নির্বাচিত কলাম

দুঃস্বপ্ন ভাঙবে না স্বপ্ন যদি না জাগে

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী


সংসারে মন্দ আছে যেমন তেমনি ভালোও আছে। ভালোর সংখ্যাই অধিক, নইলে সংসার চলে কী করে। তবে ভালোরা দুর্বল, মন্দরা প্রবল। তাই মন্দরাই রাজত্ব করে। শিশুদের দেখেছি ভালো ও মন্দকে খুব পরিষ্কারভাবে ধরে ফেলে এবং সমস্ত কিছুতে ওই দুই ভাগে ভাগ করে নেয়। তাদের কাছে ভালো যদি না হয় তাহলে অবশ্যই মন্দ। মাঝখানে কিছু রাখে না। কবি মুহম্মদ ইকবাল প্রায় সমাজতন্ত্রীই ছিলেন, কিন্তু ধর্মকে ছাড়তে পারেন নি, সেজন্য লিখেছেন, স্রষ্টা এবং সৃষ্টির মাঝে কেন তফাৎ? মধ্যবর্তী মোল্লাকে আজ হাঁকিয়ে দাও। কিন্তু মধ্যবর্তীকে হাঁকিয়ে দেয়া যায় নি। তারা আছে। এই মধ্যবর্তীদের নানা চেহারা, এরা কেউ মধ্যস্বত্বভোগী, কেউ দালাল, আর অত্যন্ত ভদ্র যারা তারা উদারনীতিক।

শিশুর কথা বলছিলাম। বিশ্বসভ্যতা অতি অদ্ভুত এক উচ্চতায় গিয়ে পৌঁছেছে। একেবারে থুরথুরে বৃদ্ধ না হোক প্রাপ্তবয়স্ক তো বটেই। কিন্তু করোনা ভাইরাসের ঐতিহাসিক আক্রমণ এক ধাক্কায় বিশ্বের সব মানুষকেই একেবারে শিশু বানিয়ে ছেড়েছে। সদ্য জন্মপ্রাপ্ত শিশুটি যেমন মাতৃগর্ভের নিরাপত্তা হারিয়ে কাঁদে, বয়স্করাও কাঁদুক না-কাঁদুক নিদারুণ নিরাপত্তাহীনতায় যে ভুগছে এবং ভুগছে তাতে সন্দেহ কী। বয়স্কদের তুলনায় শিশুদের অবশ্য নিরাপত্তাহীনতা সবসময়ই অধিক ছিল, এখন মানবসভ্যতার এই অবিশ্বাস্য উন্নতির কালেও শিশুদের নিরাপত্তা যে বেড়েছে এমন নয়। করোনাকালে সবচেয়ে অনিরাপদ অবস্থায় রয়েছিল শিশুরাই। শিশুর যত্ন সর্বাগ্রে প্রত্যাশিত তার মায়ের কাছ থেকেই। সেই মায়েরা নিজেরাই খুব বিপদের মধ্যে পড়ে। অতি আধুনিক শহর নয়া দিল্লি, সেখানে ২০২০ সালের ২৬ নভেম্বর ৮৬ বছরের একজন মহিলা ধর্ষিত হন এক যুবকের দ্বারা। বাংলাদেশের অবস্থা সম্পর্কে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বলেছিল, করোনাকালে নারী ও শিশু নির্যাতনের সব খবর মিডিয়াতে না আসার কথা; ওই সময়ে নির্যাতন বেড়েছিল। দিল্লি এবং বাংলাদেশের উভয় ঘটনাই স্বাভাবিক ছিল। করোনার সময়ের কর্মহীনতা, হতাশা, আনন্দহীনতা, আবদ্ধদশা- সবকিছুই মানুষকে ঠেলে দিচ্ছিল আদিম হিংস্রতার দিকে। রিপুগুলো সব সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। বিশেষভাবে লকলকিয়ে উঠেছিল পুরুষ মানুষের কাম, ক্রোধ ও লোভ। যার সহজ শিকার হতে হয়েছিল নারীকে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সঙ্কুচিত হওয়ার দরুন বিজ্ঞাপন কমে যায়, মুদ্রিত খবরের কাগজের পাতায় পাতায় করোনার জীবাণু লুকিয়ে থাকতে পারে এই ভয়ে অনেক বাড়িতে খবরের কাগজের প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়ে পড়ে।

নারী নির্যাতনের মতোই শিশু নির্যাতন অবশ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। উন্নতির স্তরে স্তরে শিশুশ্রমের ক্রন্দন ও ঘাম চাপা দেয়া রয়েছে। কিন্তু নতুন যা যোগ হয়েছে তা হলো শিশুধর্ষণ। ধর্ষণ করছে এবং সাক্ষী না রাখার জন্য ধর্ষিত শিশুটিকে হত্যা করছে। বাংলাদেশে এ জিনিস এখন অজানা নয়; এখন এটা নিত্যদিন যখন তখন যেখানে সেখানে ঘটছে। শিশু ধর্ষণের অনেক খবর পত্রিকায় প্রায়ই দেখা যায়। যেমন- টাঙ্গাইলে ১০ বছরের একটি শিশুকে প্রথমে ধর্ষণ ও পরবর্তীতে হত্যা করে ঝোপের মধ্যে ফেলে দেয়া হয়েছে। কিশোরগঞ্জে রাতের বেলা সিঁধ কেটে একটি শিশুকে অপহরণ ও ধর্ষণ করা হয়েছে। এ জাতীয় খবর হরহামেশাই দেখা যায়। বাংলাদেশে মানুষের জন্য নিরাপত্তা আজ কোথাও নেই। পথে ঘাটে সড়ক দুর্ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক, অনেক মানুষেরই ঘর নেই, যারা ঘরে থাকে তারাও নিরাপদে ঘুমাতে পারে না।

যে শিশু কোনো মতে বেঁচেবর্তে কিশোর হয় তাদের অবস্থাটা কী? কোথায় তাদের খেলার মাঠ, নাটকের মঞ্চ, বই পড়ার পাঠাগার, চলবার ফিরবার পরিসর? এসব জিনিস এককালে অল্পস্বল্প যা কিছু ছিল এখন তা অতীতের সুখস্মৃতিতে পরিণত। কিশোর আন্দোলনও ছিল। ছিল মুকুল ফৌজ, খেলাঘর, কচিকাঁচার মেলা, চাঁদের হাট- সেসব কোথায় গেছে চলে! একালের ছেলেমেয়েরা শুনলে মনে করবে গালগল্প। তা কোথায় গেল ওইসব আন্দোলন? কেন গেল চলে? গেল কিন্তু উন্নতির কারণে। উন্নতি মাঠময়দান সব দখল করে নিয়েছে। উন্নতি শিশুকে সমাজবিচ্ছিন্ন করেছে। উন্নতির সাম্প্রতিক আওয়াজ আইসোলেশন। উন্নতির চূড়ান্ত প্রকাশ ও প্রকোপ করোনা ভাইরাস, যার হাত থেকে বাঁচবার একমাত্র উপায় ঘরের (যদি থাকে) ভেতর লুকিয়ে থাকা। মুখে মুখোশ পরে থাকা। আগে চোর ডাকাত খুনিরা ওই জিনিস পরত।

কিশোররা এখন কী করে? হতাশায় ঝিমায়, স্বপ্ন দেখার লোভে মাদক সেবন করে, কে সিনিয়র কে জুনিয়র বিতর্কে মত্ত হয়ে খুনোখুনি করে। আর কী করে? তাদের বিনোদন কী? তার অনেক নমুনা তো করোনাকালেই পাওয়া গেছে। মদ খেয়ে মারা যায়। তুলনামূলকভাবে এগুলো তত ভয়ংকর নয় যত ভয়ংকর কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা। কিশোর আন্দোলন নিশ্চিহ্ন হলেও পাড়ায় মহল্লায় কিশোর গ্যাং গড়ে উঠেছে। তাদের তৎপরতা কমছে না; বাড়ছে। কিশোর গ্যাং কী করে? নিজেদের মধ্যে ছুরি চালাচালি করে, খুন হয়। সংঘর্ষ বাধলে শীতলক্ষ্যায় ঝাঁপ দেয়, পরে লাশ হয়ে ভেসে ওঠে। আরো কাজ আছে তাদের। যেমন- দিনাজপুরে শালবনে ‘বন্ধুকে বেঁধে কলেজছাত্রীকে ধর্ষণ’। অথবা কিশোরগঞ্জে ‘প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় স্কুলছাত্রীকে ছুরিকাঘাত’। কোনো খবরই নতুন নয়। তবে অন্য অনেক কিছু কমলেও এগুলো একটুকুও যে কমেনি সে ব্যাপারটাই তাৎপর্যপূর্ণ। মামলা মোকদ্দমাও চলছে। তবে এদের ঘাড় ইতোমধ্যেই যথেষ্ট পোক্ত ও প্রশস্ত হয়ে গেছে। ফলে পরোয়া করে না। জামিনে থেকে অথবা জেল খাটা শেষে আবারো তৎপর হয় এবং তৎপর থাকে যতক্ষণ না মৃত্যু ঘটে। আমৃত্যু সাধনা। কিশোররা কি ভালো কাজ করে না? অনেকেই করে, কিন্তু সেসব প্রচার পায় না। ভালো কাজগুলো আলো-বাতাসের মতো, তারা মিশে যায়, মিশে থাকে; খারাপ কাজগুলো গুচ্ছ গুচ্ছ অন্ধকার, তারা দুষ্ট বাতাস, তারা নাড়িয়ে দেয়। তারা সংক্রামক। আমরা টের পাই। অন্যের অপকর্মে বাধা দিয়েছে কিশোর, দিতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে, এমন ঘটনাও ঘটে। ঘটেছে এই করোনাকালেও। কিশোররা যে ভালো কাজ কতটা করতে পারে দেখেছি তা অতীতের ছাত্র-আন্দোলনে। দেখেছি মুক্তিযুদ্ধে। দেখেছি ঢাকা শহরে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনায় তারা যখন রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছিল তখনো। স্বেচ্ছাসেবী কিশোররা যান চলাচলে এমন শৃঙ্খলা এনে দিয়েছিল যেমনটা বেতনভূক ও সুবিধাপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য দুঃসাধ্য। আর সে জন্যই ওই ভালো কাজটিতে তারা টিকে থাকতে পারে নি। তাদেরকে সরে পড়তে হয়েছে। এমনকি হয়রানির শিকার পর্যন্ত হতে হয়েছে। নীরবে এমন উচিত শিক্ষা দিয়ে দেয়া হয়েছে যেন আর কখনো ও-মুখো না হয়। তোমরা মাদক খাও ঠিক আছে, অল্পবয়স এদিক সেদিক তো করবেই; তোমরা দাঙ্গা-ফ্যাসাদ করো তাও সহ্য হয়, কিন্তু পুলিশের কার্যে হস্তক্ষেপ? তাহলে পুলিশ কী করবে?

আমরা যখন কিছুটা কম উন্নত ছিলাম তখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রসংসদ নামে একটি পরিসর ছিল। ছাত্রসংসদের কার্যক্রমের অংশ নিয়ে ছেলেমেয়েরা অনুশীলনের মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক-সামাজিকভাবে গড়ে ওঠার সুযোগ পেত, পরে উন্নয়নের জোয়ার যখন চলে এলো তখন দেখা গেল তার প্রপাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ শুকিয়ে যাওয়া শুরু হয়েছে। পরিণামে দেখা গেল অপরাধ ও সহিংসতার মারাত্মক বৃদ্ধি এবং সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের দোর্দণ্ড প্রতাপ। যার সাক্ষী ছিল সহপাঠীদের হাতে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরারের করুণ মৃত্যু। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন কাজে ছাত্রলীগের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতাদের থাবা বসানোর ওই প্রচেষ্টাও জানিয়ে দেয় যে ক্ষমতা সঙ্গে থাকলে কী কী সুযোগ-সুবিধা হস্তগত করা সম্ভবপর।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension