প্রধান খবরবাংলাদেশ

বাঙালির জাতির ইতিহাসে এক গৌরব ও অহঙ্কারের দিন

রূপসী বাংলা ঢাকা ডেস্ক রিপোর্ট:  আজ ১৬ ডিসেম্বর। মহান বিজয় দিবস। বাঙালির জাতির ইতিহাসে এক গৌরব ও অহঙ্কারের দিন। ১৯৭১ সালের এই দিন বিশ্বের মানচিত্রে জন্ম হয় বাংলাদেশ নামে স্বাধীন-সার্বভৌম নতুন একটি দেশের। কালের বিবর্তনের মাধ্যমে এ বছর আমরা সেই দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত বিজয়ের ৪৭ বছরে পদার্পন করেছি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ’৭১-এর এই দিনে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আত্মসমর্পণ করে। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে বাঙালি জাতি স্বাধীনতা সংগ্রামে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। সেদিন জাতি নির্ভয়ে গেয়ে উঠেছিল অবিনাশী গান- ‘একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার/সারাবিশ্বের বিস্ময় তুমি আমার অহঙ্কার।’ এরই ধারাবাহিকতায় বাঙালি প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। জাতি শ্রদ্ধাবনতচিত্তে স্মরণ করছে পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া শহীদদের।

প্রতিবছর বিজয়  দিবস আমাদের জীবনে আসে নতুন প্রেরণা নিয়ে। এবারের বিজয় দিবস পালিত হচ্ছে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামী, রাজাকার, আল বদর, আল শামস ও তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের প্রত্যাখ্যান করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে বিজয়ী করার প্রত্যয়ে উজ্জবিত জাতি দিবসটি উদযাপন করছে ভিন্নভাবে।

দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি  মো আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণীতে আত্মত্যাগকারী শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং দেশবাসী, প্রবাসী বাংলাদেশী, মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। বিদেশেও বাংলাদেশি মিশনগুলো বিজয় দিবসের কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। আজ সরকারি ছুটির দিন। ঢাকার বিভিন্ন বিদেশি দূতাবাস এবং সংশিষ্ট অফিসগুলোও আজ বিজয় দিবসে বন্ধ থাকবে। সারাদেশে সরকারি-বেসরকারি সব ভবনে উত্তোলন করা হয়েছে জাতীয় পতাকা।

সংবাদপত্রগুলোও এ উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতারসহ বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করছে। সারাদেশে চলছে আনন্দ অনুষ্ঠান। বিজয় দিবস উপলক্ষে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভবনে আলোকসজ্জা করা হয়েছে। সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধসহ বিজয় দিবসের সব অনুষ্ঠান ঘিরেই গ্রহণ করা হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তাবলয়।

আজ থেকে ৪৭ বছর আগে ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী বাঙালির দেশপ্রেম, ঐক্য ও শৌর্যবীর্যের কাছে পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। ১৬ ডিসেম্বর বিকাল ৪টা ৩১ মিনিটে ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তি আর মিত্রবাহিনীর সামনে অস্ত্র ফেলে দিয়ে হানাদাররা অবনত মস্তকে দাঁড়ায়।

একই বছর ২৬ মার্চ বিজয় অর্জনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে অকুতোভয় বাঙালি জাতি যে যুদ্ধ শুরু করে- এর সমাপ্তি হয় ৩০ লাখ শহীদের রক্ত ও ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে এক আনন্দ-বেদনার সম্মিলনে।

বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস শুধু একাত্তরেই সীমাবদ্ধ নয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে বিস্ফোরিত জাতীয় চেতনার পথ ধরে ধারাবাহিক সংগ্রামে ১৯৬৯ সালে ঘটে গণতন্ত্র ও জাতীয় অধিকারের জন্য গণঅভ্যুত্থান। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফলে তৎকালীন পাকিস্তানে বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষার বিস্ফোরণ ঘটে। কিন্তু সেই নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনের সুযোগ না দিয়ে পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালিকে রক্তস্রোতে ভাসিয়ে দিতে চায়, শুরু করে গণহত্যা। সশস্ত্র প্রতিরোধের পথ ধরে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং বিজয় অর্জন ছিল ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতি।

আজ রাজধানী ঢাকা থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত উদযাপিত হচ্ছে বিজয় দিবস। ঢাকায় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বিজয় উৎসবের মতো ডিসেম্বরের প্রথম থেকেই শুরু হয়েছে নানা আয়োজন।

সশস্ত্রবাহিনী সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে তেজগাঁও পুরনো বিমানবন্দর এলাকায় ৩১ বার তোপধ্বনি করে দিবসের অনুষ্ঠানমালা শুরু করবে। সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর বাদক দল রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় যন্ত্রসঙ্গীত পরিবেশন করবে। বিজয় দিবস উপলক্ষে সকালে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্র, বিরোধীদলীয় নেত্রী, সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য ও আওয়ামী লীগের নেতারা, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারসহ বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, কূটনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন।

 

একাত্তরের সেই আনন্দময় দিনটি:

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সকালে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনের কর্মকর্তা জন আর কেলি পৌঁছেন সেনানিবাসের কমান্ড বাঙ্কারে। সেখানে নিয়াজি নেই, ফরমান আলিকে পাওয়া গেল বিবর্ণ ও বিধ্বস্ত অবস্থায়। ফরমান আলি জানান, আত্মসমর্পণ সংকল্পবদ্ধ মিত্রবাহিনীর প্রস্তাব তারা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সেই সংবাদ  জানাতে পারছেন না। প্রস্তাব দেয়া হলো জাতিসংঘের বেতার সংকেত ব্যবহারের। আত্মসমর্পণের জন্য বেঁধে দেয়া সময় সকাল সাড়ে ৯টা থেকে আরও ছয় ঘণ্টা বাড়িয়ে আত্মসমর্পণের বার্তা পৌঁছানো হয় জাতিসংঘের বেতার সংকেত ব্যবহার করে। ভারতে তখন সকাল ৯টা ২০ মিনিট। কলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডের (বর্তমান শেক্সপিয়র সরণি) একটি দোতলা বাড়িতে বাংলাদেশ সরকারের প্রথম সচিবালয় আর প্রধানমন্ত্রীর দফতর। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের সকাল। আনুমানিক সকাল ১০টায় তাজউদ্দীন আহমদের ফোন বেজে উঠল। ওই ফোনে গুরুত্বপূর্ণ কেউ ছাড়া ফোন করতে পারে না। কী কথা হলো জানা না গেলেও তার চোখ-মুখে আনন্দের ছাপ বোঝা গেল। ফোন রেখেই প্রধানমন্ত্রী জানালেন, ‘সবাইকে জানিয়ে দিও, আজ আমরা স্বাধীন। বিকাল ৪টায় আত্মসমর্পণ।’

এদিকে কিছুক্ষণ আগে ঢাকায় খবর এসে পৌঁছেছে। বিকাল সাড়ে ৪টায় আত্মসমর্পণ হবে। ঢাকাবাসী কী করবে আর কী করবে না- বুঝে উঠতে পারছে না। সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে মিত্রবাহিনী ঢাকায় প্রবেশ করল।

পৌষের সেই পড়ন্ত বিকালে ঢাকা রেসকোর্স ময়দান (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) প্রস্তুত হলো ঐতিহাসিক এক বিজয়ের মহূর্তের জন্য। বিকাল ৪টা ৩১ মিনিটে পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক জোন-বি এবং ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার লে. জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজির নেতৃত্বে আত্মসমর্পণ করে ৯১ হাজার ৫৪৯ জন হানাদার সেনা। মেজর জেনারেল জ্যাকবের তৈরি করা আত্মসমর্পণের দলিলে বিকালে সই করলেন লে. জেনারেল নিয়াজি ও লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। মুজিবনগর সরকারের পক্ষে এ সময় উপস্থিত ছিলেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন একে খন্দকার। ৯ মাসের জঠর-যন্ত্রণা শেষে জন্ম নিল একটি নতুন দেশ- বাংলাদেশ।

 

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension