আন্তর্জাতিকপ্রধান খবর

আল জাজিরার এক্সপ্লেইনার: ক্লিনটন থেকে ট্রাম্প: পুতিনের বশীকরণ মন্ত্র

সমকাল: আগামীকাল শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় বহুল আলোচিত বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিন। ইউক্রেন ও বিশ্লেষকদের শঙ্কা ওই বৈঠকে আলোচনার মাধ্যমে পুতিন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বশে আনতে পারেন। তবে ট্রাম্প চাইলেই তাঁর পূর্বসূরিদের আমলে হওয়া বৈঠকের অভিজ্ঞতা থেকে পুতিনকে সামলানোর শিক্ষা নিতে পারেন।

একাধিক মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে পুতিন এ পর্যন্ত ৪৮ বার বৈঠক করেছেন। রাশিয়ায় তিনি গত ২৫ বছর ধরে ক্ষমতায়। এর মধ্যে হোয়াইট হাউসে পাঁচজন প্রেসিডেন্ট বদল হয়েছে। তাঁরা হলেন, বিল ক্লিনটন, জর্জ ডব্লিউ বুশ, বারাক ওবামা, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেন।

২০০০ সালে মস্কোতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সময় বিল ক্লিনটন ও ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: এএফপি

২০০০ সালে মস্কোতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সময় বিল ক্লিনটন ও ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: এএফপি

পুতিন-ক্লিনটন
১৯৯৯ থেকে ২০০০ সালের শুরু পর্যন্ত রাশিয়ার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ছিলেন পুতিন। ২০০০ সালেই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এর তিন মাসের মাথায় মস্কোতে বিল ক্লিনটনের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। সে সফরে ক্লিনটনকে ক্রেমলিন ঘুরে দেখান পুতিন। রাশিয়ান একটি জ্যাজ ব্যান্ডও ক্লিনটনের সম্মানে পারফর্ম করে। এমন মধুর সময় কাটানোর পর দুই দেশের মধ্যে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি হয়। রাশিয়াকে পুতিন সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নেবেন- এমন প্রশংসা করেন ক্লিনটন। আর পুতিন আশা প্রকাশ করে বলেন, মস্কো আর কখনো ওয়াশিংটনের সঙ্গে বিরোধে জড়াবে না।

পুতিন-বুশ
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে ঘটে যায় ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা। যেটি নাইন-ইলেভেন নামে পরিচিত। এ ঘটনার পর পুতিনই প্রথম বিশ্বনেতা হিসেবে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে ফোন করে সমবেদনা জানান। যুক্তরাষ্ট্রের পাশে থাকার কথা ব্যক্ত করেন। এর দুই মাস পর পুতিনকে সফরের আমন্ত্রণ জানান বুশ। টেক্সাসে সাক্ষাতের সময় দেওয়া বক্তব্যে বুশ উল্লেখ করেন, তিনি যখন হাইস্কুলে পড়তেন রাশিয়া তখন যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু ছিল। কিন্তু এখনকার (২০০১) স্কুল শিক্ষার্থীরা রাশিয়াকে বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে চেনে। এরপর বুশ পুতিনকে একটি পিক-আপ ভ্যানে করে জলপ্রপাত দেখাতে নিয়ে যান।

তবে এক সময় এই দুই নেতার সম্পর্কে কিছুটা অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। ২০০২ সালে বুশ রাশিয়া সফরে গিয়ে ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্র বাড়ানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চেষ্টার কথা জানান। যা পুতিনের মধ্যে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করে।

২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি লেকে মাছ শিকারে পুতিন। ছবি: জর্জ ডব্লিউ বুশের ওয়েবসাইট

২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি লেকে মাছ শিকারে পুতিন। ছবি: জর্জ ডব্লিউ বুশের ওয়েবসাইট

২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে আক্রমণ করলে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কে উত্তেজনা দেখা দেয়। এর মাঝেও প্রেসিডেন্ট বুশ ব্যক্তিগতভাবে পুতিনের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেন। ২০০৭ সালে পুতিনকে নিজের পৈতৃক ভিটায়ও বেড়াতে নিয়ে যান। তারা একসঙ্গে মাছ শিকারেও বেরিয়েছিলেন। বুশ কোনো মাছ ধরতে না পারলেও পুতিনের বরশিতে একটি ধরা পড়ে। যেটিকে পরে পানিতে ছেড়ে দেওয়া হয়।

বুশের আমলে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্যে বিরোধ দেখা যায় ২০০৮ সালের এপ্রিলে। ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ইস্যুতে দুই নেতার বৈঠকটি হয়েছিল রাশিয়ার সোচিতে। বৈঠকে পুতিন প্রতিরক্ষা সম্প্রসারণের বিরোধীতা করেন। বুশও তাঁর দেশের নীতির পক্ষে সাফাই গান। রাষ্ট্রীয় নীতিগত পর্যায়ে বিরোধ তৈরি হলেও দুই নেতা ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক ধরে রেখেছিলেন।

পুতিন-ওবামা
২০০৮ সালে জর্জিয়ায় আগ্রাসন শুরু করে রাশিয়া। যেটির বিরোধীতা করে যুক্তরাষ্ট্র। পরের বছর ২০০৯ সালের জুলাইয়ে মস্কোতে পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন বারাক ওবামা। পুতিন তখন রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী। প্রেসিডেন্ট ছিলেন দিমিত্রি মেদভেদেভ। বৈঠকে জর্জিয়া ইস্যুতে পুতিনকে ওবামা বলেন, সবকিছুতে দুই দেশ একমত নাও হতে পারে। কিন্তু জনগণের স্বার্থে সম্মানের পরিবেশ বজায় রাখা যেতে পারে।

পুতিনের সঙ্গে ওবামার পরের বৈঠকটি হয় ২০১৩ সালের জুনে। উত্তর আয়ার‌ল্যান্ডে জি-৮ শীর্ষ সম্মেলনের সাইডলাইনে। ওই সময় পাশাপাশি বসে থাকা দুই নেতার হতাশা প্রকাশের মুহুর্ত ধরা পড়ে ক্যামেরায়। পরে সে ছবি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়। মূলত সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদাররা সিরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে পদত্যাগের জন্য চাপ দিচ্ছিল। কিন্তু আসাদকে সমর্থন দেয় রাশিয়া।

২০১৩ সালে উত্তর আয়ারল্যান্ডে জি-৮ শীর্ষ সম্মেলনের সাইডলাইন বৈঠকে বারাক ওবামা ও পুতিন। ছবি: এএফপি

২০১৩ সালে উত্তর আয়ারল্যান্ডে জি-৮ শীর্ষ সম্মেলনের সাইডলাইন বৈঠকে বারাক ওবামা ও পুতিন। ছবি: এএফপি

২০১৬ সালের এক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার মধ্যে উত্তেজনার ইস্যুতে পরিণত হয় ইউক্রেন। এর বছর দুয়েক আগে রাশিয়া ইউক্রেনের ক্রিমিয়া শহর নিজেদের দখলে নেয়। এর জেরে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এমন পরিস্থিতে ২০১৬ সালের নভেম্বরে পেরুর লিমায় এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনোমিক কো-অপারেশনের (এপেক) শীর্ষ সম্মেলনের সাইডলাইনে সাক্ষাৎ করেন পুতিন-ওবামা। তাঁরা প্রায় চার মিনিট আলাপ করেন। ওবামা পুতিনকে ইউক্রেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার মিনস্ক চুক্তির প্রতিশ্রুতি পালনের আহ্বান জানান। ওই মুহুর্তের প্রকাশিত একটি ছবিতে পুতিনের চেহারায় হতাশা দেখা যায়।

পুতিন-ট্রাম্প
২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। যে নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠে রাশিয়ার বিরুদ্ধে। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ট্রাম্প ২০১৮ সালের জুলাইয়ে পুতিনের সঙ্গে দেখা করেন ফিনল্যান্ডের হেলসিংকিতে। ওই বৈঠকে কেবল দোভাষীরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে পুতিন সম্পর্কে আশা সঞ্চারের কথা উল্লেখ করেন। তবে খবরের শিরোনাম হন ট্রাম্প।

২০১৮ সালে ফিনল্যান্ডের হেলসিংকিতে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: এএফপি

২০১৮ সালে ফিনল্যান্ডের হেলসিংকিতে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: এএফপি

সাংবাদিকরা নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের বিষয়ে ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করেন। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি পুতিনের সঙ্গে হস্তক্ষেপের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা করেছি।’ নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগটি মূলত তুলেছিল যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা। এ নিয়ে পুতিনের সঙ্গে আলাপের বরাত দিয়ে সাংবাদিকদের ট্রাম্প আরও বলেছিলেন, ‘এটা (হস্তক্ষেপ) রাশিয়ার কাজ নয়। আমিও হস্তক্ষেপের কোনো কারণ দেখি না।’

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে পুতিনের সঙ্গে বৈঠক হয় ছয়বার।

পুতিন-বাইডেন
জো বাইডেনের সময় ফের রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে অবনতি ঘটে। ২০২১ সালের মার্চে দেওয়া এক বক্তব্যে পুতিনকে হত্যাকারী বলেও উল্লেখ করেছিলেন বাইডেন। প্রতিক্রিয়ায় ওয়াশিংটন থেকে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে মস্কো। এমন বৈরি সম্পর্কের মাঝে একই বছরের জুন মাসে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় সাক্ষাৎ হয় পুতিন-বাইডেনের। সেখানে দুই দেশ পুনরায় রাষ্ট্রদূত নিয়োগের বিষয়ে সম্মত হয়।

২০২১ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ভ্লাদিমির পুতিন (বাঁয়ে) ও জো বাইডেন (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত

২০২১ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ভ্লাদিমির পুতিন (বাঁয়ে) ও জো বাইডেন (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু এরপরও সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়নি। বিভিন্ন সময় বাইডেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগের পাশাপাশি সাইবার হামলার শঙ্কা প্রকাশ করেন। বাইডেনের মেয়াদেই রাশিয়া ইউক্রেন সীমান্তে সেনা উপস্থিতি বাড়ায়। জেনেভায় বাইডেনের সঙ্গে পুতিনের বৈঠকের আট মাস পর রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু করে।

নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসার পর এবার এই যুদ্ধ থামাতেই পুতিনের সঙ্গে শুক্রবার বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

(আল জাজিরা থেকে অনুবাদ: সাদিকুর রহমান)

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension