
কবি আল মাহমুদকে শ্রদ্ধা
মারা গেলেন কবি আল মাহমুদ। এক কবি লিখেছিলেন- সবাই কবি নন, কেউ কেউ কবি। আল মাহমুদ কবি হতে পেরেছিলেন।সাধারণ মানের কবি নন, তিনি হতে পেরেছিলেন এক অনন্যসাধারণ কবি, যার ছিল নিজস্ব ঢং ও ভাষারীতি। কবিতায় আঞ্চলিক শব্দের স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বাভাবিক ব্যবহারের জন্য তাকে চেনা যায় আলাদাভাবে। ‘সোনালী কাবিন’ তার এমন এক কাব্যগ্রন্থ, যা বাংলা ভাষার এক অবিস্মরণীয় সম্পদ হিসেবে আমাদের আলোড়িত করবে চিরকাল। এছাড়া ‘লোক লোকান্তর’, ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’, ‘দ্বিতীয় ভাঙন’, ‘নদীর ভেতরের নদী’সহ তার আরও অনেক কাব্যগ্রন্থ বাংলা কবিতাকে ঐশ্বর্যময় করে তুলেছে। কবি আল মাহমুদ তার কাব্য প্রতিভার স্বীকৃতিও পেয়েছেন নানাভাবে।
কবি আল মাহমুদ বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক, জয় বাংলা পুরস্কার, কাজী মোতাহার হোসেন সাহিত্য পুরস্কার ইত্যাদিসহ আরও অনেক পুরস্কার ও পদকে ভূষিত হয়েছেন। সাংবাদিক হিসেবেও তার খ্যাতি অসামান্য। দৈনিক মিল্লাত পত্রিকার প্রুফ রিডার হিসেবে কাজ শুরু করে তিনি ১৯৫৫ সালে সাপ্তাহিক কাফেলার সম্পাদক হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি হয়েছিলেন দৈনিক গণকণ্ঠের সম্পাদক।
কবি আল মাহমুদের কাব্য প্রতিভা ও কবিতার বিষয়বস্তুর কথা শেষ হওয়ার নয়। কবিতায় লোকজ উপাদান যুক্ত করে তিনি কবিতাকে দিয়েছিলেন ভিন্ন মাত্রা। তিরিশের দশকের আধুনিক কবিরা যখন পাশ্চাত্যের প্রভাবে প্রভাবান্বিত, খানিকটা নিরাশাবাদীও, আল মাহমুদ তখন পঞ্চাশের দশকে তার কবিতায় আশ্রয় দিয়েছেন দেশজ সংস্কৃতি, মানবিকতা আর সাম্যবাদ। তার উপমা, শব্দের খেলা ও বক্তব্যের তীক্ষ্মতা কবিতার পাঠকমাত্রকেই আন্দোলিত করে। কথাসাহিত্যেও তিনি রেখেছেন অসামান্য অবদান। তার ‘পানকৌড়ির রক্ত’ একবার পাঠ করলে দ্বিতীয়বার পড়ার সাধ জাগে। তাঁর কথাসাহিত্যে এক চমৎকার উপস্থাপনা শৈলী ও শব্দ চয়ন দেখতে পাই আমরা।
কবি আল মাহমুদের শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। দীর্ঘকাল তিনি কবিতার পাঠককে যেভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলেন, তা কোনদিনও কাটিয়ে উঠবার নয়। তার মৃত্যু পরিণত বয়সেই হয়েছে, তারপরও বলতে ইচ্ছা করে তিনি আরও দীর্ঘ জীবন পেলেই বুঝি ভালো হতো। বস্তুত বাংলা কবিতা, বাংলা সাহিত্য যতদিন বহমান থাকবে, কবি আল মাহমুদও ততদিন থাকবেন আমাদের সঙ্গে। আমরা তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।
