পঞ্চাশ বছরের স্বাধীনতা ও ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারের দাপট রাজনীতির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রকট। ১৯৪৭-এ ব্রিটিশ শাসকরা চলে গেল, আমরা ভাবলাম আপদটা নেমে গেছে ঘাড়ের ওপর থেকে। কিন্তু অচিরেই টের পাওয়া গেল যে, গেছে বটে, তবু যায়নি। তাদের গড়া রাষ্ট্রব্যবস্থাটা ঠিকই রয়ে গেছে। পাকিস্তান নামের যে নতুন রাষ্ট্রটি আমরা পেলাম সেটি আয়তনে ছোট অবশ্যই, নামেও আনকোরা নতুন, কিন্তু চরিত্রে মোটেই পৃথক নয়। ব্রিটিশ শাসনের সময়ে রাষ্ট্র ছিল পুরোপুরি ঔপনিবেশিক, স্বাধীনতার পরে রাষ্ট্রীয় শাসনটা দাঁড়াল ছদ্ম ঔপনিবেশিক। তাকে নব্য-ঔপনিবেশিক বলাটা অন্যায্য নয়। রাষ্ট্রের ভেতরকার যন্ত্রপাতি, তার বিভিন্ন বাহিনী, আইনকানুন, শাসনপ্রণালি সব কিছুই আগের মতো রয়ে গেল। ব্রিটিশের দ্বারা প্রশিক্ষিত অসামরিক ও সামরিক আমলারা দেখা গেল আগের মতোই কর্তৃত্ব করছে। বিশেষভাবে দুরন্ত হয়ে উঠল সামরিক বাহিনী। ব্রিটিশের রাষ্ট্রের আদত শক্তিটা ছিল ওই সেনাবাহিনীতেই। সেনাবাহিনী রয়ে গেছে এবং থেকে থেকে শাসন ক্ষমতা দখল করে নিয়েছে। সব কিছুর অন্তরালে শাসন ও শোষণ সমানে চলল, তবে যন্ত্রপাতিগুলো যেহেতু অতিরিক্ত ব্যবহারের দরুণ কিছুটা জীর্ণ হয়ে পড়েছিল এবং নতুন চালকরা যেহেতু আগেরগুলোর মতো দক্ষ ছিল না, তাই শাসিত জনগণের যন্ত্রণা বরঞ্চ বেড়েই গেল। আওয়াজ উঠল জাতিগঠনের ও রাষ্ট্রগঠনের, কিন্তু ভেতরে ভেতরে যা চলতে থাকল তা হলো শ্রেণি সংহতকরণ।
ব্রিটিশ শাসকরা বিদেশি ছিল। পাকিস্তানি শাসকদের আমরা দেশি মনে করেছিলাম, অনতিবিলম্বেই টের পাওয়া গেল যে তারা নামেই যা আপন, নইলে ভাষায় তো অবশ্যই আচরণেও বিদেশি ভিন্ন অন্যকিছু নয়। আমরা ঠিক করলাম এদেরকে তাড়াব। এবং ঠিকই তাড়িয়ে দিলাম। স্বাধীন বাংলাদেশ নামে রাষ্ট্র তৈরি হলো। এখন আর দুর্বৃত্ত বিদেশিরা নেই, এখন আমরা এবং আমাদের মামারাই সর্বেসর্বা। তবে মামারা ছিলেন কিছুটা অগ্রসর, তাদের বিত্ত ছিল, হাতে ছিল নানাবিধ অস্ত্র; দেখা গেল অত্যাশ্চর্য দ্রুততায় তারা পরিত্যক্ত গদিগুলো সব দখল করে নিয়েছেন। মামারা শাসক হয়ে গেছেন, একটি শাসক শ্রেণি গড়ে তুলেছেন। দেশের সম্পদকে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করেছেন এবং বিদেশে পাচারও করে দিচ্ছেন। পাকিস্তানি শাসকদের মতোই তারা নিঃসঙ্কোচে লুণ্ঠন ও অত্যাচার করছেন। এই মামারা দেশেরই সন্তান, কিন্তু তারা ক্রমাগত এবং আমাদের চোখের সামনে বিদেশি হয়ে উঠেছে। আগের দিনে জমিদারেরা ছিল, তারা ছিল সামন্তবাদী; এখানকার শাসকরাও সামন্তবাদী আনুগত্য চায় ঠিকই, কিন্তু তাদের পুঁজিবাদী চোখ নগদ মুনাফা ও স্থায়ী ক্ষমতার দিকে।
আমরা আশা করেছিলাম স্বাধীন রাষ্ট্রে গণতন্ত্র পাব। যা পাওয়া গেছে তা হলো বিভিন্ন পোশাকে স্বৈরতন্ত্র। নির্বাচিত সরকার আসে, অনির্বাচিত সরকার তাদেরকে সরিয়ে দিয়ে ক্ষমতা দখল করে নেয়, আবার দেখি নির্বাচিতরা এসে গেছে, কিন্তু এদের কারোরই বিন্দুমাত্র দায় থাকে না জবাবদিহিতার। ব্রিটিশের রেখে-যাওয়া রাষ্ট্রটি ছিল নির্ভুলরূপে আমলাতান্ত্রিক, বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রটিও তা-ই। আমলাতন্ত্র জবাবদিহিতার ধার ধারে না, আমাদের রাজনৈতিক শাসকরাও একই রকমের, তারা যা ইচ্ছা তাই করে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা পেয়েছে একটি সশস্ত্র জনযুদ্ধের ভেতর দিয়ে। একাত্তরে এটা অকল্পনীয় ছিল যে এই রাষ্ট্রে আবার সামরিক শাসন আসবে। অথচ সেটাই ঘটেছে। একবার নয়, বার বার। পাকিস্তানে যেমন বাংলাদেশেও তেমনি সামরিক বাহিনীকে ক্রমাগত শক্তিশালী করা হয়েছে, সংখ্যা সুযোগ-সুবিধা ক্যান্টনমেন্টের সংখ্যা অতি দ্রুতগতিতে বেড়েছে। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা চলেছে। কিন্তু তারা সন্তুষ্ট থাকেনি, তাদের জন্য যুদ্ধের কোনো ক্ষেত্র ছিল না; এখনো নেই, তাই তারা সুযোগ বুঝে ক্ষমতা দখল করে নেয়। তারা অলস থাকাটা পছন্দ করে না। ব্রিটিশ আমলে ব্যবস্থাটা এমন ছিল যে লোকে প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষক হওয়ার তুলনায় সরকারি অফিসের পিয়ন হওয়া ঢের বেশি পছন্দ করত। অত্যন্ত কঠিন মূল্য দিয়ে দুই দুইবার স্বাধীনতা প্রাপ্তির পরও সম্মানের সেই কাঠামোতে যে পরিবর্তন এসেছে এমনটা বলবার কোনো উপায় নেই।
নাগরিকদের জান ও মালের নিরাপত্তা দানের দায়িত্ব কি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কি পাকিস্তানি নব্য-ঔপনিবেশিক কোনো সরকারই নেয়নি, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকারেরাও নিচ্ছে না। যেসব অধিকারের কথা সংবিধানে লেখা আছে বাস্তবে তাদের কোনো কার্যকারিতা দেখতে পাই না। বরঞ্চ সত্য থাকে এটাই যে রাষ্ট্র ক্রমান্বয়ে বেশি বেশি মাত্রায় নিপীড়নকারী হয়ে উঠেছে। স্বাভাবিক সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কথা আগে শুনিনি, এখন তা স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের চেষ্টা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন অধিক। রাজনৈতিক সমস্যাকে আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা বলার যে অভ্যাস ব্রিটিশ শাসকদের মজ্জাগত ছিল, পাকিস্তানি দুঃশাসনের চড়াই-উতরাই পার হয়ে এসে বাংলাদেশের শাসকরা তা থেকে মুক্তি পায়নি। অভ্যাসটি ব্যবস্থার প্রয়োজনে ও প্রশ্রয়েই তৈরি হয়েছিল। ব্যবস্থাটি নিত্যই নতুনভাবে প্রমাণ দিচ্ছে যে সে বদলায়নি।
একাত্তরে ভারত সরকারকেও উদ্বিগ্ন থাকতে হচ্ছিল। কেবল যে এক কোটি শরণার্থীর বোঝা বহন করতে হয়েছে বলে তা নয়, শরণার্থীদের ভেতর শতকরা ৮০ জনই যে ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের সে-কারণেও। পূর্ববঙ্গে হিন্দুনিধন চলছে, সেখানে হিন্দুরা আর ফিরতে পারবে না, থাকতেও পারবে না, এই ধারণা ভারতে সাম্প্রদায়িকতার বোধকে উসকানি দেবে, এটা অস্বাভাবিক ছিল না। উসকানি দিচ্ছিলও। কোথাও কোথাও দাঙ্গার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। ওদিকে আবার ভারতে তখন ৭ কোটি মুসলমানের বসবাস, তাদের অধিকাংশের কাছেই পাকিস্তান ভেঙে যাওয়াটা পছন্দের ঠেকেনি। উত্তেজনাটা এদের মধ্যেও ছিল।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে পাকিস্তান আমলে হিন্দু সম্প্রদায়ের যে সদস্যরা দেশ ছেড়ে চলে গেছে তাদের সম্পত্তিকে পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করার বিধি চালু হয়েছে। আগে ছিল শত্রæ সম্পত্তি, এখন হলো পরিত্যক্ত সম্পত্তি। ওইটুকুই যা তফাত। নামেরই। আর ব্যক্তিগত পর্যায়ে হিন্দু সম্পত্তি দখলের চেষ্টা যে কমেছে তা বলা যাবে না। একাত্তরের পরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ভারতে হয়েছে, বাংলাদেশেও হয়েছে। ভারতে বিপুল উত্থান ঘটেছে বিজেপির; বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদীদের।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কংগ্রেসের বিরোধিতাটা ছিল উগ্র, কমিউনিস্ট পার্টি এ ব্যাপারে নরম ছিল, তারা মৃদু সমর্থন পর্যন্ত জানিয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দেখা গেল কংগ্রেস নিষিদ্ধ হয়নি, তাদের নেতারা একজনও গ্রেপ্তার হননি; নিষিদ্ধ হয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি, তাদের নেতারা হয় আত্মগোপনে গেছেন, নয়তো গ্রেপ্তার হয়েছেন, কেউ কেউ চলে গেছেন দেশ ছেড়ে, কয়েকজন নিহত হয়েছেন জেলের ভেতরেই, অনশনরত অবস্থায়। ভারতেও একই ঘটনা; সেখানেও অতিপরিচিত শত্রæ মুসলিম লীগ কখনোই নিষিদ্ধ হয়নি, মাঝে মধ্যে নিষিদ্ধ হয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি, জেল খেটেছেন পার্টির নেতারা।
ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের অভ্যাসটা পাকিস্তান আমলে কেটে যাওয়ার কোনো কারণ ছিল না, কেটে যায়ওনি, উল্টো বৃদ্ধি পেয়েছে। পাকিস্তান রাষ্ট্র সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে পারেনি, সেখানে দাঙ্গা হয়েছে। তবে রাষ্ট্র কমিউনিস্টদেরই নিকৃষ্টতম শত্রæজ্ঞানে সম্মানিত করা অব্যাহত রেখেছে। তাদেরকে নাস্তিক বলে চিহ্নিত করে সরল ধর্মবিশ্বাসীদের চোখে শয়তানের অনুচর হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালিয়েছে। একেবারে যে ব্যর্থ হয়েছে তাও নয়।
ব্রিটিশ আমলে রাষ্ট্র ছিল এককেন্দ্রিক এবং দূরের প্রভুদের দ্বারা শাসিত। স্থানীয় শাসকরা ছিল সরকারি আমলা। আদত প্রভুরা থাকত বিলেতে। পাকিস্তান আমলেও রাষ্ট্র এককেন্দ্রিকই রইল। পূর্ববঙ্গের বেলায় স্থানীয় শাসকরা ছিল আমলা গোমস্তা, প্রভুরা থাকত করাচিতে, নয়তো রাওয়ালপিন্ডিতে। স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রটি আগের দুটির তুলনায় অনেক ছোট, কিন্তু একই রকমের এককেন্দ্রিক। কেবল এককেন্দ্রিক নয়, ক্ষমতার চাবিকাঠি এই রাষ্ট্রেও রয়ে গেছে একব্যক্তির হাতে; কথাকথিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তিনি প্রধানমন্ত্রী, সামরিক আধা-সামরিক ব্যবস্থায় তিনি রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রের দৃশ্যমান শাসকরা স্থানীয়, কিন্তু তাদের অদৃশ্য মুরব্বিরা থাকে বিদেশে, বিশেষভাবে ওয়াশিংটন ও দিল্লিতে। স্থানীয় শাসকরা বিদেশি মুরব্বিদের রাগ-অনুরাগের দিকে তাকিয়ে থাকে।
ব্রিটিশ শাসকদের রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে কংগ্রেস ও লীগ ছিল প্রধান প্রতিপক্ষ, কিন্তু তাদের চাইতেও বিপজ্জনক ছিল কমিউনিস্টরা। সংক্ষেপে বলতে গেলে কংগ্রেস-লীগ ছিল শাসকদের প্রতিদ্ব›দ্বী, আর কমিউনিস্টরা ছিল শাসকদের শত্রæ। ওদিকে বিবদমান কংগ্রেস ও লীগ উভয়ের চোখেই কমিউনিস্টরা ছিল জাত শত্রæ। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র, দেশপ্রেমিক কংগ্রেস এবং লীগ, পুঁজিবাদী এই তিন পক্ষই একমত ছিল এই জরুরি প্রশ্নে যে আর যাই করা হোক না কেন সমাজকাঠামোতে কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা যাবে না, পরিবর্তন বরঞ্চ ঠেকাতে হবে। অপরদিকে কমিউনিস্টরা তো ছিল সমাজবিপ্লবের স্বঘোষিত কর্মীবাহিনী। দুপক্ষের শত্রæতাটা তাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল অবশ্যম্ভাবী। রাষ্ট্র বদলেছে, প্রথমে হয়েছে হিন্দুস্থান-পাকিস্তান, পরে বাংলাদেশ হয়েছে, কিন্তু সমাজবিপ্লববিরোধিতার রাজনীতি মোটেই ক্ষান্ত হয়নি। রাষ্ট্রীয় কর্তারা ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারকে কেবল যে বহন করে চলেছেন তাই নয়, নিজেদের প্রয়োজনে তাকে আরো শক্তিশালী ও ব্যবহারের উপযোগী করে তুলেছেন।
স্মরণীয় যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ অত দ্রুত শেষ হতো না যদি না কুশীলবদের মনে এমন শঙ্কা থাকত যে যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে চরমপন্থিরা (অর্থাৎ কমিউনিস্টরা) মূল শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে নতুন একটি ভিয়েতনামেরই জন্ম দিয়ে ফেলবে। যুদ্ধ শুরুর আগেই শেখ মুজিবুর রহমান পুঁজিবাদী বিশ্বকে এই মর্মে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে তারা যেন বুঝতে ভুল না করে যে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে তিনিই শেষ রক্ষাপ্রাচীর। তার পতন ঘটলে বিপদ আছে। পুঁজিবাদী বিশ্ব যে সেটা জানত না তা নয়, কিন্তু তাদের ধারণা হয়েছিল যে, বামভাবাপন্ন তরুণরা মুজিবকে এমনভাবে ঘিরে ফেলেছে যে, শেষ পর্যন্ত তাদেরকে তিনি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেন না। সে জন্য শেষ মুহূর্তে তাঁর প্রতি সমর্থন তারা প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
আপসপন্থিদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে বাংলাদেশ যখন কোনোমতে প্রতিষ্ঠিত হলো নতুন রাষ্ট্রের জন্য তখন শত্রæ কারা? শত্রæ হওয়ার কথা হানাদারদের চিহ্নিত দোসর আলবদর রাজাকারেরাই। কিন্তু তারা শত্রæ বলে বিবেচিত হলো না, বরঞ্চ কিছুটা ধীরে ধীরে হলেও সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনেতিকভাবে পুনর্বাসিত হয়ে গেল। শত্রæ হয়ে দাঁড়াল সমাজবিপ্লবে বিশ্বাসীরা (অর্থাৎ কমিউনিস্টরা)। তবে এরা তখন দুই ভাগে বিভক্ত, নরমপন্থি ও চরমপন্থি। নরমপন্থিরা ভারতে গেছে, তারা যুদ্ধ তৎপরতায় শামিল হতে চেয়েছে, কিন্তু ভারত সরকার কমিউনিস্টদের বিশ্বাসযোগ্য মনে করেনি, এমনকি তাদেরকেও নয় যারা নরমপন্থি। যুদ্ধ থেকে তাদেরকে দূরে রাখার ব্যাপারে তাই ভারত সরকারের সুস্পষ্ট নির্দেশ ছিল। ওদিকে আওয়ামী জাতীয়তাবাদীরা নরম গরম নির্বিশেষে সকল সমাজতন্ত্রিদেরই সব সময়ে অবিশ্বাস করে এসেছে। কারণ নরমপন্থিদের পেছনেও তো মুরব্বি ছিল রাশিয়া, আর উগ্র হোক চাই নরম হোক সকল জাতীয়তাবাদীরই শেষ ভরসা তো রাশিয়া নয়, আমেরিকাই।
এখনকার শাসকরা দেশে থাকলেও আচরণ করে বিদেশিদের মতো। সন্তানসন্ততি এবং আহরিত ও লুণ্ঠিত সম্পদ বিদেশে রাখতেই পছন্দ করে, ঘরবাড়িও বিদেশে তৈরি করছে, ক্রমাগত বর্ধিত হারে। জাতি সমস্যার সমাধান ঔপনিবেশিক আমলে ঘটেনি, আর ঘটেনি বলেই দেশভাগ ঘটেছে। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ভেতর দিয়েই বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা, তাই বলে বাংলাদেশকে যে একটি জাতি রাষ্ট্র হতে হবে এমন কোনো কথা ছিল না, এর হওয়ার কথা ছিল বরঞ্চ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এ যুগে এক জাতির জন্য এক রাষ্ট্রের ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়; একটি রাষ্ট্রে একাধিক জাতি থাকবে; দেখতে হবে সেখানে সকল জাতিসত্তা গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো পাচ্ছে কি না। কিন্তু দেখা গেল বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাকালীন জাতীয়তাবাদী শাসকরা আর যাই হোক গণতান্ত্রিক হতে মোটেই সম্মত নয়, যে জন্য তারা এ রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জন্যই বাঙালি হয়ে যাওয়াটা বাধ্যতামূলক হবে বলে সাংবিধানিক ফরমান জারি করে বসল। ফলে অবাঙালি জাতিসত্তাগুলো সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেল না; তাদের জন্য নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার নিশ্চয়তা রইল না।
কোনো কোনো দিকে এ রাষ্ট্র ব্রিটিশের ও পাকিস্তানিদের রাষ্ট্রের চেয়েও নিকৃষ্ট মানের। এ রাষ্ট্র তার নিজের আইন নিজেই মানে না; বেআইনি কাজ করে, নির্বিচারে সন্ত্রাস চালায়, হত্যাকাণ্ড ঘটায়। অধিকাংশ মানুষকে অধিকাংশ সময় ধরে অনিরাপদ অবস্থায় রেখে দেয়। টেলিফোনে আড়িপাতে, অপছন্দের ব্যক্তিদের নিখোঁজ করে দেয়। মেয়েরা তাদের নিজেদের চেষ্টায় এগোয়, কিন্তু নিরাপত্তার অভাবের দরুন বোরখা ও হিজাবের আচ্ছাদন গ্রহণে বাধ্য হয়। ভবনধসে, লঞ্চডুবিতে, সড়ক দুর্ঘটনায় অহরহ মানুষ মারা পড়ে, তারা সংখ্যা হিসাবে অল্প কিছুক্ষণ উল্লেখিত হয়, তারপর বুদ্বুদের মতো অতিদ্রুত ডুবে যায় বিস্মৃতির অতলে। রাষ্ট্র কোনো ব্যবস্থা নেয় না। স্কুলে ধর্মশিক্ষা আগের কোনো আমলেই বাধ্যতামূলক ছিল না, স্বাধীন বাংলাদেশের আমলে হয়েছে। ঔপনিবেশিক ও আধা-ঔপনিবেশিক যুগের মতোই এ রাষ্ট্র জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং জনগণও রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।



