আন্তর্জাতিক

পিটিআই ঠেকাতে পাকিস্তানের রাজধানী এখন ‘কনটেইনারাবাদ’!

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ এখন যেন কনটেইনারের শহর। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, প্রবেশপথ ও মোড়ে সারি সারি ভারী কনটেইনার বসিয়ে রেখেছে কর্তৃপক্ষ।

রাজনৈতিক কর্মসূচি ঠেকাতে নেওয়া এই নিরাপত্তাব্যবস্থায় রাজধানীর স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন ট্রাকচালক ও পরিবহন ব্যবসায়ীরা।

পরিস্থিতির প্রভাব এখন রাজধানী ছাড়িয়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার দূরের করাচি বন্দরেও পৌঁছেছে। সেখানে জমতে শুরু করেছে পণ্যবোঝাই কনটেইনার।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামাবাদের সড়কে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ভারী কনটেইনার দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছে। প্রায় চার টন ওজনের এসব কনটেইনারের কিছুতে বালু ভরে ভারী করা হয়েছে, যাতে সহজে সরানো না যায়।

কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও প্রবেশপথে এমন পরিস্থিতি চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেইনারে ঘেরা ইসলামাবাদকে অনেকে ‘কনটেইনারাবাদ’ নামে অভিহিত করছেন।

এই পরিস্থিতির সূত্রপাত পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) পরিকল্পিত ইসলামাবাদমুখী মিছিলকে কেন্দ্র করে। দলটি প্রথমে ২৭ সেপ্টেম্বর কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিলেও পরে তা পিছিয়ে ৪ অক্টোবর নির্ধারণ করে। কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তি দাবিও রয়েছে দলটির কর্মসূচির অন্যতম বিষয়।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচির তারিখ বিবেচনা করে নয়, সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আগাম প্রস্তুতি হিসেবে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে এরই মধ্যে নিরাপত্তাব্যবস্থার অর্থনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

উত্তরমুখী ট্রাক চলাচল বন্ধ

কনটেইনার বসানোর সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে পণ্য পরিবহন খাতে। রয়টার্স জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরে কর্তৃপক্ষ ২ হাজারের বেশি যানবাহন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। এসব গাড়ির অনেকগুলোতেই তখন পণ্য ছিল। ফলে ট্রাকচালকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে যে, ইসলামাবাদ বা পাঞ্জাবের দিকে গেলে তাদের গাড়ি ও কনটেইনারও জব্দ হতে পারে। এ কারণে অনেক চালক উত্তরমুখী যাত্রা বন্ধ করে দিয়েছেন।

ইসলামাবাদ, রাওয়ালপিন্ডি, জেহলাম, পেশোয়ার ও অ্যাটকসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে এর প্রভাব পড়েছে। কোনো কোনো পরিবহনকারী বিকল্প পথে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, আবার অনেকে নির্দিষ্ট গন্তব্যের আগেই যাত্রা থামিয়ে দিচ্ছেন। এতে শুধু ট্রাকচালকদের আয় কমছে না, সরবরাহব্যবস্থাতেও তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের বিঘ্ন।

দিনের পর দিন ট্রাক আটকে থাকায় চালকদের স্বাভাবিক আয় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, চালকের মজুরি ও অন্যান্য খরচ ঠিকই বহন করতে হচ্ছে মালিকদের। পণ্য সময়মতো পৌঁছাতে না পারায় ব্যবসায়ীদেরও পড়তে হচ্ছে বাড়তি চাপে।

করাচি বন্দরে জমছে কনটেইনার

রাজধানীর রাস্তা আটকে দেওয়ার প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে করাচি বন্দরে। ইসলামাবাদমুখী পথে কনটেইনার জব্দ হওয়ার আশঙ্কায় ট্রাকচালকদের একটি অংশ উত্তর দিকে যাওয়া বন্ধ রাখায় বন্দরে পণ্যবোঝাই কনটেইনারের জট তৈরি হচ্ছে। ফলে একদিকে পণ্য খালাস ও পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবহনকারীদের ব্যয় বাড়ছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জব্দ থাকা একটি কনটেইনারের জন্য প্রতিদিন ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার পাকিস্তানি রুপি পর্যন্ত ডেমারেজ গুনতে হতে পারে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে পণ্য নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে না পারার ক্ষতি এবং ট্রাক অলস পড়ে থাকার ব্যয়। ফলে রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নেওয়া নিরাপত্তাব্যবস্থার আর্থিক বোঝা শেষ পর্যন্ত পরিবহন ব্যবসা ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর গিয়ে পড়ছে।

বাড়ছে পরিবহন ব্যয়ের চাপ

পাকিস্তানের পরিবহন খাত এমনিতেই মূল্যবৃদ্ধির চাপে রয়েছে। রয়টার্সের হিসাবে, সেপ্টেম্বর মাসে দেশটির ভোক্তা মূল্যসূচক আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ২৬ শতাংশ বেড়েছে।

একই সময়ে পরিবহন মূল্যসূচক বেড়েছে ২৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ রুটে পণ্য পরিবহন আটকে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হচ্ছে।

পরিবহনকারীদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। চালকদের আয় কমার পাশাপাশি গাড়ির মালিকদের অলস ট্রাকের খরচ বহন করতে হচ্ছে। অন্যদিকে পণ্য পরিবহনে বিলম্বের কারণে সরবরাহকারী ও ব্যবসায়ীদেরও ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।

শুধু পরিবহন নয়, ক্ষতি নগর অর্থনীতিতেও

আল জাজিরার প্রতিবেদনে অর্থনীতি ও নগর ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এ ধরনের দীর্ঘস্থায়ী যোগাযোগবিঘ্নের প্রভাব শুধু ট্রাক ও কনটেইনারের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। রাজধানীর ব্যবসা, পর্যটন ও বিনিয়োগ পরিবেশেও এর প্রভাব পড়ে।

সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট পলিসি ইনস্টিটিউটের গবেষণা বিভাগের উপনির্বাহী পরিচালক সাজিদ আমিন জাভেদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতির অর্থনৈতিক মূল্য কেবল কনটেইনার ভাড়া বা সরাসরি পরিবহন ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ সময় শহরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হলে বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের কাছেও এর প্রভাব পড়ে।

নগর ব্যবস্থাপনা গবেষক দানিয়াল আদম খানও রাজধানীর সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তার মতে, ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডির সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে। রাজধানীর প্রবেশপথ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে সেই যোগাযোগব্যবস্থাও ব্যাহত হয়।

এদিকে রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে ইসলামাবাদের সড়কে কনটেইনারের সারি যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই দৃশ্যমান হচ্ছে এর অর্থনৈতিক মূল্য।

রাজধানীতে প্রতিবাদ ঠেকাতে বসানো কনটেইনার এখন শুধু নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রতীক নয়; করাচি বন্দরে পণ্যজট, উত্তরমুখী ট্রাক চলাচল বন্ধ এবং পরিবহনকারীদের বাড়তি ব্যয়ের মধ্য দিয়ে তা পাকিস্তানের সরবরাহব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি করছে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension