
দাদুভাই ও নীল কালির ছন্দ
স্বপন কুমার কুণ্ডু
টেবিলের ওপর অনেক মেকআপ করা পাতা। একটির ওপর তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। পাতাজুড়ে ঘুরছে তার অভিজ্ঞ ও অনুসন্ধিৎসু চোখ দুটি। মুহূর্তের মধ্যে সজ্জিত পাতাটি তার নীল কালির ছন্দময় আঁকিবুকিতে ভরে গেল। হয়ে উঠল যেন কোনো শিল্পীর রংতুলির ক্যানভাস। পরিস্ফুটিত হলো একটি পূর্ণাঙ্গ যথার্থ সুসজ্জিত পাতা। যার দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় সজ্জিত পাতাটির সজ্জা পূর্ণতা পেল, হয়ে উঠল যথার্থ-তিনি হলেন আমাদের সবার প্রিয় দাদুভাই। যুগান্তরের ফিচার এডিটর রফিকুল হক দাদুভাই। তিনি একাধারে ছড়াকার, সাংবাদিক, লেখক ও শিশু সংগঠক। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি সফল এবং স্বমহিমায় ভাস্বর। ছড়াকার হিসাবে তিনি যেমন অতুলনীয়, সাংবাদিকতায় তার দক্ষতা প্রবাদতুল্য। লেখক ও শিশু সংগঠক হিসাবে তিনি অগ্রগণ্য। অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূর্তপ্রতীক দাদুভাইয়ের ক্ষুরধার লেখনী ছিল সর্বমহলে প্রশংসিত। তার অমায়িক ব্যবহার সবাইকে আকৃষ্ট করত। সব বয়সের মানুষকে আপন করে নেওয়ার জাদু ছিল তার। সবার কাছে তিনি হয়ে ওঠেন দাদুভাই।
শিশুদের সংবাদপত্র ও শিশু সাংবাদিকতার পথিকৃৎ দাদুভাই বাংলাদেশের ফিচার এডিটরদের মধ্যে কিংবদন্তি। বরেণ্য শিশুসাহিত্যিক দাদুভাইয়ের জন্ম রংপুরে ১৯৩৭ সালের ৮ জানুয়ারি। ১৯৬৩ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে তিনি গ্র্যাজুয়েট হন। তার বাবার নাম ইয়াছিন আহম্মদ ও মায়ের নাম রহিমা খাতুন। তার পৈতৃক নিবাস রংপুর শহরের কামালকাচনায়। তবে আদিনিবাস পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার শহরে।
বাংলা সংবাদপত্রে বহু গুরুত্বপূর্ণ পদে দাদুভাই দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৬১ সালে দৈনিক সংবাদে সহসম্পাদক হিসাবে তার কর্মজীবন শুরু। এরপর দৈনিক জেহাদ, অর্ধ-সাপ্তাহিক সোনার বাংলা, দৈনিক পয়গাম, পূর্বদেশ, সাপ্তাহিক কিশোর বাংলা ও দৈনিক জনতা, আজাদ, লাল সবুজে কাজ করেছেন। ১৯৬৯ সালে সাপ্তাহিক পূর্বদেশ দৈনিক পূর্বদেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলে সেখানে তিনি ফিচার এডিটরের দায়িত্ব নেন এবং ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৬ সালে সরকারি পত্রিকা সাপ্তাহিক কিশোর বাংলা বের হলে সেখানে তিনি কার্যনির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পান এবং ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন। দৈনিক রূপালী পত্রিকার কার্যনির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন। ২০০৪ সালে তিনি দৈনিক যুগান্তরে যোগ দেন। যুগান্তরের ফিচার এডিটর হিসাবে দায়িত্বপালনকালীন তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সুদীর্ঘ ৫৯ বছর তিনি সাংবাদিকতায় সম্পৃক্ত ছিলেন।
আপাদমস্তক পেশাদার সাংবাদিক দাদুভাই দীর্ঘদিন রিপোর্ট সম্পাদনা করেছেন। তার হাতের স্পর্শে একটি সংবাদের শিরোনাম এক মুহূর্তে হয়ে উঠত আকর্ষণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ। এক দলা নরম মাটি দিয়ে শিল্পী যেমন গড়েন সুন্দর ও আকর্ষণীয় মূর্তি, তিনিও তেমনি একটি অগোছালা ও অবিন্যস্ত সংবাদকে গড়ে তুলতেন পাঠযোগ্য ও সরসরূপে। সংবাদ-জ্ঞানের (নিউজ সেন্স) আলোকে তার জহুরি চোখ সংবাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি ঠিকই খুঁজে পেত, সেটি যে অনুচ্ছেদেই থাকুক না কেন। তথ্যগুলো পর্যায়ক্রমে সজ্জিত করতে গিয়ে তিনি সংবাদ কপিটি বেশ কাটাকুটি করতেন। কখনো জটিল ও অনুপযুক্ত শব্দ বাদ দিয়ে তিনি মানানসই ও যথার্থ শব্দ বসিয়ে দিতেন, জটিল বাক্য বাদ দিয়ে তিনি সহজ-সরল বাক্য লিখতেন। গুরুত্বপূর্ণ কোনো অংশ নিচ থেকে তুলে নিয়ে উপযুক্ত স্থানে বসাতেন। তার পরিচ্ছন্ন সম্পাদনায় সংবাদ কপি শৈল্পিক হয়ে উঠত। তার সম্পাদিত কপি নিয়ে কখনো সম্পাদনা সহকারীদের সমস্যায় পড়তে হয় না। নীল কালির আঁচড় টেনে তিনি এমন স্থানে এমনভাবে লিখতেন, যাতে কারও বুঝতে অসুবিধা না হয়। ফলে তার সম্পাদিত কপিটি নীল কালির ছন্দে ভরে উঠত। কালো কালিতে প্রিন্ট করা সংবাদ কপি অন্যরা লাল কালিতে সম্পাদনা করলেও দাদুভাই নীল কালি ব্যবহার করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। প্রবীণ সাংবাদিক কামাল লোহানীর ভাষায়, লাল-নীল কলম দিয়ে রফিক আঁকাআঁকি করত। সুন্দর মেকআপের জন্য আকর্ষণীয় হেডিং দিতেন। এসব কাজে তার সৃজনশীলতা ও পারঙ্গমতা ছিল।
দাদুভাইয়ের ভাষায়, সম্পাদনা সহকারীরা (রিডার) লাল কালি ব্যবহার করেন। আর সম্পাদক হিসাবে তিনি নীল কালি ব্যবহার করেন। কারণ কম্পিউটার অপারেটরা যাতে বুঝতে পারেন সম্পাদক কী সম্পাদনা করেছেন। দাদুভাইয়ের হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় অনেক জটিল, দুর্বোধ্য ও অপাঠযোগ্য ফিচারও পূর্ণতা পেয়েছে। ফিচারে তিনি কখনো বিষয়বস্তু সম্পর্কিত বিখ্যাত কোনো কবিতার দু-একটি লাইন অথবা বিখ্যাত কোনো ব্যক্তির যথার্থ ও মানানসই উক্তি যুক্ত করতেন। তার সম্পাদনার গুণে অনেক অতি সাধারণ ফিচার ও প্রতিবেদনও পুরস্কৃত হয়েছে। দাদুভাই কপি সম্পাদনা করতে গিয়ে কখনো বিরক্ত হতেন না। বরং সব সময় সøেহে লেখককে লেখার ভুলত্রুটিগুলো ধরিয়ে দিয়ে তিনি পুরো লেখাটাই সংশোধন করে দিতেন। সুকুমার রায় এবং অন্নদাশঙ্কর রায় উভয় ধারাতেই দাদুভাইয়ের ছড়া সমান তালে পথ চলত। তার ছড়ায় বক্তব্যের স্পষ্টতা ও কৌতুকরসের প্রয়াস দুই-ই দেখতে পাওয়া যায়। বাংলা ছড়ার দুই দিকপালই কল্পনাশক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছেন দুই রূপে। সুকুমার রায় উদ্ভটরসের সৃষ্টিতে এবং অন্নদাশঙ্কর রায় বক্তব্যের ইঙ্গিতময়তায়। অথচ দাদুভাইয়ের ছড়ায় উভয় বসের ছোয়া স্পষ্ট। দাদুভাই নিজেই বলেছেন- আবহমান ছড়ার যে রূপ আর ঢঙটি আমাকে বশীভূত করে রেখেছে সে বশ্যতা আমি কোনোদিন অস্বীকার করতে পারব না।
সামাজিক দায়িত্ব থেকেই তার কলমে মাঝে মাঝে পরিস্ফুটিত হতো সামাজিক অসঙ্গতির আখ্যান। তার ছড়ায় এসেছে যানজট, লোডশেডিং ও বৃষ্টিতে ঢাকার দুরবস্থার চিত্র। ঢাকাবিষয়ক তার লিমেরিক ঢামেরিক খুবই অর্থবহ। ঢামেরিকের ছড়া-বুড়িয়ে গেছে বুড়িগঙ্গা/বাড়ছে বহর ঢাকার/চলছে নদীর বাটোয়ারা/খেলটা অঢেল টাকার।/হায়, প্রকৃতির এই পরাজয়/নদীর বুকে রোজ জমা হয়/রাসায়নিক বর্জ্য সমেত আবর্জনা ঢাকার। অথবা-এক পশলা বৃষ্টি হলেই সৃষ্টি ছাড়া ঢাকা/নদীর দেখার কষ্ট কি আর, স্পট করে তাকা-/এমন সুখের এ রাজধানী/মেইন সড়কে কোমরপানি/ডুব দিয়ে খুব টোকাইরা বেশ হয় সাঁতারু পাকা। এ দুটি ছড়ায় ঢাকার বাস্তব চিত্রই ফুটে উঠেছে।
দাদুভাই লিখেছেন-বুলবুলিতে ধান খেয়েছে/বর্গি এসে দেশ ছেয়েছে/অনেক দিনের কথা/ঘাটতি আজও হয়নি পূরণ/তাই কি নীরবতা?/শালিধানের চিড়ে/বিন্নি ধানের খই/উড়কি ধানের মুড়কি মুড়ি/ডালা মা তোর কই?/কাঁদিস নে মা/আশিস দে মা/খুঁদ কুড়নির ঝি/আবার ডালা ভরব বলে/আমরা এসেছি।[আমরা এসেছি, পৃষ্ঠা-৫০]। দরিদ্র মানুষের দৈনন্দিন টানাপোড়েনের বাস্তবতার চিত্র তার ছড়ায় ফুটে উঠেছে। তার ছড়ায় বাস্তবতার ছোঁয়া স্পষ্ট। যেমন- পাবনা থেকে ভাবনা নিয়ে এলেন তিনি ঢাকা/শুনেছিলেন এই নগরে হাওয়ায় উড়ে টাকা/মনে অনেক স্বপ্ন নিয়ে/টাকার পিছে ছুটতে গিয়ে/মস্ত ভুলের আঁস্তাকুড়ে পড়ে গেলেন ঢাকা।
সমাজ সচেতনতামূলক ও রাজনীতি সচেতন অনেক ছড়া লিখেছেন দাদুভাই। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর প্রবল সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ১০ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। এ ঘটনা নিয়ে পূর্বদেশ পত্রিকায় দাদুভাই ছড়া লেখেন- ছেলে ঘুমোলো বুড়ো ঘুমোলো/ভোলা দ্বীপের চরে/জেগে থাকা মানুষগুলো/মাতম শুধু করে/ঘুমো বাছা ঘুমো রে/সাগর দিল চুমো রে/খিদে ফুরোলো, জ্বালা জুড়োলো/কান্না কেন ছি!,/বাংলাদেশের মানুষ বুকে/পাষাণ বেঁধেছি। ওই সময় সম্পাদকীয় পাতায় গোর্কি ৭০ নামে ছড়াটি ছাপা হলে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতা এবং পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার বিবরণ দিতে গিয়ে কলকাতার বেতার কেন্দ্র আকাশবাণীর সংবাদ পরিক্রমায় ছড়াটি প্রচার করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রখ্যাত বাচিকশিল্পী দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় তার ভরাট কণ্ঠে ছড়াটি আবৃত্তি করেন। ছড়াটিতে দাদুভাই অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের নাম বদলে বাংলাদেশ নামটি ব্যবহার করেন। পরে যা বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী বহু লেখক ও কবি তা অনুসরণ করেন।
সমকালীন ছড়া সৃষ্টিতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন দাদুভাই। সমাজে যুগ যুগ ধরেই হরিলুটের ঘটনা ঘটছে। তার ছড়ায় সেই চিত্র স্পট। পাবনার রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের বালিশ কেলেঙ্কারি নিয়ে তিনি চমৎকার ছড়া লিখেছেন। ২০১৯ সালের ২৬ মে যুগান্তরের রোববারের সাময়িকী বিচ্ছুতে তার নিয়মিত ছড়া রফিকুল হক দাদুভাইয়ের কুট্টুস-এ তিনি লেখেন জয়, বালিশের জয়। নালিশ করে বালিশ পাবি/ছেলেবেলার স্মৃতি,/বালিশটা তো কথার কথা/মূল ছিল ঢের প্রীতি।/ও মনু তোর কোন দেশে ধাম/এক বালিশের কয় টাকা দাম/বালিশে কী হয়?/শুনুন কী কয় প্রাণীবিদরা,/বালিশে হয় সুখনিদ্রা/জয়, বালিশের জয়!/বালিশ যখন ছয় হাজারী/নয় তো বালিশ হাটবাজারী/বালিশ তখন খাঁটি,/কী কারণে মনের ভুলে/বালিশ নিয়ে নালিশ তুলে/করছো জীবন মাটি!/বালিশ নিয়ে নালিশ ওঠে/দেশের মানুষ কাঁদে/আটশ টাকায় একটা বালিশ/যখন ওঠে ছাদে।
ভাষা আন্দোলন, আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সক্রিয় যোদ্ধা ছিলেন দাদুভাই। তার লেখায় মুক্তিযুদ্ধের চিত্র জীবন্ত ও প্রাণবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে। শিশু সাহিত্যের মহীরুহ দাদুভাই লেখক হিসাবে, সম্পাদক হিসাবে, সংগঠক হিসাবে অথবা সৃজনশীল মানুষ হিসাবে ছিলেন ব্যতিক্রমী। সংবাদের খেলাঘর-এর ভাইয়া, ইত্তেফাকের রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই ও রফিকুল হক দাদুভাই-এরা নিজ কর্মগুণে বাংলায় অমর হয়ে থাকবেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় উজ্জীবিত দাদুভাই সৃজনশীল কর্মের মধ্য দিয়ে সবার মাঝে চিরদিন বেঁচে থাকবেন।
লেখক: সিনিয়র সাব-এডিটর, যুগান্তর



