যুক্তরাষ্ট্র

পড়াশোনা শেষে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করতে লাগতে পারে ১ লাখ ডলারের ফি

যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সে দেশে কাজ করার অনুমতি পেতে ১ লাখ ডলার ফি দেওয়ার নিয়ম চালুর কথা বিবেচনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানা গেছে। এই নিয়মটি কার্যকর করা হলে তা বিদেশিদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করার আগ্রহকে অনেক কমিয়ে দেবে।

আইনটি পাস হলে তা বৈধ অভিবাসন সীমিত করার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চলমান প্রচেষ্টাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে। তবে এটি বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে, যারা আয়ের একটি বড় ও নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে এটি সিলিকন ভ্যালি এবং ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর ক্ষতি করবে, যা প্রযুক্তিগত ও জটিল কাজের জন্য বিপুল সংখ্যক আন্তর্জাতিক গ্র্যাজুয়েট বা ডিগ্রিধারীদের নিয়োগ দিয়ে থাকে।

এই নতুন ফি-টি ‘অপশনাল প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং’ বা ওপিটি নামের একটি কর্মসূচির ওপর আরোপ করা হবে। এই কর্মসূচির আওতায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষ করার পর তাদের স্টুডেন্ট ভিসার অধীনেই এক থেকে তিন বছর পর্যন্ত কাজ করার সুযোগ পান। সর্বশেষ পাওয়া ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, সে বছর প্রায় ৪ লাখ ১৯ হাজার বিদেশি ওপিটি-র অধীনে কাজ করছিলেন।

এই পদক্ষেপের মাধ্যমে মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের সেই লক্ষ্যই বাস্তবায়িত হবে, যা আগে বিদেশি পেশাজীবীদের জন্য এইচ-১বি ভিসার ওপর ১ লাখ ডলার ফি আরোপের মাধ্যমে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। গত বছর এই ফি নির্ধারণের ঘোষণা সিলিকন ভ্যালিতে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল। তবে গত সপ্তাহে বোস্টনের একটি আপিল আদালত সরকারকে এই এইচ-১বি ফি আদায় করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়ে তা আটকে দেয়।

যদিও কর্মকর্তারা মূলত সমস্ত এইচ-১বি ভিসার ওপর এই ফি প্রয়োগ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু প্রযুক্তি জায়ান্টদের তীব্র বিরোধিতার মুখে প্রশাসন শেষ পর্যন্ত তা কেবল বাইরে থেকে আসা নতুন কর্মীদের জন্য সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিল। সাধারণত, বাইরে থেকে সরাসরি এইচ-১বি ভিসায় আসা কর্মীরা আইটি এবং অ্যাকাউন্টিং ফার্মগুলোতে বেশি যোগ দেন।

অন্যদিকে প্রযুক্তি ও ফাইন্যান্স খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শীর্ষস্থানীয় মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে সরাসরি গ্র্যাজুয়েটদের নিয়োগ দিতে পছন্দ করে এবং কয়েক বছর পর তাদের স্টুডেন্ট ভিসা থেকে এইচ-১বি ভিসায় রূপান্তর করে। ফলে, ওপিটি-র ওপর ১ লাখ ডলারের এই নতুন ফি-টি সরাসরি এই শীর্ষ প্রযুক্তি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করে আনা হচ্ছে।

ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস)-এর এক মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত কোনো নীতিকেই চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। আমাদের বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থার অখণ্ডতা রক্ষা করতে আমাদের কাছে থাকা সব ধরনের হাতিয়ার কীভাবে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে আমরা ডিএইচএস-এ সবসময় আলোচনা করে থাকি।’

ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন কর্মকর্তাদের কাছে এই ১ লাখ ডলারের ফি এখন একটি নিয়মিত হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। সীমিত আয়ের বিদেশিদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ বন্ধ করতে তাঁরা একের পর এক নীতিগত প্রস্তাব তৈরি করছেন। এইচ-১বি এবং স্টুডেন্ট ভিসা ছাড়াও, স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থেকে গ্রিন কার্ডের আবেদনকারীদের জন্য ১ লাখ ডলারের একটি বন্ড বা জামানত নেওয়ার কথা ভাবছেন, যা কেবল তারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে নাগরিকত্ব পাওয়ার পরই ফেরত পাবেন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ওপিটি-র ওপর ১ লাখ ডলারের এই নতুন ফি-র বিষয়টি এখনও ডিএইচএস-এ আলোচনাধীন রয়েছে এবং হোয়াইট হাউস এটি অনুমোদন করবে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। এমনকি এই ফি আসলে কাকে দিতে হবে—আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের নিজেদের, নাকি তাদের সম্ভাব্য বিশ্ববিদ্যালয় বা নিয়োগকর্তাদের—তাও এখনও স্পষ্ট নয়।

চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত একটি নতুন নিয়মের সাথে এই ফি-টি যুক্ত হতে পারে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ওপিটি ব্যবহার করতে হলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের তাঁদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আবেদন করতে হবে। এর আগে পর্যন্ত, স্টুডেন্ট ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পড়াশোনার মেয়াদের পাশাপাশি অতিরিক্ত তিন বছর পর্যন্ত কাজের অনুমোদনের জন্য বৈধ থাকত।

ডিএইচএস ওপিটি-র নিয়মগুলো সম্পূর্ণ নতুন করে লেখার জন্য একটি বড় আকারের রেগুলেশন বা প্রবিধানের ওপর কাজ করছে। এটি চলতি শরতের (ফল) মধ্যেই প্রকাশিত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাওয়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ওপিটি প্রোগ্রামটি অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। অভিবাসনপন্থীদের দাবি, ওপিটি না থাকলে বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী স্নাতক শেষ করার পরপরই দেশ ছাড়তে বাধ্য হবেন, যা তাঁদের মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জিত দক্ষতা বাইরের বাজারে নিয়ে যেতে বাধ্য করবে।

অভিবাসনবিরোধীরা দীর্ঘদিন ধরে ওপিটি প্রোগ্রামকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে চাইছেন। তাদের দাবি, এটি কোনো কঠোর নিয়ম ছাড়াই কোম্পানিগুলোকে স্নাতক শেষ করার পরপরই সরাসরি বিদেশি শিক্ষার্থীদের নিয়োগ করার সুযোগ দেয়; যার ফলে মার্কিন গ্র্যাজুয়েটদের তুলনায় বিদেশি গ্র্যাজুয়েটদের কম বেতন দেওয়া হচ্ছে কি না, তা যাচাই করার কোনো পথ থাকে না।

এর আগে প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের মেয়াদে স্টিফেন মিলারসহ শীর্ষ অভিবাসন কর্মকর্তারা ‘স্টেম ওপিটি’ নামক প্রোগ্রামটি বা সুযোগটি বিলুপ্ত করার পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন, যা গণিত বা বিজ্ঞান বিভাগের গ্র্যাজুয়েটদের তিন বছর পর্যন্ত কাজের অনুমোদন দেয়। তবে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারসহ প্রশাসনের ব্যবসা-বান্ধব সদস্যদের বিরোধিতার মুখে তাদের সেই দাবি ভেস্তে গিয়েছিল।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension