প্রধান খবরবাংলাদেশরাজনীতি

বিএনপির কার্যালয় ভাঙচুর, তালা, ফখরুলের গাড়িতে হামলা

রূপসী বাংলা ঢাকা ডেস্ক রিপোর্ট:  বিএনপির মনোনয়ন বঞ্চিতরা দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন। গতকাল শনিবার  দুপুরে তারা বিক্ষোভ প্রদর্শনের মধ্যদিয়ে কার্যালয়ের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন।

বেলা ১১টায় সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন আসন্ন সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন না পাওয়ায় তার সমর্থকরা বিক্ষোভ শুরু করে। বিক্ষুব্ধ সমর্থকরা এক পর্যায়ে  কার্যালয়ের দরজায় তালা ঝুলিয়ে দেন।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মনোনয়ন না পাওয়া প্রার্থীদের সমর্থকরা এসময় স্লোগান ও মিছিলের মাধ্যমে ক্ষোভ দেখান।  তবে, এই বিক্ষোভের মধ্যেই অনেক প্রার্থী তাদের মনোনয়নের চিঠি সংগ্রহ করেন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের সমর্থক ও কর্মীরা গুলশানের দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুর চালিয়েছে। গতকাল শনিবার বিকেলে কার্যালয় ঘেরাও করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে তারা। প্রধান গেট ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টাও চালায়। কার্যালয়টির কাঁচ ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে কার্যালয়ের ভেতরে থাকা বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নজরুল ইসলাম খানসহ দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। এ সময় তাদের শান্ত হতে বারবার মাইকিং করা হয় ভেতর থেকে। তবে কোনভাবে শান্ত করা যায় নি তাদের। দলটির শীর্ষ নেতারা অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছেন। এদিকে রাতে গুলশানে দলীয় কার্যালয়ের বাইরে পার্কিংয়ে থাকা বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গাড়িতে হামলা করেছে বিক্ষুব্ধ কর্মীরা। এ সময় ফখরুল গাড়িতে ছিলেন না। তার চালক আমিরুল ইসলাম হেলালকে বেদম মারধর করা হয়েছে। তার চোখে আঘাত লাগে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস উইং সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, হামলার সময় মির্জা ফখরুল কার্যালয়ের ভেতরে অবস্থান করছিলেন। তার গাড়ি কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় পার্ক করা ছিল।

এ ঘটনার মধ্য দিয়ে মনোনয়ন নিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে অন্তর্কোন্দল ও ক্ষোভের বিষয়টি প্রকাশ্য রূপ লাভ করল। তবে ঘটনাস্থলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তৎপরতা দেখা যায় নি গতকাল। মনোনয়নবঞ্চিতদের সমর্থকরা নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও তালা দিয়ে বিক্ষোভ করেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, চাঁদপুর-১ আসনের সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, নারায়ণগঞ্জ-১-এর বিএনপি নেতা তৈমূর আলম খন্দকার, গোপালগঞ্জ-১-এর সেলিমুজ্জামান সেলিম, ময়মনসিংহ-৪-এর সাবেক এমপি দেলোয়ার হোসেন খান দুলু, ময়মনসিংহ-১০-এর সিদ্দিকুর রহমান, কুমিল্লা-৪-এর ইঞ্জিনিয়ার মনজুরুল আহসান মুন্সী, ঢাকা-৬-এর ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন, চুয়াডাঙ্গা-১-এর শামসুজ্জামান দুদু, চট্টগ্রাম-৩-এর মোস্তফা কামাল পাশা, চাঁদপুর-২-এর তানভীর হুদা, নারায়ণঞ্জ-৪ আসনের মনির হোসেন কাসেমীর কয়েক হাজার সমর্থক ও কর্মী গতকাল বিকেল ৫টার দিকে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করতে থাকলে ওই পরিস্থিতির তৈরি হয়। প্রত্যাশিত প্রার্থীকে মনোনয়ন না দিলে গণপদত্যাগেরও হুমকি দেন তারা। তারা অভিযোগ করেন, অর্থের বিনিময়ে বেশ কিছু আসনে জনপ্রিয় প্রার্থীকে বাদ দিয়েছে বিএনপি।

বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘মনোনয়ন নিয়ে ছোটখাটো দু একটি প্রতিক্রিয়া, এটা কি নতুন কিছু? বরং যাদের দেওয়া হয়েছে, তারা অত্যন্ত জনপ্রিয়। আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে শুরু করে এলাকায় তাদের সম্পৃক্ততা অত্যন্ত নিবিড়।’

গুলশানের তান্ডবের আগে শনিবার দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে বিক্ষোভ করে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী কারাবন্দি এহছানুল হক মিলনের কর্মী-সমর্থকরা। তাকে দলীয় মনোনয়ন না দেওয়ার প্রতিবাদে দুপুর পৌনে ১টার দিকে কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেছিল তারা। একপর্যায়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয়। বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের মধ্যে চাঁদপুরের কচুয়া থানা বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ছিল। তাদের অভিযোগ, এহছানুল হক মিলনের জায়গায় চাঁদপুর-১ (কচুয়া) আসনে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মো. মোশাররফ হোসেনকে এলাকায় কেউ চেনেন না। মালয়েশিয়া বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোশাররফের সঙ্গে জিয়া পরিবারের প্রয়াত সদস্য আরাফাত রহমান কোকোর ঘনিষ্ঠতা এবং কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমানের সুপারিশে তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। সারা জীবন তিনি মালয়েশিয়ায় ছিলেন। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষিত এ নেতাকে মনোনয়ন দেওয়া হলে কেউ মানবেন না। অন্যদিকে এহছানুল হক মিলন পাঁচ বছর দেশের বাইরে থাকলেও তার সঙ্গে এলাকার মানুষের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এখনও জেলে আছেন তিনি। দলের জন্য তিনি যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন তার যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় নি।

কচুয়া উপজেলা বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম ফারুকী বলেন, ‘কচুয়ার আসনটি পুনরুদ্ধার করতে মিলনের কোনও বিকল্প নেই। আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং তার স্ত্রী নাজমুন নাহার বেবীকে মনোনয়ন না দেওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ।’

চাঁদপুর জেলা যুবদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আলাউদ্দিন বলেন, ‘বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। ১২ ঘণ্টার মধ্যে কচুয়া আসনে মিলনকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা বলেছি। এই আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রার্থী বদল না হলে পল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও গুলশানের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে তালা দেওয়া হবে।’

এবাদুর রহমান নামে আরেকজন অভিযোগ করেন, ‘টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এহছানুল হক মিলনের বিরুদ্ধে ৩৩টি মামলা রয়েছে। তিনি দলের জন্য অনেক কিছু ত্যাগ করেছেন। তাকে মনোনয়ন না দিয়ে টাকা খেয়ে একজন ভুয়া লোককে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। আমরা এটা মানব না।’

এদিকে সদ্য বিএনপিতে যোগ দেওয়া গোলাম মাওলা রনির মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে শনিবার রাত ৮টার দিকে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের প্রধান ফটকে দ্বিতীয় দফায় তালা দিয়েছে হাসান মামুনের অনুসারীরা। পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন দেওয়া হয় রনিকে। এই আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি হাসান মামুন। রাতে নয়াপল্টনে বিক্ষোভ শুরু করে মামুনের সমর্থকরা। হাসান মামুনের অনুসারী মো. শাহীন বলেন, রনিকে পটুয়াখালীতে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে।

গুলশানে তান্ডব

পল্টনের ঘটনার রেশ না কাটতেই শনিবার বিকেলে গুলশান-২ নম্বরে জড়ো হন মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের কর্মী-সমর্থকরা। বিকেল ৫টার দিকে তারা কার্যালয় ঘেরাও করে বৃষ্টির মত ইট-পাথর নিক্ষেপ করতে থাকে। এক পর্যায়ে প্রধান গেটে ভাঙচুর চালায় তারা। প্রধান গেট বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে দফায় দফায় বাইরে থেকে হামলা করা হয়। এ সময় তারা কার্যালয়ের প্রধান ফটকে লাথি মারে, ধাক্কা দেয়, ইট-পাটকেল ছুড়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। অনেকেই ফটকের সামনে শুয়ে বিক্ষোভ করে। এ সময় তিতুমীর কলেজ ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা মিছিল করে ‘আওয়ামী লীগের দালালেরা হুঁশিয়ার-সাবধান’ স্লোগান দিতে থাকে।

কয়েক দফায় বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের ভেতর থেকে মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়- ‘আপনারা ধৈর্য ধরুন, শান্ত থাকুন। আমাদের নেত্রী খালেদা জিয়া কারাগারে, তারেক রহমান বিদেশে। এ অবস্থায় আপনারা সবাই ধৈর্য ধরুন। আপনারা দলের পরীক্ষিত নেতাকর্মী। আপনারা রোববার সকাল ১০টায় আসবেন। তখন মনোনয়ন বিতরণ করা হবে। কেউ কোনও ঝামেলা করবেন না। সবাই চলে যান। সবাই দয়া করে শুনুন, এটা আমাদের সবার অফিস। আজকে কোনও মনোনয়ন বিতরণ করা হবে না, কারও মনোনয়ন দেওয়া হবে না। দয়া করে কেউ দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করবেন না।’ এমন ঘোষণার পরও শান্ত হচ্ছিল না বিক্ষুব্ধ সমর্থকরা।

কুমিল্লা-৪ আসনের মনজুরুল আহসান মুন্সীর সমর্থক ফারুক হোসেন বলেন, ‘তাদের আসনে ঐক্যফ্রন্টের আবদুল মালেককে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। মুন্সীকে মনোনয়ন দেওয়া না হলে মালেকের পক্ষ হয়ে তারা কাজ করবেন না।’

চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে দুদুর সমর্থক রাজু আহমেদ বলেন, ‘ওই আসনে শরিফুজ্জামান শরীফকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তার সঙ্গে বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের তেমন কোনও যোগাযোগ নেই।’

মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে ক্ষোভ-হতাশা প্রকাশ করেছেন দলটির সাবেক মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ছেলে খোন্দকার আবদুল হামিদ ডাবলুও। শুক্রবার বিকেলে তার এলাকা মানিকগঞ্জ-১ আসনে এসএ জিন্নাহ কবিরকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়ার পর ছোট বোন দেলোয়ারা বেগম পান্নাকে নিয়ে গুলশানের কার্যালয়ে আসেন তিনি। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে নিরাপত্তা কর্মীদের বাধা পেয়ে কেঁদে ফেলেন দুই ভাইবোন। ডাবলু অনুসারীরা এ সময় হট্টগোল শুরু করেন।

বিক্ষোভ ঢাকার বাইরেও ছড়ালো

পঞ্চগড়-২ আসনে ফরহাদ হোসেন আজাদকে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণার প্রতিবাদে তার কুশপুত্তলিকা দাহ করে উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা। তারা সাবেক এমপি মোজাহার হোসেনের স্ত্রী নাদিরা আকতার অথবা জাগপা প্রার্থী ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধানকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি জানান। এ ছাড়া গাইবান্ধা জেলা বিএনপির কার্যালয় শনিবার সন্ধ্যায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। তবে কারা এ ঘটনায় জড়িত নিশ্চিত হওয়া যায় নি।

 

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension