নির্বাচিত কলাম

দায়িত্বহীনতার দায় ও জবাবহীন মৃত্যু

কামাল লোহানী

নয় বছর আগে পুরান ঢাকার নিমতলী ট্র্যাজেডি আমরা এখনও বিস্মৃত হই নি। হওয়ার কথাও নয়। ২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। ওই ঘটনা তদন্ত করে ১৭ দফা সুপারিশ পেশ করেছিল তদন্ত কমিটি। কিন্তু আজও বাস্তবায়িত হয় নি সুপারিশগুলো। আরও স্মরণে আছে, নিমতলীর সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর একটি কেমিক্যাল কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। সে ক্ষেত্রেও হতাহতের চিত্র ছিল বড়ই মর্মন্তুদ। যাত্রাবাড়ীতেও ওই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছিল জুতার আঠা (সলিউশন) তৈরির কারখানা থেকে। আমরা ভুলে যাই নি রাজধানীর মিরপুরে অগ্নিকাণ্ডের সেই মর্মান্তিক ঘটনাটিও। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর ও যুগপৎ প্রশ্নবোধক হলো, ওই ঘটনাগুলোও আমাদের দায়িত্বশীলদের সজাগ করে নি; শিক্ষা দেয় নি। চকবাজারে যে মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটে গেল এর চিত্র ফুটে উঠেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও। ২২ ফেব্রুয়ারি সমকাল শীর্ষ প্রতিবেদন করেছে, ‘মৃত্যুপুরী চকবাজার :দায়িত্বহীনতার আগুন, পুড়ে অঙ্গার ৬৭ প্রাণ।’

দেশের প্রত্যেকটি পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, টিভি চ্যানেলে এই মর্মান্তিক ঘটনা সঙ্গতই শীর্ষে স্থান পাওয়ার পাশাপাশি এর পশ্চাৎ কারণগুলোও তুলে ধরা হয়েছে। চকবাজারে ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে দায়িত্বশীল অনেকেই নানা রকম অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি ফের ব্যক্ত করেছেন। তারা বলেছেন, শিক্ষা পেয়েছি এবার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব; রাসায়নিক গুদাম সরাতে সহায়তা করব; শিগগির সরানো হবে পুরান ঢাকার দাহ্য পদার্থের গুদাম-কারখানা; পুরান ঢাকায় কোনো রাসায়নিক গুদাম থাকবে না; এজেন্সিগুলোর গাফিলতি খতিয়ে দেখা হবে ইত্যাদি। এমন কথা আমরা নিমতলীর ট্র্যাজেডির পরও শুনেছিলাম। আমি মনে করি, সমকালের এ সংক্রান্ত সংবাদ শিরোনামটি যথার্থ। নিমতলী থেকে তো আমাদের দায়িত্বশীলরা কোনো শিক্ষাই নেন নি। উপরন্তু দেখা গেছে দায়িত্বহীনতার উৎকট চিত্র। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রাসায়নিকের গুদাম যে কতটা বিপজ্জনক তা পুরান ঢাকার নিমতলীবাসীর অভিজ্ঞতায় এখনও বেদনার্ত স্মৃতি হয়ে আছে। আমরাও সেই দৃশ্য মানসপটে ভেসে উঠলে এখনও আতঙ্কিত হই। রাসায়নিকের বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন সংশ্নিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। আমি শুধু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন রাখব- দায়িত্বশীলদের দায়িত্বহীনতার কারণে আমরা আর কত লাশ গুনব? আর কত খেসারত দেব? এ দেশে ‘হবে’, ‘হচ্ছে’, ‘করব’, ‘করছি’ ইত্যাদি শব্দের ব্যবহারে দায়িত্ব পালনে যে অপসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে এর খেসারত নানা ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে দিতে হচ্ছে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত-প্রচারিত খবরে জেনেছি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। তিনি রাতভর উদ্ধার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী হতাহতদের পরিবারকে প্রয়োজনীয়তা সহায়তা ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন করারও নির্দেশ দিয়েছেন। এ জন্য তাকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু পাশাপাশি তার প্রতি এই অনুরোধও রাখি- কেন দীর্ঘ নয় বছরেও নিমতলী ট্র্যাজেডির তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়িত হয় নি, তা তিনি খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নিলে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করার পথটা সুগম হবে। তিনি নিজেও নির্দেশ দিয়েছিলেন পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের দোকান-গুদাম সরিয়ে নেওয়ার। তার নির্দেশও কার্যকর হয় নি! কেন এমনটি হলো- এর কারণ উদ্ঘাটনে তিনি যথাযথ পদক্ষেপ নেবেন, এটাও আশা করি। কারণ এবার যে বিপুল জনরায় নিয়ে তিনি সরকার গঠন করেছেন এবং নতুনভাবে দায়িত্ব নিয়ে ইতিমধ্যে অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন, তাতে জনপ্রত্যাশা সঙ্গতই আরও অনেক বেড়েছে।

চকবাজারের চুড়িহাট্টার আগুন মুহূর্তে ছিড়িয়ে পড়ে। সব গ্রাস করে নেয়। আমরা জানি, পুরান ঢাকার অধিকাংশ রাস্তা ঘিঞ্জি, সরু গলি। চকবাজারের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে এ কারণে বেগ পেতে হয়েছে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের। পাশাপাশি এ জন্য ক্ষয়ক্ষতির চিত্রও স্ফীত হয়েছে। আরও জানা গেছে, চকবাজারের আশপাশে আবাসিক ভবনে রাসায়নিক সামগ্রীতে ছিল ঠাসা। ঠিক এমন চিত্র রয়েছে পুরান ঢাকার আরও কয়েকটি এলাকায়। চকবাজারের মর্মন্তুদ ঘটনার পর যথারীতি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে, তদন্ত কমিটির দায়িত্বশীলরা তদন্ত করে কারণ উদ্ঘাটন করার পাশাপাশি হয়তো আবারও কিছু সুপারিশ প্রস্তাব পেশ করবেন। কিন্তু সেই পুরনো ধারায় আবার হয়তো এক পর্যায়ে থেমে যাবে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার এই প্রক্রিয়া। আমাদের অভিজ্ঞতা তো এ রকমই তিক্ত। এরপরও আশা রাখতে চাই, পুনর্বার সংঘটিত অত্যন্ত বেদনাদায়ক এই ঘটনার পর ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর আবাসিক এলাকায় জনস্বাস্থ্য ও অন্যান্য সুবিধা সংরক্ষণ করতে সরকার যথাযথ কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। উপযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে খুব দ্রুত একটি কমিটি গঠন করবে। তারা এ ব্যাপারে যত দ্রুত সম্ভব একটি নীতিমালা তৈরি করবেন। এরপর সরকারের উচিত হবে, একটি পরিকল্পনার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে রাজধানীর আবাসিক এলাকাগুলোয় মানুষের বাসযোগ্যতা রক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। যে কোনো সভ্য সমাজে জনবসতি, কারখানা স্থাপন, দাহ্য পদার্থের দোকান-গুদাম স্থাপনের একটি নিয়ম আছে। এমনকি জনবসতি ও বাণিজ্যিক এলাকার মধ্যেও সুস্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোয় এ নিয়মের কোনো বালাই নেই। শুধু দাহ্য পদার্থই নয়, বিষাক্ত বর্জ্য ও গ্যাস নির্গমন করে- এমন সব কারখানাও অবলীলায় গড়ে উঠছে আবাসিক এলাকায়! প্রশ্ন দাঁড়ায়, তাহলে সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলরা কী করছেন?

মানবিক বিচারে এমন মৃত্যুর দায়ভার সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলরা কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। আমাদের পরিবেশ অধিদপ্তর নামের একটি হাতি পোষার সুফল কী- বিদ্যমান বাস্তবতায় এ প্রশ্নটিও দাঁড়ায়। চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনা মানুষকে নির্বাক করে দিয়েছে। এত মানুষের এমন বীভৎস মৃত্যু! এর দায় তো কাউকে না কাউকে নিতেই হবে। দায়িত্বশীলদের অবহেলাজনিত কারণে এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। বিদেশি গণমাধ্যমগুলোতেও চকবাজারের চুড়িহাট্টার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মর্মান্তিক খবর প্রকাশিত-প্রচারিত হওয়ার পাশাপাশি নানা রকম পশ্চাৎ কারণ উঠে এসেছে। সঙ্গত কারণেই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে সংশ্নিষ্টদের সম্মিলিত ব্যর্থতার বিষয়টি। তাদের ব্যর্থতা, দায়িত্বহীনতা, স্বেচ্ছাচারিতার কারণে বারবার এ ধরনের ঘটনায় আমাদের বীভৎস পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এমন মৃত্যু জবাবহীন। পুরান ঢাকা যেন পরিণত হয়েছে মৃত্যুপুরীতে। পুরান ঢাকার বাসিন্দারা নিত্য নানা কারণে আতঙ্কের মধ্যে থাকলেও কোনো অঘটন না ঘটা পর্যন্ত দায়িত্বশীলদের যেন ঘুম ভাঙে না। চকবাজারের ঘটনা তো ফের তাই প্রমাণ করল। শুনেছিলাম নিমতলীর ঘটনার পর রাসায়নিকের গুদাম সরিয়ে নিতে পল্লী প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নাকি নিয়েছিল শিল্প মন্ত্রণালয়। কিন্তু কী কারণে তা বাস্তবায়িত হলো না, এর কারণটিও আমরা জানতে চাই।

চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডে বাঁচতে গিয়ে, বাঁচাতে গিয়েও কতজন পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছেন! ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে স্বজনদের যে আহাজারি দেখা কিংবা শোনা গেছে গণমাধ্যমের কল্যাণে, তাতে অনুমান করা মোটেও দুরূহ নয় পরিবেশ কতটা ভারি হয়ে উঠেছিল। এখনও তা-ই আছে। এমন মর্মন্তুদতার সান্ত্বনা নেই। আমরা দায়িত্বশীলদের কাছ থেকে আর কোনো রকম লোক দেখানো কর্মকাণ্ড কিংবা প্রতিশ্রুতি আর শুনতে চাই না। আমরা চাই দ্রুত তারা শিক্ষা গ্রহণ করবেন এবং করণীয় যা কিছু সেসবই সম্পন্ন করবেন দ্রুততার সঙ্গে। যদি এমন হতো যে, সব ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা সত্ত্বেও একেবারেই আকস্মিকভাবে ঘটনাটি ঘটে গেছে, তবুও কিছুটা সান্ত্বনা খুঁজে পাওয়া যেত। কিন্তু চকবাজারে যা ঘটেছে তাকে যদি বলি একটি পূর্বঘোষিত বিপর্যয়, তাহলে কি অত্যুক্তি হবে? এ ধরনের বিপর্যয় যে অবধারিত নিমতলীর অগ্নিকাণ্ড সেই বার্তাই দিয়েছিল। পুরান ঢাকার শত শত রাসায়নিক গুদাম ও কারখানার তালিকা করে কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের কথাও শোনা গিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেন কাজটি হয়নি এর উত্তর সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলরাই কেবল দিতে পারবেন। কাতর চোখগুলো এখনও খুঁজছে প্রিয়জনের মুখ। আমাদের স্পষ্ট কথা, এমন দায়িত্বহীনতা, উদাসীনতা, দীর্ঘসূত্রতা, কোনো রকম জটিলতা যাতে সৃষ্টি না হয় এমন মর্মন্তুদতার। দায়িত্বশীলরা এবার অন্তত নড়েচড়ে বসুন। কাজের কাজটি করুন।

রাসায়নিক পদার্থ অত্যন্ত দাহ্য- এ তো সচেতন মানুষ মাত্রই জানেন। তা আগুনের স্পর্শে এলে কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, সেই অভিজ্ঞতা যে আমাদের নেই তাও তো নয়। কিন্তু এরপরও গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ডিএসসিসি পুরান ঢাকার পাঁচ শতাধিক রাসায়নিক পদার্থের ব্যবসায়ীর লাইসেন্স নবায়ন করেছে। এও তো স্ববিরোধিতাই বলতে হবে। শুধু ব্যবসায়ী কেন সবাইকেই যথাযথ নিয়ম চলতে হবে। আইনের প্রয়োগ সব ক্ষেত্রে হতে হবে সমান। দায়িত্বশীল সবাইকে দায়িত্ব পালনে নিতে হবে নির্মোহ অবস্থান। পুরান ঢাকায় রাসায়নিক পদার্থের ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স নবায়ন করার পর প্রশ্ন জেগেছে- এই দোকানগুলো ওখান থেকে সরাতে কর্তৃপক্ষ কতটা আন্তরিক? এমন প্রেক্ষাপটে আশ্বাসের পুনরাবৃত্তি নিয়েও নানা রকম প্রশ্ন দাঁড়ায়। আর কত প্রাণ গেলে সচেতন হবো আমরা? কবে ঘটবে চৈতন্যোদয়? বাণিজ্যের কাছে কি মানুষের জীবন মূল্যহীন থেকেই যাবে! না, তা কোনোভাবেই হতে পারে না। এ দেশে নানাভাবে অপমৃত্যু ঘটছে আর অবিরাম অশ্রুপাতও চলছে। সড়ক-মহাসড়কের চিত্র পর্যালোচনা করলেও এরই প্রমাণ মেলে। ২২ ফেব্রুয়ারি একটি পত্রিকার প্রতিবেদনে দেখলাম, ৪১৬টি হাসপাতালে রয়েছে অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহ ঝুঁকি। এর মধ্যে ১০৫টির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। ক’দিন আগে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে এই চিত্র মিলেছে। চকবাজারের বীভৎস ঘটনার পর আমাদের দাবি-লাশের মিছিল যেন আর দীর্ঘ না হয় কারও অবহেলা, উদাসীনতা কিংবা স্বেচ্ছাচারিতায়, তা নিশ্চিত করা হোক। যদিও বলতে হয়- মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না, এটাই ইতিহাসের সাধারণ শিক্ষা। চকবাজার ট্র্যাজেডি এরই সাক্ষ্যবহ।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension