একজন শহীদ ভাই
বাংলাদেশের বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক ইতিহাসবেত্তা মহিউদ্দিন আহমদ মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার উল আলমকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন। নিজের ফেসবুক দেয়ালে পোস্ট করা ওই স্মৃতিচারণে তিনি লিখেছেন-
‘শহীদ ভাই নামেই জানতাম। পোশাকী নাম আনোয়ার উল আলম। ১৯৭০ সালের ডাকসু ইলেকশনের সময় পরিচয়। আমরা দুজনেই ছাত্রলীগের। তিনি আমার তিন ব্যাচ সিনিয়র। তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের জিএস নির্বাচিত হলেন। আমি হলাম মু্হসীন হলের এজিএস।
তিনি জাতীয় রক্ষীবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। ছিলেন উপপরিচালক (প্রশিক্ষণ)। পরে রাষ্ট্রদূত, সচিব। অনেক বছর যোগাযোগ ছিল না। রক্ষীবাহিনী নিয়ে একটি বই লিখলেন। এর পরপরই জাসদ নিয়ে আমার বইটি বের হয়। প্রথম আলো অফিসে দেখা হতেই আমাকে সস্নেহে অনেক প্রশংসা করলেন। আমি বললাম, দেখেন, লোকে জানে আপনি রক্ষীবাহিনী আর আমি গণবাহিনী। এখন কী সুন্দর মিলেমিশে আছি! জবাবে বললেন, ‘রক্ষীবাহিনীতে না গেলে আমি তো গণবাহিনীতে থাকতাম।’ বললাম, ‘দুষ্কৃতীদের’ হাতে রক্ষীবাহিনী আর আওয়ামী লীগের কে কে নিহত হয়েছেন, আপনার বইয়ে তার একটা তালিকা দিয়েছেন। কিন্তু তাদের হাতে কারা খুন হয়েছে, তাদের তালিকাটিও দিতে পারতেন। তিনি হাসলেন।
তারপরও বলব, এ বইয়ে অনেক ঘটনার উল্লেখ করে তিনি যথেষ্ট সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। যেমন, টাংগাইলে সাবেক রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর বাড়ি লতিফ সিদ্দিকী দখল করে রেখেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তিনি এক রাতে এটি দখলমুক্ত করেন। সেখানে দখলদারদের যাকেই পান, জেলে ঢোকান। ওই সময় বিভিন্ন জেলায় ক্ষমতাসীন দলের কয়েকটি পরিবার যে কী ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল, তার কিছু বিবরণ এ বইয়ে আছে। বড় অমায়িক ছিলেন।
কবি রফিক আজাদ ছিলেন তাঁর ছোট বোনের স্বামী। মোহাম্মদপুরের বাসায় একসঙ্গে থাকতেন। ‘ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাব’- ১৯৭৪ সালে এ কবিতাটি লিখে তিনি শাসকদের তোপের মুখে পড়েন। শহীদ ভাই রফিক আজাদকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে যান। সে অনেক কথা। তাঁর দেওয়া সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে ওই ঘটনাটির বিস্তারিত উল্লেখ আছে আমার ‘বেলা-অবেলা’ বইয়ে। রফিক আজাদের কবিতাটিও উদ্ধৃত করেছি।
সিরাজ সিকদার নিয়ে যখন কাজ শুরু করি, তখন তিনি আমাকে তাঁর শেষ সাক্ষাৎকারটি দিয়েছিলেন, মাস তিনেক আগে। তাঁর কাছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি। বইটি একদিন বের হবে। কিন্তু তিনি দেখে যেতে পারলেন না।
শহীদ ভাইয়ের সঙ্গে অনেক স্মৃতি। প্রায়ই বলতেন,’টাংগাইলে আমার বাড়িতে আপনাকে নিয়ে যাব।সেখানে লাইব্রেরি করেছি, জাদুঘর বানিয়েছি।’ যাওয়া হয় নি।
তাঁর কথা বলে শেষ করা যাবে না। আর দেখা হবে না, আর কথা হবে না, এটা ভাবতেই পারছি না।
শহীদ ভাইয়ের আত্মার শান্তি হোক।’
উল্লেখ্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক সচিব ও রাষ্ট্রদূত আনোয়ার উল আলম শহীদ বৃহস্পতিবার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। দীর্ঘদিন যাবত নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন আনোয়ার উল আলম। গত ১ নভেম্বর তার মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করা হয়। এরপর থেকে তিনি হাসপাতালেই নিবিড় পর্যবেক্ষণে ছিলেন।
আনোয়ার উল আলম শহীদ মুক্তিযুদ্ধকালীন টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনীর বেসামরিক প্রধান আনোয়ার উল আলম শহীদ, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি টাঙ্গাইলের শহীদ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা।
স্বাধীনতার পর গঠিত রক্ষীবাহিনীতে তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদায় উপপরিচালক (প্রশিক্ষণ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ বাহিনী বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আত্তীকরণ করা হলে তিনি সেনাবাহিনীতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে পুনর্নিয়োগ পান। পরবর্তীতে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশন ও দূতাবাসে কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।❐




