
বন্ধু তিনি পিতাও তিনি
যতদিন আমি এই পৃথিবীতে প্রত্যহ ভোরে
মেলবো দুচোখ, দেখব নিয়ত-রৌদ্র ছায়ার খেলা,
যতদিন পাবো বাতাসের চুমো দেখবো তরুণ
হরিণের লাফ, ততদিন আমি লালন করব শোক।
নিহত জনক, এ্যাগামেমনন্ কবরে শায়িত আজ।
-শামসুররাহমান
বাঙালি জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাকে বলা হয় জাতির পিতা। এই জাতির জন্য তিনি একটি দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে অবশেষে বাঙালি জাতির জন্য স্বতন্ত্র একটি দেশের পত্তন করেছেন, বাংলাদেশ যার নাম। এজন্যই জাতির পিতার মর্যাদায় ভূষিত হয়েছেন তিনি। তার আগে এ দেশবাসী, বিশেষ করে ছাত্রসমাজ শ্রদ্ধা, সম্মান ও আদর করে তাকে আরেকটি অভিধায় অভিহিত করে। পাকিস্তানি শাসকরা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে ইতিহাসখ্যাত মিথ্যা মামলায় তাকে অভিযুক্ত করে। কারাগারে আটকে রাখে অনেকদিন। বাঙালি ছাত্র-জনতা সারাদেশে এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভে কেটে পড়ে। স্লোগান দিতে থাকে- ‘জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো।’
তালা ভাঙবার উত্তাপ আঁচ করে পাকিস্তানী শাসকরা শেখ মুজিবকে মুক্ত করে দেয়। জেল থেকে বেরিয়ে এলে ছাত্ররা তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দিয়ে বরণ করে নেয়। নাম হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
মধুমতি নদী বয়ে গেছে গোপালগঞ্জ জেলার ভেতর দিয়ে। গেছে টুঙ্গিপাড়া গ্রামের ভেতর দিয়েও। এই গ্রামেই শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম। তিন ভাইবোনের একমাত্র ভাই তিনি। বড় দুই বোনের পর বাবা মায়ের বড় আশা একটি পুত্র সন্তানের। শেখ মুজিব জন্ম নিলে তাদের সাধ পূরণ হয়। বড় আদরের সন্তান। নাম দিলেন খোকা। ডাক নাম। বাবা শেখ লুৎফর রহমান। আর মার নাম সাহারা খাতুন। ছোট বেলা থেকে শেখ মুজিব ছিলেন কোমল স্বভাবের। গরিব-দুখী মানুষের কষ্ট দেখলে তিনি সাহায্য করতে এগিয়ে যেতেন। খাবার বিলিয়ে দিতেন। অকাতরে বিলানো দেখে একদিন তার মা বললেন, খোকা তুমি যে সব ওদের দান করে দিচ্ছ, আমরা খাবো কি? খোকা জবাব দেয়, আমরা তো খাচ্ছিই, ওরা তো খাবার খেতে পায় না।
শৈশবকাল থেকে মানুষের প্রতি তার মমত্ববোধ লক্ষ্য করা গেছে। এরকম দু একটি ঘটনা বলা যায় এখানে। একদিন মুজিব দেখলেন শীতকালে এক বুড়ো মানুষ শীতে ঠক ঠক করে কাঁপছে। তিনি তার কষ্ট উপলব্ধি করে নিজের গায়ের চাদর বুড়োর গায়ে জড়িয়ে দেন। আরেকদিন তার স্কুলের এক গরিব বন্ধু বৃষ্টির মধ্যে ভিজে ভিজে বাড়ি ফিরছে। বন্ধুটির বাড়ি কিছু দূরে বলে সারা পথই তাকে ভিজে যেতে হবে। মুজিব বন্ধুর কষ্টে ব্যথিত হলেন ও ছাতাটি তাকে দিয়ে দিলেন। এজন্য বাড়ি ফিরে তাকে বকুনি খেতে হয়েছিল। শেখ মুজিবদের পরিবার খুব স্বচ্ছল ছিল না। অভাব অনটনের ভেতর দিয়ে তাদের চলতে হতো। ছোটকাল থেকে মুজিব যেমন ছিলেন চঞ্চল তেমনি দুরন্ত। তার মতন দুরন্ত ছেলে আরও ছিল। কিন্তু মুজিব ছিলেন দুরন্তপনায় সেরা। সবাই সেজন্য ভয় করত আবার ভালোও বাসতো। তাদের নেতা ছিলেন মুজিব। মুজিব না হলে খেলা জমে ওঠে না। আর দলও সরগরম হয় না।
চঞ্চলতার জন্য মুজিবের লেখাপড়া শুরু হয় কিছুটা দেরিতে। সাত বছর বয়সে স্কুলে যেতে শুরু করলেন। ভর্তি হলেন গিমাডঙ্গো প্রাইমারি স্কুলে। তৃতীয় শ্রেণীতে ওঠার পর স্কুল বদল হলো। এরপর গেলেন স্থানীয় মিশনারি স্কুলে। চোখের একটি জটিল রোগের নাম বেরিবেরি রোগ। সেই রোগে আক্রান্ত হলেন মুজিব। একটি চোখে অপারেশন করতে হলো। এর ফলে চার বছরের জন্য লেখাপড়া বন্ধ থাকে। আঠারো বছর বয়সে ১৯৩৭ সালে আবার মিশন স্কুলে ভর্তি হন। এই স্কুল থেকেই ১৯৪২ সালে তিনি ম্যাট্রিক পাশ করেন।
স্কুলে যখন অস্টম শ্রেণীতে পড়ছিলেন, তখন স্কুল পরিদর্শনে গেলেন প্রধানমন্ত্রী। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক তখন অভিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীকে সম্বর্ধনা সভায় পুস্পমাল্য দেয়া হলো। প্রধান শিক্ষক মানপত্র পাঠ করলেন। অনেকে বক্তৃতা করলেন। সবই হলো। কিন্তু কেউই ছাত্রদের অভাব-অভিযোগ প্রধানমন্ত্রী বরাবর তুলে ধরলেন না। সাহস করে কেউ দাবি- দাওয়ার কথা জানাতে পারলো না। হালকা পাতলা ও লম্বাটে গড়নের শেখ মুজিব সাহস করে এগিয়ে গেলেন। জেদ করে বললেন, আমাদের অসুবিধার কথা আমিই বলবো। পুলিশের বেষ্টনী ভেদ করে ভিড় ঠেলে শেরে বাংলার নিকটে গিয়ে পৌঁছলেন। পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বললেন, আমাদের দাবি পূরণ না করে আপনি কিছুতেই যেতে পারবেন না। শেরে বাংলা মুজিবের সাহস ও প্রত্যয় দেখে চমৎকৃত হলেন। অবিলম্বে তিনি দাবি মেটানোর আশ্বাস দিলেন। ছেলে বেলা থেকেই মুজিব ছিলেন এরকম এক রোখা স্বভাবের। সাহস এবং জেদ তার ব্যক্তিত্বের মধ্যে বিকাশ লাভ করতে থাকে বালক বয়স থেকে।
মুসলমান ছাত্রদের একমাত্র সংগঠন নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশন। এতে তিনি যোগ দেন ১৯৪০ সালে। এক বছরের জন্য ফেডারেশনের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ম্যাট্রিক পাশ করেন ১৯৪২ সালে। এরপর কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসে। একই বছর তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৪৬ সালে কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। বি এ পাশ করেন ১৯৪৭ সালে। একই সালে ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে আলাদা দুটি রাষ্ট্র গঠিত হয়। ঠিক এ সময়ই হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে দাঙ্গা শুরু হয় কলকাতায়। আগুন, সংঘর্ষ ও মানুষের মৃতদেহের স্তুপ চারদিকে। এই পরিস্থিতিতে শান্তিবাদী মানুষেরা দাঙ্গা বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলেন। এর সঙ্গে জড়িত হন শেখ মুজিব। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্যান্যর সঙ্গে তিনি দাঙ্গা ঠেকানোর জন্য কাজ করেন। এরপর তিনি ঢাকায় চলে আসেন। পরের বছর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। সে বছরই ৪ জানুয়ারি মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট পাকিস্তান নামক নতুন দেশ প্রতিষ্ঠিত হলে এর অংশ হয় দুটি। একটি পূর্ব পাকিস্তান ও অন্যটি পশ্চিম পাকিস্তান। সবাই আশা করেছিলেন এবার বুঝি আর শাসন-শোষণ থাকবে না। জুলুম-নির্যাতন থাকবে না। কিন্তু না, পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বাংলাদেশের মানুষের ওপর প্রভুত্ব কায়েম করতে চাইলো। সকল ব্যাপারে পূর্ব বাংলাকে দাবিয়ে রাখার ষড়যন্ত্র আঁটতে লাগলো। তারা প্রথম আঘাত হানলো ভাষা ও সংস্কৃতর ওপর। পাকিস্তানের দুই অংশেরই রাষ্ট্রভাষা উর্দু বলে তারা ঘোষণা করলো। বাঙালী জাতি এই হীন চক্রান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালো। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে তারা গর্জে উঠলো।
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ দেশব্যাপী ধর্মঘট পালিত হলো। শেখ মুজিবসহ সে সময়ের অন্যান্য নেতৃবৃন্দের চেষ্টায় বাংলা ভাষার পক্ষে জোরদার আন্দোলন দানা বেঁধে উঠলো। গ্রেফতার করা হলো শেখ মুজিব এবং আরো অনেককে। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে ধর্মঘট পালন করতে থাকেন। গরিব কর্মচারীদের আন্দোলনের সঙ্গে শেখ মুজিব জড়িত হয়ে যান ওতোপ্রোতভাবে। এজন্য তাকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অযৌক্তিকভাবে জরিমানা ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করেন। পরে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এ বছরের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়। শেখ মুজিব তখন জেলে। সে অবস্থায়ই তিনি দলের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। জুলাই মাসে ছাড়া পাবার পর ভুখা মিছিলে নেতৃত্ব দেবার অভিযোগে আবারও তাকে গ্রেফতার করা হয়।
এরপর আসে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন চলাকালে মুজিব ছিলেন কারাগারে। একুশের দিনে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে মুজিব জেলখানায় একটানা ১৩ দিন অনশন পালন করেন। ১৯৫৫ সালের ৫ জুন পাকিস্তানে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। শেখ মুজিব গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৭ জুন পল্টন ময়দানের জনসভায় পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন দাবি করে ২১ দফা ঘোষণা করা হয়। গণপরিষদের (জাতীয় সংসদ) অধিবেশন চলাকালে শেখ মুজিব পরিষদের স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা বহুবার দাবি জানিয়ে আসছি, আপনারা এটাকে (পূর্ব পাকিস্তান) বাংলা নামে ডাকেন। বাংলা শব্দটির একটি নিজস্ব ইতিহাস আছে, আছে এর একটা ঐতিহ্য।’
পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইসলাম ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের কৌশল প্রয়োগ করতে থাকে। শাসকের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করলেই বলতো- ইসলাম গেল, ইসলাম গেল। এজন্য আওয়ামী লীগকে সর্বজনীন দল হিসেবে পরিচিত করার জন্য মওলানা ভাসানীর প্রস্তাবে দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়া হয়।
১৯৫৫ সালের ২১ অক্টোবর দলের কাউন্সিল অধিবেশনে এ প্রস্তাব পাশ হয়। শেখ মুজিব দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করেন মেজর জেনারেল আইউব খান। নিষিদ্ধ করা হয় রাজনীতি। মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবসহ অসংখ্য রাজনৈতিক নেতাকে আটক করা হয়। ১৯৬১ সালের ডিসেম্বরে ছাড়া পান। জননিরাপত্তা আইনে পরের বছর ২ জুন আবারো গ্রেফতার করা হয়। রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে ১৯৬৫ সালে পুনরায় গ্রেফতার হন। বাঙালীর মুক্তিসনদ বলে পরিচিত ঐতিহাসিক ৬ দফা তৈরি হয়। পাকিস্তানের বিরোধী দলসমূহের জাতীয় সম্মেলনে শেখ মুজিব ৬ দফা পেশ করেন। এ বছরই তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ৮ মে আবার তিনি গ্রেফতার হন। রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সাজানো হয়। এর এক নম্বর আসামী করে তাকে ঢাকা সেনানিবাসে গ্রেফতার করা হয়।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের ফলে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবকে সামরিক সরকার মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। পরদিন কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে রমনা রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ১০ লাখ লোকের সমাবেশ হয়। সমাবেশে ছাত্র সমাজ তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভ‚ষিত করে। নামের সঙ্গে যুক্ত হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বেসামাল রাজনৈতিক অবস্থা দেখে জেনারেল ইয়াহিয়া খান সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতা দখল করেন।১৯৭০ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় নির্বাচন। দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭ আসনে এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩১০টি আসনের মধ্যে ৩০৫টি আসনে শেখ মুজিবের দল আওয়ামী লীগ জয়যুক্ত হয়। কিন্তু পাকিস্তানী শাসকরা ষড়যন্ত্র করে ক্ষমতা হস্তান্তর স্থগিত করে।
১৯৭১ সালের ৩ মার্চ এর প্রতিবাদে হরতাল হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চ রেসকোর্সের বিশাল জনসভায় ঘোষণা করেন, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করেই ছাড়বো ইনশাল্লাহ।‘ এরপর থেকে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। হঠাৎ করে ২৫ মার্চ রাতে নিরস্ত্র বাঙালীদের ওপর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আক্রমণ শুরু করে। রাত ১টায় বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। গ্রেফতার বরণের পূর্বক্ষণে তিনি এক বার্তা দিয়ে যান। তাতে বলেন, ‘এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের জনগণ তোমরা যে যেখানেই আছ এবং যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য আমি তোমাদের প্রতি আহবান জানাচ্ছি।‘
