আন্তর্জাতিক

আমৃত্যু কারাগারেই থাকতে হবে যুক্তরাজ্যের ‘সিরিয়াল কিলার’ সেই নার্সকে

কারাগার থেকে জীবিত বের হতে পারবেন না যুক্তরাজ্যের ‘সিরিয়াল কিলার’ নার্স লুসি। সাত শিশুকে হত্যার দায়ে তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। বিচারে তাঁর বিরুদ্ধে আরও ছয় শিশুকে হত্যা চেষ্টার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

আজ সোমবার সন্ধ্যায় বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ম্যানচেস্টার ক্রাউন কোর্টের বিচারক জেমস গস লুসি লেটবির বিরুদ্ধে আজীবন কারাদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছেন। তবে রায় ঘোষণার সময় তিনি কাঠগড়ায় ছিলেন না লুসি। এজলাসে হাজির হতে চাননি তিনি।

রায় ঘোষণার পর আদালত কক্ষে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। তখন নিহত শিশুদের দু-এক জনের বাবা-মা ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন।

এজলাসে না থাকলেও লুসিকে উদ্দেশ্য করে বিচারক বলেন, ‘আমি আপনাকে আজীবনের জন্য কারাদণ্ড দিচ্ছি। আমি এটাও নির্দেশ দিচ্ছি যে, জীবদ্দশায় আপনার মুক্তির জন্য কোনো আবেদনও যেন গৃহীত না হয়। প্রত্যেকটি অপরাধের জন্যই আপনাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিচ্ছি এবং বাকি জীবন আপনি কারাগারেই থাকবেন।’

যুক্তরাজ্যের কাউন্টেস অব চেস্টার হাসপাতালের নবজাতক ইউনিটে নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন লুসি লেটবি। সেখানেই তিনি হত্যাকাণ্ড ও হত্যাচেষ্টার ঘটনাগুলো ঘটিয়েছেন। লুসি লেটবিকে আধুনিক যুক্তরাজ্যে শিশু হত্যায় সবচেয়ে বড় ‘সিরিয়াল কিলার’ বলা হচ্ছে।

৩৩ বছর বয়সী লুসি ২০১৫ সালের জুন থেকে ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত মাত্র এক বছরের মধ্যেই সবগুলো অপরাধ সংঘটন করেন। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে শিশুদের ইনজেকশনে বাতাস ঢুকিয়ে দিতেন এবং জোর করে মাত্রাতিরিক্ত দুধ পান করানো ছাড়াও নবজাতকের শরীরে ইনসুলিন আকারে বিষ প্রয়োগের ঘটনাও ঘটিয়েছেন।

বিচারে সর্বশেষ রায়ের দিন আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে অস্বীকার করেন লুসি। প্রায় ৭৬ ঘণ্টার দীর্ঘ আলোচনার পর ৮ আগস্ট বিচারক প্যানেল প্রথম অভিযোগের রায় পড়েছিলেন। এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন লুসি। ১১ আগস্ট দোষী সাব্যস্ত করে দ্বিতীয় রায় পড়ার সময়ও মাথা নিচু করে কেঁদেছিলেন তিনি।

এই বিচারের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশে ইতিপূর্বে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও লুসি দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর গণমাধ্যমগুলোকে প্রতিবেদন প্রকাশের অনুমতি দেওয়া হয়।

বিবিসি জানিয়েছে, ২০২২ সালের অক্টোবরে লুসি লেটবির বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। সে সময় প্রসিকিউশন তাঁকে ‘বিপথগামী’ হিসেবে আখ্যা দেয় এবং বলে যে নিজের হত্যাচেষ্টাগুলোকে গোপন করার জন্য তিনি সহকর্মীদের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করেছিলেন।

একের পর এক শিশু হত্যার এই বিষয়টি বিশ্বজুড়ে নাড়া দিয়েছে। অনেকেই শিশুগুলোকে কী কারণে লুসি হত্যা করেছেন তা জানতে উদ্‌গ্রীব ছিলেন।

বিভিন্ন গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, লুসি কেন এসব করেছিলেন সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কোনো কিছু জানা যায়নি। তবে এসব হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কিছু কারণ আদালতে তুলে ধরেছেন আইনজীবীরা। এর মধ্যে এক চিকিৎসকের প্রতি তাঁর দুর্বলতা ও গোপন সম্পর্কের কথাও প্রকাশ্যে এনেছেন তাঁরা।

শুনানিতে আইনজীবীরা জানিয়েছেন, হাসপাতালটিতে কোনো শিশুর অবস্থা গুরুতর হলেই ওই চিকিৎসককে চিকিৎসার জন্য ডাকা হতো। তাই লুসি হয়তো শিশুদের ওপর হামলা করে গুরুতর অসুস্থ বানিয়ে ওই চিকিৎসককে কাছে পেতে চাইতেন।

আদালতের নথিতে উল্লেখ আছে, লুসি এবং সেই চিকিৎসক হাসপাতালের বাইরেও বেশ কয়েকবার দেখা করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে হওয়া কথোপকথনগুলো ভালোবাসার ইমোজিতে ভরা।
তবে চিকিৎসকের সঙ্গে গোপন সম্পর্কের বিষয়টিকে অস্বীকার করেছেন লুসি লেটবি।

আইনজীবীরা দাবি করেছেন, মানসিকভাবে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিলেন লুসি। শিশুদের ক্ষতি করে তিনি হয়তো নিজেকে সৃষ্টিকর্তার মতো শক্তিমান কোনো কিছু ভাবতেন। যা ঘটছিল তা থেকে আনন্দ পাচ্ছিলেন। শিশুদের আঘাত করে তিনি হয়তো পৈশাচিক কোনো আনন্দ পেতেন। আর আঘাতের পর কী ঘটতে যাচ্ছে—তা অনুমান এবং মিলিয়ে দেখতেন তিনি।

জানা গেছে, লুসি লেটবিকে দুইবার গ্রেপ্তার করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। ২০২০ সালে তৃতীয়বার গ্রেপ্তারের পর তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হয়। তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে হাসপাতালের কিছু কাগজপত্র ও হাতে লেখা একটি চিরকুটও পায় পুলিশ। চিরকুটে লেখা ছিল–‘আমি খুব খারাপ, আমি এটা করেছি।’

এ ছাড়াও লুসি লেটবির লেখা কিছু কাগজপত্রও উপস্থাপন করা হয় আদালতে। একটি কাগজে লেখা ছিল, ‘আমি তাদের হত্যা করেছি; কারণ, তাদের পরিচর্যার কাজে আমি অতটা ভালো নই।’

আরেকটি কাগজে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি কখনোই সন্তান নেব না, বিয়েও করব না। পরিবার কেমন, তা আমি কখনোই জানতে পারব না।’

এদিকে বিচারকদের কাছে লুসি দাবি করেন, যেসব শিশুর কম যত্নের প্রয়োজন হতো, তাদের পরিচর্যা করে তিনি কোনো আনন্দ পেতেন না। শিশুরা বেশি অসুস্থ থাকলেও তিনি কাজে মনোযোগ দিতে পারতেন।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension