প্রধান খবরভারতযুক্তরাষ্ট্র

৫ বছর আগে মোদি ট্রাম্পকে স্বাগত আর চীনকে নিন্দা জানাত— এখন পুরো বিপরীত: আল জাজিরার বিশ্লেষণ

পাঁচ বছর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রথমবার ভারতে পা রাখেন, তখন তাকে দেওয়া হয়েছিল ভোলার মতো নয় এমন অভ্যর্থনা। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে আহমেদাবাদের ‘নমস্তে ট্রাম্প’ জনসমাবেশে লাখো মানুষ তাকে অভিবাদন জানিয়েছিল। সে সময় ভারত-মার্কিন সম্পর্কে উষ্ণতা, বাণিজ্যিক অগ্রগতি এবং ট্রাম্প–মোদির ব্যক্তিগত সখ্যতা সবার সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

কিন্তু একই বছরের জুনে ভারত-চীন সম্পর্ক একেবারে ভেঙে পড়ে। লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় সংঘর্ষে নিহত হয় ২০ ভারতীয় সেনা। এরপর ভারত ২০০–এর বেশি চীনা অ্যাপ, টিকটকসহ, নিষিদ্ধ করে। সীমান্তে সেনারা দাঁড়িয়ে যায় চোখে–চোখ রেখে। সেই সময় ভারত দ্রুত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও কোয়াডের (ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র) সঙ্গে।

এমনকি চলতি বছরের মে মাসেও চীনকে ভারতের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছিল। কারণ পাকিস্তান কাশ্মীরে হামলার পর চার দিনের যুদ্ধে চীনা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করেছিল।

কিন্তু এখন চিত্র পাল্টেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি ও ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনে নয়াদিল্লি ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক নতুন করে গরম হয়ে উঠছে। ভারতের আমদানি পণ্যে ট্রাম্প আরোপ করেছেন ৫০ শতাংশ শুল্ক। আর এর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্কে ‘স্থিতিশীল অগ্রগতি’র কথা বলেছেন।

‘ড্রাগন-হাতির নৃত্য’
দুই দিনের সফরে ওয়াং ই নয়াদিল্লিতে বৈঠক করেছেন ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের সঙ্গে। আলোচনায় সীমান্ত সমস্যা, ভিসা ও সরাসরি ফ্লাইট চালু, সীমান্ত বাণিজ্য সহজীকরণ এবং তীর্থযাত্রীদের জন্য তিব্বত সফরের অনুমতির মতো আস্থা বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুই দেশ ‘স্থিতিশীল উন্নয়নের পথে’ রয়েছে এবং একে অপরকে ‘বিশ্বাস ও সমর্থন’ করা উচিত।

মোদি আরও জানিয়েছেন, তিনি চীনের তিয়েনজিনে অনুষ্ঠেয় সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনে যোগ দেবেন। এটাই হবে সাত বছরের মধ্যে তার প্রথম চীন সফর।

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এ বছর শুরুর দিকে ভারত-চীন সম্পর্ককে ‘‘ড্রাগন-হাতির নৃত্য’’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।

ট্রাম্পের শুল্ক চাপ, পাকিস্তান ফ্যাক্টর
তাইওয়ান-এশিয়া এক্সচেঞ্জ ফাউন্ডেশনের গবেষক সানা হাশমি বলেন, ‘ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও পাকিস্তান-সদয় অবস্থানের কারণে ভারত এখন বাধ্য হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বী কমাতে, যার মধ্যে চীনও আছে।’
ট্রাম্প প্রশাসন এ বছর পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে দু’বার স্বাগত জানিয়েছে হোয়াইট হাউসে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে তিনি যুদ্ধবিরতি করিয়েছেন—যদিও নয়াদিল্লি এ দাবি অস্বীকার করেছে।

বাণিজ্য ও কৌশলগত অঙ্ক
ভারত-চীন বাণিজ্য ঘাটতি গত অর্থবছরে ছিল ৯৯.২ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের পরই চীন ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। ট্রাম্পের শুল্ক চাপের মধ্যে চীনের বাজারে প্রবেশাধিকার ভারতকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে।

বেইজিংয়ের কাছে ভারতের সমর্থন পাওয়া বড় কৌশলগত সাফল্য হবে, কারণ ভারত এতদিন যুক্তরাষ্ট্র–নেতৃত্বাধীন ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে ছিল।

কোয়াডের ভবিষ্যৎ?
ওবামার ‘এশিয়ায় পুনর্বিন্যাস’ নীতির পর থেকেই ভারতকে যুক্তরাষ্ট্র চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তুলে ধরেছিল। কোয়াড গঠনের মাধ্যমে চার দেশের (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া) সমন্বয়কে শক্তিশালী করা হয়।

কিন্তু ট্রাম্পের বর্তমান নীতি এই কাঠামোতে ভাঙন ধরাচ্ছে। ভারত ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ নীতি ধরে রেখেছে এবং জানিয়ে দিয়েছে, তারা কোনো সামরিক জোটে যোগ দেবে না।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বি আর দীপক বলেন, ভারত যদি চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের চীনকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা জটিল হয়ে পড়বে।

এনইউএস–এর গবেষক ইভান লিদারেভ মনে করেন, ভারত-চীন নৈকট্য কোয়াডের ভেতর ‘পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি ও উদ্দেশ্য বিভ্রান্তি’ তৈরি করবে।

তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে, সরবরাহ শৃঙ্খল, জলবায়ু পরিবর্তন ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার মতো ইস্যুতে কোয়াডের গুরুত্ব বজায় থাকবে। তবে এখন যুক্তরাষ্ট্র চাইলে এশিয়া-প্যাসিফিককে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে বদলানো বাস্তবতায় ভারতকে তার পাশে পাওয়া আগের মতো সহজ হবে না।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension