ভারত

‘বন্দে মাতরম’ থামিয়ে ‘পাপ’ করেছেন সোনিয়া, ক্ষমা চাওয়ার দাবি অমিত শাহের

স্বাধীনতা দিবসে কংগ্রেসের সদর দপ্তরে ‘বন্দে মাতরম’ গান পরিবেশনের সময় মাঝপথে গান থামিয়ে দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ শানিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।

তার অভিযোগ, সনিয়া গান থামানোর নির্দেশ দিয়ে ‘পাপ’ করেছেন। এই ঘটনার জন্য সোনিয়া গান্ধীকে দেশবাসী এবং ‘বন্দে মাতরম’–এর স্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আত্মার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে বলেও দাবি করেছেন তিনি।

রোববার (১৬ আগস্ট) রাজস্থানের চিতোরগড়ে এক জনসভায় অমিত শাহ বলেন, দেশের ১৪০ কোটি মানুষ বিষয়টি দেখেছেন। তার অভিযোগ, স্বাধীনতা দিবসের মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনে জাতীয় গান অর্ধেক গাওয়ার ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না। সোনিয়া গান্ধীর উদ্দেশে শাহ বলেন, তিনি যে কাজ করেছেন, তার জন্য দেশের মানুষ তাকে কোনো দিন ক্ষমা করবেন না।

বিতর্কের সূত্রপাত শনিবার স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে। দিল্লিতে কংগ্রেসের সদর দপ্তরে দলের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশন করা হচ্ছিল। সেখানে সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়গেসহ দলের অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন। ওই অনুষ্ঠানের একটি দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ে সমাজমাধ্যমে। সেখানে দেখা যায়, গান চলার সময় সনিয়া গান্ধী পাশে দাঁড়িয়ে থাকা খড়গের সঙ্গে কথা বলছেন। বিজেপির অভিযোগ, সোনিয়া গান থামানোর নির্দেশ দিচ্ছিলেন।

ঘটনাটি সামনে আসার পর বিজেপি নেতারা কংগ্রেসকে নিশানা করতে শুরু করেন। বিজেপির অভিযোগ, সংখ্যালঘু ভোটের কথা মাথায় রেখে কংগ্রেস ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে আপসের রাজনীতি করছে। দলের নেতা অমিত মালব্যর দাবি, সোনিয়া গান্ধী সম্পূর্ণ গান পরিবেশনে আপত্তি জানিয়েছিলেন। গানটির প্রথম কয়েকটি স্তবক গাওয়ার পর তিনি উত্তেজিত হয়ে গান বন্ধ করার নির্দেশ দেন বলে অভিযোগ তার। এমনকি রাহুল গান্ধীও গান থামানোর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন মালব্য।

তবে বিজেপির এই অভিযোগ সরাসরি খারিজ করেছে কংগ্রেস। দলের বক্তব্য, সোনিয়া গান থামাতে বলেননি। বরং কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়গে প্রবীণ ব্যক্তি হওয়ায় দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার কথা বিবেচনা করে তার জন্য একটি চেয়ার আনার কথা বলেছিলেন সনিয়া। সেই কথোপকথনকেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে বলে কংগ্রেসের দাবি।

কংগ্রেসের মুখপাত্র উদিত রাজ বলেন, সোনিয়া গান্ধীর বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগ সত্য নয়। তিনি খড়গের জন্য চেয়ার আনতে বলেছিলেন, গান থামাতে নয়। দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতেই বিজেপি এই বিতর্ক তৈরি করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা জয়রাম রমেশও দাবি করেছেন, স্বাধীনতা দিবসে কংগ্রেসের সদর দপ্তরে সম্পূর্ণ ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশন করা হয়েছিল। তবে বিজেপি সেই দাবি মানতে নারাজ। তাদের বক্তব্য, কংগ্রেসের সদর দপ্তরে অসম্পূর্ণভাবে গান পরিবেশন করে জাতীয় গানের অসম্মান করা হয়েছে।

এ নিয়ে সরব হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও। নবান্নে রোববার তিনি বলেন, কংগ্রেসের সদর দপ্তরে ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশনের সময় সোনিয়া গান্ধীর বিরক্তি, আপত্তি ও বিরোধিতা গোটা দেশ দেখেছে। স্বাধীনতা সংগ্রাম ও জাতীয়তাবাদী চেতনায় এই গানের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি কংগ্রেস নেতৃত্বের নিঃশর্ত ক্ষমা দাবি করেন।‌শুভেন্দু বলেন, ‘বন্দে মাতরম’, তার স্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং জাতীয়তাবাদী চেতনাকে যারা অপমান করেছেন, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের পক্ষ থেকে তাদের ধিক্কার ও নিন্দা জানানো হচ্ছে। সোনিয়া গান্ধী ও মল্লিকার্জুন খড়গের কাছে তিনি প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি তোলেন।

এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন নৈহাটির বিজেপি বিধায়ক এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রপৌত্র সুমিত্র চট্টোপাধ্যায়। সোনিয়া গান্ধীকে চিঠি লিখে তিনি ক্ষমা চেয়েছেন। চিঠিতে তিনি কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অতীতেও ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে আপস করার অভিযোগ তোলেন।

অন্যদিকে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও কংগ্রেসকে আক্রমণ করেছেন। তার বক্তব্য, যে বাংলার মাটিতে ‘বন্দে মাতরম’-এর জন্ম, সেই বাংলার মানুষ জাতীয়তাবোধকে তুষ্টিকরণের রাজনীতির কাছে সমর্পণ করবে না।

কংগ্রেস অবশ্য পাল্টা প্রশ্ন তুলেছে বিজেপির বিরুদ্ধে। উদিত রাজের প্রশ্ন, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের দপ্তরে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন না করার বিষয়টি নিয়ে অমিত শাহ কবে জবাব দেবেন এবং কবে দেশের মানুষের কাছে ক্ষমা চাইবেন। ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে এই রাজনৈতিক চাপানউতোরে স্বাধীনতা দিবসের পর ভারতের রাজনীতিতে ফের জাতীয়তাবাদ, তুষ্টিকরণ এবং সংখ্যালঘু রাজনীতির পুরনো বিতর্ক সামনে চলে এসেছে। আগামী দিনে এই বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension