোড়ের চারপাশে ৪০০ মিটার এলাকাজুড়ে পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ করে জেলা প্রশাসন। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৬২ ধারায় জারি করা এ নিষেধাজ্ঞা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে বলে জানানো হয়েছে।

মণিপুরে জাতিগত সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ২০২৩ সালের মে মাসে রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেই সম্প্রদায় এবং কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হলে ব্যাপক প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ওই সংঘাতে ২৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হন বহু মানুষ। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে অবিশ্বাস ও উত্তেজনা পুরোপুরি কাটেনি।

সাম্প্রতিক সময়েও রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় হামলা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৩ সেপ্টেম্বর পৃথক দুটি হামলায় কুকি-জো সম্প্রদায়ের চারজন নিহত হন। ধারাবাহিক এসব সহিংসতা রাজ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে আরও কঠিন করে তুলছে।

নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী খেমচাঁদ সিং রাজ্যে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে তার সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী রাজ্য সরকারের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন বলে জানা গেছে। তবে সাম্প্রতিক সহিংসতা বন্ধে কী ধরনের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

মণিপুরের সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের জাতিগত বিরোধও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ১৯৯০-এর দশক থেকেই কুকি ও নাগা জনজাতির মধ্যে সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। পরে ২০২৩ সালে মেইতেই ও কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে সহিংসতা রাজ্যের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

এই সংকটের মধ্যেই ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিং পদত্যাগ করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর ২০২৬ সালে ওয়াই খেমচাঁদ সিং মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। তার সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে সহিংসতা বন্ধ করা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং রাজ্যে স্বাভাবিক পরিস্থিতি নিশ্চিত করা।

আগামী বিধানসভা নির্বাচন সামনে রেখে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা রাজ্য সরকারের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করা এবং সংঘাতপ্রবণ এলাকায় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা জরুরি। কিন্তু নতুন করে প্রাণহানি, সংঘর্ষ ও জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির ঘটনা এসব উদ্যোগকে আরও জটিল করে তুলছে।

মণিপুরে নির্ধারিত সময়েই বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্যও পাওয়া যায়নি। তবে রাজ্যে দ্রুত সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে নির্বাচনকে ঘিরে অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension