
রসায়নে নোবেল: ‘মিরর ইমেজ’ ধাঁধার জট খোলার স্বীকৃতি পেলেন দুই বিজ্ঞানী
জাপানের বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই ও ফ্রান্সের বিজ্ঞানী হেনরি কাগান এ বছর রসায়নে নোবেল পুরস্কার জিতেছেন। রাসায়নিক অণুর ‘মিরর ইমেজ’ বা দর্পণ প্রতিবিম্ব নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণার জন্য তাঁদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এই আবিষ্কার ওষুধ শিল্পের বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ সময় বুধবার বিকেলে সুইডেনের স্টকহোমে রয়াল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করে। নোবেল জুরি বোর্ড জানিয়েছে, ‘অপ্রতিসম জৈব সংশ্লেষণে নন-লিনিয়ার ইফেক্ট ও অটোক্যাটালাইসিস আবিষ্কারের’ স্বীকৃতি হিসেবে দুই গবেষককে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। ওষুধ উৎপাদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যেসব রসায়নবিদ বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার নকশা নিয়ে কাজ করেন, তাঁদের কাছে এই আবিষ্কারের গুরুত্ব অপরিসীম।
রসায়নে নোবেল কমিটির প্রধান হাইনার লিংকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, কীভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হোমোকাইরালিটির উদ্ভব হয়- তা শত বছর ধরে রহস্য হয়ে ছিল। হেনরি কাগান ও কেনসো সোয়াই সেই রাসায়নিক রহস্যের সমাধান করেছেন। তাঁদের উদ্ভাবিত রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলো অভাবনীয়।
হেনরি কাগান বর্তমানে ফ্রান্সের ইউনিভার্সিটি প্যারিস-সুদ-এর সঙ্গে যুক্ত আছেন। অন্যদিকে কেনসো সোয়াই টোকিও ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সে কাজ করছেন। ১৯০১ সালের পর থেকে ১১৭ বার রসায়নে নোবেল দেওয়া হয়েছে, পেয়েছেন ১৯৮ ব্যক্তি। দুইবার পেয়েছিলেন যুক্তরাজ্যের ফ্রেডরিক স্যাঙ্গার ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যারি শার্পলেস।
দুই বিজ্ঞানীর আবিষ্কারটির বিষয়ে নিজেদের ওয়েবসাইটে একটি ব্যাখ্যা প্রকাশ করেছে নোবেল কর্তৃপক্ষ।
রসায়নবিদদের প্রায়ই জীবের মৌলিক অণুগুলো নিয়ে বেশ কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়। ধরুন, আপনি একজন তালা-চাবি প্রস্তুতকারক। গ্রাহকের ফরমায়েশ অনুযায়ী চাবি বানান। সমস্যা হলো, একটি চাবির নকশা তৈরি ও সেটি কাঠামোতে রূপ দেওয়ার সময় একই রকম আরেকটি প্রতিবিম্ব বা রূপ তৈরি হয়। এটি হলো মিরর ইমেজ বা দর্পণ প্রতিবিম্ব।
দর্পণ প্রতিবিম্ব। ইলাস্ট্রেশন: দ্য রয়াল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস
দুই চাবির মধ্যে কেবল আসলটিই তালার ভেতর ঠিকভাবে বসবে। কিন্তু একইরকম নকশা হওয়ায় কোনটি আসল চাবি তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যায়। রসায়নবিদরা যখন নতুন ওষুধ তৈরি করেন, তখন তাদেরকে ঠিক একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়।
অনেক ওষুধের অণুর দুটি ভিন্ন রূপ থাকে। সেগুলো চাবি তৈরির মতোই মিরর ইমেজ সমস্যা তৈরি করে। ওষুধের দুই অণুর যেটি আসল বা মৌলিক সেটিই কেবল মানুষের রোগ সারায়। অন্যটি শরীরের ভেতর কোনো কাজে লাগে না এবং অনেক সময় ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
এই দুই অণুর বিষয়টি জীবের মৌলিক রসায়নের সঙ্গে যুক্ত। রসায়নবিদদের ভাষায় জীবন হলো ‘হোমোকাইরাল’। গ্রিক এই পরিভাষাটির অর্থ ‘একই রকম’ বা ‘হাত’। মানুষের দুই হাতের মতো সব অ্যামিনো অ্যাসিডেরও দুটি রূপ আছে। কীভাবে ‘হোমোকাইরালিটি’ উদ্ভব হয়, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করেছেন রসায়নবিদরা। নোবেলজয়ী দুই বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই ও হেনরি কাগান সেই জটিল ধাঁধার সমাধান বের করেছেন।
দুই বিজ্ঞানীর গবেষণার ব্যাখ্যা দেন রসায়নে নোবেল কমিটির প্রধান হাইনার লিংকে। ছবি: এএফপি
হেনরি কাগান রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের একটি নতুন উপায় আবিষ্কার করেন। এর মাধ্যমে কোনো অণুর দুই ধরনের রূপের মধ্যে একটি অন্যটির তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে তৈরি করা সম্ভব। যেসব রসায়নবিদ ওষুধ, সুগন্ধি, স্বাদবর্ধক (ফ্লেভার) ও নতুন উপকরণ উৎপাদনের জন্য রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ে কাজ করেন, তাঁদের জন্য কাগানের আবিষ্কারটি এক যুগান্তকারী ঘটনা।
অন্যদিকে, কেনসো সোয়াই প্রথমবারের মতো ভিন্ন ধরনের একটি রাসায়নিক বিক্রিয়ার নকশা তৈরি করেছেন। সেখানে সম্ভাব্য দুটি রূপের মধ্যে কেবল একটি রূপ তৈরি করা যায়। এই বিক্রিয়াটি পরে ‘সোয়াই রিঅ্যাকশন’ নামে পরিচিতি পায়। বর্তমানে এটি রসায়নের সবচেয়ে চমকপ্রদ পরীক্ষাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।
গত বছর যারা পেয়েছিলেন
‘মেটাল অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্কস’ উন্নয়নের জন্য ২০২৫ সালে রসায়নে নোবেল পান তিনজন। তারা হলেন, জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সুসুম কিতাগাওয়া, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের রিচার্ড রবসন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বার্কলি) ওমর এম ইয়াঘি।
বিজয়ীরা অণুগঠিত একটি কাঠামো তৈরি করেছিলেন। যেটির মধ্য দিয়ে গ্যাস ও অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ প্রবাহিত হতে পারে। এই কাঠামোগুলোকে বলা হয় ‘মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক’। এর মাধ্যমে মরুভূমির বাতাস থেকে পানি সংগ্রহ, কার্বন ডাই অক্সাইড ধারণ, বিষাক্ত গ্যাস সংরক্ষণ বা রাসায়নিক বিক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা যায়।
এ বছর ৫ অক্টোবর থেকে নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা শুরু হয়েছে। চিকিৎসায় পেয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কার্ল ডেইসেরথ, জার্মানি পিটার হেগম্যান ও জর্জ নাগেল। আলো-নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল ও অপটোজেনেটিকস নিয়ে তাঁদের আবিষ্কারের জন্য পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার ঘোষিত পদার্থবিজ্ঞানে বিজয়ী হলেন, বেলজিয়ামের বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেন। তিনি আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। একই সঙ্গে মহাবিশ্বের দূরবর্তী স্থান থেকে পৃথিবীতে আসা উচ্চ শক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কার করেছেন। এই নিউট্রিনো অনেকের কাছে ‘ভূতুড়ে কণা’ নামে পরিচিত।
কবে কোন পুরস্কার
বৃহস্পতিবার সাহিত্যে ও শুক্রবার শান্তিতে পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা হবে। অর্থনীতিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হবে ১৩ অক্টোবর।
পুরস্কারের অংশ হিসেবে একটি করে ডিপ্লোমা, স্বর্ণপদক এবং প্রায় ১২ লাখ ডলারের চেক দেওয়া হয়। কোনো বিভাগে একাধিক বিজয়ী থাকলে পুরস্কারের অর্থ ভাগাভাগি করে নেন।
মানবতার জন্য বড় ধরনের অগ্রগতি বয়ে এনেছেন এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ১৯০১ সাল থেকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। পুরস্কারের প্রতিষ্ঠাতা, উদ্ভাবক আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।



