
নদী মরু পথে হারাবে না!
মাহমুদ রেজা চৌধুরী
আমাদের মতো সাধারণ অনেক মানুষের কোন কিছুতে মালিকানালিপসা,আধিপত্যবোধ, শঠতা, নেতিবাচক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, শক্তি প্রয়োগ।
আমাদের সৃজনশীলতাকেও ব্যাহত করে। আমাদের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতাকে অনিশ্চিত করে। সত্যি কারের একটা সুন্দর ও প্রগতিশীল সমাজ উন্নতির ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করে। রাজনীতি ও অর্থনীতিকেও ব্যক্তি বা ক্ষুদ্র শ্রেনী স্বার্থে ব্যবহার করে।
মানবচৈতন্যের নানান অমঙ্গলকর প্রবণতা গুলি বাস্তব অবস্থার যেকোনো অসুন্দর আত্মপ্রকাশে শক্তিশালী হয়ে দাঁড়ায়। সমাজ বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে, বিভিন্ন স্থানে, কালে ও বিভিন্ন নৈতিক সংকটেও এইগুলি আমাদের কল্যাণ চিন্তাকে বাধাগ্রস্ত করে।
এমন একটা অবস্থায় আমাদের সমাজ এবং রাষ্ট্রের অনেক সুন্দর নদীপথ কোন না কোন মরুভূমিতে হারিয়ে গেছে ও এখনও যায়। আমরা আমাদের কাজের অনিবার্য পরিণতি সম্পর্কে খুব একটা সচেতন না। একটা সমাজ এবং রাষ্ট্রের নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং তাদের উত্তম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের অধিকার চর্চা, অব্যাহত থাকা। আধুনিক নাগরিকদের একটা অন্যতম অধিকার ও বৈশিষ্ট্য। কিন্তু আমরা আমাদের বাংলাদেশের দিকেও যদি তাকাই দেখতে পাই, আমাদের এই রাষ্ট্রের সৃষ্টি হবার পর থেকেই আমরা এই নদীর কোন সুন্দর ধারাবাহিকতাকে বহু ক্ষেত্রেই সাগরে মিলিয়ে দিতে পারিনি। তাই আমাদের অনেক স্বপ্নের নদী হারিয়ে গেছে চলতে চলতে মরুপথে।
৫ আগস্ট, ২০২৪ পরে আমাদের মধ্যে একটা নতুন সমাজ ও রাষ্ট্রের সার্বিক নিরাপত্তাবোধ ও স্বাধীনতার সঠিক পথ খুঁজে বের করবার নতুন ইচ্ছা ও স্বপ্ন সৃষ্টি হয়। আমরা এখনও একটা কোলাহলের মধ্যেই আছি ও যাচ্ছি। একে কোলাহল বা হট্টগোল যাই বলি না, এর উত্তরনে আপাতত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা এবং সেটা প্রতিষ্ঠা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কতটা সফল কখন হব এতে। তা এই মুহূর্তে যদিও জানিনা। এখন পর্যন্ত আমাদের সফলতার সেইরকম কোন সূর্যের আলো দেখি না। হতে পারে, এটা আমার দেখার সীমাবদ্ধতা বা যা দেখছি তা ঠিকই দেখছি।
আপাতত অনেক কিছুই না দেখার কারণ, আমাদের অধৈর্য, নেতৃত্বের দুর্বলতা এবং জরুরী কিছু সিদ্ধান্তে বিলম্ব করা। যেমন, বিগত সরকারের কয়েকজন চিহ্নিত জনশত্রু, দেশের ও সমাজের শত্রুকে এখন পর্যন্ত দ্রুত বিচারের আওতায় না আনার ব্যর্থতা; যা উদ্দেশ্যমূলক হতেও পারে। আমরা এখনো জানিনা, বিগত সরকার ক্ষমতা হারাবার পর যে কয়েকশ’ ব্যক্তি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় ছিলেন। সেই তালিকাও কিন্তু অজানা।
সরকারি প্রশাসনের ভেতর এখনো ছদ্মবেশে জাতির শত্রু বহাল আছে। কর্তৃপক্ষ এদের যে চেনেন না, তাও না। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে দ্রুত কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না সরকার। এই বিলম্বের ফলাফল শুভ না হবার সম্ভাবনা আছে।
বিগত ৫২, ৫৩ বছরে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় মনোবৃত্তিতেও যে লুণ্ঠন মানসিকতা তৈরি হয়, এই নেটওয়ার্ক থেকেও দ্রুত বের হওয়া সম্ভব না। দুই দিকেই আমাদের লুটপাটের “কালচার” বহুদিন থেকেই চলছে। আমাদের উৎপাদন এবং এর সাথে উৎপাদন বন্টন প্রক্রিয়ায় আমাদের মধ্যে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বা গণতান্ত্রিক রাজনীতির কোন ভালো কিছুকেই প্রতিষ্ঠা করতে পারি নাই। তাই এখনো সমাজ কাঠামোতে এবং এর রাজনীতিতে অর্থনৈতিক অবিচার বর্তমান অব্যবস্থাপনার একটা বড় দিক।
এটার সব কিছু ঠিক করা বর্তমান স্বল্প মেয়াদের সরকারের পক্ষে সম্ভব না। পাশাপাশি, এই সরকার সারা রাষ্ট্রের একটা টোটাল অব্যবস্থাপনার মধ্যে তড়িঘড়ি করে কোন নির্বাচন দিলেও নির্বাচিত কোন দল বা সরকার, দেশের মূল সমস্যার সমাধানে কতটা সহায়ক হবেন। এই ব্যাপারেও সাধারন মানুষের মনে সন্দেহ আছে, সংশয় আছে, আছে অনেক অনাস্থাও।
আমরা জানি, আধুনিক রাষ্ট্রে সরকারি আমলাদের ক্ষমতা এক বিরাট ও ক্রমবর্ধমান বিপদ। নানা কারণেই তারা বিপদ হয়ে আছেন জাতির নদীর সুশৃংখল বহমানতারপথে। তাই আমাদের চিন্তা, চেতনা এবং ইচ্ছার অনেক নদীপথ মরুপথে হারিয়ে গেছে ও যাচ্ছেও বার বার।
আমরা সংকটে থাকলেও এর উত্তরণের ব্যাপারে নতুন কিছুকে বা নতুন ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিতে পারি না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা পুরাতনকেই ধরে থাকতে চাই, নিজস্ব শ্রেণী স্বার্থে। কোন ব্যাপারে পূর্ণ সত্যে পৌঁছবার ক্ষমতা মানুষের নাই, কিন্তু পূর্ণ সত্যের দিকে পর্যায়ক্রমে অগ্রসর হওয়া খুব অসম্ভব কিছু না হয়তো। প্রত্যেক দেশে প্রত্যেক সাধারণ প্রয়োজনের ব্যাপারে একেক সময় একেকটা পূর্ব মত প্রচলিত থাকে। যারা কোন ব্যাপারে বিশেষ কিছু চিন্তা করেন না, তারা এই গতানুগতিক মতকে জীবনযাত্রার পদ্ধতি হিসেবে সহজে গ্রহণ করে নেন এবং সেটাই অনুসরণ করেন। এই পূর্ব প্রান্ত মত সম্পর্কে কোন প্রশ্ন উঠলে নানা করনে এই আমরাই তার বিরোধিতা করি।
কেন করি? এই প্রশ্ন আসতেই পারে। এর অনেকগুলি কারণের একটা উল্লেখযোগ্য কারণ, গতানুগতিক ধারায় চলার সহজাত প্রবৃত্তি। দ্বিতীয় কারণ, যেসব বিশ্বাস অবলম্বন করে আমরা জীবন যাপন করি, সেইগুলি সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করার ফলে সৃষ্টি হয় এক এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা বোধ। তৃতীয় কারণ, যেকোনো কায়েমি স্বার্থ পূরণে সব বিশ্বাসের সাথে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কে যুক্ত থাকি আমরা। সংক্ষেপে, গতানুগতিকতার সহজাত প্রবৃত্তি, অনিশ্চয়তার ভয় এবং কায়েমি স্বার্থ নতুনের পথে আমাদের মন চিন্তা ও মানসিকতার পরিবর্তনে বড় বাধা।
এই সবগুলি আমাদের নতুন মত বা নতুন পথে অগ্রসর হবার ব্যাপারেও পেছন থেকে ধরে রাখে। আমরা নিজেদের যতই আধুনিক মনের মানুষ বলি না কেন, বিশেষ করে রাজনৈতিক এবং সামাজিক অনেক ক্ষেত্রেই নতুন অনেক কিছুকেই গ্রহণ করতে পারিনা বা চাই না। সেই কারণেও ৫ আগস্ট ২০২৪ এর পরিবর্তনে অনেকেই আমরা এর সাথে আত্মিকভাবে যুক্ত হতে পারছি না।
কেউ, কেউ সমর্থন করছি এই পরিবর্তনকে কিন্তু তার সাথে নিজেদের পরিবর্তনের মনস্তাত্তিকতা তৈরি না এখনোও। বারবার যে “গাভী” লাথি মারে
তাকেই কাছে পেতে চাই। সর্বনাশের দৃশ্যগুলিও আমরা নিমিষেই ভুলে গেছি ও যাচ্ছি। যেকোনো পরিবর্তনের নতুনত্বকে গ্রহণ করতে আমাদের মধ্য থেকে “ক্ষমতা বাসনার” দূষণীয় বায়ু থেকেও মুক্ত থাকা দরকার। তবে এই ক্ষমতার বাসনা পুরোটাই যে দূষণীয় তাও না। এই বাসনা নিয়ে অনেক ভালো কাজ করাও সম্ভব। খারাপ দিকে পরিচালিত হওয়ার বিষয়টা ব্যক্তি স্বার্থ ও ব্যক্তির জীবনবোধের উপরে নির্ভর করে, পাশাপাশি তার ক্ষুদ্র শ্রেণী স্বার্থ।
নতুন বাংলাদেশে একটা নতুন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইলে আমাদের মধ্য থেকে ক্ষমতার অপব্যবহারের রাজনীতি প্রবণতা দূরে রাখা দরকার। বাসনার সাথে আকাঙ্ক্ষার একটা “ইতিবাচক” যোগসূত্রতা না থাকলে ক্ষমতার অপব্যবহার সংস্কৃতি দ্রুত বিকশিত হয় ও হবে। আমাদের সুন্দর আকাঙ্ক্ষায় থাকে সবার জন্য যা ভালো, সেটাই আমার জন্য ভালো। কিন্তু আমার একার জন্য ভালো কিছু আশা করা আকাঙ্ক্ষার নেতিবাচক প্রভাবকে প্রভাবিত করতে পারে। আমাদের বৃহত্তর সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও রাজনীতি চিন্তার যেকোনো নেতিবাচক প্রবণতাকে রোধ করতে পারলেই পদ্মা, মেঘনা, যমুনার নদীপথ আর মরুভূমিতে হারাবেনা। কারোর রক্তেও লাল হবে না।