এই ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য এই আমরা ওদিন স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করি। বার্তাটি চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বার বার প্রচারিত হয়।
এরপর শুরু হয় এক রক্তক্ষয়ী লড়াই। আমরা যাকে বলি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ সেটা চলে টানা নয় মাস। ৩০ লাখ নিরীহ নিরস্ত্র মানুষের প্রাণের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা লাভ করি। স্বাধীন বাংলাদেশ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং এদেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রায় সারাটি জীবন ব্যয় করে গেছেন। অত্যাচার নির্যাতন সয়েছেন, কারাভোগ করেছেন। জেল খেটেছেন ১১টি বছর। কিন্তু কখনো শাসক ও অন্যায়ের সঙ্গে আপোস করেননি। বাঙালি জাতি অবিসম্বাদিত এই নেতাকে জাতির পিতার মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। এ দেশ, এই জাতি যতদিন পৃথিবীর মানচিত্রে অটুট থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও অমর হয়ে থাকবেন। এখন থেকে সাড়ে চার দশক আগে তার মৃত্যু হয়েছে। অস্বাভাবিক প্রয়াণ কবলিত হয়ে তিনি মহাপ্রয়াণে ধাবিত হয়েছেন।
ভারতের বিশিষ্ট লেকক ও বুদ্ধিজীবী অন্নদা শংকর রায় বঙ্গবন্ধুর হত্যা সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের বছর দেড়েক আগে এক বাঙালি মুসলিম ভদ্রলোক শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন তার কন্যাকে বিশ্বভারতীর কোনো এক বিভাগে ভর্তি করার জন্য। একদিন তিনি সুজিত বাবুর কন্যাকে বলেন, ‘দেখবেন রুচিরাদি, একদিন আমরা শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করব। ঘটনার পরে এই কথা শুনে আমি একেবারে হতভম্ব হয়েছিলাম। হত্যার পরিকল্পনাটি তাহলে বাংলাদেশের সংবিধানে সম্প্রতি সংযোজিত চতুর্থ সংশোধনী, বাকশাল গঠন ইত্যাদি পদক্ষেপের জন্য নয়, পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ গড়ার জন্য। সেটাই বঙ্গবন্ধুর আসল অপরাধ এবং এর জন্য একদিন তাকে চরম দন্ড পেতে হলো। তাও সপরিবারে। একজনও নাহি রবে বংশে দিতে বাতি। কৃত্তিবাসী রামায়ণে পড়েছিলাম রাবণের সম্বন্ধে। কিন্তু ঘটনাচক্রে দুই কন্যা রয়ে গেলেন, হাসিনা ও রেহানা, শেখ মুজিবের বংশ। সৌভাগ্যক্রমে বাংলাদেশের জনগণের ভোটে শেখ হাসিনা নির্বাচনে সদলবলে সফল হয়ে সরকার গঠন করেছেন- এটি একটি ইতিহাস সৃষ্টিকারী ঘটনা।
সুদীর্ঘ বিরতির পর বঙ্গবন্ধু পুনরুত্থান ঘটল। এটা এক প্রকার রেজারেশন। কবর থেকে তিনি বেরিয়ে এসেছেন জনগণের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাদের সেবা করার জন্য। জনগণ তাকে ভোলে নি, ভুলবেও না। তবে তার স্মৃতিকে চিরস্থায়ী করার জন্য একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা আবশ্যক। যেমন হয়েছে ফজলুল হক সাহেবের বেলায়, নাজিমুদ্দিন সাহেবের বেলায় ও সোহরাওয়ার্দী সাহেবের বেলায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের কীর্তি তাদের কীর্তির থেকেও দীর্ঘস্থায়ী হবে। কারণ, বাংলাদেশেই তার কীর্তি। তার সম্বন্ধে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আমি যা লিখেছিলুম তা আরও একবার উদ্ধৃত করি।
যতকাল রবে পদ্মা যমুনা
গৌরী মেঘনা বহমান
ততকাল রবে কীর্তি তোমার
শেখ মুজিবর রহমান।
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়াারি তারিখে। তার ডানপাশে বসিয়েছিলেন আমাকে। বলেছিলেন, ‘আমি যখন বুঝতে পারলাম আমাদের দেশ স্বাধীন হতে চলেছে তখন আমি আমার অনুগামীদের জিজ্ঞাসা করি, স্বাধীনতার পর আমাদের দেশের নাম কি হবে? তখন কেউ বলেন, পূর্ব বাংলা, কেউ বলেন, পাক বাংলা। আমি বলি, না, বাংলাদেশ। তারপরে আমি জিজ্ঞাসা করি, আমাদের ধ্বনি কি হবে? আমি নিজেই উত্তর দেই, জয় বাংলা।’
গোপালগঞ্জে কিশোর বয়সে থানায় ঢিল ছুঁড়ে তিনি তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন। শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাকশাল নামক এক প্রকান্ড ঢিল ছুঁড়ে তিনি তার জীবনের ইতি টেনেছেন।❐



