
দ্য গার্ডিয়ানের কলাম: এআইয়ের ওপর নির্ভরতা মস্তিষ্ক পচিয়ে দিচ্ছে: বাঁচার উপায় কী?
কার্লি ডোবার
আপনার কি নিজের কোনো পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্টের জন্য মনকেমন করে? প্রযুক্তির এই হুড়োহুড়ির যুগে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা সম্প্রতি ‘মিউজ’ নামক নতুন একটি এআই পার্সোনাল এজেন্ট চালু করেছে। সাধারণ চ্যাটবটগুলোর মতো না, এই ছোট্ট এআই টুলটা নিজে থেকেই আপনার ফরম ফিলাপ করে দিতে পারবে, ক্যালেন্ডার গুছিয়ে রাখতে পারবে, বিল মিটিয়ে দিতে পারবে আর নানা জায়গায় বুকিংও করে দিতে পারবে।
মেটা তো বলেই দিয়েছে, মিউজ এমন একটা পার্সোনাল এজেন্ট যা ‘সবার জন্য তৈরি’। এআই এজেন্টরা যখন সরকারি ওয়েবসাইট, সরকারি সংস্থা এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হ্যাকিংয়ের কারণে খবরের শিরোনাম হচ্ছে, ঠিক তখনই এর আত্মপ্রকাশ ঘটল। তবে আমার চিন্তাটা নিজের ঘরের মানুষদের নিয়ে একটু বেশি।
পেশায় আমি একজন মনোবিজ্ঞানী। তাই ক্লায়েন্টদের সঙ্গে প্রায়ই এমন সব লাইফস্টাইল বা অভ্যাস নিয়ে কথা হয়, যেগুলোতে সাময়িক আরাম বা লাভ পাওয়া গেলেও লম্বা সময়ে গিয়ে বেশ কষ্ট পোহাতে হয়। আমাদের ব্রেনের একটা চমৎকার স্বভাব আছে- এটা সবসময় সবচেয়ে সোজা আর কম খাটুনির পথটাই বেছে নিতে চায়, যাতে একটু কম শক্তি খরচ হয়। বর্তমান সময়ে মানুষের জীবনের চাপ এত বেশি যে, কাজের শেষে হাড়ভাঙা ক্লান্তি নিয়ে একটু স্ক্রোল করার বা ঝামেলা এড়াতে কোনো চ্যাটবটের ওপর ভরসা করার লোভ সামলানো সত্যিই খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
টেক কোম্পানিগুলোর মালিকরা তাদের পণ্য আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা তো আর আজ নতুন করছে না (মেটাভার্সের কথা কার আর মনে নেই বলুন!)। কিন্তু এখন যেভাবে তারা কোমর বেঁধে প্রচার চালাচ্ছে যে, মানুষের উন্নতির জন্য এআই কতটা জরুরি আর অপরিহার্য, তা একদম চরমে গিয়ে ঠেকেছে। তাই একটু থেমে নিজেদেরই ভাবা দরকার যে, এর বিনিময়ে আমরা আসলে ঠিক কী হারাচ্ছি, কার হাতে নিয়ন্ত্রণ তুলে দিচ্ছি আর কেনই বা দিচ্ছি- আর আমাদের অমূল্য ডেটাগুলো অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার আগে এর ঝুঁকিগুলো কী, তা একটু খতিয়ে দেখা দরকার।
কিছু প্রযুক্তি, যেমন বড় ভাষার মডেল (এলএলএম) আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রোল করার সোশ্যাল মিডিয়া- এগুলো অতিরিক্ত ব্যবহারে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। এগুলোর ওপর বেশি নির্ভর করলে আমাদের মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু মানসিক পক্ষপাত তৈরি হয়, মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট হয়, মনমেজাজ ও মানসিক স্বাস্থ্যে খারাপ হয়, এমনকি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা বা স্নায়বিক দক্ষতাও ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে- এরকম বহু ঝুঁকির কথাই নথিভুক্ত রয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে আমাদের শেখার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। কারণ, গভীরভাবে কোনো কিছু চিন্তা করা বা নতুন কোনো স্নায়ু সংযোগ তৈরি করার জন্য যেটুকু মানসিক খাটুনির দরকার হয়, এআইয়ের কারণে আমরা তা একদম এড়িয়ে চলি। একে বলা হয় ‘কগনিটিভ অফলোডিং’। এআইয়ের ঘন ঘন ব্যবহারের ফলে আমরা অন্ধের মতো সব তথ্য মেনে নিতে শুরু করি, যার আমাদের ভেতরের কৌতূহল এবং নিজে নিজে সমস্যা সমাধান করার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। আমাদের মস্তিষ্ককে ধারালো ও কর্মক্ষম রাখতে হলে একটু মানসিক লড়াই আর ব্যর্থতা পেরিয়ে আসার অভিজ্ঞতা অর্জন করা খুব জরুরি। সেই লড়াই বা কষ্টটুকু এড়াতে গিয়েই দিন দিন আমাদের মানসিক শক্তি কমে যাচ্ছে।
প্রযুক্তি (যেমন চ্যাটজিপিটি বা ক্লড) আমাদের সামনে যা এনে দেয়, আমরা তা একদম চোখ বুজে বিশ্বাস করতে শুরু করি। এমনকি এর সঙ্গে মিল নেই বা এটা ভুল- এমন কোনো সঠিক তথ্য যদি কোনো বইয়েও থাকে, তবুও আমরা বইয়ের কথা বাদ দিয়ে ওই প্রযুক্তির ওপরই বেশি ভরসা রাখি। একে বলা হয় ‘অটোমেশন বায়াস’ (প্রযুক্তির প্রতি অন্ধ পক্ষপাত)। এর সঙ্গে ঠিক হাত ধরাধরি করে চলে ‘অটোমেশন কমপ্ল্যাসেন্সি’ (প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত আত্মতুষ্টি)। এর সহজ মানে হলো, আমাদের মনে এই অন্ধ বিশ্বাস থাকে যে প্রযুক্তি তো আর ভুল করবে না, তাই এটি ঠিকঠাক কাজ করছে কি না তা আমরা আর অত খতিয়ে দেখি না- যদিও আমরা ভালোভাবেই জানি যে এই এলএলএম বা এআই অনেক সময়ই ভুলভাল উত্তর দেয়।
সোশ্যাল মিডিয়াগুলোকে এমনভাবে আসক্তিমূলক করে তৈরি করা হয়েছে যাতে মানুষ সারাক্ষণ স্ক্রিনেই আটকে থাকে, কারণ ওতেই কোম্পানিগুলোর লাভ। অন্যদিকে, মানুষ খুব সহজেই নিজের গোপনীয়তার কথা জলাঞ্জলি দেয় কারণ তাৎক্ষণিক একটু বিনোদন বা পাওয়ার লোভে তারা ভবিষ্যতের বড় ঝুঁকির কথা বেমালুম ভুলে যায়। মুখে সবাই বলে যে তারা গোপনীয়তা রক্ষা করা চায়, কিন্তু তাদের কাজকর্মে তার পুরো উল্টোটা দেখা যায়। অর্থনীতি আর মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই অসঙ্গতিকে বলা হয় ‘প্রাইভেসি প্যারাডক্স’।
ডিজিটাল জিনিসপত্র আমাদের জীবনটাকে ভীষণ সহজ করে দিয়েছে- একটা বোতাম টিপেই গাড়ি ডেকে নেওয়া যায়, ঘরে গরম খাবার চলে আসে, আর একটা মানুষের সাথেও মুখ ফুটে একটা কথাও না বলে অনলাইনে জামাকাপড় অর্ডার করে আবার ফেরতও দেওয়া যায়। একটু ফ্রি ম্যাপ, নিজের পছন্দমতো শপিংয়ের আইডিয়া আর সহজে যোগাযোগের জন্য মানুষ খুব আনন্দের সঙ্গেই নিজেদের লোকেশন, ফোন নম্বর আর ব্রাউজিংয়ের ইতিহাস সব তুলে দিচ্ছে। অনেকেই আবার এই ভুল ধারণায় থাকেন যে, “আরে ভাই, আমি তো আর কোনো ক্রাইম করছি না, তাহলে আমার ডেটা দিয়ে কার কী বা লাভ হবে?” তারা বোঝেন না যে, এই ডেটাগুলো এক জায়গায় জমা করে তাদের কেনাকাটার অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা হয়, নির্বাচনে ভোট প্রভাবিত করা হয় এবং ব্যক্তিগত জীবনের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নানা পূর্বাভাস তৈরি করা হয়।
প্রাইভেসি পলিসির শর্তগুলোও বেশ কায়দা করে এমন প্যাঁচালো আর ভারী আইনি ভাষায় লিখে রাখা হয়, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা অসম্ভব। একে তো আইনকানুন বোঝা কঠিন, তার ওপর বিরক্তিকর পপ-আপ উইন্ডো বারবার সামনে আসতে আসতে মানুষ এমনিতেই বিরক্ত হয়ে যায় (একে বলে ‘কনসেন্ট ফ্যাটিগ’ বা সম্মতি ক্লান্তি)। তখন আর কোনো উপায় না পেয়ে মানুষ বিরক্ত হয়ে শুধু ‘সব অ্যাকসেপ্ট করুন’ বোতামে ক্লিক করে পার পেতে চায়।
তবে এই গোলকধাঁধা থেকে বের হয়ে আসার রাস্তা কিন্তু একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। অনলাইনে আপনি কার সঙ্গে কী ডেটা শেয়ার করছেন, সে বিষয়ে একটু সচেতন হন। ম্যাপ বা নেভিগেশন অ্যাপ ব্যবহার করা ছাড়া বাকি সময় লোকেশন বন্ধ রাখুন। যেসব কুকিজ বা ট্র্যাকার আপনার ওপর নজরদারি করে, সেগুলোকে বর্জন করুন। আর সত্যি যদি আপনি এর প্রতিবাদ করতে চান, তাহলে নিজের ডেটা নিজেই উল্টাপাল্টা তথ্য দিয়ে ভুয়া করে দিন (ডেটা পয়জনিং), যাতে কোম্পানিগুলো আপনার আসল তথ্য না পায়। আপনি যে অনলাইন দোকান থেকে একবার একটা টি-শার্ট কিনেছিলেন, তাদের কি সত্যি আপনার পুরো নাম আর জন্মতারিখ জানার কোনো দরকার আছে”
এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হলে আপনাকে আপনার দৈনন্দিন অভ্যাসে একটু বাধা বা ‘ঘর্ষণ’ তৈরি করতে হবে, যা এই তাৎক্ষণিক আরাম পাওয়ার ক্ষতিকর চক্রটাকে ভেঙে দেবে। মনস্তাত্ত্বিকভাবে বলতে গেলে, এআই মানুষকে খুব দ্রুত আসক্ত করে তোলে কারণ এটি কোনো রকম মাথা খাটাতে না দিয়ে চোখের পলকে সব সমাধান সামনে এনে দেয়। আর আমাদের মস্তিষ্ককে সচল রাখতে হলে কিন্তু ঠিকমতো মাথা খাটাতে হয় বা একটু কষ্ট করতে হয়। যখনই আপনি কোনো সমস্যার সমাধান নিজে করার চেষ্টা করেন বা কমেন্ট বক্সে সময় না কাটিয়ে একটা বই হাতে তুলে নেন, তখন সেটা আপনার মস্তিষ্কের জন্য এক একটা ব্যায়ামের মতো কাজ করে।
যদি আপনার সোশ্যাল মিডিয়া বা এআই ব্যবহারের অভ্যাস কমাতে কষ্ট হয়, তাহলে শুরু করার একটা ভালো উপায় হলো অনলাইন অ্যাকাউন্ট থেকে লগআউট করে রাখা। প্রতিবার পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করার ঝামেলা থাকলে এমনিতেই আর অত ঘন ঘন ওটা ঘাঁটার ইচ্ছে করবে না। এছাড়া, চ্যাটজিপিটি, ক্লড বা জেমিনির মতো এআই টুলগুলোকে মোবাইল ফোন থেকে একদম মুছে ফেলুন এবং এগুলো কেবল কম্পিউটার বা ল্যাপটপে ব্যবহার করুন। এতে রাস্তাঘাটে হাঁটার সময়, বিছানায় শুয়ে শুয়ে বা লাইনে দাঁড়িয়ে ফোন ঘাঁটার বদভ্যাসটা দূর হবে। ফোনে সারাক্ষণ স্ক্রোল করা বা এআইয়ের সঙ্গে বকবক করার কারণে আমাদের মস্তিষ্ক যে একটু নিজের মতো ভাববে বা অলস সময় কাটাবে, সেই দরকারি সময়টুকুও আর পায় না।
আপনার যখনই কোনো কিছু জানার জন্য এআইকে প্রশ্ন করার বা লিখিয়ে নেওয়ার ইচ্ছে করবে, নিজেকে একটু থামিয়ে ৩০ মিনিট অপেক্ষা করুন। এই সময়টায় নিজে একটু ভাবুন, বইয়ের পাতা ওল্টান বা চুপচাপ বসে সমস্যাটা নিয়ে চিন্তা করুন। দেখবেন কিছুক্ষণ পর আর সেই তাগিদটা থাকছে না, কিংবা আপনি নিজেই দিব্যি তার সমাধান বের করে ফেলেছেন। কোনো ই-মেইল, চিঠি বা প্রেজেন্টেশনের প্রথম খসড়াটা নিজে হাতে লিখে ফেলার অভ্যাস করুন। জিনিসটা ভুল হতে পারে, সেই অস্বস্তিটাকে মেনে নিন। এআইয়ের কাছে কোনো কিছু জানার বা কোনো পরামর্শ চাওয়ার বদলে কোনো বন্ধু বা সহকর্মীর সঙ্গে কথা বলুন, কিংবা কোনো ভালো ও নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট ঘুরে দেখুন। মানুষের উত্তরের জন্য একটু অপেক্ষা করা আপনার মধ্যে ধৈর্য বাড়াবে, আর এই ধৈর্যশীলতা ধরে রাখা আমাদের নিজেদের স্বার্থেই ভীষণ দরকার।
দিনের নির্দিষ্ট কিছু সময় স্ক্রিন থেকে একদম দূরে থাকুন। বই পড়ুন, কাগজ-কলমে লিখুন অথবা ফোন ছাড়াই একটু হেঁটে আসুন। টানা ছয় সপ্তাহ এই ছোট্ট পরিবর্তনগুলো করে দেখুন, আপনার নিজের ভেতর কতখানি তফাত মনে হয়। সবকিছু এত সহজে হাতের কাছে পাওয়ার এই যুগে জেনেশুনে একটু বাধা বা কষ্ট তৈরি করা কঠিন তো বটেই- কিন্তু বিশ্বাস করুন, আপনার মস্তিষ্ক এর জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাবে।
লেখক: অস্ট্রেলিয়ার একজন মনোবিজ্ঞানী
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মনিরুল হক ফিরোজ



