নির্বাচিত কলাম

ট্রাম্প কি শাসনতান্ত্রিক সংকট সৃষ্টি করবেন?

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী


গত শতকে ইউরোপে গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি তৈরি করেছিলেন হিটলার ও মুসোলিনি। এই শতাব্দীতে সারা বিশ্বে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। হিটলার দাবি করেছিলেন, ‘পৃথিবীতে জার্মানরাই সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি। সব জাতির ওপর রাজত্ব করতে একমাত্র অধিকার জার্মানদের।’ তিনি বিনা উস্কানিতে প্রথমে অস্ট্রিয়া দখল এবং পরে পোল্যান্ড আক্রমণ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করেছিলেন। ইহুদি-বিদ্বেষ প্রচার এবং ইহুদি নিধন ছিল তার অন্যতম রাজনৈতিক কর্মসূচি।

এই শতাব্দীতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এবং হোয়াইট সুপ্রিমেসির সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ এবং বর্ণবিদ্বেষ প্রচার করে প্রথম দফা প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। জয়ী হয়েই তিনি হিটলারের মতো হুমকি-ধমকি দিতে শুরু করেন। বহিরাগতদের আমেরিকায় আসা বন্ধ করার নামে মেক্সিকো সীমান্তে পাকা দেয়াল তোলার উদ্যোগ নেন।

হিটলার ইহুদিদের জন্য ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’ তৈরি করেছিলেন। ট্রাম্প বহিরাগতদের জন্য কনসেনট্রেশন ক্যাম্প তৈরি করেন। হিটলার ধমক দিয়ে জার্মানির তৎকালীন গণতান্ত্রিক শাসক ভন হিল্ডেনবার্গকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিলেন। সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞ জেনারেলদের সরিয়ে তার অনুগত জেনারেলদের দ্বারা ওয়ার কেবিনেট গঠন করেছিলেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউস, পেন্টাগনসহ সর্বত্র অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সরিয়ে নিজের ইয়েসম্যানদের বসিয়েছিলেন। এমনকি ডাক ও তার বিভাগে এবং সুপ্রিম কোর্টেও তার দলীয়করণ নীতি চালিয়েছিলেন। তিনি যুদ্ধ শুরু করেননি। কিন্তু ইরান ও উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধায়োজনে সারা বিশ্বে ভয়াবহ যুদ্ধ উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি করোনার মতো বিশ্ব মহামারির বিরুদ্ধে যথাসময়ে ব্যবস্থা গ্রহণ না করে একগুঁয়েমি দেখিয়ে লাখ লাখ আমেরিকানের মৃত্যুর কারণ ঘটিয়েছেন। আমেরিকায় একমাত্র বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ ছাড়া সাধারণ মানুষের মধ্যে তার কোনো জনপ্রিয়তা নেই।

গত ৩ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের কাছে বেশ ভালো ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। তিনি জানতেন, পরাজিত হবেন। ফলে নির্বাচন শুরু হতেই বাংলাদেশের বিএনপির মতো ধুয়া তোলেন, নির্বাচনে কারচুপি হচ্ছে। নানা ধরনের তদন্ত দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে নির্বাচনে কোনো কারচুপি হয়নি। তবু তিনি গোঁ ধরে বসে আছেন। তার দাবি, তিনি পরাজিত হননি এবং জয়ী প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেনের কাছে পরাজয় স্বীকার না করে আমেরিকার গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এক গভীর সংকট সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছেন। তিনি ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত হোয়াইট হাউসে থাকবেন। কিন্তু তিনি আর নির্বাহী প্রেসিডেন্ট নন। তবু হোয়াইট হাউস থেকে পেন্টাগন পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাবলে কর্মকর্তাদের রদবদল ঘটাচ্ছেন। তার দাবি সমর্থন করে নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে এ কথা স্বীকার না করায় তিনি একটি সরকারি এজেন্সির চিফকেও বরখাস্ত করেছেন।

অর্থাৎ নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর ট্রাম্প যা শুরু করেছেন, তা পাগলামির নামান্তর এবং তা বিশ্ব শান্তি ও গণতন্ত্রের জন্য এক বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ১৪ নভেম্বর শনিবারের গার্ডিয়ানে কলামিস্ট জনাথন ফ্রিডল্যান্ড আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, সম্প্রতি পেন্টাগনের প্রধানকে যে ট্রাম্প সরিয়ে দিলেন, তার মূলে কী তার মতলব, নিজের অনুগত কোনো জেনারেলকে তিনি সেখানে বসাবেন এবং তিনি ক্ষমতা না ছাড়লে ওয়াশিংটনে যে গণবিক্ষোভ হবে তা গুলি চালিয়ে দমন করতে সম্মত হবেন সেই জেনারেল?

ফ্রিডল্যান্ডের চাইতেও বড় আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আরেক পশ্চিমা সাংবাদিক। তিনি লিখেছেন, ট্রাম্প ক্ষমতা না ছাড়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য হঠাৎ ইরান আক্রমণ করে বিশ্বময় যুদ্ধের দাবানল ছড়িয়ে দিতে পারেন। এই সাংবাদিকের অনুমান কতটা সত্য তার প্রমাণ মেলে গত বুধবার (১৮ নভেম্বর) লন্ডনের কাগজে প্রকাশিত খবরে। ট্রাম্প তার যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা নেই জেনেও বৃহস্পতিবার ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার জন্য ওভাল অফিসে সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তাদের এক বৈঠক ডাকেন। এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন তার ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স. পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও, নতুন দেশরক্ষামন্ত্রী ক্রিস্টোফার মিলার এবং উপসামরিক অফিসাররা। ট্রাম্প তাদের কাছে ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা চালানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেন, নিউইয়র্ক টাইমস খবরটি প্রকাশ করে। সুখবর এই যে, ট্রাম্পের মন্ত্রী এবং জেনারেলরা সবাই এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে মত প্রকাশ করেছেন। ইরানও ট্রাম্পের মতলব জানতে পেরে কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ইরান আক্রান্ত হলে আত্মরক্ষার বৈধ অধিকারবলে সে আক্রমণকারীর উপযুক্ত জবাব দেবে।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট জো বাইডেন বলেছেন, তার একগুঁয়ে পরাজিত প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার জন্য হাজার হাজার মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছেন। বাইডেন কভিড-১৯-এর প্রকোপ হ্রাস করার জন্য তার অন্তর্বর্তীকালীন টিম দ্বারা যে ব্যবস্থা গ্রহণ করাতে চেয়েছিলেন, ট্রাম্প তাতেও বাধা দেওয়ায় তারই রিপাবলিকান দলীয় সিনেটর সুসান কলিন্স দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং বলেছেন, করোনায় ভ্যাকসিন বের হওয়ার পরেও তা সবার কাছে দ্রুত পৌঁছবে না। মধ্যবর্তী সময়ের জন্য সাময়িক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত এবং এই সাময়িক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণে বাইডেনের টিমকে বাধা দিয়ে ট্রাম্প মার্কিন জনগণেরই ক্ষতি করছেন।

প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট জো বাইডেন যাতে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের নেতাদের সঙ্গে (যারা তার নির্বাচন বিজয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন) যোগাযোগ স্থাপন না করতে পারেন, সে জন্যও বাধা সৃষ্টি করছেন ট্রাম্প। মার্কিন মিডিয়ার একটি বড় অংশ এই বলে শঙ্কা প্রকাশ করছে, ট্রাম্পের একগুঁয়েমির ফলে আমেরিকায় সিভিল ওয়ার শুরু হয়ে দেশটি ভাগ হয়ে যায় কিনা। অনেকেই বলছেন, ট্রাম্প পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী এই পাগলামি করছেন। জো বাইডেন তার চেয়ে ৫.৫ মিলিয়ন বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন।

একটি মার্কিন সাময়িকীতে বলা হয়েছে, গত শতকে ইউরোপে ফ্যাসিবাদ তার থাবা প্রসারিত করেছিল। এই শতাব্দীতে সেই ফ্যাসিবাদ আরও ভয়ংকর চেহারায় আমেরিকায় মাথা তোলার চেষ্টা করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তারই প্রতিভূ। তবে আশা এই যে, আমেরিকার গণতান্ত্রিক সংবিধান অত্যন্ত শক্তিশালী। এই সংবিধান সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করা ছাড়া আমেরিকায় ফ্যাসিবাদী শক্তি স্থায়ীভাবে জয়ী হতে পারবে না। আর আমেরিকার জনগণ তাদের সংবিধানের পবিত্রতা রক্ষায় এতই সচেতন যে, অতীতে এই সংবিধান লঙ্ঘনের চেষ্টা যেমন সফল হয়নি, তেমনি বর্তমানেও হবে না।

ডোনাল্ড ট্রাম্প পরাজিত হয়েও হোয়াইট হাউস না ছাড়ার যে ভাব দেখাচ্ছেন, তা সফল হবে না- এটা ভেবেই ডেমোক্র্যাট দল তার হুমকি-ধমকির বিরুদ্ধে তেমন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। হোয়াইট হাউসের স্টাফও তাদের স্বাভাবিক নিয়মে কাজ করে যাচ্ছেন এবং নতুন প্রেসিডেন্টকে বরণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। রিপাবলিকান দলেরও একটা বড় অংশ মনে করে, ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন এবং তার এই পরাজয় মেনে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করা উচিত।

২০ জানুয়ারি ট্রাম্পকে যে হোয়াইট হাউস ত্যাগ করতে হবে, এটা এখন একপ্রকার নিশ্চিত। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরে রাজি হবেন কিনা। তার সমর্থনে রয়েছে এক বিরাট বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ দল। তারা ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সমর্থনে সমাবেশ করেছে। ফলে ট্রাম্পবিরোধী সমাবেশও ওয়াশিংটনে হয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের খবরও পাওয়া গেছে। পুলিশ দাঙ্গা বাধানোর অভিযোগে কয়েক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে।

রাশিয়ায় ইয়েলৎসিন সিআইএর সাহায্যে ক্ষমতায় বসার পর নির্বাচিত পার্লামেন্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন এবং সেনাবাহিনী দ্বারা পার্লামেন্ট ভবনে পার্লামেন্ট সদস্যদের ঘেরাও করে রেখে আত্মসমর্থনে বাধ্য করেছিলেন। বর্তমান আমেরিকায় ট্রাম্প অতটা করার সুযোগ ও সাহস পাবেন না, কিন্তু শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীদের সহায়তায় তিনি আমেরিকার গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় সংকট অথবা অচলাবস্থা সৃষ্টি করতে পারেন। যারা বলছেন ট্রাম্পের এসব পরিকল্পনা সফল হবে না, তাদের সাধুবাদ জানাই। কিন্তু ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত একটা শঙ্কা বিশ্বের সবার মনেই বিরাজ করবে।❐

লন্ডন, ২০ নভেম্বর, শুক্রবার, ২০২০

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension