
নির্বাচিত কলাম
যে ভূখণ্ড কখনোই তাদের ছিল না
ড. মাহবুবা নাসরীন
গত ১৪ মার্চ বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে সংঘটিত সন্ত্রাসী ও নৃশংস ঘটনায় সারাবিশ্ব মর্মাহত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য বিশেষ উদ্বেগের কারণ হলো জাতীয় ক্রিকেট দলের সিংহভাগ খেলোয়াড়ের জন্য। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নিউজিল্যান্ডবাসীসহ সন্ত্রাসের শিকার নিহত ও আহতদের জন্য ছিল সমব্যথা, আকুলতা ও উদ্বেগ। নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশের হাইকমিশন নেই, যেমনটি বাংলাদেশে নেই সেদেশটিরও। তাই কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখতে হয় অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের মাধ্যমে। তবে নিউজিল্যান্ডস্থ অকল্যান্ডে আছে বাংলাদেশের কনস্যুলার অফিস। এই দুই দেশ থেকে সরকারি পর্যায়ে হতাহতদের খবর বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে। যারা দেশটিতে বসবাস করেছেন স্বল্প বা দীর্ঘ সময়ের জন্য, তারা এই শান্তিপ্রিয় বর্ণবাদমুক্ত দেশটির কথা জানেন।
উচ্চশিক্ষার্থে ১৯৯১ সালে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে প্রায় চার বছর নিউজিল্যান্ডে বসবাস করার সুযোগ হয়েছে আমার। সে সুবাদে ওই দেশের বন্ধু-শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছি। স্বাভাবিকভাবেই নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকতে পারি নি। বিশেষত ক্রাইস্টচার্চে আমাদের খুব ঘনিষ্ঠ একজন ইমেরিটাস অধ্যাপকের ছেলে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত। তাকে ফোন করেই বুঝতে পারি, অধ্যাপক দম্পতি ভয়ানক রকম উদ্বেগ ও শঙ্কার মধ্যে আছেন। তারা ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে নিউজিল্যান্ডে বসবাস করেন। বারবার আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন, সন্ত্রাসী ‘কিউই’ (জাতীয় পাখির নামে নিউজিল্যান্ডের নাগরিকদের এই নামে ডাকা হয়) থেকে নয়, অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছে। এই ভূমিতে যারা বেড়ে উঠেছে, তারা এমন নয়। আমারও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় না যে, সুনসান নীরবতা আর শান্তিপ্রিয় এই দেশে এ ধরনের সন্ত্রাসী হামলার জন্য সরকার থেকে শুরু করে কোনো মানুষই প্রস্তুত ছিল না।
দুর্নীতিমুক্ত আর বসবাসের জন্য বিশ্বে দ্বিতীয় নিরাপদ দেশ হিসেবে নিউজিল্যান্ড ইতিমধ্যে অনেকেরই পছন্দের দেশ হিসেবে স্থান করে দিয়েছে। কর্মসংস্থানের জন্য আমাদের পরিচিত অনেকেই বৃহৎ ও কোনো না কোনো দেশে পাড়ি জমিয়েছে। নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া এই দুই দেশের নাগরিকের উভয় দেশেই কাজ করার (ওয়ার্ক পারমিট) সুযোগ পেত। বছর কয়েক আগে নিউজিল্যান্ডদের জন্য এই সুযোগ আর থাকবে না- এই সংবাদে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন অভিবাসী নাগরিকরা অন্য দেশে চলে যেতে শুরু করেন। তবুও অনেকেই রয়ে যান। শুধু চাকরির জন্য নয় বরং অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশকে ভালোবেসে। ইমিগ্রেশন নিয়ে বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা নিউজিল্যান্ডে আসতে থাকেন নব্বইয়ের দশক থেকেই। কিউইদের সততা, বন্ধুবাৎসল্য আর সহযোগিতা যারা পেয়েছেন তারা জানেন, এদের মধ্যে দৃশ্যমান বর্ণবিদ্বেষ নেই বললেই চলে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নিউজিল্যান্ডদের আদিবাসী হিসেবে তারা মাওরি জনগোষ্ঠীর মিথকে গুরুত্ব দিয়ে নিজের দেশের ইতিহাস বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরে। ক্রিকেট থেকে শুরু করে সব জাতীয় অনুষ্ঠানের শুরু হয় মাওরি আদিবাসীদের ‘হাকা’ দিয়ে। এই দ্বীপটিতে ইউরোপিয়ানদের আগমন ঘটে ৩৬০ বছর আগে ডাচ্ পর্যটক আদেল তাসমানের সময়ে। আদেল তাসমান দুর্যোগের কারণে এখানে বসবাসযোগ্য মনে করেন নি।
পরবর্তীকালে ব্রিটিশ পর্যটক জেমস কুক ১৭৬৯ সালে এই ভূখণ্ডে এসে আবাস গড়েন। ধীরে ধীরে এ দেশের জনসংখ্যা বেড়ে ৩.৩০ মিলিয়ন হয়; যার ১০ শতাংশ মাওরি আদিবাসী। আয়তনে বাংলাদেশের তিন গুণ বড় নিউজিল্যান্ড। এই স্বল্প জনগোষ্ঠীর মধ্যে সব ধর্মাবলম্বীর ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ বসবাস। মানুষের ধর্ম-পরিচয় তেমন করে কখনোই বড় হয়ে দেখা যায় নি। নিকটস্থ বিভিন্ন ক্ষুদ্র দ্বীপ থেকে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরা বিশেষত ফিজি, সামোয়া, পাপুয়াগিনি যাদের অনেকে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ছিল, যারা এখানে বসবাসের জন্য এসেছে। মানবাধিকার রক্ষার দিক থেকে আমার দেখা ৩৪-৩৫টি দেশের মধ্যে নিউজিল্যান্ডকে অনন্য মনে হয়েছে। যেখানে অস্ট্রেলিয়াতে এবরিজিন বা আদিবাসীদের সীমাহীন অবহেলা দেখেছি, সেখানে নিউজিল্যান্ডে মাওরি জনগোষ্ঠী ও অভিবাসীদের প্রতি ছিল বিশেষ দৃষ্টি। কিছু কিছু ব্রিটিশ মনোভাব এক প্রজন্মের মধ্যে লক্ষ্য করা গেলেও নতুন প্রজন্ম বা তরুণদের মধ্যে দেখা যায়নি। তার প্রমাণ অভিবাসীদের মধ্যে শ্রীলংকার তামিল জনগোষ্ঠীর আধিক্য।
ক্রাইস্টচার্চের মতো নৃশংস সন্ত্রাসের জন্য নিউজিল্যান্ড একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। যে দেশ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে চলে এসেছি, সেখানে আজও আমার মতো কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী লাইব্রেরিতে ছাতা বা দোকানে টাকার থলে ফেলে এসে দু’দিন পরেও একই জায়গায় ফিরে পায়। আমার দেখা অপরাধের মধ্যে একবার শুধু কোনো এক বাসায় ছিঁচকে চোর ঢুকেছে শুনেছি। আমার বাসা ছিল সুউচ্চ পাহাড়ে। সেখান থেকে একা একা দিনে-রাতে অসংখ্যবার নিঃশব্দ নীরবতার মধ্যে প্রাকৃতিক সিঁড়ির পথ বেয়ে ম্যাসি ইউনিভার্সিটিতে গেছি। কোনো এক ‘কিউই’ মিষ্টি হেসে জগিং করতে করতে পাশ দিয়ে চলে গেছে। কেউ একজন বিমানবন্দরে আমার হাতের বড় ব্যাগ টেনে ট্রলিতে তুলে দিয়েছে। ঠাট্টা করে কিউই বন্ধু (পিএইচডি সহপাঠী) প্রায়ই বলত, ‘হান্ড্রেড অ্যান্ড টেন মিলিয়ন পিপল, অ্যান্ড ইউ ডোন্ট হ্যাভ এন ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট টিম?’ বাংলাদেশের জাতীয় দল যখন নিউজিল্যান্ডে গেল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই কিউই ‘পাকেহা’কে (শ্বেতাঙ্গদের এই নামে ডাকা হয়) জানালাম। যা হোক, মাওরি আর পাকেহাদের বিয়ে আর প্রেম নিয়ে তখনও কিছুটা রক্ষণশীলতা ছিল। কিছু কিছু অসহযোগিতা বা মাওরিদের নিষ্ফ্ক্রিয়তা, লেখাপড়ায় অনাগ্রহ নিয়ে গবেষণা হতো। তবে ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক সহিংসতা কখনও শোনা যায় নি। কয়েক বছর আগে বাংলাদেশি একজন ক্যাবচালকের টাকা ছিনতাই করেছে বখাটেরা। সেখানে এই খবরটি শুনেছি। বড় কোনো বৈষম্য হয় নি বরং ইসলাম ও হিন্দু ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো ছাড়াও বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালন আজকাল অনেক আড়ম্বরপূর্ণভাবে হয়। আমরা ছোট্ট একটি শহরে প্রথম একটি আন্তর্জাতিক দিবসে বাংলাদেশ স্টল, দেশাত্মবোধক গান এগুলোর আয়োজন করি। যাতে দুই বাংলার বাঙালিসহ কিউই বন্ধুরা অংশ নেয়।
এবার আসি ক্রাইস্টচার্চ প্রসঙ্গে। নিউজিল্যান্ড দুটি দ্বীপে বিভক্ত- নর্থ (উত্তর) ও সাউথ (দক্ষিণ)। উত্তরের চেয়ে দক্ষিণের সৌন্দর্য নিয়ে প্রচণ্ড ঠাণ্ডার গল্প শুনেছি। প্যাসিফিকের ওপর দিয়ে সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে ইন্টার আইল্যান্ডার ফেরি যখন আমাদের ক্রাইস্টচার্চে নিয়ে গেল, দেখলাম এক অপরূপ ভূমিকে। ক্যান্টারবুরির এই শহরের পার্ক, ওক গাছের সারি, হিথকোট নদী, গোথিক আর ভিক্টোরিয়ান যুগের সৌন্দর্য, অ্যাংলিকান ক্যাথেড্রাল, মসজিদ আর কিছুটা ব্রিটিশ নির্মাণভিত্তিক স্থাপত্য দেখলাম। আমার স্বামী তার যমজ ভাইসহ আল নূর মসজিদে নামাজও পড়ল একদিন। ক্রাইস্টচার্চ দক্ষিণ দ্বীপের সবচেয়ে বাণিজ্যিক কেন্দ্র, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং অনেক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রও আছে। ‘মাল্টিকালচারালিজম’ বলতে আর ‘ইনক্লুসিভ’ সমাজ বলতে যা বোঝায়, তা পুরোপুরি নিউজিল্যান্ডেই ছিল।
বিমানবন্দরের সুচারু নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ডগস্কোয়াড আছে বলে নিউজিল্যান্ডে নেইল কাটার, খাবার, ফল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা কেউ করে না। স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় পেরিয়ে গেলে হাসপাতাল থেকে চিঠি চলে আসত। অ্যান্টিবায়োটিক তেমন নেওয়া লাগে না। কারণ সংক্রামক রোগ নেই।
সেই দেশে এই নৃশংস সন্ত্রাসী হামলাকারীর কোনো স্থান হতে পারে না। যেখানে নিউজিল্যান্ডবাসী ইউরোপিয়ানরা স্বীকার করেছে যে, এই ভূমিতে মাওরি হচ্ছে আদিবাসী। সেখানে অস্ট্রেলীয় বংশোদ্ভূত কট্টর ডানপন্থি বর্ণবাদের বিষ নিয়ে প্রার্থনারত নিরস্ত্র মুসলমানদের ওপর নৃশংস হামলাকে তারা শক্ত হাতে প্রতিহত করবে বলে বিশ্বাস করি। নিউজিল্যান্ডকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার এবং আপামর জনসাধারণও এ বিষয়ে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করবে। সন্ত্রাসবাদ, বর্ণবাদ বিশ্ব থেকে চিরতরে বিদায় দেবে নতুন প্রজন্ম। এ জন্য প্রয়োজন কঠোর আইন, অস্ত্র আইনের পরিবর্তন ও বিশ্ববাসীর একাত্মতা।
যে অমূল্য প্রাণ ঝরে গেল, যত মানুষ আহত হলো, যারা প্রত্যক্ষদর্শী তাদের সবার ত্যাগের মহিমাকে ধরে কঠোর হাতে সন্ত্রাস প্রতিরোধ করতে হবে। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যেখানেই যাক না কেন, তাদের নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। বিশেষত যে কোনো খেলার উদ্দেশ্যে বিদেশগামী খেলোয়াড়দের।
অধ্যাপক ও পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



